ভ্যালেন্টাইন ডে

ভ্যালেন্টাইন ডে

Advertisemen

ভ্যালেন্টাইন ডে
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

সবে পাঁচদিন মাত্র কাজে জয়েন করেছি। মাইনেটা আহামরি কিছু না হলেও খেয়ে পরে হাজার দুয়েক বাড়িতে পাঠাতে পারব। এটাই বা কম কীসের। গ্রামের মাটির গন্ধ ছেড়ে এতদূর আসার ইচ্ছে আমার মোটেই ছিল না। দ্বিতীয় রাস্তা খোলা থাকলে হয়তো কখনই আসতাম না। এখন যখন এসেই পড়েছি তখন ওসব ভেবেই আর কী হবে। তবে আমার মতো ঘরকুনো ছেলে এই শাল কাজুবাদামের জঙ্গলে মোড়া চালের মিলে কতদিন টিকতে পারে সেটাই দেখার।
একটা সময় ঝাড়খণ্ডের এই চাকুলিয়া অঞ্চলটায় রাজনৈতিক খুব উপদ্রব ছিল শুনেছি। এখন যদিও তার ছিটে ফোটাও নেই আর। বেশ নিরিবিলি শান্ত এলাকা। যেমন গাড়ি ঘোড়ার ঘ্যানঘ্যানানি নেই তেমন আকাশে গুঁতো মারতে ওঠা বড় বড় দালান বাড়িও নেই। সারাদিন নিজের কাজে ডুবে থাকো আর বিকেল-সন্ধ্যে বেলায় পাতলা জঙ্গলে পা’ডুবিয়ে ঘুরে বেড়াও। আমার কিন্তু খুব একটা মন্দ লাগছে না। রাতের দিকে একটু গা ছমছম করে যখন চাল মিলের দেওয়াল ঘেঁষে হাতির পাল পেরিয়ে যায়। এই পাঁচ দিনেই তিনবার হাতির পাল পেরিয়ে যেতে দেখেছি। মিলের কর্মচারীদের মুখে শুনেছি ওরা হাতির হাত থেকে জমি জমা রক্ষা করার জন্য ‘বুড়ো মাহুত ঠাকুর’ নামক গ্রাম্য দেবতার পূজা করে প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার। এখানকার কর্মচারীরাও বেশ নিরীহ নিষ্পাপ। বনানীর স্নিগ্ধতা ওদের মনে পাপ ঢুকতে দেয়নি এখনো। তাই ওদের জীবন স্রোতের সাথেই ওদের সরলতাও জড়াজড়ি করে আছে।
আর পি সিং এই চাল মিলের মালিক। পুরো নাম রুদ্র পুরি সিং। ভদ্রলোকের বাড়ি এখানে নয়, বিহারের সমস্তিপুরের কাছে। ওখান থেকে কীভাবে এখানে এসে ব্যবসা শুরু করেছেন সেটা আমার অজানা। ওসব জানার কৌতূহলও আমার নেই। আমার সময়ে টাকা পেলেই হবে। আজকে সকাল সকাল মালিক রামগড় বেরিয়ে গেছেন। ওখান থেকে রাঁচি হয়ে বেশ কয়েক দিন পরে ফিরবেন। শুনেছি রাঁচিতেও নাকি উনার চালের মিল আছে। উনার ছোট ভাই ওখানে দেখা শুনা করে।
এই পাঁচটা দিন আমার ভালোই কেটেছে। আজকে বিকেলের দিকে আর মিলের বাইরে যেতে ইচ্ছে করছিল না। মিলের পশ্চিম দিকের একটা কোনায় গিয়ে ঘাসের উপর বসে সূর্য ডোবা দেখছিলাম। শালগাছের মাথার উপর দিয়ে সূর্যটা নীচে ঢলে পড়ছে। পুরো আকাশটাই লাল হয়ে আছে এখন। সূর্যটাকে ডুবতে দেখে বারবার বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছে। এই বিকেলের দিকে আমার ঘরের জন্য একটু বেশিই মন কেমন করে। বসে বসে মায়ের মুখটা মনে করছিলাম ঠিক এমন সময় আমার পিছন থেকে এক মধুর কণ্ঠ ভেসে এল, -‘কী বাঙালী বাবু এই জঙ্গলে মন লাগছে ?’ পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম কাজুবাদাম গাছে হেলান দিয়ে এক যুবতী দাঁড়িয়ে। কালো জিন্সের উপর লাল রঙের টিশার্ট। কানে মোবাইলের হেডফোন গোঁজা। সুন্দরী বললে কম বলা হবে হয়তো। মেয়েটি তার প্রথম প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই তার দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছুড়ল আমার দিকে, ‘আপনার নাম কী যেন সরকার ?’
এবার আমি জবাব দিলাম, ‘ পার্থ প্রতিম সরকার।’
-‘বাঃ বেশ চমৎকার নাম তো আপনার। তা এখানে ভাল লাগছে ?’
-‘সেই চেষ্টাই চলছে। তা আপনাকে ঠিক...’
-‘চিনলেন না এই তো। আমি শরতের পাখি। প্রতি বছর এই সময়েই এখানে আসি। আমার নাম তন্নবি সিং। এই মিল মালিকের এক মাত্র মেয়ে। কলেজের পরীক্ষা শেষ, তাই ছুটি কাটাতে আরামবাগ থেকে সোজা বাবার কাছে এসেছি কদিন আগে। যদিও এবার দাদানের কাছে সমস্তিপুর যাবার কথা ছিল। গেলাম না। হালকা শিশিরের এই সময় টুকু এখানেই ভালো লাগে আমার তাই এবছরও চলে এলাম।’ 
কথা গুলো বলতে বলতেই শরতের পাখি অর্থাৎ তন্নবি আমার পাশে এসে বসে। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি কদিন আগেই এসেছেন কিন্তু আপনাকে আজকেই প্রথম দেখলাম। ঘরে বসেই সময় কাটান বুঝি ?’
-‘শরতের পাখিকে সব সময় দেখা  যায় কি ?’ কথাটা বলেই খিলখিল করে হাসে মেয়েটি। তারপর পশ্চিমের লাল আকাশটার দিকে তাকিয়ে কী যেন খোঁজার চেষ্টা করে। আমি ওর সাবলীলতা দেখে অবাক হয়ে যাই। হয়তো মালিকের মেয়ে বলেই ওর পক্ষে এতটা সাবলীল হওয়া সম্ভব। আমার ভেতরে কিন্তু কোথাও একটা আড়ষ্ট ভাব কাজ করছে। আমি চাই না মালিকের মেয়ের সঙ্গে কেউ আমাকে একান্তে বসে থাকতে দেখুক। পশ্চিমের আকাশটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা সময় পাখির চোখ দুটোতেও লালচে রঙের মেঘ জমা হয়। ডানহাতের আঙুল দিয়ে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘সূর্য অস্ত যাবার সময় মনটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে ওঠে। এটা কী শুধু আমারই হয় ? আচ্ছা সূর্য অস্ত যাবার সময় আপনার কী মনে হয় ?’
আমি আরেকবার পশ্চিমের লাল আকাশটার দিকে চেয়ে দেখি। সত্যিই মনখারাপ করে দেওয়ার মতো সুন্দর। পাখির প্রশ্নের উত্তরে আমি বলি, ‘সূর্য অস্ত যাবার সময় মায়ের কথা, ছেলেবেলার কথা, স্কুল জীবনের কথা আমার খুব মনে পড়ে। মনে হয় যে দিনটা লোকচক্ষুর আড়ালে তলিয়ে গেল সেটা আর কোনোদিন ফিরবে না। এটা ভেবেই ভেতরে ভেতরে একটা কষ্ট হয়। ইচ্ছে করে নিজের দেখা প্রতিটা ছোট বড় জিনিশ প্রিয় জনকে দেখাই।’
-‘ঠিকেই বলেছেন। আমারও ইচ্ছে করে যা দেখছি যা শুনছি তা সবাইকে শোনাই সবাইকে দেখাই। ঐ যে বকের সারিটা জঙ্গলের ওপারে হারিয়ে যাচ্ছে ওটুকুও সবাইকে দেখাতে ইচ্ছে করে। দেখাতে পারি না বলেই একটা কষ্ট হয়। তবে সূর্য যখন অস্ত যায় আমার মনে হয়, যেন একটা গোটা জীবন পেরিয়ে গেল। আমার কাছে একটা দিন একটা জীবনের সমান জানেন। তাই আমি প্রতিটা দিন নতুন করে বাঁচি।‘
পাখিটির সঙ্গে কথা বলতে আমার বেশ লাগছিল। পাশে বসে এত সাবলীল ভাবে কোনও মেয়ে এর আগে আমার সঙ্গে কথা বলেনি। আমিও বলিনি।  দুজনের গল্প চলতে চলতে দূরের জঙ্গলটা বেয়ে যখন সন্ধ্যা চাল মিলের সীমানায় ঢোকে তখন আমরা উঠে পড়ি। হালকা চালে ফিরতে থাকি কোয়াটারের দিকে। এদিকটায় আসার পরেই খেয়াল করেছিলাম অনেক দূরের থেকে একটা কুলকুল কুলকুল শব্দ ভেসে আসছে। সন্ধ্যায় সব শান্ত হতেই শব্দটা যেন আরও পরিষ্কার শোনা যায়। শব্দটা কীসের জিজ্ঞেস করতেই তন্নবি বলে, ‘ওটা জোড়বাঁধের শব্দ। বর্ষার সময় দুপাশের জঙ্গলের জল গড়িয়ে গিয়ে জমা হয় ওখানে। কদিন আগে ওর বাঁধন ভেঙেছে। এখন জল গড়িয়ে যাচ্ছে নিজের খেয়ালে। সিংভুম জেলায় এমন জোড়বাঁধ প্রচুর আছে। চাষের সময় জোড়বাঁধের জল কাজে লাগে।’
বিকেল-সন্ধ্যার মুহূর্তটুকু ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুম আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়। বারবার চোখের সামনে মালিক কন্যার মুখটাই ভেসে উঠে। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি মালিকের ঘরের আলোটাও জ্বলছে। হয়তো পাখিটিরও এখনো ঘুম আসেনি। তবে কী পাখি এই শাল কাজুবাদামের জঙ্গলে আমার মতোই পথ হারাল ? কী জানি।                  

আজকে রবিবার কাজের চাপ নেই বললেই চলে। এই রবিবার দিনটায় মিলের ভেতরকার কাজ চললেও বাইরে থেকে ধানের ট্রাক আসে না। মিলের থেকে চালের ট্রাকও বাইরে যায় না। মিলের দক্ষিণ পশ্চিম দিকের একটা কোনায় এক চিলতে বাগান আছে। বাগান বলতে ওই দেশি বিদেশি কিছু ফুলের গাছ আরকি। আমি বাগানটার বাইরে দাঁড়িয়ে রজনীগন্ধা ফুল গুলোকে দেখছিলাম। চোখ পড়ল শরতের পাখির উপর। পাখি এখন আনমনে দূরের দিকে তাকিয়ে কোথায় যেন ডুবে আছে। সেদিন সন্ধ্যার পর আর ওর সাথে দেখা হয়নি। আজকে ওকে দেখতে পেয়ে আমিই কাছে গেলাম। আমাকে কাছে আসতে দেখে হাসি হাসি মুখে পাখি জিজ্ঞেস করে,  ‘কী বাঙালী বাবু আজকে সকাল সকাল ঘুরতে বেরিয়েছেন ?’
ঠোঁট দুটোয় সামান্য হাসির রেখা টেনে আমি বলি, ‘আজকে তো কাজের চাপ কম তাই আরকি। তা আপনাকে তো এই কদিনে এক বারও দেখতে পাইনি। ভেবেছিলাম উড়ে গেছেন হয় তো।’
-‘যাক ভেবেছিলেন তাহলে বলুন ?’ কথাটা বলেই মুচকি মুচকি হাসে তন্নবি।
 -‘আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো দেশের বাড়ি গেছেন।’
-‘না এবারের ছুটিতে আর কোথাও যাব না ভাবছি। এখানেই বেশ ভালো লাগছে। এমন প্রাণবন্ত সবুজ ফেলে কোথাও যেতেই ইচ্ছে করে না। আচ্ছা বাঙালী বাবু...’
-‘আপনি আমাকে পার্থ বলেই ডাকতে পারেন। আর আমাকে প্লিজ আপনি করে বলবেন না। কেমন যেন একটা অসোয়াস্তি হয় ভেতরে ভেতরে।’
-‘ওকে, তবে তাই হবে।’
-‘আচ্ছা আপনি তো বাঙালী নন তাহলে এত ভালো বাংলা বলছেন কী করে?’
-‘বাংলা বলার জন্য কী বাঙালী হওয়া লাগে ?’
-‘না ঠিক তা নয়। কিন্তু আপনি বাংলা...’
-‘আমাকেও আপনি বলে সম্বোধন না করলে খুশি হব। আমি তো ছোট থেকেই আরামবাগে মায়ের কাছে মানুষ। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক সবেই ওখান থেকে দিয়েছি। ওখানে থেকেই তো গ্রেজুয়েসেনও করছি। জানতেন না আপনি ?’
-‘না। আমি আবার কেমন করে জানবো।’
-‘বাবা মায়ের যখন ডিভোর্স হয় তখন আমি খুব ছোট। তখন থেকেই আরামবাগে মায়ের কাছে। কিন্তু বাবার কাছে এলে মা কোনও দিনেই বাধা দেয়নি। এখনো দুজন দুজনকে ভালবাসে কিন্তু কেবল মাত্র ইগোর জন্য কেও কাউকে কাছে ডাকতে পারে না। আমি মা বাবার ভাঙা সম্পর্কের সেতু বাঁধতেই উড়ে উড়ে এখানে আসি।’
-‘তোমার মা যখন তোমাকে এখানে আসতে মানা করেন না তখন মনে হয় চেষ্টা করলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’
-‘চেষ্টা যে করিনি তা নয়। কিন্তু কাজ হয়নি। আচ্ছা এখন আমি যাই পূজার দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
-‘কী পূজা আজকে ?’
-‘না আসলে আমি এখানে এলেই ছিন্নমস্তার পূজা দিতে যাই। বহুকাল আগেকার মন্দির। বাবা বলে সাঁওতাল বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত নাকি মায়ের মন্দিরে নরবলি হত।’
-‘কোথায় মন্দিরটা ?’
-‘এই তো আমাদের মিলের ঠিক বিপরীত দিকে। তুমি যাবে আমার সঙ্গে ?’
-‘গেলে তো মন্দ হয় না।’
-‘আচ্ছা তাহলে স্নানটা সেরে নেবে যাও। আমি ভজুয়াকে বলে দিচ্ছি ওকে আর যেতে হবে না।’
স্নান সেরে তন্নবির সঙ্গে আমিও মিলের বাইরে আসি। দূরের থেকে দেখলেই বোঝা যায় কত প্রাচীন মন্দিরটা। শাল আর বটের নীচে দাঁড়িয়ে কয়েকশো বছরের ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে নির্জনে। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুই জঙ্গল। এদিকটায় কাজুবাদামের গাছ তেমন একটা নেই বললেই চলে। মন্দিরের কাছে আসতেই চোখে পড়ে সিমেন্টের তৈরি বিশালাকার হাড়িকাঠটার উপর। মায়েই জানেন এই হাড়িকাঠে মাথা ঢুকিয়ে কত প্রাণ গেছে। এখন মন্দিরটার দশাও জরাজীর্ণ। মূর্তিটারও তাই। আমাদেরকে দেখতে পেয়ে একটা শেয়াল মন্দিরের বারান্দা থেকে হুশ করে কেটে পড়ল জঙ্গলের দিকে। সামনে যেতেই দেখতে পেলাম মায়ের মূর্তিটা পাথরের তৈরি। এক হাতে নিজের কাটা মুণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা। মূর্তিটার দিকে তাকাতেই ভেতরটা কেমন যেন ছমছম করে। আমি চারদিকটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। তন্নবি পিছন থেকে এসে আমার হাতে এক টুকরো মিঠাই আর একটা কলা দিয়ে বলে, ‘ওই দিকটায় চল ওখানে বসার জায়গা আছে।’
একটা দৈত্যাকার পাথরের উপর বসি আমরা। এখান থেকে জঙ্গলটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। কোনদিন কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম এমন জঙ্গলের পাদদেশে কোনও এক প্রাচীন মন্দিরের নিকট এক রাজকন্যার সঙ্গে বসে থাকব ? আজকে লাল পাড় সাদা শাড়িতে পাখিটিকে আরও বেশি করে সুন্দর দেখাচ্ছে। ঠিক যেন প্রকৃতি কন্যা। এমন মুহূর্ত গুলোকে প্রাণপণ চেষ্টায় আটকে রাখতে ইচ্ছে করে। মাত্র দুবারের দেখায় তন্নবিকে এতটা আপন বলে মনে হত না, যদি না এখানের প্রকৃতি এতটা সুন্দর হত। ও আনমনে দোয়েল দুটোর দিকে উদাসীন ভাবে তাকিয়ে আছে। আজকে ওর দিকে তাকালেই কেমন যেন নেশা ধরে যাচ্ছে বারবার। আজকে পাখি সৌন্দর্যের সীমা পার করে গেছে। পাতা ঝরা হেমন্তের আদুরে বাতাস মাঝে মাঝেই ওর শাড়ির ভেতর ঢুকে লাল ব্লাউজ স্পর্শ করে যাচ্ছে। এমন সময় পুরুষ বুকের ভেতর সবারেই হয়তো কেমন কেমন যেন একটা হয়। সেটা কাম না প্রেম আমার জানা নেই। তবে আমার ভেতরে যে কিছু একটা হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি। আমরা দুজনেই নীরব ভাষায় কথা বলে যাচ্ছি। কিছুই শোনা যাচ্ছে না অথচ সব বোঝা যাচ্ছে।

দেখতে দেখতে আরও কয়েকটা দিন স্বপ্নের মতো কেটে গেল। প্রকৃতির নিয়মে হঠাৎ  করেই শরতের পাখিটিও এসে বসেছে আমার জীবনের ডালে। এখন কাজের ভিড়েও ডুব মারতে শিখেছি। এখন প্রতিদিন আমার কাছে মানসিক ভ্যালেন্টাইন ডে। মিলের কুলি কামিনরাও দেখেছে আমাদেরকে এক সঙ্গে ঘুরতে। কিছু বলেনি ওরা, শুধু মুচকি মুচকি হেসেছে। ও হাসির অর্থ আমি বুঝি। হয়তো তন্নবিও বোঝে। কিন্তু সব বোঝার পরেও কিছু না বোঝা ইচ্ছে করেই রেখে দিতে হয়। তাই তো তন্নবির হাতে হাত রেখে বলতে পারিনি একটা জীবন একসঙ্গে বাঁচার গল্প। ও যে মালিকের মেয়ে এটুকু অস্বীকার করতে পারি না আমি কিছুতেই। কেবল মাত্র এই অদৃশ্য বেড়াজালটার জন্যেই আমি পাখির দিকে এগিয়ে যেতে পারি না। তন্নবি বারবার শুনতে চেয়েছে আমার মুখ থেকে কয়েকটা শব্দ। কয়েকটা অক্ষর। যে অক্ষর গুলো আমি বলতে পারব না হয়তো কোনদিন। যত দিন পেরিয়েছে তন্নবি ততই অস্থির হয়েছে আমার মুখ থেকে ভালবাসার গল্প শোনার জন্য। কিন্তু কেউ না জানুক আমি তো জানি সব ভালবাসার গল্প শোনানোর জন্য নয়। কিছু ভালবাসার গল্প একান্তই নিজের জন্য। এমন কী তার জন্যেও নয় যাকে মন ভালবেসেছে। আমার তন্নবির সঙ্গে ঘুরতে ভাল লাগে, আমি ঘুরি। তন্নবির দিকে চাইতে ভাল লাগে, আমি চাই। কথা বলতে ভাল লাগে, আমি কথা বলি। ভালবাসতে ভাল লাগে, ভালবাসি। ওকে হারানোর কথা ভাবতে যে ভাল লাগে না তাই তো ওকেও বলিনি, ‘তোমায় ভালবেসে ফেলেছি শরতের পাখি।’ থাক না এই না বলা ভালবাসাটুকু আমার নিজের ভেতরেই।
আরও কয়েকটা দিন পরেই বুঝলাম, ভালবাসাকে নিজের ভেতরে ভেতরে লালিত করে যাওয়া বড় সহজ কথা নয়। সে মাঝে মাঝেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে আত্মপ্রকাশের ইচ্ছায়। আজকে সকালে এসেই তন্নবি বলল, ‘আজকে বাবা ঝাড়গ্রাম গেছে। ফিরতে ফিরতে সেই রাত হবে। চল আজকে জোড়বাঁধ থেকে ঘুরে আসি। বাড়িতে বসে বসে আর মোটেই ভালো লাগছে না।’ আমাকে হাঁ না কিছু বলার সুযোগ দিল না তন্নবি। আমার হাত ধরে টেনে বার করল বাইরে। তারপর বলল, ‘যাবে না আমার সঙ্গে ?’ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ‘না’ বলার শক্তি সাহস কোনটাই আমার নেই। 
তন্নবি ভালো মতোই জানে আমিও ওর সাথে যেতে চাই অনেক অনেক দূরে কোথাও যেখানে এমন সবুজ থাকবে যেখানে প্রকৃতি এমন ভাবে হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেবে। কিন্তু বাবা-মা, ভাই-বোন দের কথা মনে পড়লেই আমি তন্নবির সুরে সুর মেলাতে পারি না। পাদুটো কেমন যেন থরথর করে কাঁপে। তখন আমি ভয় পেয়ে যাই। ছাপোষা বাঙালী ঘরের প্রতিটা ছেলে যে ভয় পায় সেই ভয়টা আমাকেও জাপটে জড়িয়ে ধরে। তখন আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, ‘না আমি পারব না। কিছুতেই পারব না।’ কিন্তু  পাখি যখন শিশ দিতে দিতে ডাকে ? আমি তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো পিছু পিছু উড়তে থাকি। তখন কোনও পিছুটান থাকে না। তখন ডালে ডালে পাতায় পাতায় পাখির সাথে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
জোড়বাঁধের কাছাকাছি গিয়ে আমরা দুজনে একটা পাথরের উপর বসি। জল আটকে রাখার জন্য যে বাঁধনটা দেওয়া হয়েছিল সেটার একটা দিক ভেঙে ঝুলে পড়েছে নীচের দিকে। ওই ভাঙা অংশটা দিয়েই কলকল করে নীচে নেমে যাচ্ছে জলের ধারা। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। অনেক দূরে ঠিক যেখানে শাল কাজুবাদামের জঙ্গল দিগন্ত রেখার সঙ্গে মিশেছে সেখানে যেন কেউ পাহাড়ের বেড়া দিয়ে রেখেছে। কিছুটা দূরেই জোড়বাঁধের জমা জলের উপর কয়েকটা বুনোহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে আপন মনে।
তন্নবি পাথরটা থেকে নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। ওর দুহাত দিয়ে আমার দুহাত ধরে টেনে আমাকেও পাথরটা থেকে নামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমি আর আরামবাগ যেতে চাই না। আমি তোমার কাছে কাছে থাকতে চাই। সারাজীবন এমন করে ঘুরে বেড়াতে চাই। আমি বাঁচতে চাই পার্থ।, আমার মা বাবার মতো করে নয় আমি নিজের মতো করে বাঁচতে চাই। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবে না তো পার্থ! বল না ফিরিয়ে দেবে না তো?’ কথা গুলো এক নিশ্বাসে শেষ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে তন্নবি। ওর চোখের জলের ছোঁয়া লাগে আমার বুকে। আমি কিছুই বলতে পারি না। ওর নরম পালকের মতো চুলে আমার ঠোঁট দুটোকে ডুবিয়ে রাখি। এক সময় আমার চোখ দুটোও জলে ভরে আসে। 
অনেকক্ষণ আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। একটা সময় তন্নবির দু’বুকের জোয়ারে আমার ঘর, আমার গ্রাম, আমার পরিবার কোথায় যেন তলিয়ে যায়। দুটো শরীর জুড়ে একটা ঝড় ওঠে। সেই ঝড়ের হাত থেকে আমরা কিছুতেই নিজেদেরকে বাঁচাতে পারি না। আমাদের শরীর জুড়ে থাকা বস্ত্রের আবরণ দমকা হওয়ায় কোথায় উড়ে যায়। ঝড়ের দাপটে আমরা তলিয়ে যাই গভীর থেকে আরও গভীরে। যখন ঝড় থামে তখন দূরের একটা কাজুবাদাম গাছের পাতার ফাঁকে বসেথাকা হলদে রঙের ইষ্টিকুটুম পাখি শিস দিয়ে বলে, ‘কৃষ্ণ খোকা হোক’ ‘কৃষ্ণ খোকা হোক’  তন্নবি আমার চোখের দিকে একবার তাকিয়েই লজ্জাবতী লতার মতো আবার আমার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে বলে, ‘অসভ্য পাখি একটা লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখেছে, ছিঃ।’ আমি তন্নবির খোলা পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলি, ‘আমার আবার কেমন কেমন ইচ্ছে হচ্ছে যেন।’ তন্নবি আমার খোলা পিঠে চিমটি কেটে বলে, ‘দুষ্টু কোথাকার। আমারও তো হচ্ছে।’  আমাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে তন্নবি।
আমরা শালজঙ্গলের ভেতর দিয়ে খুনসুটি করতে করতে ফিরছিলাম। চাকুলিয়াতে আসার পর জীবনটা এমন করে পালটে যাবে ভাবতেই পারিনি। হঠাৎ করেই তন্নবির আমার জীবনে আসাটা যেন স্বপ্নের মতো। আজকে আমিও নিজেকে নতুন করে চিনছি। এই প্রথমবার আমি নিজেকে নিয়ে ভাবছি। শুধু মাত্র নিজেকে নিয়ে। তবে কী আমিও পাল্টে যাচ্ছি ? জানি না এটাকেই পাল্টে যাওয়া বলে কী না। তন্নবি আমার হাতে হাত রেখে পথ চলতে চলতেই বলে, ‘কালকে মা আসবে।’
মুহূর্তে আমার বুকে ভয়ের একটা বাতাস ধাক্কা দিয়ে যায়। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আগে বলনি কেন? এবার কী হবে ?’
-‘যা হবে ভালোই হবে।’ কথাটা বলেই আমার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে তন্নবি।
-‘মানে ?’
-‘আমি মাকে তোমার কথা বলেছি।’
-‘তাহলেই মরেছে।’ কথাটা বলেই ওর চোখের দিকে তাকাই। ওর চোখে এখনো নেশা লেগে আছে।
-‘মরেনি বুদ্ধুরাম বেঁচেছে। মাকে বলেছি বাবা আমাদের সম্পর্ক মনে হয় মেনে নেবে না। ব্যাস ওটা শুনেই মা বলেছে আমি তোদের বিয়ে দেবো দেখি তোর বাবা কেমন করে আটকায়।’
-‘কিন্তু তোমার বাবা তো কিছুই জানেন না।’
-‘কালকে জেনে যাবে। আসলে বাবাও মাকে মায়ের মতোই ভালবাসে। মা যখন রাজি হয়েছে তখন বাবা আর না বলবে না। আমাদের মিলন দিয়েই ওদের দ্বিতীয়বার মিলনের একটা রাস্তা খুলে যাবে। আমি চাই আমার বাবা-মা আবার ওদের হারানো দিন গুলো ফিরে পাক। তুমি শুধু সাথে থেকো দেখবে এই শরতেই বসন্তের ফুল ফুটবে আমাদের সবার জীবনে।’
আমি তন্নবির কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলি, ‘তুমি তো শরতের পাখি হয়ে এসেছিলে আমার জীবনে। হেমন্তের বিকেলে উড়ে যাবে না তো ?’
তন্নবি আমাকে বুকে জড়িয়ে বলে, ‘উড়ে যাব বলে তো বাসা বাধিনি। আমি তোমার বুকে আজীবন ভ্যালেন্টাইন ডে-র মতো জেগে থাকব।’ এমন সময় পিছন থেকে পাখিটা আবার ডাকে, ‘কৃষ্ণ খোকা হোক’ ‘কৃষ্ণ খোকা হোক’তন্নবি হাসতে হাসতে বলে, ‘বেহায়া পাখিটা পিছু নিয়েছে দেখো। খোকা না হওয়া পর্যন্ত ওর শান্তি নেই।’ তন্নবির সাথে আমিও হাসতে হাসতে চলতে থাকি। পাখিটা নিজের খেয়ালেই শিস দিয়ে যায়। ও আমাদেরকে যেন আজীবনের ভ্যালেন্টাইন পথ দেখাচ্ছে। 
                                                                                [সমাপ্ত]
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments