হঠাৎ বৃষ্টি

হঠাৎ বৃষ্টি

Advertisemen

হঠাৎ বৃষ্টি

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


এখানের বৃষ্টির ফোঁটাগুলোও যেন প্রাণে ভরপুর। গাছের সবুজ পাতায় ঝাঁপিয়ে পড়ার পরই হাওয়ার তরঙ্গে হারিয়ে যেতে চায়। দীপক চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে অনুভব করে। ফোঁটাগুলো দীপকের ভেতর পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়। কিছু কিছু কষ্ট বৃষ্টির জলে ভেসে যায় সুবর্ণরেখা নদীর দিকে। কিছু কষ্ট বৃষ্টির জলে ধোয়া হয়ে চকচক করে চোখে।
সম্পর্কের হালকা পালকগুলো খসতে খসতে যখন শরীরটায় কুঁকড়ে যাওয়া চামড়া ছাড়া কিছুই ছিল না, তখন এই হাতিবাড়িতে এসেছিল দীপক। এখানের প্রকৃতি ওকে আর ফিরতে দেয়নি। হাতিবাড়ি ফরেস্ট রেস্ট হাউসে মেনেজারির একটা কাজ পেয়ে গিয়েছিল ও। প্রথম প্রথম জীবনের দগদগে দিনগুলো চোখে ভিড় করে আসত। এখন এখানের সবুজে অতীত অনেকটা ম্লান হয়ে এসেছে...
[এক]
আজ সকাল থেকেই রিমঝিম রিমঝিম বৃষ্টি। টুরিস্ট আসার কোনও সম্ভাবনা নেই জেনেই বৃষ্টি মাথায় বেরিয়ে পড়ে দীপক। সোঁদা মাটি আর ভেজা পাতার গন্ধে পুরো পরিবেশটাই এখন নেশা নেশা। কাছে-পিঠেই হয়তো কোথাও অর্কিড ঝুলছে। বনফুলের বুনোগন্ধ বাতাসে। পায়ে পায়ে দীপক সেই ভাঙা মাটির ঘরটায় এসে বসে। এই ঘরটায় কয়েক বছর আগে এক সাঁওতাল পরিবার ছিল। কেন যেন ওরা পালিয়ে গেছে। বেঁচে আছে ঘরটার আনাচে কানাচে ছোট বাচ্চার হাতে আঁকা কয়েকটা ফুলের ছবি। এই ঘরটায় এলে দীপকের অন্যরকম একটা শান্তি লাগে। বাবার মুখটা মনে পড়ে। মায়ের মুখ মনে নেই দীপকের। ও তখন অনেক ছোট। তবে জোড় ধারের শ্মশান থেকে উঠতে থাকা ধোঁয়ার ছবিটা এখনো মনে আছে ওর। ওটা কেন মনে আছে দীপক নিজেও জানে না।
হঠাৎ একটা শব্দে চমক ভাঙে দীপকের। সেই ময়ূর দুটো আজকেও এসেছে। প্রথম প্রথম ওরা ভয় পেতো দীপককে। এখন ওরা দীপকের খুব কাছ দিয়ে ঘুরঘুর করে। ঘাসের ভেতর থেকে কিসব যেন খুঁটে খুঁটে খায়।

‘দীপক দাদা... ও দী-প-ক দাদা...’ পিক্লুর ডাক ভেসে আসে দীপকের কানে। ময়ূর দুটো বার কয়েক এদিক সেদিক তাকিয়ে উড়ে যায় সুবর্ণরেখার দিকে। এই পিক্লু পাশের গ্রামের সাঁওতাল ছেলে। ওর বাপ মা কেউই নেই। দেড় বছরের পিক্লুকে ফেলেই ওর মা ভেগেছিল ওর কাকার সঙ্গে। বছর তিনেক হল ওর বাপটা বিষ খেয়ে মরেছে। সেই থেকে ছেলেটা এই গেস্ট হাউসে। ঝাঁটপাট দেওয়া,  রুমে রুমে খাবার পৌঁছানো আর টুরিস্টদেরকে নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরতে যাওয়াই পিক্লুর কাজ। যদিও পিক্লু এর বাইরেও বেশ কিছু কাজ করে তবে সেগুলোর জন্য ওর কোনও বেতন নেই।
‘আমি জানতাম তুমি এখানেই থাকবে। তাই সোজা এখানেই এলাম। এসেছে এসেছে...’ জোরে জোরে শ্বাস নেয় পিক্লু। ছুটে আসার ক্লান্তি ওর চোখে মুখে।
‘এই জলে জলে গেস্ট !’
‘সেই যে সেদিন বিকেলে বাজারে তোমাকে অডিটেড বলেছিল...’
‘অডিটেড নয় ইডিয়... চুপকর। ও কী জন্যে এসেছে এখানে।’
‘সঙ্গে আরও দুজন। একটা মেয়ে আর একটা লোক। আমার মনে হয় এরাও সেই ছেলে মেয়েটার মতোই...’
‘চুপকর। বলেছি না তোর ইঁচড় পাকা মাথা নিয়ে কোনও কিছু মনে করার চেষ্টা করবি না। যা ওদেরকে বলে দিবি যা রুম খালি নেই।’
‘সেটা তুমিই গিয়ে বলো। ওরা বলছে ওদের অন্য লাইন বুকিং।’
‘অন্য লাইন দিয়ে এখানে বুকিং হয় না বলে দিবি যা।’
‘কেন ? ওই কলকাতার বাবুটাও তো অন্য লাইন বুকিং করেছিল।’ কথাটা বলে আঙুল দিয়ে মাথার জল ঝাড়ে পিক্লু।
‘ওহ গড , ওটাকে অন্য লাইন বলে নারে গাধা ওটাকে অন লাইন বলে। চল দেখি এদের বুকিংটাই পরিনিতা চ্যাটার্জীর নামেরটা কি না...’
[দুই]
‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেবো বেচা কেনা,
মিটিয়ে দেব গো,...’
                                                     - হঠাৎ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর কানে আসতেই ঘুমটা ভেঙে যায় দীপকের। ওর রুমটা গেট হাউসের দোতলার এক্কেবারে কোনায়। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে দীপক। মেঘলা আকাশ কেটে আকাশমণি গাছের ফাঁকে একফালি চাঁদ হাসছে এখন। চাঁদটার থেকে চোখ সরাতেই চোখ পড়ে ছাদের উপর। ওখানে একলা দাঁড়িয়ে গান গাইছে মেয়েটা। চাঁদের ঝাপসা আলোতেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ওকে।
বাজারে এই মেয়েটাই সেদিন অপমান করেছিল দীপককে। সাইকেলের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে দীপক পড়েছিল ওর পিঠের উপর। দীপকের দোষ ছিল না। তবুও যা মুখে এসেছিল তাই বলেছিল মেয়েটা। অচেনা অজানা বন্ধু-বান্ধবহীন জায়গায় দাঁড়িয়ে দীপক চুপচাপ শুনেছিল। পিক্লু হাঁ করে দেখেছিল।
সেদিনের পর মেয়েটার মুখটা মনে এলেই রাগে শরীরটা রিরি করত দীপকের। আজকে কিছু বলার উপায় নেই। মেয়েটা আর ওর দিদি জামাইবাবু গেস্ট হাউসে তিন দিনের অতিথি। আজকে যদিও সেদিনের সেই বাজারে দেখা মেয়েটার সঙ্গে এই মেয়েটার যেন কোনও মিল নেই। কোথায় যেন দীপকের মতোই সব ভেসে যাওয়া সুরে গাইছে ও,-
‘নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাধবে নতুন বাহু-ডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই আমি,
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।’
                                                                                 -পায়ে পায়ে ছাদে উঠে আসে দীপক। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে পিছন থেকে ডাক দেয়, ‘এই যে শুনছেন ? রাত্রি দশটার পর ছাদে আসা নিষেধ আছে। নিজের ঘরে চলুন।’
এবার পিছন ফিরে তাকায় মেয়েটা। হাসি হাসি মুখে টলতে টলতে কয়েক পা দীপকের দিকে এগিয়ে এসে বলে, ‘নিজের ঘর ? মেয়েদের নিজের ঘর বলে কিছুই হয় না মশায়। নিজের ঘর কেন, নিজের বলেও কিছুই হয় না...’ দীপকের সামনে দাঁড়িয়ে আবার খিলখিল করে হাসে মেয়েটা। একটা উগ্র ঝাঁঝালো গন্ধ দীপকের নাকে-মুখে এসে ধাক্কা মারে।
‘আপনি ড্রিঙ্ক করেছেন! এখানে কিন্তু ড্রিঙ্ক করা...’
‘বিশ্বাস করুন আমার নেশা হয়নি। আসলে আমার ঘুমোতে ভয় হয় জানেন। চোখ বন্ধ করলেই কেমন যেন সব দুঃস্বপ্ন দেখি। তাই আমি যতক্ষণ সম্ভব জেগেই থাকি।’
‘এখন অনেক রাত হয়েছে। এবার শুয়ে পড়লে ঠিক ঘুমিয়ে পড়বেন।’
‘ওটাই তো চাইছি না আমি।’
‘দেখুন এখানের একটা নিয়ম আছে, তাছাড়া এটা জঙ্গল এলাকা। সিকিউরিটিও মেন গেটের বাইরে থাকে। আমি আপনাকে ছাদে থাকার অনুমতি দিতে পারি না।’
‘আপনিও বসুন না কিছুক্ষণ। ওই চাঁদটার দিকে তাকান, দেখুন ভাল লাগবে।’
‘প্লিজ আপনি নিজের রুমে চলুন। রুমের জানালা খুলে দিলে আপনি চাঁদ দেখতে পাবেন।’ বেশ বিরক্ত হয়েই এবার কথাগুলো বলে দীপক।
‘সেদিন বাজারে আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলাম বলেই... আচ্ছা সেদিনের জন্য সরি বলছি। প্লিজ এবার তো আমাকে ছাদে থাকতে দিন।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপক। তারপর ছাদের একটা কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। চাঁদটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনি চান আমার চাকরিটা চলে যাক ? এখানে আরও গেস্ট আছেন। স্টাফ আছেন। কেউ যদি স্যারকে জানিয়ে দেয়...’ দীপকের কথা শেষ হওয়ার আগেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায় মেয়েটা। কোনও কথা না বলে চুপচাপ নিজের রুমে গিয়ে ঢোকে। দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
[তিন]
আজকে সকাল থেকেই কখনো মেঘলা কখনো রোদ ঝলমলে আকাশ। মিষ্টি এলাচ-এলাচ একটা গন্ধ বাতাসে গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে দীপকের নাকে এসে ধরা দিচ্ছে। সম্ভবত ছাতিম ফুলের গন্ধ। এদিকটায় ছাতিম গাছ প্রচুর না থাকলেও কমবেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বেশ কিছুটা দূরে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাশ ঝাড়গুলো। আর কদিন পরেই কাশ ফুল ফুটবে। হঠাৎ করেই বাড়ির কথা মনে পড়ে দীপকের। সব হিসেব-নিকেশ কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেছে। সেই দিনরাত জেগে পড়াশুনার দিনগুলো আজ বেকার বলে মনে হয়। এটাই যদি নিয়তি ছিল তাহলে এত পড়াশুনার...
‘এদিকটা বেশ নিরিবিলি তাই না ?’ হঠাৎ মেয়েলি কণ্ঠ কানে আসতেই চমক ভাঙে দীপকের। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। সদ্য স্নান সেরে এসেছে মনে হয়। চুলগুলো এখনো ভেজাই রয়েছে। কিন্তু ওর শাড়ি পরার কারণটা মাথায় ঢোকে না দীপকের।
‘চুপ করে রইলেন যে ?’
‘না মানে আপনি এত দূর একা একা!’
‘আপনিও তো একাই এসেছেন। আসলে যারা ভেতরে ভেতরে একা তারা হয়তো একাই ঘুরতে ভালবাসে...’
‘আর আপনার দিদি জামাই বাবু ?’
‘ওরা আমার দিদি জামাই বাবু নয়...’ হাসতে গিয়েও হাসতে পারে না মেয়েটা ‘উনি আমার স্বামী আর ওই মেয়েটা উনার... ছাড়ুন ওসব কথা। চলুন না ওই জঙ্গলটা থেকে ঘুরে আসি। ওখানে অনেক ময়ূর আছে শুনেছি। যাওয়া হয়নি কোনওদিন।’
‘কিন্তু...’
‘আজকে আমার জন্মদিন। তাই প্লিজ...’
কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারে না দীপক। হাজার প্রশ্নের ভিড়েও কোথায় যেন একটা কষ্ট হয় ওর। কে কার স্বামী হয়ে কার বিছানায় ঘুমোচ্ছে সেটা দেখা দীপকের কাজ নয়। হোটেল বুকিং আছে পরিনিতা চ্যাটার্জ্জীর নামে, সে অলোক চ্যাটার্জ্জীর স্ত্রী হয়ে পাশের রুমে একলা ঘুমোলে দীপকের কিছু করার নেই।
‘কী এত ভাবছেন ? চলুন না...’

এদিকটায় দীপক একবারই এসেছে। গেস্ট হাউস থেকে জায়গাটা বেশ দূরে। পরিচিত অপরিচিত নানান পাখির দেখা মেলে এদিকটায়। এই জঙ্গলটার ভেতরেই প্রথম ময়ূর দেখেছিল দীপক। এই জায়গাটার কথা পিক্লু বলেছিল দীপককে। 
‘আপনি কিন্তু আমাকে শুভেচ্ছা জানালেন না...’
‘ও হ্যাঁ তাই তো... সরি, শুভ জন্মদিন। প্রতিটা দিন আনন্দে কাটুক। অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল। আপনি যদি বলেন তো গেস্ট হাউসের তরফ থেকে আমরা আজকে সন্ধায় ছোটখাটো একটা...’
‘ধন্যবাদ। অতশতর প্রয়োজন নেই। আমার জন্মদিনে কোনওবারই ধুমধাম হয় না। হওয়াও উচিৎ নয়।’
‘কেন ? হওয়া উচিৎ নয় কেন ?’
‘আজকে আমার বাবার মৃত্যু দিন...’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটা, ‘আমাকে প্রথমবার দেখতে আসছিলেন বাবা। জানি না কেমন করে এক্সিডেন্ট হয়েছিল।’
‘আই এম সরি। আমি অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিলাম।’
‘এতে কষ্ট দেওয়ার কিছুই নেই। আমি জানি না বাবা কী জিনিস তাই বাবাকে হারানোর কোনও দুঃখ কষ্ট নেই আমার ভেতর। বরং বলতে পারেন ওই বাবা শব্দটাকেই ঘেন্না হয় আমার।’
‘প্লিজ এভাবে বলবেন না। যতই হোক উনি আপনার...’
‘উনি কেমন ছিলেন না ছিলেন আই ডোন্ট নো। বাট উনার মৃত্যুর জন্য মা ঠাকুমা-ঠাকুরদা আমাকে আজীবন ঘেন্না করেছে। দূরে সরিয়ে রেখেছে। ইউ নো আমি মদ-গাঁজা সব খাই ? শুধু ওই লোকটার জন্য। আমার নাম পর্যন্ত ছিল না জানেন! আমার মুখ দেখে গ্রামের কোনও লোক কোনও শুভ কাজে যেত না। পাড়ার বাচ্চারাও স্কুলের পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় আমার মুখ দেখত না। কুঁকড়ে কুঁকড়ে বড় হয়েছি ওই বাবার জন্য। তারপর একদিন ভাবলাম স্বাধীন হব। বাড়ি ছেড়ে দিলাম। যা খুশি তাই করলাম। এমনকি বিয়েও। কিন্তু কী পেলাম। কিছুই না, কিচ্ছু না...’
‘প্লিজ আজকের দিনে অন্তত কাঁদবেন না। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনার স্বামী...’
‘আমি নিজেই নিজের নাম রেখেছিলাম, পরিনিতা। আসলে কোনও দিক দিয়েই তো পরিণত নই তবুও নিজেকে পরিনিতা ভাবতে বেশ ভাল লাগে। ডাক্তার বলেছে আমি কোনওদিন মা হতে পারব না। আমি খুশি হয়েছিলাম। অন্তত আরেকটা অপরিনিতা জন্মাবে না, কী বলেন ?’
‘ওদিকে তাকিয়ে দেখুন...’
‘ও-য়া-ও... সত্যিই অপূর্ব, তাই না ? আমি ময়ূরকে নাচতে প্রথম দেখছি। দেখুন দেখুন পুরো পেখমটা মেলে দিয়েছে।’
‘এটা ময়ূর নাচার সময় নয় কিন্তু। তবুও ও নাচছে। জন্মদিনে এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে বলুন। আপনি যে নিজের নামটা ভুল রাখেননি ময়ূরটা কিন্তু তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
‘ধুর ওটার সঙ্গে এটার কোনও সম্পর্ক নেই।’
‘আপনার বাবার মৃত্যুর সঙ্গেও আপনার জন্মের কোনও সম্পর্ক নেই। মদ-গাঁজায় জীবন কোথায় ? জীবন আপনার চোখের সামনে নাচ করছে। আপনি যে পরিনিতা সেটা প্রমাণ আপনাকেই করতে হবে।’
‘আপনি তো দেখছি দারুণ কথা বলেন।’
‘লিখিও...’
‘আপনি লেখক ?’
‘না লেখক নই। নিজেকে লেখক ভাবতে ভাল লাগে তাই লিখি।’
‘আমার ওসব কোনও গুন নেই...’
‘আপনার গানের গলা খুব সুন্দর। কালকে রাতে শুনেছি।’
‘সুন্দর না ছাই। ওই পেটে পড়েছিল বলেই...’
‘চলুন ফিরতে ফিরতে কথা বলা যাবে। বৃষ্টি নামবে মনে হয়।’
‘নামুক না। আমার ভিজতে ভালই লাগে। তাছাড়া বৃষ্টি হলে এখানে আরও ময়ূর আসতে পারে।’
বলতে না বলতেই ফোঁটা-ফোঁটা করে শুরু হয় বৃষ্টি। একটা সেগুন গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়াল ওরা। ময়ূরটা নিজের খেয়ালে এখনো নেচেই যাচ্ছে। ওর নাচ থামার কোনও লক্ষণ নেই।
‘একটা গান শোনাবেন প্লিজ ?’ পরিনিতার চোখে চোখ রেখে কথাটা বলে দীপক।
‘এখন ? ধুর...’
‘প্লিজ না বলবেন না।’
‘আমি কিন্তু রবি ঠাকুরের বাইরে কিছুই জানি না।’
‘রবি ঠাকুরের ভেতর যা আছে তাতে একটা জীবন আরামে কেটে যাবে। আপনি ওই গানটা জানেন, এমন দিনে তারে বলা যায়...’
‘অল্প জানি।’
‘আচ্ছা তবে অল্পই শোনান। আজকে ওই গানটা সকাল থেকেই খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।’
সেগুন গাছের তলা থেকে সরে এসে খোলা আকাশের নীচে বৃষ্টিতে দাঁড়ায় পরিনিতা। তারপর আপন মনেই গুনগুন করে ওঠে,-

“এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।

এমন দিনে মন খোলা যায়-
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরোঝরে
তপনহীন ঘন তমসায় ।।

সে কথা শুনিবে না কেহ আর,
নিভৃত নির্জন চারি ধার।

দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,
আকাশে জল ঝরে অনিবার –
জগতে কেহ যেন নাহি আর ।।”
-পায়ে পায়ে দীপক পরিনিতার পাশে এসে দাঁড়ায়। আজ কেন যেন খুব কান্না পাচ্ছে ওর। বৃষ্টিটা বাড়ছে আবার। রবি ঠাকুরের প্রাণের সুরে সুরে ভিজতে থাকে ওরা। আজকের বৃষ্টিতে অনেক দগ্ধস্মৃতি ধোয়া হয়ে যাবে ওদের।
‘আপনিও গান না আমার সঙ্গে’
“সমাজ সংসার মিছে সব,
  মিছে এ জীবনের কলরব।
    ...”
ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে এবার। রবি ঠাকুরের সুর বৃষ্টির দানায় দানায় ভেসে যাচ্ছে সুবর্ণরেখার দিকে। ওরা গাইছে। বৃষ্টিরে পুড়তে পুড়তে ওরা গাইছে।
                                        [সমাপ্ত]
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments