মনভাঙা প্রেমের গল্প, তবুও ভাল থেকো ভালবাসা

মনভাঙা প্রেমের গল্প, তবুও ভাল থেকো ভালবাসা

Advertisemen
সিটি গোল্ডের আঙটি

সিটিগোল্ডের আংটি
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

এখন মধ্যরাত্রি ছুটছে জানালার ওপারে। শনশন করে কামরার ভেতর ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। তবুও জানালাটা বন্ধ করেনি শুভঙ্কর। জানালার রডে মাথাটা হেলান দিয়ে ও দূরের লাইট গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। অনেক দূরের আলোআঁধার গ্রাম গুলোকে দেখে মনে হচ্ছে সূর্যোদয়ের সময় হয়ে এল যেন। আর এই পথ দিয়ে কোনদিনেই আসা হবে না ওর। হয়তো তাই পাঁচ বছরের না পড়া রাস্তাটাকে এক রাতেই পড়ে ফেলতে চাইছে শুভঙ্কর। ট্রেনের কামরাটায় যাত্রীও তেমন নেই। যে কয়েকজন আছে তারা গভীর ঘুমে সাঁতার দিচ্ছে। কিছুই ভাল লাগছে না এখন শুভঙ্করের। লিপিকে পর্যন্ত একটাও কল করে নি আজকে সকাল থেকে। কল করেই বা বলবেটা কী ? বললেও তো আর বন্ধ হওয়া স্পঞ্জ আয়রন কারখানাটা টুক করে চালু হয়ে যাবে না।
অন্যান্য বারের বাড়ি ফেরার সঙ্গে শুভঙ্করের আজকের এই বাড়ি ফেরাটায় অনেক ফারাক। আজকে আর লিপির জন্য আংটিও কেনে নি। ইচ্ছে করেই কেনে নি। অন্যান্য বার বাড়ি ফেরার সময় নিয়ম করেই লিপির জন্য একটা করে আংটি কিনে এনেছে। সিটিগোল্ডের আংটি। লিপি বরাবরেই আংটি পরতে ভালবাসে। তবে ইদানীং আংটি পরার চেয়েও আংটি জমা করাতেই ওর ঝোঁকটা যেন বাড়ছিল দিনদিন। সেটা শুভঙ্করের চোখ এড়ায় নি। একটা সামান্য স্পঞ্জ আয়রন কারখানার সাধারণ সুপারভাইজারের কাজ করে শুভঙ্কর। না, কাজ করে বললে ভুল বলা হবে। কাজ করত। কতই আর বেতন ছিল ওর ? তাই বাধ্য হয়েই সিটিগোল্ডের আংটি উপহার দিতে হয়েছে লিপিকে। লিপিও শুভঙ্করের দেওয়া সিটিগোল্ডের আংটি গুলোকেই সোনার চেয়েও বেশি যত্ন করে রেখেছে নিজের কাছে। আবার যখন যেটা ইচ্ছে হয়েছে তখন সেটা পরেছে। আজকেই প্রথমবার আংটি নেয় নি শুভঙ্কর।
শুধু শুভঙ্কর কেন কেউই তো ভাবে নি দুম করে কারখানাটা বন্ধ হয়ে যাবে। ভালই তো চলছিল। কী এমন দরকার ছিল ইলেকট্রিক চুরি করতে যাওয়ার! চুরির ইলেকট্রিক দিয়েই কারখানার একটা আস্ত চুল্লি চলছিল এতদিন! অথচ শুভঙ্কর সুপারভাইজার হয়েও কিচ্ছুটি টের পায় নি। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে শুভঙ্করের নাকমুখ দিয়ে। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ওর চুল গুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে যায়। জানালাটার থেকে মাথাটা সরিয়ে নেয় শুভঙ্কর। ওর এখন মনে হচ্ছে এই যাত্রীবাহী ট্রেনটার সঙ্গে যেন সমান ভাবে পাল্লা দিয়ে আরেকটা ট্রেন ছুটছে ওর বুকের ভেতর। দুশ্চিন্তার ট্রেন।
তিন তিনবার এস এস সি পরীক্ষা দিয়েও যখন কিছুই সুবিধে হল না তখন বাধ্য হয়েই পেটের টানে বেরিয়ে পড়েছিল শুভঙ্কর। পাড়ার এক দাদার সাহায্যে স্পঞ্জ আয়রন কারখানার সুপারভাইজারের একটা কাজ জুটেও গিয়েছিল। লিপির ইচ্ছেছিল না শুভঙ্কর ওকে ছেড়ে বাড়ির বাইরে যাক। তাই বারবার বলেছিল, ‘এতটা দূরে কাজ করতে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না। বাপিকে তুমি একবার বলে দেখো, বাপি ঠিক কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবে।’ 
শুভঙ্করেই পারে নি শ্বশুরের কাছে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে সাহায্য চাইতে। কারণ ও ভাল মতোই জানত, যে শ্বশুর মশায় তাকে কোনদিন জামাই বলেই স্বীকার করেন নি তিনি দয়া করলেও করতে পারেন কিন্তু সাহায্য করবেন না। কিন্তু আজকে শুভঙ্কর কী বলবে লিপিকে ? কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে লিপির কাছে ? হাজার দুশ্চিন্তার ভিড়ে মাথাটা যেন কেমন ভার হয়ে আসে শুভঙ্করের।
এক
‘চায়ে গরম, চায়ে গরম, গরম চা’- ভাবনার ভিড়ে শুভঙ্কর এতক্ষণ কোথায় তলিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ চাওয়ালার ডাকে সম্বিৎ ফেরে। রোড চন্দ্রকনা ষ্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে ট্রেনটা। ষ্টেশন চত্বরে বসে দুয়েকটা লোক চাদর মুড়ি দিয়ে ঝিমোচ্ছে। চাওয়ালাকে ডেকে এক কাপ চা নেয় শুভঙ্কর। চায়ের কাপে এক চুমুক দিতে না দিতেই ট্রেনটা মৃদুমন্দ গতিতে আবার চলতে শুরু করে। আর ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা মাত্র।
এক হাতে ছোট্ট বেডিং আর পিঠে একটা মস্ত ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে সমস্যা হলেও মন্দ লাগছিল না শুভঙ্করের। ষ্টেশন থেকে কতটুকুই বা রাস্তা। ইতিমধ্যেই দুয়েকটা দোকান ঝাপ তুলে চুলোতে আগুন ধরিয়েছে। একটু পরেই ভিড় হয়ে যাবে রাস্তাটা। বিভিন্ন গ্রাম থেকে শাক সবজি নিয়ে আড়তে জড়ো হবে চাষিরা। মাছ পট্টিতেও ভিড় জমবে। মাছের আঁশটে গন্ধে মম করবে বাজারটা। আর কোনদিকে না তাকিয়ে শুভঙ্কর বাড়ির মুখে চলতে থাকে।
যখন শুভঙ্কর বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় তখনো পূবের আকাশে আলো ফুটতে দেরি আছে। বাড়ির কলিং বেলটার সুইচে আঙুল দেবার আগে মনে মনে সংলাপ গুলোকে আরেকবার ভালভাবে সাজিয়ে নেয়। তারপর চাপ দেয় কলিং বেলে। বেল-এর আওয়াজটা বাইরে থেকেই শোনা যায়। কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর আরেকবার বাজায় বেলটা। আরও একবার। এবার মৃদু শব্দ করে খুলে যায় দরজাটা।
‘গুড মর্...র্নিং’ 
‘মর্নিং। তা এত ভোরে ? তাও আবার কিছু না জানিয়ে। শরীর ভাল আছে তোমার ?’ বেশ চিন্তিত দেখায় লিপিকে। এভাবে শুভঙ্করকে দেখে ঘাবড়ে গেছে হয়তো।
‘হুম শরীর ভালই আছে। আগে একটু চা করো তারপর সব বলছি।’- ঘরে ঢুকেই বেডিং আর ব্যাগটাকে মেঝেতে নামিয়ে ধপাস করে সোফায় বসে পড়ে শুভঙ্কর। কী আর বলবে লিপিকে ? কাজ চলে গেছে। তোমার বাবাকে বলে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে বলো! না, একথা বলতে পারবে না ও। তাহলে কী বলবে ?
‘আমি হাত পা ধোবার জন্য আগে গরম জল করে দিচ্ছি। তুমি ততোক্ষণে জামা প্যান্টটা খুলে হালকা কিছু একটা পর। আর মোজা দুটোকে বাথরুমেই দিয়ে এসো।’ লিপি বলে।
‘সেই বরং ভাল। এখানে তো দেখছি ঠাণ্ডা এক্কেবারেই নেই। ওদিকেও কমেছে কিন্তু এতটাও নয়।’
লিপি গরম জল করতে যায়। রান্না ঘর থেকে টুংটাং শব্দ আসে। শুভঙ্কর দেওয়ালে ঝোলানো বাবা মায়ের ছবিটার দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়। অনিচ্ছাতেও একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। যখন বাবা মারা যায় তখন শুভঙ্কর ক্লাস ফোর ফাইভ হবে হয়তো। মায়ের যাওয়াটা বছর দুয়েক হল। বাবার যা জমিজমা ছিল সব সুভদ্রার বিয়েতেই গেছে। সুভদ্রা শুভঙ্করের দিদি। বিয়ের পর কয়েকটা বছর নিয়ম করেই আসত সুভদ্রা। মা মারা যাওয়ার পর থেকে আসেনি বললেই চলে। যদিও মায়ের মৃত্যুটাই সুভদ্রার না আসার একমাত্র কারণ নয়। রনি বড় হচ্ছে। ওর স্কুল আর টিউশনের ঝামেলার জন্যই আসতে পারে না সুভদ্রা। শুভঙ্কর লিপিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নিজের কাছে। লিপি রাজি হয়নি। বলেছিল, ‘মাস্টার ডিগ্রি কমপ্লিট না করে আমি কোথাও যাব না। নীচে গাঙ্গুলি অ্যান্টিরা যত দিন ভাড়া আছেন আমার একা থাকতে কোনও সমস্যা নেই।’ শুভঙ্কর কাজে জয়েন করার পর লিপি একাই থেকেছে।    
‘তুমি এখন স্নান করবে না পরে ?’ রান্না ঘর থেকেই জিজ্ঞেস করে লিপি।
‘মাথা খারাপ হয়েছে না কি। স্নান দশটার আগে নয়।’
বাথরুমে হাত পা ধুতে গিয়ে শুভঙ্কর লক্ষ্য করে বাথরুমের কোনায় কয়েকটা সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে। আগেও একবার দেখেছিল। তখন লিপি কথা দিয়েছিল আর খাবে না। অন্যদিন হলে হয়তো বেশ রেগেই যেত শুভঙ্কর। আজকে রাগও হল না। পরিচিত দীর্ঘশ্বাসটাই বেরিয়ে এল আবার।
পড়ন্ত বিকেলে ছাতের উপর এসে দাঁড়ায় শুভঙ্কর। সকালে চা খেতে খেতেও লিপিকে বলতে পারে নি কারখানা বন্ধ হওয়ার কথাটা। লিপিও কিছুই জানতে চায়নি। ব্যাগ আর বিছানা পত্র দেখে হয়তো সবেই বুঝতে পেরেছে তাই কিছু জানতে চায়নি। ছাতের পশ্চিম কোনায় দাঁড়িয়ে শুভঙ্কর দূরের পলাশ গাছ গুলোকে তাকিয়ে আছে একমনে। বসন্তের রঙ লেগেছে গাছ গুলোতে। লাল সূর্যটার সঙ্গে পলাশ ফুল গুলোও সমান ভাবে পাল্লা দিচ্ছে।
‘তোমার চা’- পিছনে চায়ের কাপ হাতে এসে দাঁড়িয়েছে লিপি।
‘দেখো পলাশ ফুল গুলো সূর্যের সাথে পাল্লা দিচ্ছে।’
‘সত্যিই সুন্দর লাগছে। তুমি না থাকলে ছাতে এসে তেমন ভাবে দাঁড়ানোই হয় না। ছাত বলতে তো আমার কাছে কাপড় মেলতে আসা আর কাপড় তুলতে আসা।’
‘সারাদিন সিরিয়াল না দেখে মাঝে মাঝে ছাতে এসে দাঁড়িও মনটা ভাল থাকবে।’
‘এবার তুমি তো আমার সঙ্গে এখানেই থাকবে তাই মাঝে মাঝেই ছাতে আড্ডা দেবো দুজনে।’
‘তুমি কেমন করে জানলে আমি এবার এখানেই থাকব ?’ প্রশ্নচিহ্নটা পরিষ্কার ভাবে শুভঙ্করের চোখে মুখেও ফুটে ওঠে।
‘ঠিক যেমন করে জেনেছিলাম তুমি আমাকে ভালবাস।’
‘স্পঞ্জ আয়রন কারখানাটা সোমবার বন্ধ হয়ে গেল দুম করেই। আর খুলবে বলেও মনে হয় না।’
‘সোমবারের পরেও তো কতবার ফোন করলে একবারও তো বল নি সে কথা।’
‘চিন্তা করবে ভেবেই বলি নি।’
‘চিন্তা না ছাই। আমি মনে মনে ওটাই চেয়ে এসেছি এতদিন।’
‘তাই নাকি?’ হেঁয়ালির সুরে কথাটা বলে শুভঙ্কর।
‘অবশ্যই। কোন মেয়েটা বিয়ের পর স্বামীর থেকে দূরে থাকতে চাইবে শুনি।’
শুভঙ্কর কিছু বলে না শুধু লিপির নাকে আলতো করে নাড়া দেয়।
চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। লিপি চায়ের কাপ দুটো নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যায়। শুভঙ্কর কল্পনাতেও ভাবে নি পুরো ব্যাপারটা এত সহজেই মিটে যাবে। এখন শুভঙ্করের নিজেকে বেশ হালকা লাগছে। এখন শুধু একটা কাজ পেয়ে গেলেই হল। 
দুই
দুয়েকটা দিন কাটতে না কাটতেই শুভঙ্কর লিপির ভেতর একটা অদ্ভুত পরিবর্তন খেয়াল করে। লিপি একবারের জন্যেও শুভঙ্করকে বলে নি ওর বাবার কাছে সাহায্য চাইতে। অন্যান্য সময় হলে হয়তো, ‘বাপিকে বলো বাপিকে বলো’ বলে বলেই শুভঙ্করের মাথাটা খারাপ করে ছাড়ত। ইদানীং বাবা মাকে তেমন একটা ফোনও করে না লিপি। আগে সারাদিনে চারবার ফোন করত কম করে। শুভঙ্কর একবার ভেবেছিল লিপিকে জিজ্ঞেস করবে ওর বাবা মায়ের সঙ্গে কিছু...। সেটা আর জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠেনি। সেদিন সিগারেট খাওয়া ব্যাপারটা নিয়ে জিজ্ঞেস করাতে লিপি এমন ওভার রিয়েক্ট করেছিল যে...
যাই হোক আসল কথা হল এই কয়েকদিনের ভেতর শুভঙ্কর বেশ কয়েকটা ইন্টার্ভিউ দিয়ে এসেছে নানান জায়গায়। কিন্তু কেউ কোনও খবর দেয় নি। এমন ভাবে বেশিদিন চললে হয়তো শুভঙ্করকে নিজের থেকেই শ্বশুর মশায়ের কাছে সাহায্য চাইতে হবে। এই দুবছরে যে কয়েক হাজার জমেছে সেটা শেষ হতেও বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের যা অবস্থা তাতে পাঁচ দশ হাজার টাকার একটা কাজ জোগাড় করাও মুখের কথা নয়। লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার ফ্যালফ্যাল করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও একটু গুড়ের গন্ধ পেলেই ভনভন করে জড়ো হচ্ছে হাজার হাজার মাছি।
আজকেও একটা ইন্টার্ভিউ আছে বিষ্ণুপুরে। মার্কেটিং কোম্পানির। মাইনে হাজার দশেক। তাই শুভঙ্কর সকাল সকাল বেরিয়েছে সামান্য ডাল ভাত খেয়েই। প্রতিদিনের মতোই আজকেও একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে ওর বুকের ভেতর। 
ষ্টেশন থেকে বেরিয়েই কোনও দিকে না তাকিয়ে রাজা বাঁধের পথ ধরে সোজা হাঁটতে থাকে শুভঙ্কর। বিষ্ণুপুর ওর অচেনা জায়গা নয়। মাস্টার ডিগ্রি করার সময় দূর্বাদল বাবুর কাছে টিউশন পড়তে প্রায় বছর দেড়েক বিষ্ণুপুরে আসতে হয়েছে শুভঙ্করকে। রাজা বাঁধ পেরিয়ে বাজাজ সোরুমের পাশের গলিটা ধরে সোজা হাঁটলেই মিথিলা পাম্পের সোরুমটা। মিথিলা কোম্পানিই লোক নিচ্ছে মার্কেটিং এর জন্য। চারজন নেবে।
পরিচিত রাস্তা ধরে হেঁটে পৌঁছাতে শুভঙ্করের বিশেষ সময় লাগল না। কিন্তু মিথিলার গেটের কাছে পৌঁছে শুভঙ্কর যা দেখল সেটা ব্যাখ্যা করার মতো নয়। লোক নেবে চারজন আর ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছে প্রায় পাঁচ সাতশোর মতো ছেলে মেয়ে। ছেলে মেয়ে গুলো আলাদা আলাদা দুটো লাইন করে দাঁড়িয়েছে। ছেলেদের লাইনটা যে কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে সেটা চোখেও পড়ল না শুভঙ্করের।
বেশ কিছুক্ষণ লম্বা লাইনটার দিকে তাকিয়ে থাকার পরেও শুভঙ্কর ঠিক করতে পারল না ইন্টার্ভিউটা দেবে না বাড়ি ফিরে যাবে। তবে মোটের উপর ওর এটা বুঝতে বাকি রইল না যে, এখানে ইন্টার্ভিউ দিয়েও বিশেষ পড়তা হবে না। শেষ পর্যন্ত একটা বট গাছের নীচে চুপচাপ বসে শুভঙ্কর। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ করেই ওর চোখ পড়ে যায় মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোকের উপর। ভদ্রলোকটিকে দেখে তো ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছে বলে মনে হয় না। হালকা গেরুয়া রঙের একটা পাঞ্জাবী আর নীল জিন্সে লোকটির সঠিক বয়স বোঝা না গেলেও উনার কাঁচাপাকা চুলদাড়ি দেখেই যে কেউ বলে দেবে লোকটির বয়স চল্লিশের কম হবে না। শুভঙ্করের কেন যেন মনে হল লোকটা চোখের ইশারায় ওকেই ডাকছে। প্রথমটায় বেশ একটু ঘাবড়ে যায় শুভঙ্কর। ভদ্রলোক শেষমেশ নিজেই এগিয়ে আসেন। টুকটাক পারিবারিক কথাবার্তা দিয়ে শুরু করার পর ভদ্রলোক শুভঙ্করকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি ইন্টার্ভিউ দিতে... ?’
‘হাঁ। আর আপনি ?’ ভদ্রলোকের মুখ থেকে কথাটা কাড়িয়ে নিয়ে পালটা প্রশ্ন করে শুভঙ্কর।
‘আমি এসেছি মজা দেখতে।’
‘মাফ করবেন ঠিক বুঝলাম না।’
‘এই যে লম্বা লাইন দুটো দেখছেন এই লাইন দুটোতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটা ছেলে মেয়েই ভাবছে ওর চাকরিটা হলেও হতে পারে। আপনিও একেই ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন তাই তো ?’
‘হাঁ তাতে কী হয়েছে ?’
‘সময় নষ্ট।’
‘হেঁয়ালি না করে আসল কথাটা বলবেন প্লিজ।’ এবার শুভঙ্করের গলায় যথেষ্ট বিরক্তি প্রকাশ পায়।
‘আরে মশাই এতে রাগের কী হল ?’
‘না রাগ করছি না। বলছি আপনার কিছু বলার থাকলে না ভাটিয়ে পরিষ্কার করেই বলতে পারেন।’
‘আপনি চাকরিটা পেতে চাইছেন ?’
‘নতুবা আসব কেন বলুন ?’
‘তাহলে এখানে বসে না থেকে বাড়িতে গিয়ে এক লাখ টাকা জোগাড় করবেন যান।’
‘মানে ?’ 
‘এই কথাটার মানে বোঝার মতো বয়স আপনার হয়েছে। আমার একটা কার্ড রাখুন এক মাসের ভেতর টাকাটা জোগাড় যদি করতে পারেন তাহলেই ফোন করবেন। চিন্তা করবেন না প্রথম মাসের বেতন পাবার পরে টাকাটা নেব। কিন্তু টাকাটা জোগাড় করে রাখবেন।’
‘আর চাকরিটা পাবার পর...’
‘টাকাটা যদি না দেন তাই তো ? ওটা আপনার ভাবনা নয়।’ ভদ্রলোক পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা রজনীগন্ধার প্যাকেট বেরকরে সেটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে কথা গুলো বলে। কথা গুলো বলার পর পকেট থেকে আরেকটা তুলসীর প্যাকেট বার করে। দুটোকে মিশিয়ে মুখে ঢালার পর পাঞ্জাবীর বুক পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে শুভঙ্করের হাতে ধরিয়ে দেয়। আর কোনও কথা বলে না। সোজা চলতে থাকে মেয়েদের লাইটার দিকে। শুভঙ্করের সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায়।                        
তিন
এক বন্ধুর কাছে শুভঙ্কর খবর পেয়েছে হরিগ্রাম স্কুলে কন্ট্রাক্ট চ্যুয়াল শিক্ষক নেবে। মাইনেটাও মন্দ নয়। আর যাই হোক শুভঙ্কর পড়াশুনাতে তো কোনদিনেই খারাপ ছিল না। তাই সম্ভাবনা একটা আছেই। কিন্তু পরীক্ষাটা দিতে যাবে কেমন করে! ওর পকেট তো এখন...
সেদিন বিষ্ণুপুর থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর আর কোথাও কোনও ইন্টার্ভিউ দিতে যায় নি শুভঙ্কর। ওর পক্ষে অতটা টাকা জোগাড় করাও সম্ভব ছিল না। আর সামান্য কোম্পানির কাজের জন্য একটা অচেনা অজানা লোককে অতটা টাকা দিতেই বা যাবে কেন। বিষ্ণুপুর থেকে ফিরে আসার পরের দশদিন শুভঙ্কর শুধু এটাই ভেবেছে, কোম্পানির চাকরিতে ঘুষ কেন দেবো! এই ব্যাপারে লিপির সঙ্গেও কথা বলেছিল শুভঙ্কর। বিশেষ লাভ হয়নি। লিপি চায় শুভঙ্কর চাকরিটা করুক। কিন্তু এই মুহূর্তে এতটা টাকা...। এই কয়েকটা দিন শুভঙ্কর কোথাও ইন্টার্ভিউ দিতে যায়নি শুধুমাত্র টাকার জন্যই। কয়েকটা দশ টাকার নোট ছাড়া পকেট কাটলেও এর বেশি আর কিছুই বার হবে না। ব্যাঙ্কে পঞ্চাশ হাজার ফিক্সড করা আছে ঠিকেই, কিন্তু ওই টাকাটাতে হাত দিতে চায় না শুভঙ্কর। বিপদে আপদে দরকার পড়লে তখন কী করবে...? 
দূরের ছেঁড়াফাটা মেঘ গুলোর ভেতর চাঁদটা আজকে নৌকার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘুম আসছিল না শুভঙ্করের। তাই ছাতে এসেই দাঁড়িয়েছে এত রাতে। ছাতের ঠাণ্ডা বাতাসটা ভালই লাগছে এখন ওর। অনেক দূরের কোনও গ্রাম থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে মাঝে মাঝে। একটা সময় এই ছাতে মাদুর বিছিয়ে সারারাত তারাদের সঙ্গে শুয়ে থাকত শুভঙ্কর। আজকে তারা গুলোকেও যেন অচেনা লাগছে। হরিগ্রামের স্কুলটাতে ইন্টার্ভিউ দিতে যাবার ইচ্ছে তো আছে অথচ যায় কেমন করে। এক দুশো টাকা ধার চাইলে হয়তো অনেকেই দিয়ে দেবে। কিন্তু শোধ তো ওকেই করতে হবে। এমনিতেই গোপালের দোকানে ধারের খাতাটা লম্বা হচ্ছে দিনদিন। যেদিন গোপাল জানবে শুভঙ্করের চাকরিটা আর নেই সেদিনেই হয়তো... 
লিপিও পাল্টে গেছে সময়ের সাথে। শুভঙ্করকে ছাড়াই এখন থাকতে শিখে গেছে লিপি। সারাদিন ফেসবুকেই ডুবে থাকে। যে মাস্টার ডিগ্রির দোহায় দিয়ে লিপি একদিন শুভঙ্করের সঙ্গে যায় নি সেই মাস্টার ডিগ্রির ক্লাস করতে যাওয়ার নামও নেই ওর মুখে। পড়াশুনা তো অন্য গ্রহের গল্প। তবে শুভঙ্কর খেয়াল করেছে এত দুশ্চিন্তার সময়েও লিপি সিগারেট খায় নি। যদিও শুভঙ্কর কোনদিনেই লিপিকে সিগারেট খেতে দেখনি। দেখেছে সিগারেটের পোড়া টুকরো গুলোকেই। তবে পাশের বাড়ির লোক তো আর এই বাড়িতে সিগারেট খেতে আসবে না। 
নিজের ভাবনার ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতেই একটা সময় শুভঙ্কর থমকে দাঁড়ায় নিজের ভেতর। একটা উপায় এসেছে মাথায়। লিপিকে উপহার দেওয়া সিটিগোল্ডের আংটি গুলো। হাঁ ওগুলো বিক্রি করেও তো...। চাকরিটা পেয়ে গেলে না হয় লিপিকে অমন আংটি আবার কিনে দেওয়াই যাবে। অন্ধকারেও যেন ওর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। সত্যিই এই মুহূর্তে কিছুটা টাকার খুব দরকার শুভঙ্করের।
চোরের মতোই শোবার ঘরে ঢোকে শুভঙ্কর। লিপি গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। ওর এখন ঘুম ভাঙার কোনও সম্ভাবনা নেই। নিঃশব্দে আলমারি খুলে আংটি গুলোকে বারকরে শুভঙ্কর। আবার আলমারিটা বন্ধ করে ছাতে এসে দাঁড়ায়। তারপর হাতের তালুতে রাখা আংটি গুলোকে চোখের সামনে তুলে ধরে। অস্পষ্ট চাঁদের আলোতেও চকচক করে ওঠে আংটি গুলো। এতদিন আংটি গুলো ছিল সুখস্মৃতির টুকরো মাত্র। আজকে তার চেয়েও মূল্যবান কিছু।
চার
পরেরদিন সকাল সকাল আংটি গুলোকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শুভঙ্কর। গিয়ে দাঁড়ায় সর্বমঙ্গলা জুয়েলার্সের সামনে। দোকানের ভেতর একজন বৃদ্ধ আপন মনে একটা মোটা খাতায় কীসব লিখছেন। ভেতরে ঢোকে শুভঙ্কর। কোনও রকম ভণিতা না করেই বলে, ‘বেশ কয়েকটা সিটিগোল্ডের আংটি আছে যদি বলেন...’
ভদ্রলোক মুখ না তুলেই হাতের ইশারায় শুভঙ্করকে চুপ করতে বলেন। কিছু হিসেব করছেন হয়তো। শুভঙ্কর পকেট থেকে আংটি গুলো বের করে।
‘হাঁ এবার বলুন।’ মোটা কাঁচের চশমার ফাঁক দিয়ে বৃদ্ধ ব্যবসায়ী দৃষ্টিতে শুভঙ্করকে একবার জরিপ করে নেয়।
‘বলছিলাম বেশ কয়েকটা সিটিগোল্ডের আংটি আছে ওগুলো বেচতাম।’
‘সিটিগোল্ড ?’ বেজার মুখেই শব্দটা উচ্চারণ করেন ভদ্রলোক।
‘হাঁ সিটিগোল্ডের।’
‘ওসব আংটি আবার কেউ বেচতেও আসে এই প্রথম দেখছি।’
ভদ্রলোকের কথায় শুভঙ্করের উজ্জ্বল মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে পড়ে। তবুও বলে, ‘ভাল দাম দিয়ে কেনা সবকটাই।’
‘আমি ওসবের কারবার করি না। অন্যকনো দোকানে দেখুন যদি কেউ কেনে। মনে তো হয় না ওসব কেউ কিনবে বলে।’ শাল পাতার মোড়কের ভেতর থেকে একটা পান বার করেন ভদ্রলোক। কথাটা শেষ করে পানটা মুখের ভেতর ঢোকান। শাল পাতার গায়ে লেগে থাকা চুনটা চেটে নেন জিব দিয়ে।    
ঠিক কী বলবে খুঁজে পায় না শুভঙ্কর। চুপ করে বসে থাকে। ভদ্রলোক শুভঙ্করকে বসে থাকতে দেখে আবার বলেন, ‘রাধামাধব ষ্টোরে গিয়ে দেখুন নিলে নিতেও পারে। তবে তেমন দাম পাবেন না।’
‘আচ্ছা এগুলো দেখে বলতে পারবেন কেমন দাম পাওয়া উচিৎ ?’
ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে শুভঙ্করের হাত থেকে আংটি গুলো নেন। বেশ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে দেখে চোখ দুটোকে বড় বড় করে জিজ্ঞেস করেন, ‘চোরাই মাল নাকি ?’
‘না চোরাই মাল কেন হতে যাবে ?’
‘তাহলে এত গুলো সোনার আংটি কোথায় পেলেন মহাশয় ?’
‘সোনার আংটি নয় তো!’
‘সোনারেই তো। সত্যি করে বলুন না ঠিক কোথায় পেয়েছেন এত গুলো আংটি একসঙ্গে ?’
‘আপনি ভাল করে দেখুন ওগুলো সোনার নয় মোটেই।’
‘চল্লিশ বছর কারবার করছি মশাই। তাই আসল নকল চেনার বসয় আমার অনেক বছর আগেই হয়েছে। পেলেন কোথায় এত গুলো আংটি ?’
ভদ্রলোকের মাথাটা গেছে ভেবেই শুভঙ্কর বেরিয়ে গিয়েছিল দোকান থেকে। সেখান থেকে সোজা গিয়েছিল আরেকটা দোকানে। সেখানেও একেই কথা শুনতে হয়েছে শুভঙ্করকে। তারপর আরেকটা দোকান। তারপর আরেকটা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় প্রতিটা দোকানেই শুভঙ্করকে এক কথাই শুনতে হয়েছে বারবার। চোরাই মাল ভেবে আংটি গুলো কিনতে কেউই রাজি হয়নি শেষ পর্যন্ত। শুভঙ্করের কিছুতেই মাথায় ঢোকে না সিটিগোল্ডের আংটি গুলোকে কেন সবাই সোনার আংটি বলছে। 
আর যদি শুভঙ্কর অন্ধকারে ভুল করেই লিপির সিটিগোল্ডের আংটি গুলোর পরিবর্তে সোনার আংটি গুলোই নিয়ে থাকে তাহলেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, লিপিই বা এত গুলো সোনার আংটি পেল কোথায় ? ওর বিয়ের সময় অনেকেই আংটি দিয়েছিল ঠিক কথা কিন্তু তার সংখ্যা দশের বেশি হবে না। শুভঙ্করের কাছে পঁচিশটারও বেশি আংটি আছে। প্রতিটাই সোনার আংটি!
একবুক ক্লান্তি আর হতাশা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুভঙ্কর এসে দাঁড়ায় ছোট্ট শহরটার বুকে বয়ে চলা দ্বারকেশর নদীটার তীরে। নদীটার বুকে মুঠো মুঠো লাল ছড়িয়ে দিয়ে পশ্চিম দিগন্তে ডুবছে সূর্যটা এখন। শুভঙ্কর তাকিয়ে থাকে নদীটার দিকে। ওর চোখ দুটোও জলে ভরে আসে একটা সময়। বারবার আংটি গুলোকে নেড়ে চেড়ে দেখে। না, একটা আংটিকেও চিনতে পারছে না শুভঙ্কর। হাজার হাজার প্রশ্নের পোকা কিলবিল করছে ওর মাথায় এখন। কোথায় পেল লিপি এত গুলো সোনার আংটি ? কে দিল লিপিকে আংটি গুলো ? তাহলে কী সেদিনের সেই সিগারেটের টুকরো গুলোও... 
অল্প অল্প করে সব হিসেব যেন মিলে যাচ্ছে এখন। নদীর পারে জেগে থাকা বালির চরের উপরেই বসে পড়ে শুভঙ্কর। আর একটু পরেই নদীর জলে সন্ধা এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। তারপর অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই থাকবে না নদীর চরে। অন্ধকারে শুভঙ্করকেও দেখা যাবে না আর। নদীর বালির উপরেই আংটি গুলোকে নামিয়ে রাখে শুভঙ্কর। তারপর একটা একটা করে ছুড়তে থাকে নদীটার জলে। শুভঙ্করের ভেতর থেকে কে যেন চিৎকার করে বলছে,- ‘লিপিকে দেওয়া সেই সিটিগোল্ডের আংটি এগুলো নয়। এগুলো লিপির আঁধার রাতের সঞ্চয়।’ গুমরে গুমরে কেঁদে ওঠা শুভঙ্করের ঠোঁট দুটো কিছু একটা বিড়বিড় করে বলছে নদীটাকে। সেটা আর শোনা যাচ্ছে না। অন্ধকার নদীর চরে এখন দমকা হাওয়া বইছে।
                                   [সমাপ্ত]
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments