রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস, আবার হীরের খোঁজে

রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস, আবার হীরের খোঁজে

Advertisemen

 

আবার হীরার খোঁজে     

 বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


প্রিয় শঙ্কর,
আমি বেশ কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় তোমার আফ্রিকার অভিজ্ঞতা পড়েছি। আর সেটা পড়েই আমি তোমাকে এই চিঠি লিখছি। তুমি হয়তো আমার নাম শুনে থাকবে। সে যাই হোক যদি রহস্য আর কাঁচা হীরা তোমারও লক্ষ্য হয়ে থাকে তাহলে বারমুডার বুকে তুমি আমার সঙ্গী হতে পারো। বারমুডার বুকে জেগে থাকা কোরক দ্বীপ গুলোতে রহস্য বা হীরা দুটোর কোনটারই অভাব নেই। এখন শুধু তোমার উত্তরের অপেক্ষা।
ইতি
অলিভার আর্নল্ড
পুয়ের্তো রিকো
 চিঠিটা একবার নয় বারবার পড়েছে শঙ্কর। প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয়নি। অলিভার আর্নল্ড! সেই বিখ্যাত প্যাট্রিয়ট জাহাজের ক্যাপ্টেন অলিভার আর্নল্ড যিনি বারমুডার বুকে জেগে থাকা মৃত্যুকে হাতছানি দিয়ে ঘরে ফিরেছেন একাধিক বার। সেই তিনি আজ বারমুডার পথে শঙ্করকে সঙ্গে নিতে চান!
আফ্রিকা থেকে দেশে ফেরার পরই শঙ্কর জানতে পেরেছিল বারমুডার বুকে জেগে থাকা কয়েকটা দ্বীপের কথা। সেখানকার হীরার কথা। কিন্তু রহস্যময়তা আর মৃত্যু দিয়ে ঘেরা বারমুডার বুক থেকে অলিভার আর্নল্ড ছাড়া আর কেউই ঘরে ফেরেনি। যেমন আফ্রিকার রিখটারসভেল্ট থেকে ঘরে ফেরেনি জিম কার্টার, আত্তিলিও গাত্তি কিংবা প্রিয় আলভারেজ।
আর্নল্ডের চিঠির উত্তর দিতে বেশ কয়েক মাস সময় লেগেছিল শঙ্করের। কদিন আগেই দু'পায়ে মৃত্যু মাড়িয়ে এসে আবার বারমুডার মতো মৃত্যুপুরীতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুম করে নেওয়াটা শঙ্করের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। কিন্তু যে জনহীন আফ্রিকার জঙ্গলে নিজের অন্তর আত্মার মুক্তি খুঁজে পেয়েছে সে কি আর কুনো ব্যাঙ হয়ে ঘরের কোনায় বেশিদিন বসে থাকতে পারে ? শেষ পর্যন্ত আর্নল্ডের কাছে একদিন শঙ্করের সম্মতিসূচক উত্তর আসে।
                               
[এক]
২১ সে জুন ১৯১২ পুয়ের্তো রিকো থেকে বারমুডার পথে একটা জাহাজ ভাসতে দেখা গেল। বলার অপেক্ষা রাখে না ওটাতেই শঙ্কর আর আর্নল্ড চলেছে পৃথিবীর সব চেয়ে রহস্যময় এলাকার দিকে। পৃথিবীর সবচাইতে অভিশপ্ত স্থানগুলোর মধ্যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বা ত্রিভুজকে অন্যতম মনে করা হয়। এ পর্যন্ত এখানে যত রহস্যময় দুর্ঘটনা ঘটার কথা শোনা গেছে, অন্য কোথাও এত দুর্ঘটনা ঘটেনি। তিনটি প্রান্ত দিয়ে এ অঞ্চলটি সীমানা বদ্ধ। আর তাই একে বলা হয় বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বা বারমুডা ত্রিভুজ। তিনটি প্রান্তের এক প্রান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, একপ্রান্তে পুয়ের্তো রিকো এবং অপর প্রান্তে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বারমুডা দ্বীপ অবস্থিত। ত্রিভুজাকার এই অঞ্চলটির মোট আয়তন ১১৪ লাখ বর্গ কিলোমিটার। এটি ২৫-৪০ ডিগ্রি উত্তরাংশ  এবং ৫৫-৫৮ ডিগ্রি পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। এ অঞ্চলের রহস্যময়তার একটি দিক হল, কোনও জাহাজ এই ত্রিভুজ এলাকায় প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই বেতার তরঙ্গ প্রেরণে অক্ষম হয়ে পড়ে। উপকূলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়। একসময় দিক নির্ণয় করতে না পেরে রহস্যজনক ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। মার্কিন সূত্র অনুযায়ী, গত ২০০ বছরে এ এলাকায় কমপক্ষে ৫০-টি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ২০-টি বিমান চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
শঙ্কর সম্মতি সূচক উত্তর দেওয়ার পরে-পরে আরও বেশ কিছু পত্র বিনিময় হয়েছিল দুজনের মধ্যে। এতে একটা সুবিধা হয়েছে, দুজন দুজনের ব্যাপারে জেনেছে অনেক কিছু। পুয়ের্তো রিকো বন্দরে আর্নল্ডকে দেখে শঙ্করের প্রথমেই আলভারেজের কথাই মনে পড়েছিল। আর্নল্ডের লালচে তামাটে গায়ের রঙ, কাঁচাপাকা দাড়ি, আর মুখে সর্বদা জ্বলন্ত চুরুট। সব মিলিয়ে আলভারেজকে মনে পড়াটাই স্বাভাবিক।
বাড়ি ফেরার পর শঙ্কর যে একবারের জন্যেও পরিবারের কথা ভেবে সংসার গড়ার কথা মাথায় আনেনি, সেটা নয়। কিন্তু আফ্রিকার রিখটারসভেল্ট পর্বতশ্রেণী, আত্তেলিও গাত্তির নরকঙ্কাল আর বিশেষ করে আলভারেজের মৃত্যুর ছবিটা শঙ্কর চোখের পাতা থেকে মুছতে পারেনি কিছুতেই। হয়তো তাই শঙ্করের আর সংসার গড়া হল না। ওর পায়ের পাতায় চিরদিনের জন্য আফ্রিকার মাটি লেগে গেছে।
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দূরবীন চোখে দূরের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে সমুদ্রের রূপ দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে পড়েছিল শঙ্কর। হঠাৎ মাথার উপর এক ঝাঁক পাখি উড়ে যেতেই ওর সম্বিৎ ফেরে। আর্নল্ড এখন ইঞ্জিন ঘরে নিজের কাজে ব্যস্ত। জাহাজটা যে কোন পথে চলেছে সেটা বোঝার ক্ষমতা শঙ্করের নেই। বনজঙ্গল পাহাড় পর্বত ও যতটা কাছের থেকে চেনে সমুদ্র ততটা কাছের থেকে চেনা কখনই নয়। একঘেয়ে পাহাড়ে চড়তে বা জঙ্গলে পথ চলতে বিরক্তি আসে ঠিকই কিন্তু অবিরাম সমুদ্রের বুকে ভেসে চলা আরও বেশি বিরক্তিকর। মাঝে মাঝে বড় মাপের ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজটা দুলে-দুলে উঠে। গা গুলিয়ে যায়। আকাশে ক্রমশ পাখির সংখ্যা কমতে কমতে এখন দু-একটা করে উড়তে দেখা যাচ্ছে। খানিক বাদে সেটাও হয়তো দেখা যাবে না আর।
আজকের যাত্রা পথে শঙ্করের বারবার আফ্রিকার দিনগুলোই মনে পড়ে যাচ্ছিল। হয়তো আর কোনও দিন আফ্রিকায় যাওয়া হবে না ওর। আফ্রিকায় গেলে শেষ বারের মতো একবার আলভারেজের সমাধিটা অবশ্যই ও দেখে আসবে। ঘুরে আসবে কিসুমু থেকে ত্রিশ মাইল দূরের সেই ষ্টেশনটায়। কি ভয়ানক ছিল ওখানকার সিংহের গর্জন। তবু একটা নেশা ছিল সেই গর্জনে। এবারের যাত্রাপথটা কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়ে। আকাশ কুসুম ভাবনার ভেতর দিয়ে আফ্রিকা আর বারমুডার পার্থক্য নির্ণয় করতে থাকে শঙ্কর।
একটা সময় বিরক্তি আর ক্লান্তিতে নিজের কেবিন ঘরের মেঝের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল শঙ্কর। বুকের উপর উপুড় করা একটা গল্পের বই। হয়তো গল্পের বইটা পড়তে পড়তেই চোখ লেগে গিয়ে থাকবে। হঠাৎ ডেকের উপর হুড়মুড় করে একটা শব্দ হতেই ঘুমটা ভেঙে গেল শঙ্করের। ঘুম থেকে উঠে শঙ্কর ডেকের সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালে আর্নল্ড বাধা দিয়ে বললে- এখন উপরে যেও না শঙ্কর, বৃষ্টি হচ্ছে। মনে হয় ঝড় উঠবে, আকাশের অবস্থা মোটেই ভাল নয়। বরং আমার সঙ্গে ইঞ্জিন ঘরে চলো কফি খেতে খেতে গল্প করা যাবে।
আর ডেকের উপরে যাওয়া হল না শঙ্করের। তবে ইঞ্জিন ঘরে এসে ও যা দেখল তাতে ওর হাড় হিম হবার জোগাড়। জাহাজের বাইরেটা ঘনান্ধকার কালো মেঘে ঢাকা। কিছুই চোখে পড়ছে না। মনে হচ্ছে হাজার হাজার বছরের প্রাচীন মেঘের দল জাহাজটাকে গিলে ফেলতে চাইছে। অন্তত শঙ্করের তো তেমনটাই মনে হল। আর্নল্ড শঙ্করের দিকে একটা চেয়ার বাড়িয়ে দিয়ে বললে- সমুদ্রের বুকে এসব নতুন কিছুই নয়। তুমিও দেখে থাকবে নিশ্চয়। তবে পার্থক্য এটুকু যে, এখানের মেঘগুলো সমুদ্রের শরীরে নেমে এসেছে। শঙ্কর কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না, শুধু মনে মনে বললে- লোকটা কি পাগল ?

মিনিট কুড়ি পরে শঙ্করের মনে হল, আর্নল্ড স্টিয়ারিং হাতে ঘুমিয়ে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ অবশ্য কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি আর্নল্ডের। চোখ দুটোও বন্ধ। যাচাই করার জন্য শঙ্কর জিজ্ঞেস করে-  আচ্ছা আমরা বারমুডা রেঞ্জে কখন পৌঁছব ?
আর্নল্ড চোখ বন্ধ করেই বললে- এক মিনিট পরেও পৌঁছতে পারি আবার একমাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে। বারমুডার কোনও নির্দিষ্ট এলাকা নেই। ওটা কমা বাড়া করতেই থাকে। তবে যখন বারমুডার রহস্যময় এলাকায় ঢুকব তখন নিজেই বুঝতে পারবে পরিবর্তনটা।
কেমন পরিবর্তন ?- জিজ্ঞেস করে শঙ্কর।
আর্নল্ড বললে- সেটাও ঠিকঠাক বলা সম্ভব নয়। বারমুডা আমাকে এক একবার এক একরকম রহস্যময় ওয়েলকাম জানিয়েছে। কখনো রাক্ষুসে শ্যাওলার মুখে ফেলে তো কখনো কুয়াশার ঝড়ে জাহাজ আটকে দিয়ে। কখনো আবার ভয়ংকর জলজ দাবানলে জাহাজটাকে ঘিরে ধরে। আমিও ছাড়ার পাত্র নই, প্রতিবার বারমুডার বাধা কাটিয়ে গেছি। কথাগুলো বলতে বলতেই একটা চুরুট ধরিয়ে নেয় আর্নল্ড।
শঙ্কর আবার আশ্চর্য হয়ে জানতে চায়- জলজ দাবানল! কিন্তু সেটা কেমন করে সম্ভব ?
শঙ্করের প্রশ্নে আর্নল্ডের ঠোঁটে এক টুকরো হাসির রেখা দেখা দেয়। হাসি মুখেই আর্নল্ড বলে- বারমুডায় অসম্ভব বলে কিছুই হয় না। যেটা অন্যান্য কোথাও সম্ভব নয় সেটাই প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে বারমুডায়। তবে সেবার আগুনটা লেগেছিল সমুদ্রের বুকে ভাসমান শুকনো শ্যাওলার জন্য।       
জাহাজটা এখন নিজের খেয়ালে চলেছে। এখন আর আকাশে মেঘ নেই। যতদূর দেখা যায় শুধু নীল আর নীল। সুদূর নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঝিমঝিম করে শঙ্করের। এই নীলের যেন শেষ নেই। জাহাজটা দুলতে দুলতে এগিয়ে যাচ্ছে বারমুডা ট্রাঙ্গেলের দিকে।
[দুই]
পরের দিন বিকেলের দিকে জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে শঙ্কর নিজের আফ্রিকা জীবনের গল্প শোনাচ্ছিল আর্নল্ডকে। পড়ন্ত বিকেলের পাতলা আলোয় কত স্মৃতি কত কথাই না আজ ওর মনে পড়ে যাচ্ছে। আগ্নেয়গিরিটার কথা বলার পর শঙ্কর হয়তো আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ আর্নল্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল। আর্নল্ডের মুখটা ভয়ঙ্কর রকম থমথমে হয়ে আছে। শঙ্কর দূরের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে রহস্যময় কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করল ঠিকেই কিন্তু তেমন কিছুই চোখে পড়ল না ওর।
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আর্নল্ড বললে- আফ্রিকায় তুমি তোমার খুব কাছের যে বন্ধুকে হারিয়েছিলে তাঁকে আজও তুমি মনে মনে পথপ্রদর্শক করে রেখেছ তাই তো ?
-ঠিক তাই। আমি দিয়াগোকে ভুলতে পারিনি।
  কিছুক্ষণ উদাসীন ভাবে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকার পর আর্নল্ড বলতে শুরু করে ফেলে আসা দিনের কথা- একটা সময় সমুদ্রের নেশা আমাকে পেয়ে বসেছিল। নেশাটা যে এখন নেই সেটা নয় তবে সেই সময়ের সঙ্গে আজকের তুলনা চলে না। তখন বয়সটাও ছিল কম, তাই সব স্বপ্ন গুলোকেই জ্যান্ত বলে মনে হত। নিজেকে জাহাজের ক্যাপ্টেন ছাড়া দ্বিতীয় কিছু ভাবতেই পারতাম না। সেদিন পাড়ি দিয়েছিলাম পুনটা কানার পথে। মেরিন, আমার স্ত্রী কিছুতেই আমাকে যেতে দিতে চায়নি। কিন্তু ওই যে বললাম, নেশা। সেদিন মেরিনের কথা অগ্রাহ্য করেই বেরিয়ে পড়েছিলাম পুনটা কানার সুদীর্ঘ পথে। মাস তিনেক পরে যখন ফিরে এলাম তখন সব শেষ হয়ে গেছে। আমি পুনটা কানা যাবার পরেই পুয়ের্তো রিকোতে বন্যা দেখা দিয়েছিল। আমার ঘর ভেঙে গুড়িয়ে গিয়েছিল। জলে তলিয়ে গিয়েছিল মেরিন। জানতো শঙ্কর নিজেকেই অপরাধী বলে মনে হয়। মেরিন মারা যাবার পর যখন বাঁচার আর কোনও উদ্দেশ্যই রইল না তখন বেরিয়ে পড়লাম নানান রহস্যময় এলাকায়। নিজেকে মৃত্যুর মাঝে বারবার দাঁড় করিয়ে দিয়ে তামাশা দেখেছি। কিন্তু কই মৃত্যু তো আমাকে নিলো না !
কথাগুলো বলতে বলতে আর্নল্ডের দুচোখ জলে ভরে আসে। সেটা শঙ্করের দৃষ্টি এড়ায় না। কিন্তু এমন সময় মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কিছুই থাকে না। কিছু কষ্টের কোনও সান্ত্বনা হয় না কখনো।
ডুবন্ত সূর্যের আলো এবার সমুদ্রের নীলের উপর লাল মাখিয়ে দিচ্ছে আলতো করে। সমুদ্রের জল এখন শান্ত। আর্নল্ড হয়তো দূরের দিকে তাকিয়ে সুদূর অতীতে রেখে আসা পরিবারের কথা মনে করার চেষ্টা করছে। শঙ্কর বারবার হারিয়ে যাচ্ছে আফ্রিকার সবুজ স্মৃতিতে।
আজকে আর বেশিক্ষণ রাত জাগেনি শঙ্কর। সামান্য কিছু চিঁড়ে ভাজা আর জল খেয়ে শুয়ে পড়েছিল। আলভারেজের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে করতে করতে জাহাজের মৃদু দুলুনিতে একটা সময় ঘুম এসে গিয়েছিল ওর। ঘুমটা ভাঙল ভয়ানক একটা শব্দে। ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল শঙ্কর। কিন্তু মিশমিশে অন্ধকারে কিছুই দেখা গেল না। ব্যাপারটা বোঝার জন্য শঙ্করকে কেবিন ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটতে হল ইঞ্জিন ঘরের দিকে।
ইঞ্জিন ঘরের ভেতরে ঢুকে শঙ্কর যা দেখল তাতে করে ওর মূর্ছা যাবার জোগাড়। সমুদ্রের যে দিকটায় দৈত্যাকার কয়েকটা পর্বত দাঁড়িয়ে রয়েছে সেদিকেই ছুটে চলেছে জাহাজটা। জাহাজের ঘোলাটে আলোয় পর্বতগুলোর উচ্চতা ঠিক মতো বোঝা যাচ্ছে না। স্টিয়ারিং হাতে দাঁড়িয়ে আর্নল্ড জাহাজের মুখটা প্রাণপণ শক্তিতে ঘোরাবার চেষ্টা করছে। চুল্লির আগুনের মতো গনগনে লাল হয়ে আছে আর্নল্ডের চোখ দুটো। চিতি সাপের মতো বেরিয়ে পড়েছে হাতের প্রতিটা শিরা। সামনের দিকে তাকিয়েই আর্নল্ড চিৎকার করে বললে- লাইফ বেল্ট পরে নাও শঙ্কর, ফাস্ট...ফাস্ট...ফাস্ট...
শ্বাস-রুদ্ধ বাক্-রুদ্ধ হয়ে কাটল আরও কয়েক মিনিট। এবার যেকোনও মুহূর্তে জাহাজটা ধাক্কা খাবে পর্বতের সঙ্গে। গুড়িয়ে যাবে জাহাজটা। তারপর ? …জানে না শঙ্কর। কিছুই জানে না ও। মৃত্যুর অনেক রূপ দেখার পরেও মৃত্যুর প্রতিটা রূপকেই অন্যটার থেকে ভয়ঙ্কর বলে মনে হয়েছে শঙ্করের। তবুও আর্নল্ড বলার পরেও লাইফ বেল্ট বাঁধেনি শঙ্কর। অ্যাটল্যান্টিকার মাঝে দাঁড়িয়ে আর যাই হোক লাইফ বেল্ট পরে লাইফ রক্ষা হবে না এটা শঙ্করের অজানা নয়। আর মাত্র কয়েকশো মিটার। তারপরই প্রচণ্ড ধাক্কায় গুড়িয়ে যাবে জাহাজটা। আর্নল্ড এখনো চেষ্টা করেই যাচ্ছে জাহাজটার মুখ ফেরানোর। কিন্তু কিছুতেই নিজের কক্ষপথ থেকে এক চুল নড়ছে না জাহাজটা। যেন কোনও দানব প্রবল আকর্ষণে জাহাজটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পর্বতগুলোর দিকে। তাহলে এটাই কী বারমুডার আকর্ষণ ? জানা নেই শঙ্করের।
আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড তারপরই সব শেষ। কিন্তু এটা কি দেখছে শঙ্কর ? জাহাজটার মুখ দ্রুত গতিতে ফিরছে এবার। আর্নল্ড প্রাণপণ শক্তিতে স্টিয়ারিং ধরে নিজেকে উৎসাহ দিচ্ছে কামন…কামন…কামন…
না আর ধাক্কা হবার কোনও সম্ভাবনা নেই। জাহাজটার মুখ সম্পূর্ণ ভাবে ঘুরে গেছে এখন। স্টিয়ারিং ছেড়ে শঙ্করের দিকে এগিয়ে আসে আর্নল্ড। জড়িয়ে ধরে শঙ্করকে, বলে- বারমুডা ওয়েলকাম জানাল আমাদের। কয়েক মিনিটের জন্য হলেও প্রতিবারের মতোই মনে হয়েছিল এখানেই বুঝি সব শেষ। বারমুডার বুকে ভূমিকম্প প্রায়শ হতেই থাকে, এমন ভাবে কত পর্বতের জন্ম-মৃত্যু হয়। আজ যেখানে পর্বত দেখলে কালকেই সেখানে নতুন কোনও দ্বীপের জন্ম হতে পারে।
ইঞ্জিন ঘরের চেয়ারে বসে আর্নল্ডের সঙ্গে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল শঙ্কর। যখন ঘুম ভাঙল তখন সকাল হয়েছে। ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রের বুকে। হঠাৎ শঙ্করের মনে হল বাইরে পাখি ডাকছে। প্রথমটায় মনের ভ্রম বলেই মনে হয়েছিল ওর। কিন্তু পরের মুহূর্তেই বুঝতে পারল এটা মনের ভ্রম নয়, বাইরে সত্যি সত্যিই পাখি ডাকছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় শঙ্কর। আর্নল্ডের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে দেখে। আর্নল্ড এখন গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে।
ডেকের উপরে এসে শঙ্করের খুশির ঠিকানা রইল না আর। জাহাজটা এসে দাঁড়িয়েছে একটা দ্বীপের কিনারায়। কত শত রকমের পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে সমুদ্র সৈকতে। জাহাজটার একদিকে শুধু নীল নীল আর শুধুই নীল। ঠিক তাঁর উল্টোদিকে সবুজ বসন্ত বিরাজমান। সমুদ্রের কিনারা থেকেই শুরু হয়েছে সবুজের মেলা। বিশাল বিশাল আকারের গাছগুলো থেকে ঝুলছে নানান রঙের অর্কিড আর ঝুমকো লতা। অনেক দূরে পশ্চিমের দিগন্ত রেখায় প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সারি সারি পর্বতমালা। শঙ্করের মনে হল পর্বতের বেড়া দিয়ে দ্বীপটাকে যেন কেউ মুড়ে রেখেছে পরম যত্নের সঙ্গে। এর আগে প্রকৃতির এতো রকমের রূপ এক সঙ্গে ধরা দেয়নি শঙ্করের চোখে। শঙ্কর মনে মনে বলে- আফ্রিকা সুন্দর কিন্তু এই দ্বীপটা যেন রানী সেজে বসে আছে বারমুডার বুকে। এর সৌন্দর্যের কাছে হাজার হাজার আফ্রিকা হার মেনে নেবে হাসি মুখে।
প্রায় আধ ঘণ্টার মতো জাহাজের ডেকে অপলক ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল শঙ্কর। আর্নল্ডের এখনো হয়তো ঘুম ভাঙেনি। এর পর কোথা থেকে কুয়াশা এসে সব সৌন্দর্য ঢেকে দিয়ে যায়। ডেকের থেকে নীচে নেমে এসে শঙ্কর দেখে আর্নল্ড ঠোঁটে জ্বলন্ত চুরুট ঝুলিয়ে একটা ম্যাপে চোখ পেতে বসে আছে। শঙ্কর ইঞ্জিন ঘরে ঢুকতেই আর্নল্ড বললে- বারমুডা বি।
শঙ্কর জিজ্ঞেস করে- এটা কি এই দ্বীপটার নাম ?
-বারমুডায় তো তেমন ভাবে কেউই আসেনি যে বারমুডার বুকে ভাসমান দ্বীপ গুলোর নাম দেবে। যে কয়েকজন এসেছিলেন তাদের অধিকাংশই মারা গেছেন। তিনশটা কোরক দ্বীপের ভেতর আমি যে কয়েকটা দ্বীপে এসেছি তার প্রত্যেকটার নাম দিয়েছি নিজের মতো করে, সালত্রা; মেরিন; গ্যালাক্সি; ডার্কমুন। এই দ্বীপটা আর একটা দ্বীপের নাম দেওয়া হয়নি। আসলে সালত্রা দ্বীপ থেকে বাড়ি ফেরার সময় পথ ভুল করেই বারমুডা-এ আর বারমুডা-বি এর সন্ধান পেয়েছিলাম। এই দ্বীপটাতে এর আগেও আমি দু’সপ্তাহের মতো কাটিয়ে গেছি।
-অপূর্ব সুন্দর দ্বীপটা।
-এই সৌন্দর্যটা তোমাকে কতটা টানবে আমার জানা নেই। তবে আমার মনে হয় তুমি এখানে দ্বিতীয়বার আসতে চাইবে না।
-কেন ?
-কারণ এটা আফ্রিকা নয় এটা বারমুডা। প্রেতপুরী কিংবা মায়াপুরি। এখান থেকে বাড়ি ফেরার পর আমি দিবাস্বপ্নেও এই দ্বীপটা কল্পনা করতাম না।
-তাহলে এই দ্বীপটাতে আবার কেন ? শঙ্করের চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে ওঠে।
-আগের থেকে ঠিক করে বারমুডার কোনও দ্বীপে আসা যায় না শঙ্কর। বারমুডা নিজের আকর্ষণে নিয়ে আসে। কথাগুলো বলতে বলতেই আর্নল্ডের কপালে কয়েকটা চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে। চুরুটের ধোঁয়ায় কুণ্ডলী পাকাতে থাকে আর্নল্ড।
দুপুরের দিকে জাহাজে নোঙর দেওয়ার পর ডেকে দাঁড়িয়ে দ্বীপটার প্রকৃতি নিয়ে শঙ্করের সঙ্গে আলোচনায় মগ্ন আর্নল্ড। ঠিক এমন সময় জঙ্গল থেকে ভেসে এল হাড় হিম করা একটা গর্জন যেটা অনায়াসেই আফ্রিকার সিংহ গর্জনকেও হার মানায়। আর্নল্ড বললে- শয়তানের গর্জন। এই প্রাণীটা দেখতে অনেকটাই বাঘের মতো কিন্তু বাঘের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী। অনেক বেশি ভয়ংকর। বারমুডার প্রতিটা দ্বীপেই হাজার হাজার এমন অদ্ভুত প্রাণী আর বিষধর সাপের বাস। এখানের প্রকৃতি যেমন গোলমেলে প্রাণীগুলোও তেমন। কোনটা মাংসাশী আর কোনটা যে তৃণভোজী বোঝাই ভার।
বিকেলের দিকে আর্নল্ডের সঙ্গে দ্বীপটা ঘুরে দেখার জন্য একবার বেরিয়েছিল শঙ্কর। বড়ই চমৎকার দ্বীপটা। চারদিকে ফুলের মেলা, গাছের ডালে ডালে নানা রঙের অর্কিড। কত রকমের নাম না জানা সব পাখির দল। দূরের থেকেই চোখে পড়ছে বেশ কয়েকটা পাহাড়ি ঝর্ণা। দূরের কোনও গাছে বসে অনেকক্ষণ থেকে একটা পাখি শিস দিয়ে যাচ্ছে আপন মনে। একটানা শুনলে মনটা হুহু করে ওঠে। গাছের নীচে পড়ে থাকা শুকনো পাতার উপর সাবধানে পা ফেলে ফেলে আর্নল্ডের সঙ্গে চলতে থাকে শঙ্কর। সমুদ্রের কিনারায় এসে ওরা দাঁড়ায় কিছুক্ষণ। অস্তগামী সূর্যের লাল আলোয় ভরে আছে চারদিকটা। দূরের পর্বতশ্রেণীর চূড়াগুলোতেও রঙের মেলা। শঙ্কর বললে- আফ্রিকায় হীরার খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে আমরা একবার আগ্নেয় গিরির সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। রাত্রির দিকে অগ্নুৎপাত হওয়ার আগে আকাশটা দেখেছিলাম এমন ভাবেই লাল হয়েছিল। আগ্নেয়গিরি বা অগ্নুৎপাতের যে এতো রূপ হতে পারে সেটা আমার জানা ছিল না। কি ভয়ংকর অথচ কি অপূর্ব সৌন্দর্য তার !
শঙ্করের কথা শোনার পর আর্নল্ড বললে- আমি আমার জীবনে কখনো আগ্নেয়গিরি দেখিনি তবে বারমুডার পথেই একবার যে জলজ দাবানলের মুখে পড়েছিলাম সেটা তো তোমাকে বলেছি।
সমুদ্র সৈকতে দ্রুত সন্ধ্যা গড়িয়ে আসায় দুজনে পায়ে পায়ে জাহাজের দিকে ফিরতে থাকে। যদিও এখনো পর্যন্ত রহস্যময় কিছুই চোখে পড়েনি শঙ্করের, তবুও অপরিচিত দ্বীপে আলো-অন্ধকারে হাঁটার সময় ওর বুকটা ছ্যাঁক ছ্যাঁক করতে থাকে।
সন্ধ্যার দিকে সমুদ্রের কিনারায় ঠাণ্ডা বাতাসে হাঁটতে কারুরই মন্দ লাগছিল না। গল্প করতে করতেই ফিরছিল দুজনে। সমস্যা দেখা দিল যেখানে জাহাজটা থাকার কথা সেখানে আসার পর। যত দূর দৃষ্টি যায় শুধু জল আর জঙ্গল। জাহাজের কোনও চিহ্ন কোথাও নেই। কিন্তু এটা কেমন করে সম্ভব কিছুতেই মাথায় ঢুকল না শঙ্করের।

 
 [তিন]
রাত্রি তখন এগারোটা হবে হয়তো। আর্নল্ডের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে ঝিমোচ্ছিল শঙ্কর। বন্ধুকটা কখন যে হাতের থেকে খসে বালিতে পড়ে গেছে সেটাও ওর খেয়াল নেই। ঘুমটা ভাঙল সারা শরীরে অসহ্য চুলকানি হওয়ায়। প্রথমটায় কিছু বুঝতে না পারলেও খানিক বাদেই শঙ্কর বুঝতে পারল ওদের দুজনকে জংলি পিঁপড়েতে ঘিরে ধরেছে। আর্নল্ডও হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছিল, শঙ্কর আলতো ঠেলা দিতেই সোজা হয়ে উঠে বসল আর্নল্ড। জংলি পিঁপড়ের উপস্থিতি আর্নল্ডও এতক্ষণ টের পায়নি।
এভাবে আর কতক্ষণ পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকা যায় ? অথচ করারও কিছু নেই। দুঘণ্টার বেশি সময় ধরে জাহাজটা খোঁজার পরেও সেটা চোখে পড়েনি। শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত হয়েই দুজনে বসে পড়েছিল। যে কারণেই হোক না কেন জাহাজটা মনে হয় ভেসে গেছে। আর সত্যিই যদি জাহাজটা অন্যত্র ভেসে গিয়ে থাকে তাহলে বড় রকমের সমস্যায় পড়বে দুজনে।
রাত্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল হরেক রকম পশু-পাখির ডাক। পরিচিত বলতে হায়না আর শেয়ালের ডাকটাই শঙ্করের যা চেনা, বাকি ডাকগুলোর একটাও এর আগে শুনেছে বলে ওর মনে হল না। যদিও জঙ্গলটার থেকে অনেকটা দূরে সমুদ্রের গা ঘেঁষে ওরা দুজনে বসে আছে। হঠাৎ করে কোনও বন্য জন্তু আক্রমণ করলে ওরা আগাম টের পেয়ে যাবে। তবুও অচেনা অজানা দ্বীপে বলা তো যায় না কখন কোথা থেকে মৃত্যু হামাগুড়ি দিয়ে নেমে আসে। সতর্ক থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অতিরিক্ত সতর্ক হতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যে ভুলটা করে অভিজ্ঞ শঙ্কর আর আর্নল্ডও সেই ভুলটাই করে ফেলল। আর একটু হলে বড় রকমের একটা অঘটন ঘটে যেতেই পারত। রাত্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্য জন্তুর গর্জন দ্বীপটাকে যত ভয়ংকর করে তুলছিল ততই এরা দুজনে সরে সরে আসছিল সমুদ্রের দিকে। ওদের দুজনের কারুরেই মাথাতে ছিল না যে বিপদ সমুদ্রের থেকেও আসতে পারে। শঙ্কর আর আর্নল্ড দুজনেই কান খাড়া করে রাইফেল উঁচিয়ে জঙ্গলের দিকে তাক করে বসেছিল। ঠিক এমন সময় পিছন থেকে কখন যে অদ্ভুত ধরণের কদাকার কচ্ছপের মতো একটা সামুদ্রিক প্রাণী ওদের দুজনের খুব কাছে চলে এসেছে ওরা টের পায়নি। আর একটু দেরি হলেই হয়তো... ভাগ্যিস ঠিক সময়ে কয়েকটা সামুদ্রিক পাখি ওদেরকে সতর্ক করে দিয়েছিল!
বড় অদ্ভুত ধরণের জন্তুটা। আর্নল্ডের রাইফেল গর্জন করে উঠতেই প্রায় পাঁচ-সাত মিটার ঝাঁপিয়ে সমুদ্রের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল। আর্নল্ড বললে- এমন ধরণের প্রাণী এর আগে আমার চোখেও পড়েনি। দেখে তো মনে হল উভচর। কিন্তু উভচর হলে আগেরবার একবারের জন্য হলেও আমার চোখে পড়ত।
শঙ্কর কিছুই বলল না। উদাসীন ভাবে শুধু চেয়ে রইল জঙ্গলের দিকে। বুনিপের পায়ে ক্ষতবিক্ষত হওয়া আলভারেজের চেহারাটাই বারবার মনে পড়তে লাগল ওর।
ভোরের দিকে দুজনেরেই হয়তো আবার তন্দ্রা এসে থাকতে পারে। সূর্যের কচি আলোয় যখন ওদের ঘুম ভাঙল তখন সমুদ্রের কিনারায় হরেক রকম পাখির হাট বসেছে। কোনওটা শিস দিচ্ছে কিনারায় বসে তো কোনওটা ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করছে আপন মনে। এক মুহূর্তের জন্য হলেও শঙ্কর জাহাজ খুঁজে না পাওয়ার কথাটা ভুলে গেল পাখিগুলোকে আপন মনে বাঁচতে দেখে। পাখিগুলোর জীবনটা আমাদের চেয়ে ঢের বেশি সুন্দর তাই না ?- শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে কথাটা বলেই ফেলে শঙ্কর। আর্নল্ড কিছু না বলে পরম তৃপ্তির সঙ্গে পাখিগুলোর দিকে চেয়ে থাকে।
সমুদ্র কিনারায় আরও কিছুক্ষণ বসে থাকার পর ওরা প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পশ্চিম দিকে হেঁটে গেলে জাহাজটা দেখতে পায়। জাহাজটা যেখানে ছিল সেখানেই আছে। অন্তত জায়গাটাকে দেখে শঙ্করের তো তাই মনে হয়। কিন্তু এটা কেমন করে সম্ভব ? কালকে ওরা জাহাজ থেকে নেমে বহুদূরে কোথাও যায়নি। তাহলে জাহাজটা এতোটা দূরে এল কেমন করে। জাহাজটা যে ভেসে এসেছে তাও নয়, জাহাজটা যেখানে ছিল সেখানেই আছে!
পুরো ব্যাপারটাকে মনের ভ্রম বলে উড়িয়ে দিতেই পারত শঙ্কর কিন্তু সেটা পারল না আরেকটা কারণে। গত কাল সকালে জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে দ্বীপটার পশ্চিম দিকে সারি সারি যে পর্বতশ্রেণী গুলোকে দেখেছিল শঙ্কর ওগুলো এখন পশ্চিম থেকে সরে গিয়ে উত্তর দিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শঙ্করের বিস্ময়ের সীমা রইল না আর। এখানের সবই যেন জীবন্ত। চলমান। পরিবর্তনশীল। কিন্তু এটা কেমন করে সম্ভব তার কোনও যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা খুঁজে পেলো না ও।
বিকেলের দিকে কফি খেতে খেতে আর্নল্ড বললে- আমি এখান থেকে ঘরে ফেরার পর বাল্ট্রা দ্বীপের কথা শুনেছিলাম। ওখানেও নাকি স্থান কাল পাত্রের কোনও হিসেব মেলে না। তুমি তো এটুকুতেই অস্থির হয়ে পড়েছ শঙ্কর, সত্যি বলতে আগেরবার আমার নিজেকে নিয়েও সন্দেহ হচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল আমি যেন আমি নই। আমি যেন অন্য কেউ। আর কয়েক দিন থাকলে হয়তো আমি পাগল হয়ে যেতাম। এখান থেকে বাড়ি ফিরতে হলে এখানের মূল স্রোতটাকে বুঝতে হবে। আমার মনে হয় সেটা বুঝতে অন্তত তোমার বিশেষ সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আরেকটা কথা, আমরা আগামীকাল সকালেই কাঁচা হীরার সন্ধানে বার হব। জাহাজে ফিরতে কয়েকটা দিন হয়তো দেরি হবে তাই প্রয়োজনের বেশি গুলি খরচা না করাই ভাল।
আর্নল্ডের কথাগুলো শুনতে শঙ্করের মোটেই মন্দ লাগে না। আর্নল্ডের ভেতর কোথায় যেন দিয়াগোর একটা ছায়া খুঁজে পায় শঙ্কর। হয়তো সেই জন্যই আর্নল্ড কিছু বললে বেশ মনোযোগের সঙ্গেই কথাগুলো শোনে।
দুজনেই বেশ ক্লান্ত ছিল বলে বেশিক্ষণ রাত জাগল না কেউই। জাহাজের কেবিন ঘরটাতে দুজনে পাশাপাশি দুটো বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
কি একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল শঙ্করের। জাহাজের বাইরে থেকে আসছে শব্দটা। ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল শঙ্কর। আর্নল্ড হয়তো আগেই জেগে গিয়েছিল শঙ্করকে উঠে বসতে দেখে হাতের ইশারায় শব্দ করতে মানা করল। কেবিন ঘরের জানালায় দুজনেই কান পেতে বসে রইল কিছুক্ষণ। কিন্তু শব্দটা ঠিক কীসের আর কোথা থেকেই বা আসছে সেটা বোঝা গেল না। শঙ্করের মনে হল কেউ যেন জাহাজটার বাইরে দাঁড়িয়ে চাবুক কিংবা দড়ির মতো কিছু একটা জিনিশ বালির উপর সপাৎ সপাৎ করে পেটাচ্ছে। কেবিনের জানালা খুলে বাইরেটা দেখতে গেলে বাইরের প্রাণীটা জাহাজের ভেতরে আর্নল্ড আর শঙ্করের উপস্থিতি টের পেতে পারে। বাধ্য হয়েই আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইতে হল দুজনকে। বাইরে কিন্তু এখনো সপাৎ সপাৎ করে শব্দটা হয়েই চলেছে। তাহলে কি বাইরের প্রাণীটা ভেতরের প্রাণী দুটোর অস্তিত্ব টের পেয়েছে! কথাটা মনে হতেই শঙ্করের সারা শরীরটা কেঁপে ওঠে। গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
বেশ কয়েক মিনিটের জন্য সপাৎ সপাৎ শব্দটা বন্ধ হয়েছে দেখে আর্নল্ড জানালাটা খুলে বাইরেটা দেখতে যাচ্ছিল ঠিক এমন সময় জানালা ঘেঁষে বেশ দীর্ঘ একটা নিশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। প্রাণীটা যে ভেতরটা শোঁকার চেষ্টা করছে সেটা আর্নল্ড বা শঙ্কর কারুরই বুঝতে বাকি রইল না আর। আর্নল্ড ইশারায় শঙ্করকে কেবিন ঘরের বাইরে বেরিয়ে যেতে বলে নিজেও বেরিয়ে আসে। প্রাণীটা এতক্ষণে জানালায় গোঁতা মারতে শুরু করে দিয়েছে। যে কোনও সময় ভেঙে পড়বে জানালাটা।
আর রিস্ক নেওয়াটা ঠিক হবে না ভেবেই রাইফেল হাতে নিয়ে আর্নল্ড ডেকের উপরে উঠে আসে। পিছনে পিছনে শঙ্করও। ডেকের উপরে দাঁড়িয়ে ওরা দেখে, জানালা ভেঙে কেবিন ঘরের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে বিশাল মাপের এক পাইথন। বালির উপর বারবার লেজটাকে চাবুকের মতো আছাড় দিচ্ছে পাইথনটা। শঙ্কর আর্নল্ডকে ফিসফিস করে বললে- ফুট কুড়ি তো  হবেই, তাই না ?
আর্নল্ড শঙ্করের প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে রাইফেলটা উঁচিয়ে ধরে। মুহূর্তের মধ্যে রাইফেলের গর্জনে কেঁপে উঠল এলাকাটা। বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ শঙ্করের নাকে মুখে এসে ঝাপটা দিয়ে গেল। একটা গুলিতেই লুটিয়ে পড়ল পাইথনটা। মরার আগেও শেষ কয়েকবার লেজটা বালির উপর সজোরে আছড়ে নিলো সপাৎ সপাৎ করে। পাইথনটাকে সাবাড় করার পর আর্নল্ড মৃদু হেসে শঙ্করকে বললে- হাঁ ফুট কুড়ি তো হবেই। তবে চাইলে কালকে সকালে মেপে নিতে পারো একবার।
[চার]
রাত্রিতে আর ঘুম ধরল না শঙ্করের। বারবার মনে হতে লাগল এই বুঝি আবার কোনও পাইথন কিংবা অন্য কোনও জংলি জানোয়ার এসে জানালা দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। ভয়ে ভয়েই পার হল রাত্রিটা।
পরদিন সকাল সকাল ওরা দুজনে বেরিয়ে পড়ল হীরার সন্ধানে। এই ধরণের রহস্যময় দ্বীপে হীরা কিংবা তার চেয়েও মূল্যবান রত্ন খুঁজে পাওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়। সারা দ্বীপটা জুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রঙ-বেরঙের নানান মাপের নুড়ি পাথর।
নিজের হাতে বানানো একটা ম্যাপ দেখে শঙ্করের আগে আগে চলেছে আর্নল্ড। মোটামুটি ভাবে উত্তর পশ্চিমের পর্বতশ্রেণী গুলোর দিকেই এগিয়ে চলেছে ওরা। তবে ওই পর্বতশ্রেণীগুলো যে মোটেই কাছে নয় সেটা শঙ্কর ভাল মতোই জানে। আফ্রিকায় ও দেখেছে অনেক দূরের পাহাড় পর্বতগুলোকেও কাছের বলে ভীষণ রকম ভুল হয়। এদিকটায় জঙ্গল একটু হলেও কম, তবে আর কয়েক মাইল হাঁটার পর শুরু হবে গভীর জঙ্গল। সেটা এখান থেকে দেখেই বেশ বুঝতে পারছে শঙ্কর।
এখন যেখান দিয়ে ওরা হাঁটছে তার চার দিকেই চুনা পাথরের ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে দু-একটা করে বট প্রজাতির প্রাচীন গাছ। গাছ গুলোর গায়ে আঁচড় কেটে কেটে এগিয়ে চলেছে শঙ্কর। এটা আলভারেজের কাছ থেকেই শেখা। এমন পরিবর্তনশীল দ্বীপে পথ চিনে জাহাজে ফিরতে না পারলে মৃত্যু ছাড়া দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই। তাই যত দূর ওরা যাবে চিহ্ন দিয়ে দিয়েই যেতে হবে। পথ চলতে চলতেই আর্নল্ড বললে- শঙ্কর তোমার পদ্ধতিটা মোটেই মন্দ নয় তবে আমার মনে হয় না তোমার এই ফর্মুলা এখানে কাজ করবে বলে। এখানকার সবেই জীবন্ত। আজকে তুমি যে পথ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছ কালকে এই পথটাকে খুঁজে পাবার আর আশা না রাখাই ভাল। তবে আমার শরীরে-মনে সমুদ্র আছে, আমি দশ দিন পরে হলেও ঠিক ওকে খুঁজে নেবো।
এবার গভীর বনের ভেতর ওরা প্রবেশ করে। চার দিকটাই বেশ শান্ত। বড় বড় গাছের গুঁড়ি বেয়ে ঝুলছে বন্যলতা। আর্নল্ড শঙ্করকে সাবধান করে দিয়ে বললে- ওই লতা গুলোর থেকে দূরেই থেকো ওরাও জীবন্ত, মাংসাশী। কথাটা শঙ্করের বিশ্বাস না হলেও ও যথাসাধ্য ঝুলন্ত লতা গুলোকে এড়িয়েই চলতে লাগল। আরও কিছুদূর চলার পরেই শঙ্কর টের পেলো কেন আর্নল্ড লতাগুলোর থেকে দূরে থাকতে বলছিল। সতর্ক ভাবে হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ এক জায়গায় রাইফেল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে আর্নল্ড, একটা বিশালাকার গাছের উপর একটা অদ্ভুত প্রাণী ঝুলছে। শঙ্কর প্রথমে দেখতে পায়নি পরে আর্নল্ড আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দেয়। প্রাণীটাকে বন্যলতাগুলো জাপটে জড়িয়ে আছে, নিজেকে বাঁচানোর জন্য ছট-ফট করছে প্রাণীটা কিন্তু পারছে না কিছুতেই। প্রাণীটাকে দেখতে অনেকটা ঘোড়া আর জেব্রার মিলিত রূপের মতো। আর্নল্ড বললে- ওটা কুয়াগা, বিরল প্রজাতির প্রাণী। একটা সময় পশ্চিম আফ্রিকায় প্রচুর ছিল এখন আর দেখা যায় না। এখানকার প্রায় প্রতিটা দ্বীপেই প্রচুর আছে। নানান মাংসাশী প্রাণীর খাদ্যের যোগান দেয় ওরা।
প্রাণীটার দম বন্ধ হয়ে আসছে দেখে শঙ্করের বাঙালী মনটা ডুকরে উঠছিল বারবার। করার কিছুই ছিল না। প্রাণীটাকে সাহায্য করতে না পারার যন্ত্রণা নিয়েই আর্নল্ডের সঙ্গে এগিয়ে চলল শঙ্কর। হঠাৎ করে ওর কানে এল পিছন থেকে ভেসে আসা সড়সড় শব্দটা। কিন্তু পিছন ফিরে কিছুই চোখে পড়ল না। কথাটা আর্নল্ডকে বলতেই দাঁড়িয়ে পড়ে আর্নল্ড। চোখ বন্ধ করে শব্দটা শোনার চেষ্টা করে। কিন্তু, কিছুই কানে আসে না। যথেষ্ট সতর্ক ভাবেই ওরা আবার পা বাড়ায়। কয়েক পা চলতে না চলতেই শব্দটা আবার কানে আসে। এবার শঙ্কর একা নয় আর্নল্ডও শুনেছে শব্দটা।
স্থির ভাবে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েই আর্নল্ড বুঝতে পারে গাছে ঝুলতে থাকা বন্যলতা গুলোই গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। প্রায় প্রতিটা গাছে ঝুলতে থাকা লতাই এবার দুলতে শুরু করেছে। কোনও কিছু ভাবনা চিন্তা না করেই আর্নল্ড শূন্যে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়তেই লতাগুলো কয়েক সেকেন্ডের ভেতর গাছের উঁচু উঁচু ডালে অদৃশ্য হয়ে যায়।                           
লতাগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য হলে দুজনে আরও চলতে শুরু করে। বারেক্কে বনটা গভীর হচ্ছে। পায়ের তলায় এখন পচা পাতার স্তূপ ছাড়া আর কিছুই নেই। মাথার উপর হালকা ভাবে সূর্যের কিরণ এলেও সেটা এতটাই ক্ষীণ যে তাতে গাছের তলায় পড়ে থাকা স্যাঁতস্যাঁতে পাতাগুলো মনে হয় কোনও দিনও শুকনো হবে না। আরও কিছুক্ষণ চলার পর পাখির ডাক শোনা গেল। শঙ্কর বললে- বালিহাঁস, কাছে পিঠেই কোথাও জলাশয় আছে মনে হয়।
শঙ্করের ধারণাটা মোটেই ভুল নয়, আরও কিছুটা হাঁটার পর চোখে পড়ল একটা ঝিল। একটা পাহাড়ি ঝর্ণা এই ঝিলে এসেই বিশ্রাম নিয়েছে। ঝিলটার চারদিকে বালিহাঁস আর তিতির পাখির মতো ছোট এক ধরণের পাখি খেলা করছে। মুহূর্তেরে জন্য হলেও শঙ্করের মনে হল ও এখন নিজের গ্রামেই আছে। বারমুডার মতো ভয়ংকর দ্বীপে বালিহাঁস কিংবা তিতির প্রজাতির পাখি থাকতে পারে সেটা মনে হয় অতিবড় মূর্খও কল্পনা করবে না। আর্নল্ড বললে- দিনের আহারটা এখানে সেরে ফেললে মন্দ হয় না। সামনে খাবারের তেমন জোগাড় করতে না পারলে সমস্যায় পড়ব।
শেষ পর্যন্ত বালিহাঁসের ঝলসানো মাংস আর শুকনো পাউরুটি দিয়েই দুজনে দিনের আহারটুকু সেরে নেয়। আবার শুরু হয় চলা। এই চলার যেন শেষ নেই। আসলে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আফ্রিকা কিংবা বারমুডার পথে পা বাড়িয়ে দেয় তারা আর যাই হোক শুধুমাত্র হীরা কিংবা রত্নের সন্ধানেই ঘর ছাড়ে না। তারা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে জীবনের এই বিপদ সঙ্কুল পথটুকু চলার জন্যই বোধ হয়।
সারাদিন চলার পর যখন জঙ্গলটা একটু পাতলা হয়েছে বলে মনে হল তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হব হব। খুব বেশি হলে আর ঘণ্টা খানেক পথ হাঁটা যাবে তারপর বিশ্রাম নেবার কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। আফ্রিকার চেয়ে এখানে একটা সুবিধা যে এখানে সিংহ কিংবা বুনিপের ভয়টা নেই।
শেষ পর্যন্ত জঙ্গলের ভেতরেই এক টুকরো ফাঁকা জমি পেয়ে সেখানেই তাঁবু ফেলল দুজনে। জায়গাটাও বেশ নিরিবিলি। দুপুরের খাওয়াটা একটু ভারী রকমের হয়েছে বলে রাত্রিতে কারুরই খাবার প্রতি তেমন আগ্রহ দেখা গেল না। তাঁবুর বাইরে শুকনো কাঠের আগুন জ্বালিয়ে নটা দশটার পর শুয়ে পড়ল দুজনে। সারাদিনের ক্লান্তিতে দুজনের কারুরেই ঘুম আসতে বিশেষ দেরি হল না।
ঘুমিয়ে পড়ার ঘণ্টা খানেকের ভেতরেই শঙ্করের ঘুমটা ভেঙে গেল। বিছানা থেকে উঠে শঙ্কর খেয়াল করল তাঁবুর ভেতর আর্নল্ড নেই। মুহূর্তের ভেতরেই ভয়ের একটা শীতল স্রোত খেলে গেল শঙ্করের সারা শরীরে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর নিজেকে সামলে নিয়ে রাইফেল আর টর্চ হাতে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এল শঙ্কর। তাঁবুর বাইরেটা জ্যোৎস্নার আলোয় ভরে আছে। পূর্ণিমার চাঁদ এখন মাথার উপর। চারপাশটা ভাল করে তাকিয়ে দেখতেই শঙ্করের চোখে পড়ল তাঁবুর থেকে অল্পদূরে আর্নল্ড আপন মনে বসে বসে চুরুট টানছে। কাছে যেতেই আর্নল্ড বললে- আচ্ছা শঙ্কর এখানে আসার পর চাঁদ দেখেছো বলে তোমার মনে আছে ? শঙ্কর হাঁ-না কিছু বলার আগেই আর্নল্ড আবার বললে- শুধু তাই নয় শঙ্কর, আমার মনে হয় আমরা বারমুডার চক্রব্যূহে আটকা পড়েছি। সামনের জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে দেখো!
সামনের জঙ্গলটার দিকে তাকিয়ে শঙ্করের আশ্চর্যের সীমা রইল না। সারা জঙ্গলটা সাদা সাদা অর্কিড আর জংলি ফুলে ভরে আছে। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল কোথাও কোনও পর্বতশ্রেণীর চিহ্ন মাত্র নেই। এ কোন গোলকধাঁধার মধ্যে আটকা পড়েছে ওরা! এখানের তো কোনও কিছুরেই কোনও স্থিরতা নেই। প্রতি মুহূর্তে সব যেন অদ্ভুত ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। এখানের সবই যেন মায়া কিংবা কালা-জাদু। আর্নল্ডের প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে না পেরে শঙ্কর দূরের জঙ্গলটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। নিজের চোখকেই যেন এখন বিশ্বাস হচ্ছে না ওর।
পরেরদিন সকাল সকাল তাঁবু উঠিয়ে আবার চলতে শুরু করল দুজনে। এবার আর কোনও লক্ষ্য নেই, যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকেই হাঁটা। কিন্তু এমন ভাবে কতদিন চলবে ওরা! সময় মতো জাহাজে ফিরতে না পারলে রাক্ষুসে বারমুডার দ্বীপে বেঘোরে প্রাণ দেওয়া ছাড়া আর অবশিষ্ট কিছুই থাকবে না।
আজকে পথ চলতে তেমন একটা সমস্যা হচ্ছিল না শঙ্করের। দ্বীপটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতেই অজানা পথে চলছিল দুজনে। আজকে সকালের পর থেকে এক বারও ম্যাপটা বার করেনি আর্নল্ড। ম্যাপটা দেখেও তেমন কোনও লাভ হত বলে তো মনে হয় না। নিজেদের খেয়াল খুশি মতো সারাদিন চলার পরেও যখন জঙ্গলটার কোনও রকম কূলকিনারা পাওয়া গেল না তখন বাধ্য হয়েই বিশ্রাম নেবার জন্য একটা পাতা বহুল গাছের নীচে বসতে হল দুজনকে। শরীর বেজায় ক্লান্ত, জল আর খাবার ছাড়া আর এক পা চলার শক্তি দুজনের কারুরেই নেই। এক ঘণ্টার মতো বিশ্রাম নেওয়ার পর শুরু হল জলের খোঁজ।
সারাদিন ঘোরার পরেও ওরা এক ফোটা জলের সন্ধান করতে পারল না শেষ পর্যন্ত। আজকে সারাদিন তেমন কিছু খাবারও পড়েনি পেটে। খিদে আর তেষ্টাতে চোখের পাতায় অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। বারমুডার মৃত্যুচক্রে সম্পূর্ণ ভাবে জড়িয়ে গেছে ওরা। এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে না পারলে মৃত্যু নিশ্চিত। শঙ্করের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে আর্নল্ড বললে- নিজেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে হবে শঙ্কর। এর চেয়েও বিপরীত পরিস্থিতিতে কাটিয়ে এসেছ তুমি। রাত্রি নামার আগেই আমরা জলের সন্ধান ঠিক খুঁজে বের করব। আর্নল্ডের কথাতেও শঙ্করের উদাসীন মুখের তেমন কোনও পরিবর্তন হল না। এতক্ষণে শঙ্কর ভাল মতোই বুঝতে পেরেছে যে ওদের সঙ্গে প্রতিমুহূর্তে প্রতারণা করছে বারমুডার প্রকৃতি। বারমুডা সদয় না হলে জলের অভাবে তিল তিল করে মরতে হবে।
রাত্রি নেমে আসতে বিশেষ দেরি নেই আর। এদিকে চলার শক্তি টুকুও হারিয়ে ফেলেছে শঙ্কর। বারমুডার প্রকৃতির সঙ্গে আফ্রিকার কোনও তুলনাই যে চলে না সেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই টের পাচ্ছে শঙ্কর। এখানকার এক একটা জঙ্গল এতটাই নিস্তব্ধ যে বন্য পশুর ডাক তো দূরের কথা পাখির ডাক শোনাও ভাগ্যের ব্যাপার। শেষ কখন পাখির ডাক কানে এসেছিল সেটাও মনে পড়ছে না ওর এখন। আফ্রিকার সিংহ গর্জনের চেয়েও বারমুডার নিস্তব্ধতা যেন শতগুণ বেশি ভয়ংকর। একাধিকবার বারমুডার চোখে ধুলো দিয়ে বারমুডা বিজয়ের শ্রেষ্ঠ গৌরবের অধিকারী অলিভার আর্নল্ড পর্যন্ত মুষড়ে পড়েছে এখন। সুদূর ভারতবর্ষ থেকে শঙ্কর কীসের টানে এখানে এসেছিল সেটাও হয়তো ওর এখন আর মনে নেই। শঙ্করের হাতে হাত রেখে আর্নল্ড আবার বললে- শঙ্কর এখানে বসে থাকলে চলবে না। আমাদেরকে পাহাড়ি ঝর্ণা কিংবা ঝিল খুঁজে বের করতেই হবে... কামন ইয়াং ম্যান, নিজের উপর বিশ্বাস হারিও না।
খিদে আর তেষ্টাতে সারা রাত্রি টলতে টলতে জলের খোঁজে ঘোরার পর ভোররাতে ওদের কানে এল পাহাড়ি নদী বয়ে চলার শব্দ। নদীটার কাছে পৌঁছে শঙ্করের চোখে পড়ল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, একটা মাঝারি মাপের পাহাড়ের উপর থেকে আটটা ঝর্ণা এক সঙ্গে নেমে এসে নদীটার সৃষ্টি করেছে। পাহাড়টাকে দেখার পর আর্নল্ডের তেষ্টা যেন মুহূর্তের ভেতর মিলিয়ে গেল। পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে আর্নল্ড বেশ খুশির সঙ্গেই উচ্চকণ্ঠে বললে- পেয়েছি শঙ্কর। খুঁজে পেয়েছি। আগেরবার নিজের ভুলে এই পাহাড়টাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না আমি কতটা খুশি। কথাগুলো বলার পর আনন্দে শঙ্করকে জড়িয়ে ধরে আর্নল্ড। আর্নল্ডের খুশির কারণটা সঠিক বুঝতে না পারলেও খানিকটা অনুমান করতে পেরেছে শঙ্কর।
পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো থেকে নেমে নদীটা যে দিকে বয়ে গেছে সেদিকটায় বেশ কয়েকটা বড় মাপের গাছে প্রচুর কালো কালো ফল ঝুলছে। সম্ভবত পেকেছে ফলগুলো। আর্নল্ড শঙ্করকে অভয় দিয়ে বললে- যে ফল পেকে কালো হয় সে ফল সচরাচর বিষাক্ত হয় না। যদিও এখন ওদের পেটের যা অবস্থা তাতে কোনও কিছুকেই ওদের বিষাক্ত মনে হবার কথা নয়।
গাছের তলায় গিয়ে শঙ্কর দেখল ফলগুলো দেখতে অনেকটা পাকা জামের মতোই। গাছের নীচে প্রচুর ছড়িয়ে রয়েছে। নীচের থেকে কিছু কুড়িয়ে কিছু গাছের থেকে পেড়ে ওরা পেট ভর্তি করে ফলাহার করে নেয়। বেশ কিছু সঙ্গেও নিয়ে রাখে। আবার কখন কোথায় খাবার পাবে বলা যায় না। পেট ভর্তি করে ফলগুলো খাবার পর আরও খানিকটা করে জল খেয়ে নিলো ওরা।
আবার শুরু হল চলা। এবার ওই মাঝারি মাপের পাহাড়টাকে লক্ষ্য করে। আর্নল্ডের কথা মতো ওই পাহাড়টা পেরিয়ে গেলেই দেখা যাবে কাঁচা হীরা বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতশ্রেণী। নদীটাকে ডানপাশে রেখেই হেঁটে চলেছিল ওরা। তবে বেশিক্ষণ চলতে পারল না। কিছুক্ষণ চলার পরই শুরু হল বমি। প্রথমে আর্নল্ড তারপর শঙ্কর। খালি পেটে প্রচুর পরিমাণ ফল খাওয়াটা মনে হয় ঠিক হয়নি ওদের। এখন বিশ্রাম নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
বিশ্রাম নিয়ে নিয়েই অনেকটা এগিয়ে এসেছে দুজনে। তবে এখন মাথার উপর চড়া রোদ। আর হাঁটা সম্ভব নয়। খানিকটা বাধ্য হয়েই ওদেরকে একটা গাছের নীচে বসতে হল। কাছেপিঠে কোথাও সুগন্ধি ফুল ফুটেছে মনে হয়। মিষ্টি গন্ধে চারপাশটা ভরে আছে।
এতক্ষণে শঙ্করের কানে এসে পাখির ডাক আবার ধরা দিল। যেন কতশত বছর পাখির ডাক শোনেনি ও, এমনটাই মনে হল শঙ্করের। আর্নল্ড বললে- পাখির ডাক আবার শোনা গেছে তারমানে সামনে আমাদের খাবারের অভাব হবে না। জানতো শঙ্কর ছোটর থেকেই এমন বন-জঙ্গল-পাহাড়-সমুদ্র-পর্বতের স্বপ্ন দেখতাম। আসলে হীরা আমার লক্ষ্য নয় বরং অজুহাত বলতে পারো। আমি বনে জঙ্গলে পাহাড়ে সমুদ্রে ঘোরার অজুহাত খুঁজে বেড়াতাম। বয়স তো আর কম হল না মাই ডিয়ার ইয়াং ফ্রেন্ড, কী করব হীরা দিয়ে আমি ? এখানে যা পাবো সব তোমার সব সব... ওসব আমার লাগবে না।এই যে চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়টা? মাথায় আটটা ঝর্ণা ধরে রেখেছে এটার সৌন্দর্য কি হীরার চাইতে কম? আমার তা মনে হয় না। আমার জীবন নিয়ে আমি যথেষ্ট খুশি। নিজের মতো করে বেঁচেছি সারাটা জীবন।
আর্নল্ডের কথা শুনতে শুনতে নিজের ভেতরেই হারিয়ে পড়ে শঙ্কর। সেই ফুটবল খেলার মাঠটা ? সাঁতার কাটার দিনগুলো ?  দল বেঁধে পাঠশালায় যাওয়া ? সবাই মিলে সুর করে স্কুলের পাঠ পড়া ? আচ্ছা ফেলে আসা শৈশবের সেই দিনগুলোর চেয়েও কি হীরার টুকরোর দাম বেশি ? নিজের ভেতরে কীসব বিড়বিড় করে বলতে থাকে শঙ্কর। মাথাটা কেমন যেন ভার ভার লাগে ওর।
একটা চুরুট আনমনা ভাবে ঠোঁটে ঝুলিয়ে নিজের আজীবনের অপ্রকাশিত স্মৃতিগুলো শঙ্করকে বলতে বলতেই একটা সময় আর্নল্ড খেয়াল করে, কেমন ভাবে যেন ঝিমচ্ছে শঙ্কর। ওর চোখ দুটোও মাত্রাতিরিক্ত লাল। আর্নল্ড বেশ চড়া গলায় শঙ্করকে ডেকেও কোনও সাড়া শব্দ না পেয়ে প্রথমটায় একটু ঘাবড়ে যায়। কিন্তু অভিজ্ঞতার জোরেই আর্নল্ড বুঝতে পারে দূর থেকে ভেসে আসা মিষ্টি ফুলের গন্ধতেই চেতনা হারিয়েছে শঙ্কর।
কোনোক্রমে শঙ্করকে তুলে নদীটার কাছে নিয়ে আসে আর্নল্ড। চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দেয় বারবার। মিনিট দশেক জলের ঝাপটা দেওয়ার পর শঙ্করের চেতনা ফেরে। চেতনা ফিরলে শঙ্করের চোখের পাতায় আফ্রিকার দিনগুলো ভেসে উঠে। নদীর ধারে বসে আরও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয় ওরা তারপর আবার চলতে শুরু করে।
[পাঁচ]
যখন ওরা পাহাড়টায় চড়তে শুরু করেছে তখনো সূর্যাস্ত হতে কিছুটা সময় বাকি। পড়ন্ত বিকেলের হালকা হলুদ আলোয় ঝলমল করছে ঝর্ণাগুলো। পাহাড়ের উপর থেকে ভেসে আসছে নানান ধরণের পাখির কিচির-মিচির শব্দ। পাহাড় চড়তে চড়তে শঙ্করের মনে হচ্ছিল, মৃত রাজ্যের থেকে জীবনের দিকে এগিয়ে চলেছে ওরা। একটু বড় মাপের গাছগুলোতে দল বেঁধে বানর আর হনুমান বসে আছে। এখানকার বানর কিংবা হনুমানগুলো পরিচিত বানর হনুমানের মতো না হলেও প্রায় একই রকম। এদের লেজ একটু বড় আর মুখের গঠনটা অনেকটাই বেড়ালের মতো এই যা পার্থক্য। ওদের রাজ্যে এসে পড়া অপরিচিত দুই আগন্তুককে অদ্ভুত রকম ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ওরা।
পাহাড়ের উপর চড়তে চড়তে শঙ্করের চোখ পড়ে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা হালকা হলুদ পাথর গুলোর উপর। শঙ্কর ভাল মতোই চেনে এই পাথরগুলোকে। এই পাথরগুলোর খোঁজেই আফ্রিকায় জীবন দিয়েছিল আলভারেজ। জিম কার্টার। আত্তেলিও গাত্তি। এই পাথরগুলোর খোঁজেই শঙ্কর আর আর্নল্ড বারমুডায়। একটা হলুদ পাথর কুড়িয়ে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে দেখে শঙ্কর, হাঁ কাঁচা হীরা। তবে হীরার তুলনায় খাদ অনেক বেশি। শঙ্করের দিকে চেয়ে আর্নল্ড বলে- এগুলো কুড়িয় না শঙ্কর। আসল জিনিশ পেতে এখনো সময় লাগবে। বারমুডা চাইলে তোমাকে মহারানী শেবার চেয়েও বেশি রত্নের মালিক বানাতে পারে।
পাহাড়টার এক্কেবারে চূড়ায় উঠে শঙ্কর দেখতে পেল বেশ কয়েক মাইল দূরেই দাঁড়িয়ে আছে কাঙ্ক্ষিত সেই পর্বতশ্রেণী। ওই পর্বতগুলো থেকে হুমড়ি খেয়ে ছুটে আসছে বেশ কয়েকটা জলের ধারা। বেলা শেষের মৃদু আলোতে ঝলমল করছে পর্বত চূড়াগুলো। মন্ত্রমুগ্ধের মতো নির্বাক হয়ে শঙ্কর কয়েক মিনিট তাকিয়ে দেখল পর্বতগুলোকে। এতক্ষণে ওর মনে হচ্ছে বারমুডায় আসা ওর সার্থক।
দিনের আলো থাকতে থাকতেই পাহাড়ের উপর তাঁবু টাঙিয়ে নিলো দুজনে। এখানে খাবারেরও কোনও সমস্যা নেই, শয়ে শয়ে নানান ধরণের পাখি আর বাদুড় ঘুরছে মাথার উপর। কিন্তু খানিক বাদে একটা অদ্ভুত জিনিশ খেয়াল করল দুজনেই, সূর্য ডুবতে না ডুবতেই পাহাড়ের উপর থেকে নাম না জানা সব পাখির দল নিজেদের মতো করে উড়ে চলে যাচ্ছে দূরের জঙ্গলের দিকে। হনুমান আর বানরগুলোও পাহাড় থেকে নেমে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। ব্যাপারটা শঙ্কর বা আর্নল্ড কারুর মাথাতেই ঢুকল না।
রাত্রিতে বাদুড়ের নরম মাংস দিয়ে আহার সেরে আর্নল্ডের পাশেই শুয়ে পড়েছিল শঙ্কর। তবে পাহাড়ি ভ্যাপসা গরমের চোটে ওর ঘুম আসছিল না কিছুতেই। তাঁবুর বাইরে গিয়ে বসাটা উচিৎ হবে কি না এটাই ভাবছিল শুয়ে শুয়ে ঠিক এমন সময় ওর কানে ভেসে এল একটা বাচ্চা ছেলের কান্নার শব্দ। বড় বিষণ্ণতায় ভরা কান্নার সুরটা। বারমুডার এই রহস্যময় দ্বীপ থেকে বাচ্চা-ছেলের কান্নার শব্দ ভেসে আসা হতবাক করার মতোই ঘটনা। অথচ একটানা বিরক্তিকর ভাবে কেঁদে চলেছে বাচ্চাটা। শঙ্কর একবার ভাবলে বাইরে বেরিয়ে ব্যাপারটা দেখবে তারপরই ওর মনে হল অচেনা অজানা দ্বীপের পাহাড়ে একা একা বাইরে বার হওয়াটা ঠিক হবে না। বাধ্য হয়েই ঘুম ভাঙাতে হল আর্নল্ডের।
বেশ কিছুক্ষণ মন দিয়ে বাচ্চার কান্নাটা শোনার পর আর্নল্ড বললে- চল একবার বাইরে বেরিয়ে দেখা যাক, নতুবা ঘুম আসবে না আর কিছুতেই। শঙ্কর আর আর্নল্ড যখন টর্চ আর রাইফেল হাতে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এল তখনো কেঁদেই চলেছে বাচ্চাটা। তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এসে ওরা দেখল আরেক অদ্ভুত দৃশ্য। প্রায় প্রত্যেকটা বড় বড় গাছের মাথায় হাজার হাজার ক্ষুদ্র লাল আলো জ্বলজ্বল করছে। ঠিক যেন রক্তরাঙা জোনাকি। শঙ্কর জিজ্ঞেস করলে- ওগুলো কীসের আলো ? আর্নল্ড শঙ্করের প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে সোজা টর্চ ফেললে একটা বড় মাপের গাছের মাথায়। টর্চের আলোয় শঙ্কর বা আর্নল্ড যা দেখলে তাতে করে ওদের রক্ত হিম হওয়ারেই কথা। প্রায় প্রতিটা বড় মাপের গাছের ডালে শয়ে-শয়ে বাদুড় ঝুলছে। টর্চের তীব্র আলোয় ঝকঝক করছে ওদের রক্ত লোলুপ দাঁত গুলো।
খানিকটা ভয়ের সঙ্গেই শঙ্কর জানতে চাইলে- ওগুলো কি ভাম্পায়ার ? আর্নল্ড এবারেও শঙ্করের প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে একটা বড় মাপের গাছের দিকে আঙুল বাড়িয়ে কিছু একটা দেখাতে চাইল।
শঙ্কর দেখতে পেলো একটা গাছের নিচু একটা ডালে বসে কয়েকটা শকুন বাচ্চা ডাকছে, ওদের ডাকটাই ঠিক যেন বাচ্চা ছেলের কান্নার মতো। আর শকুনের বাসাটার ঠিক নীচেই ঝুলছে কয়েকটা বাদুড়। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ওদের মুখ থেকে। কয়েক মিনিট আগেই হয়তো ওরা রক্ত চুষেছে। আর্নল্ড এবার ফিসফিস করে বললে- এখানে থাকাটা ঠিক সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না আমার। ওরা আক্রমণ করে বসলে বন্দুক দিয়ে আটকানো সম্ভব হবে না। চলো অনেক হয়েছে এবার তাঁবু উঠিয়ে নেওয়া যাক।
তাঁবু উঠিয়েও খুব একটা সুবিধে হল না। পাহাড়ের উপর ছড়িয়ে থাকা প্রতিটা বড় মাপের গাছেই বাদুড় ঝুলছে। এতক্ষণে শঙ্কর ঠিকই বুঝতে পেরেছে ওগুলো আর যাই হোক স্বাভাবিক বাদুড় নয়। কয়েক মিনিট চলতে না চলতেই কয়েকটা বাদুড় ওদের খুব কাছ দিয়ে উড়ে চলে গেল জঙ্গলের দিকে। তারপর আরও কয়েকটা, আরও কয়েকটা। ওরা হয় পর্যবেক্ষণ করছে নয় তো আক্রমণের সুযোগ খুঁজছে। এতো সস্তায় পাওয়া খাবার ওরাও ছাড়তে চায় না। শেষ পর্যন্ত শঙ্কর যেটা ভয় পাচ্ছিল সেটাই ঘটে গেল, একসঙ্গে প্রায় দুতিন ঝাঁক বাদুড় ঝাঁপিয়ে পড়ল দুজনের উপর। শূন্যে ফায়ার করে কিংবা গুলি করে বাদুড় মারার চেষ্টা করেও লাভ হল না বিশেষ কিছু। শুরু হল প্রাণপণ ছুট। কিন্তু ঘনান্ধকার রাত্রিতে পাহাড়ের উপর ছোটা যে কী জিনিশ সেটা যাদের অভিজ্ঞতা নেই তাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। বাদুড়ের ধারালো দাঁতের কামড়ে আর্নল্ডের ডান হাতের বেশ কয়েকটা জায়গায় চোট লেগে রক্তপাত হচ্ছে। শঙ্করের চোট তেমন গুরুতর না হলেও বাদুড়ের দাঁতে কেটে গেছে ঘাড়ের কিছুটা মাংস। সেখান থেকে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে ভাল মতোই।
বাদুড়গুলোর হাত থেকে যেন কিছুতেই নিস্তার নেই। বারবার এসে ঝাপটা মেরে যাচ্ছে। আর্নল্ডের হাতে আর শঙ্করের ঘাড়ে শুরু হয়েছে তীব্র যন্ত্রণা। তবুও প্রাণ রক্ষার জন্য ওদেরকে ছুটতে হচ্ছে প্রাণপণ। বাদুড়ের অত্যাচারের সঙ্গে এবার সমান ভাবে তাল মিলিয়ে দিয়েছে পাহাড়ি কাঁটাগাছগুলো। শেষ পর্যন্ত একটা গিরি খাদের কাছে এসে পৌঁছায় ওরা। আর সামনে যাবার কোনও রাস্তা নেই। এতক্ষণে ওদের খেয়াল হয় বাদুড় গুলো কাছেপিঠে কোথাও নেই এখন। ওদের ডানার সাঁই সাঁই শব্দও আর ভেসে আসছে না।
একটা গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে দম নিতে থাকে শঙ্কর আর আর্নল্ড। সমগ্র গিরিখাতটা জুড়ে একটা জমাট নীরবতা বিরাজ করছে গম্ভীর ভাবে। কোথাও কোনও আলো নেই, টুঁশব্দ টুকুও নেই কোথাও। বারমুডার চাঁদ, বারমুডার পাখি অদৃশ্য আজ নিজের খেয়ালে।
জায়গাটা ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর আবার তাঁবু টাঙিয়ে দুজনেই শুয়ে পড়ে। কিন্তু বিধাতা বোধহয় ওদের কপালে শান্তির শয্যা লিখে রাখেননি। চোখের পাতা বন্ধ হয়েছে কি হয়নি কানের পাতা কেঁপে ওঠে ভয়ংকর গর্জনে। পাহাড় আর গিরিখাতের আনাজে কানাচে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে গর্জনটা। আর্নল্ডের কথা মতো, শয়তানের গর্জন। বারমুডায় আসার পর আগেও একবার এই গর্জনটা শুনেছে শঙ্কর। গিরিখাতের নীচ থেকে ভেসে এল গর্জনটা। বেশ কিছুক্ষণের জন্য সব আবার শান্ত। খানিক বাদেই আবার শোনা গেল গর্জন। এবার তাঁবুর বেশ কাছাকাছি।
শ্বাসরোধ করেই তাঁবুর ভেতরে বসে তৃতীয়বার গর্জনের অপেক্ষা করতে লাগল শঙ্কর আর আর্নল্ড। এবার গর্জনটা ভেসে এল মিটার পনের কুড়ি দূর থেকে। তাঁবুর ছিদ্র দিয়ে এখনো পর্যন্ত শয়তানটাকে দেখা যাচ্ছে না। হয়তো কোনও ঝোপের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে ওত পেতে বসে আছে শিকার ধরার অপেক্ষায়। আর্নল্ড রাইফেলটা বাইরের দিকে তাক করে শঙ্করকে বললে- আমি গুলি চালানোর আগে তুমি কিছুতেই গুলি চালিও না।
এখন নিজেদের চাপা শ্বাসের শব্দটুকুও নিজেরা শুনতে পাচ্ছে ভয়ে আর চরম উত্তেজনায়। শঙ্করের দু’কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে নামছে গরম ঘাম। এতক্ষণে শঙ্করের চোখে পড়েছে জানোয়ারটা। আর্নল্ড ঠিকেই বলেছিল জানোয়ারটা দেখতে অনেকটা বাঘের মতো হলেও আকারে বাঘের চেয়ে অনেক বড় তাই ক্ষমতা আর হিংসতা বাঘের চাইতে বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। ভীষণ রকমের একটা বোটকা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে আসে পাশে। জানোয়ারটা এবার তাঁবুটাকে ঘুরতে শুরু করেছে। এখন আর গর্জন করছে না।
শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আরও কিছুক্ষণ বসে থাকার পর শঙ্কর আর আর্নল্ড দুজনেই খেয়াল করলে যে জানোয়ারটা তাঁবুর বাইরের মাটি খুঁড়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করেই আর্নল্ড ফায়ার করে, আর্নল্ডের দেখা দেখি গর্জে ওঠে শঙ্করের রাইফেলটাও। জানোয়ারটা কয়েক মিটার ছিটকে সরে যায়। বিশেষ আঘাত লেগেছে বলে তো মনে হয় না। এর পরেই শুরু হয় ভয়ংকর তর্জন গর্জন। তবে এই গর্জনের সঙ্গে প্রথমবার শোনা গর্জনের কোনও মিল খুঁজে পেলো না শঙ্কর বা আর্নল্ড। খানিক বাদেই ব্যাপারটা দুজনের কাছেই পরিষ্কার হয়ে উঠল যখন গিরিখাতটার উল্টোদিক থেকে ভেসে এল আরও কয়েকটা জানোয়ারের মিলিত গর্জন। ওরাও গর্জন করতে করতে শঙ্করদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
-না আর এখানে এক মুহূর্ত থাকাটাও ঠিক হবে না শঙ্কর। তাঁবু এখানেই পড়ে থাক কাল সকালে এসে নিয়ে যাব। এখন যেভাবেই হোক এখান থেকে পালাতে না পারলে জানোয়ারগুলো টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে খাবে। আর্নল্ডের কথা মতো তাঁবুর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে শঙ্কর। তাঁবু থেকে বাইরে আসতেই শঙ্করের চোখ পড়ে বিকটাকার প্রাণীটার উপর। প্রাণীটা যন্ত্রণায় ছটফট করছে, তবুও ভাবখানা যেকোনও মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো। আর্নল্ড আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে জানোয়ারটাকে আরও দুটো গুলিতে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে শঙ্করের সঙ্গে ছুটতে থাকে গিরিখাতটার দিকে।
কয়েক মিনিটের ভেতরেই ওরা বুঝতে পারে জানোয়ারগুলো ওদের পিছু ধাওয়া করছে। ঝড়ের গতিতে ছুটে আসছে ওরা। অথচ ঘনান্ধকার পাহাড়ের উপর ছুটতে সমস্যা হচ্ছে এদের দুজনের। ছুটতে ছুটতে গিরিখাতটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে শঙ্কর আর আর্নল্ড। আর সামনে যাওয়ার কোনও রাস্তা নেই। অন্ধকারে দেখাও যাচ্ছে না গিরিখাতটার গভীরতা। শঙ্কর আর আর্নল্ড কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই এসে পড়ে জানোয়ার গুলো। শঙ্কর টর্চের আলো ফেলে দেখে পাঁচটা জানোয়ার একই সঙ্গে শিকার ধরার জন্য প্রস্তুত। ওদের ছুরির মতো নখ আর দাঁত চকচক করছে টর্চের আলোয়, ঝুলন্ত জিব থেকে লালা ঝরছে।  চারপাশের বাতাস ভারী বোটকা গন্ধে ভরে গেছে। একপা একপা করে এগিয়ে আসছে জানোয়ারগুলো এবার। সামনের পা'দুটোকে ভাঁজ করে লাফ দেওয়ার জন্য দুটো জানোয়ার প্রস্তুত।
জানোয়ার দুটো লাফ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শঙ্কর আর আর্নল্ডও ঝাঁপ দেয় গিরিখাতে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য শঙ্করের মনে হয় ওর শরীরটা যেন ওজন শূন্য হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি বরফগলা ঠাণ্ডা জলে ঝাঁপিয়ে শঙ্করের সারা শরীর কনকন করে ওঠে। আর্নল্ডকে ডাক দিলে আর্নল্ড জানায় তার কোনও সমস্যা হয়নি বলে। সাঁতার কেটে ডাঙায় উঠে আসে ওরা দুজনে। এখনো উপর থেকে জানোয়ার গুলোর হতাশ গর্জন ভেসে আসছে। সময় মতো ঝাঁপ দিতে না পারলে আর্নল্ডের সাথে সাথে শঙ্করেরও দফারফা হয়ে যেত আজকেই।
গিরিখাতের কিনারায় দাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাকাতেই শঙ্করের চোখ পড়ল গাছের উপর ঝিকমিক করতে থাকা লাল আলো গুলোর উপর। এখন আর ওদের কোনও আশ্রয় নেই। ঠাণ্ডাজলে ভেজা শরীর পাহাড়ি বাতাসে কনকন করছে এখন। আর্নল্ড বা শঙ্কর কারু মুখ দিয়েই কথা বার হচ্ছে না। কয়েক মিনিট আগেকার মৃত্যুর সাক্ষাত ছবিটা এখনো চোখের পাতায় ভাসছে। এমন সময় অনেক দূরের কোনও জঙ্গল থেকে হঠাৎ রাতচোরা পাখির ডাক ভেসে এসে পুরো পরিবেশটাকে আরও থমথমে করে তুলল। এখন কনকনে বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে ভোরের অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই ওদের।
রাত্রি এখন ঠিক কটা হবে শঙ্কর বা আর্নল্ড কারুরেই জানা নেই। প্রতিটা মুহূর্ত পার হচ্ছে ঘণ্টার হিসেবে। মাথার উপর রক্তমাংস লোভী জানোয়ার গুলোর ক্রুদ্ধ গর্জন আর রক্তচোষা বাদুড়ের ডানার হাড় হিম করা সাঁই সাঁই শব্দ মাঝে মাঝে ওদের তন্দ্রা কাটিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। শঙ্করের ঘাড়ের ক্ষত স্থানটা তেমন গুরুতর না হলেও আর্নল্ডের ডান হাতদিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে এখনো।
একটা গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে শঙ্কর আফ্রিকার দিন গুলোকে মনে করছিল। কত কথা কত স্মৃতিই না ওর চোখে ভাসছে এখন। আচ্ছা এখন দিয়াগো আলভারেজ থাকলে কী করত ? -মনে মনে ভাবে শঙ্কর। আড়চোখে তাকায় আর্নল্ডের দিকে। আর্নল্ড আর আলভারেজের ভেতর একটা অদ্ভুত মিল। দুজনের কেউই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে ভয় পায় না। ডান হাতের ক্ষত স্থানটার দিকে একবারের জন্যও তাকিয়ে দেখেনি আর্নল্ড। আলভারেজ থাকলেও তাকিয়ে দেখত না। পৃথিবীর দুই রহস্যময় জায়গায় এমন দুজনকে পেয়ে শঙ্করের গর্ব হয় মনে মনে।
[ছয়]
সকাল থেকেই শুরু হল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। মাথার উপর ঝাঁককে ঝাঁক মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন আর তাঁবুও নেই যে আশ্রয় নেওয়া যাবে। বাধ্য হয়ে গিরিখাতের থেকে কিছুটা সরে গিয়ে একটা বড় মাপের গাছের নীচে কোনও রকমে শরীর বাঁচিয়ে বসে আছে দুজনে। গতকাল রাত্রিতে ভেজা জামা-কাপড় এখনো স্যাঁতস্যাঁত করছে। এই বৃষ্টিতে কোনও পশু পাখি শিকার করাও সম্ভব নয়। আর শিকার করলেও কাঁচা খেতে হবে। এমন আবহাওয়া আর ভিজে কাঠে আগুন জ্বলবে না কিছুতেই। এখন বসে বসে ঘুমানো ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
সারারাত দুজনের যে ভাবে কেটেছে তার উপর ভোররাত থেকে বিরক্তিকর বৃষ্টিতে দুজনের কেউই লক্ষ্য করেনি যে গাছটার নীচে তারা আশ্রয় নিয়েছে তার ডাল গুলোর দিকে। যখন শঙ্করের ঘুম ভাঙল তখন রাক্ষুসে লতা গুলো ওর পা থেকে কোমর পর্যন্ত জড়িয়ে ধরেছে। নড়াচড়া করার মতো ক্ষমতাটুকুও নেই। আর্নল্ডের অবস্থা আরও খারাপ, ওর শরীরের কোনও অংশই দেখা যাচ্ছে না এখন। এমন অবস্থায় যা করার শঙ্করকেই করতে হবে। কোনও রকমে কোমরে গুঁজে রাখা ছুরিটা বার করে শঙ্কর। তারপর এক একটা লতাকে ধরে ধরে কাটতে শুরু করে। ছিন্ন লতা গুলো যন্ত্রণায় সাপের মতো ছট-ফট করতে থাকে। মুহূর্তের ভেতর কয়েকটা লতা সড়সড় করে গাছের উপর অদৃশ্য হয়ে যায়। আর্নল্ড এখনো অচেতন অবস্থায় রাক্ষুসে লতায় মোড়া হয়ে পড়ে আছে। নিজেকে মুক্ত করে শঙ্কর আর্নল্ডের শরীরে পেঁচিয়ে থাকা লতা গুলোকে কাটতে শুরু করলে ওরাও গাছের উপরেই অদৃশ্য হয়। কয়েকটা ছিন্ন লতা মাটিতে পড়ে কেঁচোর টুকরোর মতো ছটফট করতে থাকে।
আর্নল্ডের যখন জ্ঞান ফেরে তখন বারমুডার সূর্য অস্ত গেছে। ভ্যাপসা অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে গিরিখাতটার চারপাশে। অনাহারে শঙ্করের দশা যথেষ্ট করুণ হলেও সেটা আর্নল্ডের মতো গুরুতর নয়। আর্নল্ডের শরীরটাকে লতা গুলো পাইথনের মতো এমন ভাবে পেঁচিয়ে ধরেছিল যে তার চিহ্ন পরিষ্কার। সারা শরীরের এদিক সেদিক রক্ত জমাট বেঁধেছে। ঠোঁট দিয়েও রক্ত গড়িয়ে পড়েছে খানিক। কথা বলার মতো শক্তি আর্নল্ডের এখন নেই। কেবল মাত্র বিশ্রাম নিয়ে আর্নল্ড যে সুস্থ হবে না সেটা শঙ্কর ভাল মতোই বুঝতে পারছে। কিন্তু আর্নল্ডকে একা ফেলে রেখে খাবারের সন্ধানে যাওয়া কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে সেটা বুঝতে পারছে না শঙ্কর।
সবে কিছুক্ষণ হল আর্নল্ড ঘুমিয়েছে ঠিক এমন সময় শঙ্কর খেয়াল করল মিটার খানেক দূরের কাঁটা ঝোপটা যেন নড়ে নড়ে উঠছে। রাইফেল বাগিয়ে বসল শঙ্কর। এমন সব অদ্ভুত দ্বীপে কোনও কিছুকেই বিশ্বাস করা উচিৎ নয়। খানিকক্ষণ নিঃশব্দে বসে থাকার পর শঙ্করের চোখ পড়ল ছোট্ট একটা প্রাণীর উপর। দেখতে অনেকটা খরগোশের মতোই। মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ জানিয়ে গুলিটা ছুড়ল শঙ্কর। আশ্চর্যের বিষয় এতো কাছের থেকেও লক্ষ্যভ্রষ্ট হল শঙ্করের। গুলির শব্দে আর্নল্ডের ঘুম ভাঙতেই সে বললে- বারমুডা জাগছে শঙ্কর পালিয়ে যাও পালিয়ে যাও এবার এখান থেকে। আমার যাত্রাপথ এখানেই শেষ।
আর্নল্ডের কথা শুনে শঙ্করের মনে হল অসুস্থ শরীরে আর্নল্ড এখন প্রলাপ বকছে। আর্নল্ডের কথায় বিশেষ আমল দিল না শঙ্কর। প্রাণীটা গুলির শব্দে কাঁটা ঝোপ থেকে ছুটে পালিয়ে গেল দূরের ঘাস জঙ্গলটার দিকে। এবার রাইফেল হাতে উঠে দাঁড়াল শঙ্কর। এখন প্রাণীটার পিছু ধাওয়া করা ছাড়া উপায় নেই।
শঙ্করের খুব সামনে দিয়েই ছুটছে প্রাণীটা তবুও বারবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে শঙ্কর। এভাবে প্রায় মিনিট চল্লিশ কাটল কিন্তু কিছুতেই জখম করা গেল না প্রাণীটাকে। শুকনো ঘাস জমির উপর ছুটতে শঙ্করের তেমন সমস্যা হচ্ছিল না বলেই হয়তো ওর খেয়াল ছিল না যে ও গিরিখাতটার থেকে কতটা দূরে চলে এসেছে। যখন শঙ্করের খেয়াল হল তখন চোখের সামনে তুষারের মুকুট পরে দাঁড়িয়ে আছে বারমুডার প্রহরী পর্বতশ্রেণী।
শঙ্করের ধাওয়া খেয়ে একটা ঘাস ঝোপের ভেতর হারিয়ে গেল ছোট্ট প্রাণীটা। ঝোপটার কাছাকাছি যেতেই শঙ্করের চোখে পড়ল অল্প দূরে একটা পাথর যেন অন্ধকারেও অভ্রের মতো চকচক করছে। আরও কয়েক পা এগিয়ে গেল শঙ্কর। আলতো করে হাতের তালুতে তুলে ধরল পাথরটাকে। কোটি-কোটি কিলোমিটার দূর থেকে ছুটে আসা তারাদের আলোতেও ঝলমল করে উঠল পাথরটা। শঙ্করের মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল- কোহিনূর ?
পুরো এলাকাটা জুড়েই ছড়িয়ে আছে হীরার টুকরো। এগুলোকে ঠিক কাঁচা হীরা বলা যায় না, এদের উজ্জ্বলতা অনেক বেশি। একটা একটা করে হীরার টুকরো কুড়োতে কুড়োতে শঙ্কর সামনের দিকে এগিয়ে চলল। পর্বতটা যত কাছে আসছে হীরার টুকরো যেন ততই বাড়ছে। তাহলে কি পুরো পর্বতটাই... মনের কথা মনেই রইল শঙ্করের। কথাটা মুখ দিয়ে বার হওয়ার আগেই ভয়ংকর একটা শব্দে কেঁপে উঠল পুরো দ্বীপটা। হঠাৎ করে চমকে যাওয়ায় শঙ্করের হাত থেকে শেষ কুড়িয়ে পাওয়া হীরার টুকরোটা আবার মাটিতেই পড়ে গেল।
শঙ্কর কিছু বুঝে উঠার আগেই দুলতে শুরু করল ওর পায়ের তলার মাটি। ধ্বস নামতে শুরু করল পূব দিকের জঙ্গলটায়। হঠাৎ করেই শঙ্করের মনে পড়ল আর্নল্ডের কথাগুলো। তাহলে কি সত্যিই বারমুডা ট্রাঙ্গেল জাগছে! খানিকক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল শঙ্কর। সমুদ্রের প্রবল ঘূর্ণিতে হুড়মুড় করে তলিয়ে যাচ্ছে পূবের জঙ্গলটা। ঝাঁককে ঝাঁক পাখি শঙ্করের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে নিরুদ্দেশ ঠিকানায়। শঙ্করের কানের সামনে কে যেন চিৎকার করে বলে উঠল- পালাও শঙ্কর, পালিয়ে যাও। শঙ্করের চোখের সামনে পূবের জঙ্গলটা তলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না ওর। মন্থর গতিতে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস বাড়ছে। বারমুডার নাম না জানা সব পশুর দল ছুটে আসছে শঙ্করের দিকেই। আর এক মুহূর্ত দেরি করার সময় নেই নতুবা ছুটন্ত পশু গুলোর পায়ের তলায় ওকে থেঁতলে যেতে হবে। এবার পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করে শঙ্কর। প্রাণপণ গতিতে ছুটতে থাকে।
আর্নল্ডকে ঠিক কোথায় ফেলে এসেছে খেয়াল করতে পারে না শঙ্কর। অন্ধকার চক্রব্যূহে দিক্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে আসতে হয়েছে ওকে। আর কিছুক্ষণ পরেই ভোরের আলো ফুটে উঠবে, ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই শঙ্করের। এদিকে অ্যাটল্যান্টিকা গিলতে শুরু করছে দ্বীপটাকে। সারা দ্বীপ জুড়েই শুরু হয়েছে ভীত সন্ত্রস্ত পশু পাখিদের বিকট চিৎকার। শঙ্করের বারবার মনে হচ্ছে আর কিছুক্ষণ পরেই পায়ের তলা থেকে সবুজ মাটি খসে গিয়ে তরল নীল মৃত্যু জেগে উঠবে।
এমন অবস্থায় কী করা উচিৎ মাথায় ঢোকে না শঙ্করের। যেদিকে দুচোখ যায় সেদিকেই শুরু হয়েছে ধ্বংসলীলা। দ্বীপটা সমুদ্রের জঠরে অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণ করছে। কয়েক মিনিটের ভেতর কী করে যে কী হয়ে গেল বুঝে উঠতে পারে না শঙ্কর। কোথায় যাবে এবার ও ? কোনদিকে গেলে আর্নল্ডকে খুঁজে পাবে ? জাহাজটাই বা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে ? কতটা দূরে ? আচ্ছা আর্নল্ড কেমন করে বুঝতে পারল বারমুডা জাগছে ? হাজার হাজার প্রশ্নের কিচিরমিচির শব্দে শঙ্করের মাথাটা ঘুরতে থাকে...
দ্বীপটার চারদিক জুড়ে মৃত্যু জেগে উঠতে মায়ের মুখটা মনে পড়ে শঙ্করের। চোখদুটো নোনা জলে ভরে আসে। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে শঙ্কর। সমগ্র দ্বীপটা জুড়েই ভাঙন শুরু হয়েছে এবার। আর কোথাও পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা নেই। যেখানে সেখানে ধ্বস নামছে। এখন সময় হাসি মুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার। তাসের ঘরের মতো দ্বীপটার এক একটা দিক তলিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের করাল গ্রাসে। মৃত্যুকালীন আলভারেজের মুখটা মনে করে শঙ্কর। আজ ওর পালা, আজ ওর অভিযান শেষ হবার দিন। পকেট থেকে একটা হীরার খণ্ড বের করে অদ্ভুত ভাবে হীরাটার দিকে তাকায় শঙ্কর। হাতের তালুতে হীরাটাকে শক্ত করে ধরে মুচকি হাসে। তারপর সামান্য মাটি খুঁড়ে সেটা আলভারেজের নামে উৎসর্গ করে।
খিদে আর তেষ্টায় শঙ্করের চোখে তন্দ্রা নেমে আসছে এবার। দুচোখের পাতায় নীল মৃত্যু ছাড়া আর কোনও স্বপ্ন জেগে নেই। আলভারেজকে একদিন বাঁচাতে পারেনি শঙ্কর। আজকে হয়তো নিজের মৃত্যুর বিনিময়েও আর্নল্ডকে বাঁচাতে পারবে না ও। চারদিকটা কুয়াশায় ভরে যাচ্ছে। অনেক দূরে দাঁড়িয়ে কুয়াশার ওপার থেকে কে যেন শ-ঙ্ক-র... শ-ঙ্ক-র... করে ডাকছে ওকে।

যখন শঙ্কর চোখের পাতা খুলল তখন জাহাজটা বেজায় দুলছে। শঙ্করের মাথার কাছে বসে আপন মনে চুরুট টানছে আর্নল্ড। শঙ্কর বিছানা থেকে উঠে বসার চেষ্টা করলে আর্নল্ড বাধা দিয়ে বললে- এখন তোমায় বিশ্রাম নিতে হবে বন্ধু। বাড়ি পৌঁছানোর আগেই তোমাকে সুস্থ হতে হবে।
নিজের চোখ-কান কোনটাকেই বিশ্বাস হয় না শঙ্করের। অপলক ভাবে শঙ্কর আর্নল্ডের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। আর্নল্ড শঙ্করের ডান হাতটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় ধরে আবার বলে- অনেক খোঁজার পর যখন গতকাল তোমায় খুঁজে পেলাম তখন তোমার শরীরে চেতনা বলে কিছুই ছিল না। জ্বরের ঘোরে তোমার মুখ থেকে শুধু ‘মা মা’ শব্দটুকুই বেরিয়ে আসছিল। ওটা শুনতে না পেলে হয়তো আমি তোমায় খুঁজেই পেতাম না। মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড তোমার মা তোমায় এই যাত্রায় বাঁচিয়ে দিল। তবে তোমাকে জাহাজ পর্যন্ত তুলে আনতে আমাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। কথা গুলো বলার পর শঙ্করকে বিশ্রাম নিতে বলে কেবিন ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায় আর্নল্ড।
আর্নল্ডের কোনও কথাই শঙ্করের বিশ্বাস হয় না। মনে মনে হিসেব মেলানোর চেষ্টা করে শঙ্কর। কিন্তু হিসেব মিলছে না কিছুতেই। জাহাজের ক্রমাগত দুলুনিতে সব হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে বারবার। অসুস্থ আর্নল্ড কেমন করে শঙ্করকে উদ্ধার করে আনল মৃত্যুর মুখ থেকে...! অসম্ভব... অসম্ভব... নিজের মাথাটাকে জোরে জোরে ঝাঁকাতে থাকে শঙ্কর। ঘাড়ের ক্ষত জায়গাটায় টান পড়ে।
বিকেলের দিকে একটু সুস্থ বোধ করলে শঙ্কর কেবিন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে একপা একপা করে ইঞ্জিন ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। বুকের থেকে প্রশ্নের যে বুদ্বুদগুলো দলা পাকিয়ে গলায় এসে জমা হচ্ছে সেগুলোর সঠিক উত্তর না পাওয়া অবধি ওর মুক্তি নেই। কিন্তু ইঞ্জিন ঘরে এসে শঙ্কর দেখে আর্নল্ডের চেয়ারটা ফাঁকা। জাহাজ নিজের মতো এগিয়ে চলেছে পুয়ের্তো রিকোর পথে। এই বিকেলের দিকে আর্নল্ড বরাবরেই জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখে। হয়তো এখন জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে চুরুট ঠোঁটে…
শঙ্কর কোনোক্রমে ডেকের উপর উঠে আসে। ডেকের উপর দাঁড়িয়ে পুয়ের্তো রিকোর গম্বুজটা চোখে পড়ে। কিন্তু আর্নল্ড কোথায় ? শূন্য ডেকের উপর হো-হো করে বাতাস বইছে।
নিজের শারীরিক দুর্বলতার কথা একরকম ভাবে ভুলে গিয়েই শঙ্কর ডেকের উপর থেকে কেবিনে ছুটে নেমে আসে।প্রতিটা কেবিন ঘর শূন্য পড়ে আছে, কোথায় আর্নল্ড ? শঙ্কর চিৎকার করে ডাকে- ক্যাপ্টেন...ক্যাপ্টেন...ক্যাপ্টেন... শূন্য জাহাজে শঙ্করের কথাগুলোই প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। একরাশ বিস্ময় আর অভিমান নিয়ে শঙ্কর জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়ায়। আর্নল্ডের শেষ কথাগুলো বারবার মনে পড়ে ওর- বারমুডা জাগছে শঙ্কর পালিয়ে যাও পালিয়ে যাও এবার এখান থেকে। আমার যাত্রাপথ এখানেই শেষ। তাহলে কি মৃত্যুর পর শঙ্করকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল আর্নল্ড ? এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই শঙ্করের কাছে।
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ডুবন্ত লাল সূর্যটার দিকে সজল চোখে চেয়ে থাকে শঙ্কর। একদিন আফ্রিকা কেড়ে নিয়েছিল প্রিয় আলভারেজকে। আজ বারমুডা কেড়ে নিলো আর্নল্ডকে। নীরবে চোখের জল মুছে পকেটের ভেতর থেকে হীরার টুকরোগুলো বেরকরে শঙ্কর। তারপর এক একটা হীরার টুকরো ছুড়তে থাকে সমুদ্রের নীল বুকের উপর। আজ আর এই টুকরোগুলোর উপর কোনও মোহ-মায়া অবশিষ্ট নেই শঙ্করের। ছোট বড় ঢেউয়ের উপর দুলতে দুলতে জাহাজটা এগিয়ে যাচ্ছে পুয়ের্তো রিকো বন্দরের দিকে। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে শঙ্করের বারবার মনে হচ্ছে এখনো ইঞ্জিন ঘরে ক্যাপ্টেনের চেয়ারটায় আর্নল্ড বসে আছে স্টিয়ারিং হাতে।
[সমাপ্ত]
               
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments