শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক গল্প, কোজাগরী পূর্ণিমায়

শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক গল্প, কোজাগরী পূর্ণিমায়

Advertisemen
মাছ না ধরলে মাছ ধরার গল্পও লেখা যায় না, আমার বেশ কয়েকটি গল্প আছে মাছধরা নিয়ে। এই গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল আজকের সম্পূর্ণায়। পরে আমার বই এ ছাপা হয়।
(আহা আমি মাছ ধরি আনন্দে, আপনিও ধরবেন নাকি? 
একটু আধুনিক হোন মশাই, ওই কেঁচো আর আঁটা দিয়ে আর কতদিন চালাবেন? 


কোজাগরী পূর্ণিমায়
            বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

কুবেরের বাবা কানাই ছেলের নাম কুবের রাখার আগে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসটা যে পড়েনি সেটা আমি ভাল মতোই জানি। কারণ কানাই খুড়ো নিজের নামের বাইরের একটা অক্ষরকেও চিনত না। এর মানে কিন্তু এটা নয় যে কানাই খুড়ো নিজের নামের অক্ষর গুলোকে চিনত। নিজের নামের বানান আঁকতে পারত বলেই কানাই খুড়ো নিরক্ষর ছিল না। তবে কানাই খুড়ো কেন ছেলের নাম কুবের রেখেছিল সেটা কিন্তু কারুরেই জানা নেই। এমনকি কুবেরের নিজেরও না।
 আর যাই হোক কুবেরের নামকরণ কিন্তু সার্থক। জাল আর মাছ ছাড়া কুবের তেমন ভাবে আর কিছুই চেনে না। তাতে বর্ষার শুরুই হোক বা শেষ, কুবের জাল কাঁধে নিয়ে ঠিক বেরিয়ে পড়ে । গেল বছর ডাকে বত্রিশ হাজার টাকা আর সত্তর কেজি মাছের বিনিময়ে তাঁতিদের পদ্ম-পুকুরটা দু’বছরের লিজে নিয়েছে কুবের। প্রচুর পরিমাণ মহুয়ার খৈল দিয়ে পুকুরের তেলাপিয়া মাছ গুলোকে মেরে চুন দিয়ে জল পরিষ্কার করে গতবছর বর্ষায় কাতলা মাছের ডিম ফাটিয়ে ছিল কুবের। এখন সেই মাছগুলো পদ্ম গাছ নাচিয়ে নাচিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পোনামাছ গুলো সকাল বেলায় ঘাটের কাছে এসে ঝাঁককে ঝাঁক চাক কাটে। সেটা লোকের চোখে পড়েছে। তাই এখন কুবেরকে রাতের বেলায় পাহারা দিতে হয়। পাহারা দেবার জন্যেই পুকুরটার পশ্চিম কোনে খড়ের একটা ঘর বানিয়েছে কুবের। সেখানেই খেজুর তাড়ির নেশায় বুঁদ হয়ে সারারাত শুয়ে থাকে।
 কার্তিক মাসের পর থেকে মাছ আর বাড়ে না। ঠাণ্ডার আমেজ পড়লেই মাছের বাড় বন্ধ হয়ে আসে। বিশেষ করে রুই আর কাতলা মাছগুলো ঠাণ্ডায় বেশি ছোটাছুটি করতে চায় না। তাই মাঝে মাঝেই কুবেরকে জাল ফেলে মাছ গুলোকে ছোটাতে হয়। আর সন্ধ্যার সময় জলে খিয়া দেওয়ার আরেকটা সুবিধে হল মাছ গুলো আত্ম সচেতন হয়। জলের ধারে আসে না, ফলে চুরির ভয় কম থাকে। 
  ।।২।।

প্রতিদিনের মতো আজকে রাতেও কুবের তাড়ির নেশায় বুঁদ হয়ে খড়ের ঘরটার ভেতরেই পড়েছিল। কিন্তু যে কারণেই হোক না কেন আজকে ওর ঘুম আসছিল না কিছুতেই। বুকের ভেতর একটা অপরিচিত দুশ্চিন্তা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল সন্ধ্যা থেকে। বেশ কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পরেও যখন চোখের পাতা এক করতে পারল না তখন বিছানা ছেড়ে উঠে বসল কুবের। বিড়ির বান্ডিল থেকে একটা ৫২২ বিড়ি বারকরে দুটো আঙুল দিয়ে বেশ কয়েকবার রগড়ে নিল। তারপর বিড়ির মাথায় কয়েকবার ফুঁ’দিয়ে দেশলাইয়ের আগুনে ফোঁস করে ধরাল বিড়িটাকে। এক মুহূর্তের জন্য খড়ের ঘরটা আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুব মারল। তাড়ির নেশার উপর বিড়ির ধোঁয়ার চোট পড়তেই মাথাটা বেশ ভার ভার লাগল কুবেরের। মুহূর্তের জন্য একবার ভাবল টর্চটা নিয়ে বাইরেটা ঘুরে আসবে। কিন্তু বাইরে মাঘের ঠাণ্ডা বাঘের কামড় বসাবে ভেবেই ইচ্ছেটা চুপসে গেল হয়তো পরের মুহূর্তে। ঠিক এমন সময় পুকুরটার দক্ষিণ পাড়ের দিক থেকে ভেসে এলো কয়েকটা শেয়ালের হুক্কাহুয়া হুক্কাহুয়া সুর। শেয়ালগুলো কয়েকবার ডেকেই চুপ করে গেল নিজের খেয়ালে। হটাৎ করেই কুবেরের মনে পড়ল শশীর মুখটা। গলায় দড়ি দিয়ে মরেছিল শশী। লোকে বলে কুবেরের জন্যই নাকি গলায় দড়ি দিয়েছিল শশী।
 কোজাগরী পূর্ণিমার রাত। গ্রামের প্রায় সবাই গিয়েছিল পাশের গ্রামের লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে যাত্রা দেখতে। পুকুরে মাছ পাহারা দেবার অজুহাতেই যাত্রা দেখতে যায়নি কুবের। কল্পনাতীত ভাবেই ধান ক্ষেতের ভেতর কুবের আর রত্নার উলঙ্গ শরীরে শশীর টর্চের আলো পড়েছিল সেদিন। ‘তুই একটা বেইমান। বেইমান তুই একটা,’ বলতে বলতে সেখান থেকে ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল শশী। সেদিন ভোরে পায়খানা করতে গিয়ে রঞ্জন প্রথম দেখেছিল তাল বাগানের পাশের শিশু গাছটার ডালে শশীকে ঝুলতে। চোখ দুটো রাক্ষসের মতো বেরিয়ে গিয়েছিল শশীর। শশীর মুখটা মনে পড়তেই বুকটা কেমন যেন ছ্যাঁক করে ওঠে কুবেরের। সারা শরীরে ভয়ের একটা ঢেও খেলে যায়। গায়ে কাঁটা দেয়।
 সকালের দিকে যখন কুবেরের ঘুম ভাঙে তখন পুকুরটাতে গুটিকয়েক হাঁস ছাড়া আর কিছুই নেই। যে যার প্রাতঃকৃত্য সেরে কখন যে ফিরে গেছে কুবের আজ টের পায়নি। শশীর মুখটা আরেকবার মনে পড়ে কুবেরের। আবার শরীরে কাঁটা দেয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নেয় কুবের।
       ।।৩।।
আজকে সকাল থেকেই জ্বর-জ্বর লাগছিল চায়নার। কালকে রাতেও ভাল করে খাবার খেতে পারেনি। এই কদিনে ডান পায়ের গাঁটের ব্যথাটাও যেন একটু বেড়েছে। একবার ভেবেছিল পরিমলের দোকান থেকে যা হোক কয়েকটা ট্যাবলেট কিনে আনবে। কিন্তু সময় হয়নি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই গোয়াল ঘর পরিষ্কার করা। তারপর পুকুর গিয়ে পায়খানা আর স্নান সেরে কাপড় কেচে আসা। আজকে যদিও মাথায় স্নান করতে পারেনি তবুও তো পায়খানা করে কাপড় কেঁচে ভেজা কাপড়েই ঘরে ফিরতে হয়েছে চায়নাকে। বাসি ঘরদোর পরিষ্কার করে ভাত বসাতে হয়েছে।
 বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জ্বরটাও যেন একটু একটু করে বাড়তে শুরু করল। জ্বরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুরু হল কপালের ব্যথা। ছেলের স্কুল থেকে ফিরতেও এখন অনেক দেরি। নতুবা নিতাইকে দিয়েই কিছু ঔষধ আনিয়ে নিতে পারত চায়না। কুবের সেই যে ভোরে মাছ নিয়ে বেরিয়েছে আর ফেরার নাম নেই। ফিরলেই বা কি! হয় চুল্লু নয় তাড়ি গিলেই তো ঘরে ফিরবে। ও তো আর চায়নার জন্য পরিমলের দোকানে যাবে না। চায়না কিছু বলতে গেলেই বলবে, ‘অমন জ্বর আমার ডেলি আসে। নিজেই সাইরবেক। তুকে বারোমাস ডাক্তার দেখাবার পয়সা নাই। তুর বাপকে বল।’ কোনোদিন যদি চায়না রাগের মাথায় বলে ফেলে, ‘ডেলি ডেলি তুমার মদ গিলার পয়সা আছে আর আমি কিছু বল্লেই বাপকে বল।’ ব্যাস তাহলেই চায়নার চোদ্দ গুষ্টির ষষ্ঠীপূজা হবে। তাই চায়না কুবেরকে কিছুই বলতে চায় না। কুবের মাঝেমধ্যে ঘরের জন্য যে মাছ গুলো নিয়ে আসে তার থেকেই এক দুটোকে এদিক সেদিক করে চায়নাকে নিজের সখ আহ্লাদ মেটাতে হয়।
 অন্যান্য দিনের মতোই আজকে যখন কুবের ঘরে ফিরল তখন বেলা গড়িয়ে বিকেল হব হব। চায়না ঘরের উঠোনে এক চিলতে রোদের উপর খাট পেতে শুয়েছিল। কুবেরকে ঘরে ঢুকতে দেখেই হড়বড় করে উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করে, ‘সিনান সেরে ভাত খাবে না ভাত এখুনি বাড়ব ?’
কুবের কিছু যেন একটা চিন্তা করে বলে, ‘না আজকে বেশ জাড় জাড় লাগছে থাক আজকে। বাড় ভাত বাড়।’
চায়না অদ্ভুত ভাবে কুবেরের মুখের দিকে একবার তাকায়। আজকে কুবের বেশ শান্ত। দেখেই মনে হচ্ছে আজকে মদ খায়নি। অনেকদিন পর কুবেরের শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে চায়নার মনে একটা স্মৃতির ভেলা ভেসে উঠে। তখনো নিতাই পেটে আসেনি। দীঘার সমুদ্র তার ছোটবড় ঢেও গুলো দিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল চায়নাকে। কুবের বালির পাড়ে দাঁড়িয়ে অপলক ভাবে তাকিয়েছিল চায়নার ভেজা শরীরটার দিকে। সমুদ্র স্নান সেরে চায়না উঠে এলে কুবের চায়নাকে আলতো ভাবে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘ভেজা শাড়িতে তুকে মাগুর মাছের মতো লাইগছে।’ বিয়ের আগে চায়না মল্লিকা বৌদির কাছে প্রথম হানিমুন শব্দটা শুনেছিল। শুনেছিল হানিমুনে কী কী হয়। সেই তখন থেকেই হানিমুনকে ঘিরে চায়নার কত স্বপ্ন ছিল। না বলেনি কুবের। চায়নার ইচ্ছে মেটাবার জন্যেই বিয়ের পর পরেই দুজনে মিলে গিয়েছিল দীঘায়। সেটা নিয়ে পাড়ায় কত কথা। কুবের পাত্তা দেয়নি সেদিন কারুর কথায়।
 এখন কুবের নিজের মনেই ভাত খেয়ে যাচ্ছে। চায়না কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কুবেরের দিকে তাকিয়ে ভেতরটা খুঁড়ে খুঁড়ে বেরকরে আনছে নানা রঙের দিনগুলি। চায়নার মনেও পড়ে না ঠিক কখন থেকে কুবের পালটে গেল। আগে এত মদ খেত না কুবের। শশী মরার পর থেকেই মদে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। কুবেরের মুখেই চায়না শুনেছে শশী আর কুবেরের বন্ধুত্বের কত গল্প। হরিহর আত্মা ছিল নাকি দুজনে। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা এক সঙ্গে নিয়ম করে পুকুর যাওয়া। আলু বাড়িতে জল পাওয়াতে যাওয়া। সরসে কিংবা বেগুন বাড়িতে ওষুধ দিতে যাওয়া। দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতেই পারত না। চায়না জানে না কী করে দুজনের ভেতর ফাটল তৈরি হয়েছিল। তবে পুকুর ঘাটে অনেককেই গল্প করতে শুনেছে শশীর বৌয়ের সাথে কুবেরের সম্পর্ক ছিল বলে। বিশ্বাস হয়নি চায়নার। কিছুতেই বিশ্বাস হয়নি। ওর বিশ্বাস কুবের আর যাই হোক চরিত্রহীন নয়।
     

    ।।৪।।
নিতাই একটা প্ল্যাস্টিকের বল দেওয়ালে ছুড়ছে আর লুফছে। এভাবে অনেকক্ষণ ধরেই একা একাই খেলে যাচ্ছে ছেলেটা। আজকে বিকেলের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে বলেই হয়তো কেও খেলার মাঠে আসেনি আজ। তাই বাধ্য হয়েই একা একা খেলতে হচ্ছে নিতাইকে। কুবের জালের ছেঁড়া অংশ গুলোকে সুতো দিয়ে জোড়া দিতেই দিতেই একবার করে আড়চোখে তাকিয়ে দেখছে নিতাইকে। ঠিক বাবার মতোই হয়েছে নিতাই। ঝাঁকড়া চুল, চওড়া কপাল, ধারালো নাক, পুরু ঠোঁট সবেই কুবেরের মতো। চোখ দুটো শুধু চায়নার মতো পেয়েছে। নিতাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আনমনা ভাবেই কানে গুঁজে রাখা বিড়িটা ধরায় কুবের। ফোঁস ফোঁস করে কয়েকটা টান দিয়ে আবার নিজের কাজে ডোবার চেষ্টা করে। ঘরের উঠোনটা বিড়ির গন্ধে ভরতে থাকে। হটাৎ পশ্চিমের আকাশে বিদ্যুতের ঝলক ফুটে উঠতেই টালির চালের কড়িকাঠের সাথে বাঁধা হাড়িগুলোর ভেতর থেকে পায়রা গুলো বকম্ বকম্ করে ওঠে। আবার বৃষ্টি নামবে মনে হয়।
 সন্ধ্যার গড়ায় গড়ায় শুরু হয় অঝোর বৃষ্টি। ম্যাজম্যাজে বাল্বের আলোয় বসে কুবের তখনো নিজের কাজ করেই চলেছে। নিতাই বাবার পাশে বসে, ‘কালছিল ডাল খালি...’ কবিতাটা পড়তে পড়তেই আড়চোখে উঠোনের দিকে তাকিয়ে দেখছে বৃষ্টি থেমেছে কি না । বৃষ্টি থামলেই নিতাই ছুটবে পুকুরের দিকে। উজানে আজ মাছ ভেসে বেরিয়ে আসবে ভালমতোই জানে নিতাই। মাছ ধরার নেশাটাও নিতাইয়ের কুবেরের মতোই। বৃষ্টিটা একটু ধরতেই বিড়ি টানতে টানতে বাইরে বেরিয়ে আসে কুবের। দেখে রাস্তার জল গড়িয়ে গিয়ে হুড় হুড় করে নামছে মণ্ডলদের ডোবায়। কাছে পিঠের খালবিল গুলো থেকে ভেসে আসছে হরেক রকম ব্যাঙের সুর। অন্ধকারে পুকুরটাকে দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝেই পশ্চিমা ঠাণ্ডা বাতাস এসে ভেতরটা কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এখন চায়নার কাছে গিয়েও লাভ নেই। ওর সবেমাত্র দুদিন হল শরীর খারাপ হয়েছে। হটাৎ করেই রত্নার কথা মনে পড়ে কুবেরের। শশী মারার পর চক্ষুলজ্জার জন্যই রত্নার কাছে যেতে পারেনি আর কুবের। আজকে আবার রত্নার শরীরের মানচিত্রটা মনে পড়তেই ভেতরটা ছ্যাঁক করে ওঠে। মনে মনে চায়নার শরীরটার সাথে রত্নার শরীরটা মেলানোর চেষ্টা করে। মিল খুঁজে পায়না। স্মৃতির ভেতর ঘর থেকে রত্নার বুকের গন্ধটা বারবার কুবেরের নাকে এসে ধাক্কা দিয়ে যায়।
       ।।৫।।
সময়ের সাথে পা ফেলতে ফেলতে দিন পেরিয়ে নতুন মাস আসে। আবার চোখের অগোচরেই যেমন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে আসে ঠিক তেমন ভাবেই এক একটা মাস গড়িয়ে নতুন বছর আসে। সময়ের সাথে জীবন ধরাও বদলে যায়। কিছু ধূসর স্মৃতি কেবল বুকে জমা থাকে যে গুলো কিছুতেই বদলায় না। এখন আর কুবেরকে পরের পুকুরে মাছ চাষ করতেও যেমন হয়না তেমন রাত জেগে মাছ পাহারা দিতে যেতেও হয়না। এখন তাঁতিদের পুকুরটা নিজের পুকুর হয়েছে। নিতাই সেটার দেখভাল করে। সেই মাটির গোয়াল ঘরটাও এখন আর নেই সেটা ভেঙে আরও দুটো রুম বানিয়েছে কুবের। এমনকি এখন চায়নার শরীর খারাপ হলেও কুবেরকে আর বলতে হয় না, ‘তুকে বারোমাস ডাক্তার দেখাবার পয়সা নাই। তুর বাপকে বল।’ তবুও কেন যেন রাত্রির অন্ধকারে যখন কুবের নেশার ঘোরে নিজের অতীতের দিকে তাকায় তখন শশীর মুখটা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। 
এতগুলো বছর পরেও শশীর সেই নিরীহ মুখটায় বয়সের কোনও ছাপ পড়েনি। কুবের যেন বয়সের চেয়েও একটু বেশিই বুড়িয়ে গেছে। কদিন আগে হাটে যাবার সময় কুবের একবার রত্নাকে দেখেছিল। বদলায়নি রত্নাও। রত্নার ডাগর বুকে বয়স এখনো ছাপ ফেলতে পারেনি। কুবেরের দিকে তাকিয়ে সেদিন যেন কেমন করে হেসেছিল রত্না। হাসিটা পছন্দ হয়নি কুবেরের। মাথা নিচু করেই সেদিন হাটে গিয়েছিল কুবের। তারপর বাড়ি ফিরে চায়নার শরীরের প্রতিটা ভাঁজের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করেছিল রত্নার শরীরের ভাঁজ গুলোকে। এতগুলো বছর নিজের অজান্তেই কুবের ভেতরে ভেতরে রত্নার শরীরের সাথে চায়নার শরীরের একটা প্রতিযোগিতা চালিয়ে এসেছে। আর সেই প্রতিযোগিতায় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও চায়নাকে জেতাতে পারেনি কুবের। বারংবার রত্নার ভরা যৌবনের সামনে চায়নার রুগ্ন শরীরটা মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়েছে কুবেরের কাছে।  
 এখন তেমন কোনও কাজ না থাকায় সারাদিন ভাবনার ভেতরে ঘুরপাক খেতে খেতেই দিন কাটাতে হয় কুবেরকে। মাছের আঁশটে গন্ধের মতো কিছু স্মৃতি কিছুতেই মুছে ফেলতে পারে না। রত্নার উদ্দাম যৌবনে সাঁতার দিতে গিয়েই তো হারাতে হয়েছে শশীর মতো ছোটবেলার বন্ধুকে। তারপর থেকেই কুবের একা। কোনও কিছুর বিনিময়েই সেই একাকীত্ব টুকুকে পেরিয়ে যেতে পারেনি কুবের।
 সেদিন শশীর জন্য পাত্রী পছন্দ করতে যেতে হয়েছিল কুবেরকেই। প্রথম দেখাতেই ভাল লেগে ছিল রত্নাকে কুবেরের। কিন্তু বন্ধুর স্ত্রীর প্রতি বাঁকা নজর দেওয়ার সাহস সেদিন কুবেরের ছিল না। সাহস যুগিয়ে ছিল রত্নাই। কখনো শাড়ির ফাঁক দিয়ে কোমর আর পেটের অনাবৃত অংশের জাদু দেখিয়ে তো কখনো ভেজা গামছার ভেতর থেকে উদ্দাম বুক দুটোকে দেখিয়ে। রত্নার শরীরের নেশায় শশীর অনুপস্থিতিতেই শশীর খোঁজে রত্নার কাছে আসতে বাধ্য হত কুবের। শশীর যে সন্দেহ হয়নি তা কিন্তু নয়। তবুও অন্ধ বিশ্বাস ছিল বন্ধুর উপর। সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে পারেনি কুবের। নরম নারী শরীরের গরম উষ্ণতায় তলিয়ে গিয়েছিল কুবের। ঠিক যেমন ভাবে মাঝ পুকুরে চার পড়লে চালাক মাছ জলের গভীরে তলিয়ে যায়। একটা সময় কুবের ভেবেছিল রত্নাকে সঙ্গে নিয়ে অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে যাবে। পালিয়েই যেতে পারত কুবের কিন্তু পারেনি শুধু ছেলে নিতাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই।
    ।।৬।।
 আজকে সন্ধ্যায় আবার আকাশে রুপোলী চাঁদ বেরিয়ে এসেছে। কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ। সকালের দিকে খানিকটা বৃষ্টি হয়ে মেঘ কেটে যাওয়ায় যেন আকাশটাকে আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে। এতক্ষণ রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে চায়নার সঙ্গে বেশ খুনসুটি করছিল কুবের। বাইরে বেরিয়ে এসে হটাৎ করে চাঁদটা চোখে পড়তেই মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল কুবেরের। যাত্রা দেখতে যাওয়ার আনন্দটাও চুপসে গেল এক নিমেষে। এই চাঁদটার দিকে তাকালেই যেন একটা অদৃশ্য আতঙ্ক কাজ করে কুবেরের বুকের ভেতর। সব যেন কেমন গোলমেলে লাগে। মনে হয় এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল। চায়নাকে যাত্রা দেখতে যাবার জন্য তৈরি হতে বলে রাস্তায় বেরিয়ে আসে কুবের। পেটে মদ না পড়া পর্যন্ত আর স্বস্তি পাবে না কুবের। শশীর মুখটা কিছুতেই ওকে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে দেবে না।
 হাজার দর্শকের ভিড়ে চায়নার পাশে বসেও কুবেরের মনে হল ও যেন একাই একটা জনশূন্য মাঠের মাঝে বসে আছে। এখুনি হয়তো ষ্টেজের উপর দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে শশী চিৎকার করে বলবে, ‘তুই একটা বেইমান। বেইমান তুই একটা।’ দুহাত দিয়ে কান দুটোকে প্রাণপণে চেপে দুটো হাঁটুর ভেতর মুখটা গুঁজে বসে থাকে কুবের। চায়না জিজ্ঞেস করে, ‘তুমার শরীদটা ভাল আছে তো ?’ কুবের কোনও উত্তর দিতে পারে না। শুধু থরথর করে কাঁপতে থাকে।
 যাত্রা শেষ হবার আগেই বাইরে বেরিয়ে আসে কুবের। আসার সময় চায়নাকে বলে আসে, ‘লতিকার মায়ের সঙ্গে তুই আসবি ক্ষণ আমি যাই। শরীদটা বড্ড খারাব লাইগছে।’
সত্যিই শরীরটা খারাপ লাগছিল কুবেরের। হালকা হিমের দিনেও ঘেমে ভিজে যাচ্ছিল। যাত্রা মাঠের প্যান্ডেলের বাইরে বারিয়ে এসে খানিকটা ভাল লাগে ওর। ধান ক্ষেতের আল ধরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে পাকা ধানের গন্ধে কুবেরের কত কথাই যেন মনে পড়ে যায়। ছোট বেলার ধান বাঁধতে যাবার কথা থেকে শুরু করে শশীর সঙ্গে আলু কিংবা সরসে চাষ সবেই মনে পড়ে কুবেরের। দেখতে দেখতে কতগুলো বছর পেরিয়েছে তবুও মনে হয় যেন সেদিনের গল্প।
 ধান ক্ষেতের আল দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতেই কুবেরের চোখ চলে যায় পদ্ম পুকুরটার দিকে। বেশ কয়েক বছর হল কুবের পুকুরটা কিনেছে। মাছ তো আর মন্দ হয় না। অনেক দিন হয়েছে কুবের মাছ পাহারা দিতে আসেনি। এখন নিতাই নিজেই রাত জেগে মাছ পাহারা দেয়। আজকেও নিতাই মাছ পাহারা দিচ্ছে। পুকুরটার দিকে তাকিয়ে কী যেন চিন্তা করে কুবের তারপর পুকুরটার দিকে পা বাড়ায়। এখন আর সেই খড়ের কুঁড়ে ঘরটা নেই। সেটা ভেঙে টিনের মজবুত ঘর বানিয়েছে নিতাই।
 পুকুরটার পাড়ে চড়তেই কুবের দেখে সারা পুকুর জুড়ে পদ্মপাতায় জমে থাকা জলের উপর জ্যোৎস্নার আলো ঝিলমিল ঝিলমিল করছে। কতদিন হয়ে গেছে এমন ভাবে পুকুরটাকে দেখেনি কুবের। পুকুরটার মাঝ জলের থেকে মাঝে মাঝেই ভেসে আসছে কুব কুব শব্দ। কুবের জানে যখন বড় মাছ জলে ঘাই মারে তখন এমন শব্দ হয়। আরও কিছুটা এগিয়ে এসে কুবের দাঁড়িয়ে পড়ে। কারা যেন ফিস ফিস করে কথা বলছে। মাছ চোর নয় তো! কুবের ফিস ফিস শব্দ গুলোকে কানে ধরার চেষ্টা করে। পারে না। পা টিপে টিপে আরও কিছুটা এগিয়ে আসে কুবের । টিনের ঘরটা যেদিকে সেদিকের থেকেই ভেসে আসছে ফিস ফিস শব্দটা। কুবের ঘরটার আরও কাছা কাছি আসে। এবার বুঝতে পারে ঘরের ভেতর থেকেই আসছে শব্দটা। একটা নিতাইয়ের গলার অন্যটা মেয়েলি কণ্ঠ । আরও কয়েক পা সামনে এগিয়ে আসতেই কুবের নিশ্চিত হয়ে যায়। এই মেয়েলি কণ্ঠের সুরটা কুবেরের ভীষণ পরিচিত। অন্তত এক জীবনে ভোলার নয়। নিজের কান দুটোকে বিশ্বাস হয় না কুবেরের। ঝকঝকে জ্যোৎস্নার আলোয় টিনের দেওয়াল ভেদ করেই যেন কুবের দুটো নগ্ন শরীরকে দেখতে পায়। বহু বছর আগে এমনেই কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে ঠিক শশী যেমন দেখেছিল দুটো নগ্ন শরীরকে। চোখ দুটোকে প্রাণপণে চাপা দিয়ে পুকুর পাড়ের উপরেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে কুবের। বর্তমানের সাথে অতীতের এমন নির্মম মেল বন্ধন কিছুতেই সহ্য হয় না কুবেরের। তবুও কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ কুবেরের মাথার উপর জ্যোৎস্না ঢালছে।
[সমাপ্ত]
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments