গল্প, বাঁক

গল্প, বাঁক

Advertisemen

বাঁক

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

ঝড়জলের রাতে আর ঘরে ফিরতে পারেনি গোকুল। জড়সড় হয়ে পড়েছিল প্ল্যাটফর্মের প্রান্তিক একটা কোনায়। দশটা কুড়ির লোকাল পেরিয়ে যাওয়ার পর, শুনশান ষ্টেশন। মাঝে-মাঝে মালগাড়ির ঘটোর-ঘটোর আর মশার গুনগুনানিতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছিল ঠিকই, কিন্তু ওকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। মশার সঙ্গে সহবাস ওর নতুন নয়। রক্ত খেয়ে খেয়ে মশাগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়লে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছিল গোকুলও। ঘুমটা ভাঙল হঠাৎ একটা চিৎকারে...

[এক]

বৈশাখের মাঝামাঝি। চারদিক জুড়ে যেন আগুন ঝরে পড়ছে। কবে যে শেষবার বৃষ্টি হয়েছিল সেটাও ঠিকঠাক মনে পড়ে না। ডোবা-পুকুরগুলো চৈত্রেই আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ছটফট করে মরেছে। এখন স্নান-খাওয়া সব কলের জলে। তাও আবার একটানা পাম্প করলে জল ওঠে না। কয়েক বালতি জল নেওয়ার পর কয়েক মিনিট বিরতি। বট গাছের নীচে বসে আকাশকুসুম ভাবতে ভাবতে ঝিমচ্ছিল গোকুল। এখনো বেশ কয়েক মাইল হাঁটার পর পলাশকলি। পৌঁছতে-পৌঁছতে দুটা আড়াইটা বাজবে। আজকে এতদূর হেঁটেও তেমন পড়তা হয়নি। আসলে যা দিনকাল পড়েছে তাতে করে মানুষের আর ভক্তি-টক্তি নেই তেমন। আর মানুষেরই বা দোষ কী ? রোজদিন কাজ থাকলে, জমানো চাল থাকলে, চাষের ব্যাবস্থা থাকলে... আসলে নিজের পেটের ভাগ অন্যের ঝুলিতে দিয়ে এখন আর পুণ্যি করার দিন নেই। এখন সবাই বোঝে, চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। নতুন ভিখিরি পাঁচ গ্রাম বেশি ঘুরবে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু গোকুল তো আর নতুন নয়। গোকুল জানে কোন গ্রামে গেলে কতটুকু চাল জুটবে...

চালের থলি হাতে আজকে একটু সকাল সকালই বেরিয়ে পড়েছিল গোকুল। ভেবেছিল কয়েকটা গ্রাম বেশি ঘুরলে হয়তো কালকে আর বেরোতে হবে না। আসলে ভিক্ষে করলেও গোকুলেরও ইচ্ছে করে অন্তত সপ্তাহের একটাদিন মালার সঙ্গে কাটাই। কিন্তু সেটা আর হল কই ? আজকেও সেই কেজি চারেক চাল। কেজি তিনেক বিক্রি করে তেল-নুল-আলু-পেঁয়াজ কিনতে হবে। বাকিটা, দুবেলার ভাত চড়ালেই শেষ। মা ষষ্টির অশেষ কৃপায় তিন তিনটি মেয়ের বাপ গোকুল। ছায়া, ছন্দা আর বিরতি। শেষ কন্যাটির নাম রেখেছিল গাঁয়ের স্কুল মাস্টার। তবে কপাল গুনে মেয়ে তিনটি মায়ের রূপ পেয়েছে, এই যা সৌভাগ্য।

‘হ-রে কৃষ্ণ... হ-রে কৃষ্ণ...’ করতে করতে উঠে দাঁড়ায় গোকুল। গামছাটাকে মাথায় পেঁচিয়ে চালের থলি হাতে হাঁটতে থাকে। এখন মাথার উপর থেকে লম্বালম্বি ভাবে সূর্য রোদ ঢালছে। চারদিক জুড়ে খাঁ-খাঁ মাঠ আর তাল-খেজুরের সারি ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। দূরের দিকে তাকালে মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে। মনে হয় পৃথিবীটা যেন চোখের সামনে পাক খেয়ে গেল। এই কদিনের ভেতর বৃষ্টি না হলে... হঠাৎ করেই মায়ের মৃত্যুটা মনে পড়ে গোকুলের। তখন গোকুলের বয়স বার-তেরর বেশি নয়। বিছানায় শুয়ে জল-জল করে কাতরাচ্ছিল বৈষ্টমি-বৌ। গোকুলের বাপ ঘরে ছিল না, পাশের গাঁয়ে খড়ের চাল ছাইতে গিয়েছিল। মায়ের কাতরানি শুনে জলের বালতি হাতে তাঁতিদের কুয়োয় জল আনতে ছুটেছিল গোকুল। কিন্তু জল নিয়ে ফেরার আগেই, সব শেষ। মায়ের মুখে আগুন দেওয়ার আগে মায়ের শুকিয়ে থাকা ঠোঁটদুটোর দিকে অপলক ভাবে তাকিয়েছিল গোকুল। ওর মনে হয়েছিল মায়ের শুকনো ঠোঁটদুটো দু-ফোঁটা জলে পেলেই হয়তো নড়ে উঠত। শ্মশানের কাজ শেষ হওয়ার আধঘণ্টার ভেতরই ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। মায়ের মৃত্যুর দিনটা ভাবতে ভাবতেই গোকুলের চোখে জল জমা হয়...

মা মরার বছর কয়েকের ভেতর বাপটাকেও টিবিতে খেলো। মুখের উপর কপাট বন্ধ করার মতো করেই স্কুলের দরজা বন্ধ হল গোকুলের। বাপ মরার পর মাস খানেক চায়ের দোকানে কাপ-প্লেট ধুয়েছিল গোকুল। কিন্তু মালিকের বিষাক্ত ব্যাবহার আর দুহাত ভরা হাজার অত্যাচারে কাজটা ছেড়ে দিল একদিন। তারপর কে যে কীভাবে গোকুলকে পূর্বপুরুষের বৃত্তি সেই ভিক্ষার ঝুলিটা হাতে ধরিয়ে দিল, আজ গোকুলেরও ঠিকঠাক মনে পড়ে না। বেশ কয়েক বছর শহরের ষ্টেশনে ষ্টেশনে ভিক্ষে করে ভাল টাকা কামিয়েছিল গোকুল। পুকুর পাড়ের নীচে হালদারদের বিঘাদুই জমিও কিনেছিল। ষ্টেশনে ভিক্ষে করায় সুবিধা ছিল, একমাথা রোদ নিয়ে এত হাঁটতে হত না। কেত্তন বাজিয়ে হরি নাম করতেও হত না। ইউনিয়ন-টিউনিয়ন হয়ে ষ্টেশন চত্বরে ভিক্ষের অধিকার গেল। ষ্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়েও কদিন ভিক্ষে করেছিল গোকুল। পড়তা হয়নি। শেষে সেই পায়ে-পায়ে গাঁয়ে-গাঁয়ে ঘোরা। প্রথম প্রথম কতলোক ভিক্ষে না দিয়ে জ্ঞান দিত। কাজের খবর দিত, অফারও দিত কেউ কেউ। গোকুল সেসব কথা গায়ে না মেখে হাসি মুখে নিজের কাজ করে গেছে। গোকুল জানে সম্মান সম্ভ্রান্ত লোকের সম্বল। 

মাধবের দোকান দুয়ারে এসে আমগাছটার নীচে দাঁড়ায় গোকুল। মাথার গামছা খুলে মুখের ঘাম মোছে। টেবিল থেকে জলের জাগটা নিয়ে চোখেমুখে জল দেয়। মাধবের দোকানের ছেলেটা জানে গোকুল এক কাপ চা চাইবে। গোকুলের চোখেমুখে জল দেওয়া হতে না হতেই চা নিয়ে আসে ছেলেটা। গোকুল কোনও কথা না বলে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে চুমুক দেয়। ভেতর থেকে মাধব জিজ্ঞেস করে, ‘আইজ ঢের দেরি কল্ল্যে যে খুড়া ?’

চায়ের কাপে আরেক চুমুক দিয়ে গোকুল বলে, ‘আইজ নদীপার তক গ্যেইছলম...’

‘তুমার দম আছে-ব খুড়া। শালা এই ধুপসি রোদে ইঘর-উঘর কত্ত্যে পিছন ফাইট্যে যাচ্চ্যে আর তুমি দু-মুঠা চালের লাইগ্যে...’

‘পেটের ভিতরে ত আর দকান নাইরে বাপ, যে ভোগ লাইগলেই চপ কিনে খাব...’ মরচে পড়া দাঁতগুলো বের করে নিজের কথায় নিজেই হাসে গোকুল।

‘এই গরমে উনান ধারে বইসে চপ ভাইজত্যেও পিছন দিয়ে তেইল বার হব্যেক।’

শব্দ করেই চায়ের খালি কাপটা নামায় গোকুল। তারপর ভেতরে ঢুকে একটা দুটাকার কয়েন মাধবের হাতে দিতে দিতে বলে, ‘নারে বাপ তুই পিছনের তেইল দিয়েই চপ ভাজ আমি চলি...’

‘পিছলা ধারটা কবে দিবে-হ্যে খুড়া ? বহুদিন ত...’

‘গাঁ ছাইড়্যে ত পালাই যাচ্চি নাই। আর পালালেও তর কুড়িটা টাকা দিয়েই যাব। তর ধার পেটে লিয়ে সগ্-গে গেলেও পাতলা হাগা হব্যেক।’

মাধব কিছু একটা বিড়বিড় করে বলছিল হয়তো। গোকুল কান না দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসে।



[দুই]

‘এই যে গোকুল তুমার খোঁজেই একচক্কর গেইছলম তুমার ঘর। তা তুমি তখন...’

‘হ আইজ টুকু সকাল সকাল বেরাইছিলম, তা কী ব্যাপার দুম কইর‍্যে আমার ঘর ?’ রাস্তার একপাশের একটা পলাশ গাছের নীচে সরে এসে দাঁড়ায় গোকুল। চালের ব্যাগটাকে নামিয়ে গামছা দিয়ে ঘাম মোছে। লোকটাও সাইকেল দাঁড় করিয়ে গোকুলের পাশে এসে দাঁড়ায়। ময়লা পাঞ্জাবীর পকেট থেকে দুটো বিড়ি বের করে একটা নিজে ধরিয়ে অন্যটা গোকুলের দিকে বাড়িয়ে দেয়। গোকুল বিড়িটা ধরাতে ধরাতে লোকটার মুখের দিকে একবার ভাল করে তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে।

‘তুমাদের মায়ার জন্যি একটা ভাল পাত্তের খোঁজ পাইয়েছি বুইঝল্যে।’ লোকটা দু-দাঁত ভাঙা ঘুলঘুলি দিয়ে ধোঁয়া চালান করতে করতে গর্বের হাসি হাসে।

‘মায়া লয়, আমার ডাগর বিটিটার নাম ছায়া...’

‘ওই এক-ই ব্যাপার...’

‘না-হে এক ব্যাপার লয়। তুমাকে স্বপন না ডাইক্যে খোকন ডাইকল্যে কি সাড়া দিবে ?’

গোকুলের কথায় আড়ষ্টের হাসি হেসে স্বপন বলে, ‘বাপের নাম ধইর‍্যে ডাইকল্যে...’

‘তাহলে ? তুমি আমার বৌ এর জন্যি পাত্ত দেখার কথা বইলছ।’

‘না মানে আমি তুমার বিটিটার...’

‘থাক বুইঝ্যেছি। তা ছেইল্যা কুথাকার ? কী করে ? বয়েস কত ? ইগুলা জান ত ?’

‘শিশিরপুরের লখাই...’

‘ছেইল্যা না ছেইল্যার বাপ ? তুমি ত আবার নাম...’

‘না না ছেইল্যার বাপ ত ওই আমাদের তারাপদ। মাছের আড়ত করে।’

‘তা তারাপদ আবার তুমাদের কবে হৈল-হে, তুমরা ত মণ্ডল। উহারা ত দাস ?’

‘না মানে ওই ইস্কুলের বন্দু...’

‘থাক তুমার ইস্কুলের দৌড় আমার জানা আচে। তা তারাপদর ছেইল্যাটার বয়স কত হব্যেক ? আমাদের ছায়ি ত এই সাতেরতে পা দিবেক।’

‘লখাই এর গাইদ্যে কম বয়েস।’ বিড়িটার সজোরে কটা টান দেয় স্বপন।

‘গাইদ্যে কম বয়স ত একন টুকু বড় হোক।’ চালের ব্যাগটা তুলে ধরে গোকুল। একবার সূর্যের দিকে তাকিয়ে সময়টা অনুমান করার চেষ্টা করে।

‘না না মানে পঁচিশ-তিরিশ হব্যেক আরকি।’

‘ইটা গাইদ্যে কম বয়েস ? শুন ওই পঁচিশের ভিতরে হল্যেই হব্যেক, না হৈলে অন্য মেয়া দেইখব্যে যাও।’ আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের পথে চলতে শুরু করে গোকুল।

স্বপন পিছন থেকে উঁচু গলায় বলে, ‘সইন্দায় আইসব সব খবুর লিয়ে। ঘরেই থাইকব্যে কুতাও যাইও না কিন্তু, উয়ারা ঝটমট বিয়াঘর কইরব্যেক...’ 

[তিন]

মায়া তিন মেয়েকে নিয়ে পাশের রান্নাঘরটায় ঘুমিয়েছে ঘণ্টা খানেক আগেই। গোকুলের ঘুম আসছিল না। আজকে গরমটাও ততটা নেই। গত দুদিনের কালবৈশাখী ঝড়বৃষ্টিতে গরমটা কমেছে। দড়ির খাটে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল গোকুল। মাথায় এখন একটাই চিন্তা, দশ হাজার টাকা। কিন্তু এই মুহূর্তে অতটা টাকা যোগাড় করা গোকুলের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু টাকাটার যোগাড় না হলে কিছুতেই কিছু সম্ভব নয়। ছায়ার বিয়ের দিন যতই এগিয়ে আসছে ততই ঘুমে টান পড়ছে গোকুলের। তারাপদ লোক হিসেবে মন্দ নয়। বেশ নামডাক আছে মার্কেটে। তারাপদর মতো লোক যে ছেলের বিয়ে গোকুলের মতো পাতি ভিখেরির মেয়ের সঙ্গে দিতে পারে সেই ভাবনাটাই মাথায় আসবে না কারুর। সেদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্বপন যখন গোকুলকে প্রস্তাবটা শুনিয়েছিল তখন গোকুল বিশেষ আমল দেয়নি। পুরো ব্যাপারটাকেই হেঁয়ালি বলে মনে হয়েছিল ওর। কিন্তু সত্যিই যেদিন তারাপদ নিজে এসে মেয়ে দেখে পছন্দ করে গেল সেদিন..., তবে ছেলেটা রাজি হয়নি প্রথমে। হবু শ্বশুরের পেশা শুনেই হয়তো ঘাবড়ে গিয়ে থাকবে। পরে ছায়াকে দেখে আর না বলতে পারেনি। উল্টে বেশ কয়েকবার এসেছে গোকুলের ঘরে। 

বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে এসে তারাপদ জানিয়ে গেছেন, কোনও দাবিদাবা নেই উনার। তবুও বিয়েটা তো বিয়েই, তাতে একটা খরচ থেকেই যায়। কিছু না হলেও ছায়াকে আর জামাইকে একটা করে সোনার আংটি দিতে হবে। ঘরপিছু একজন করে হলেও বিয়ের রাতে খাওয়াতে হবে। এর সঙ্গে বরযাত্রী। পুরোহিত। প্যান্ডেল। লাইট। মাইক। বিয়ের এটা-ওটা কেনাকাটা। হাজার তিরিশের ধাক্কা। এর কমে অসম্ভব। 

হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় গোকুল। নিঃশব্দে পা ফেলে ঘরের পশ্চিম কোনাটার দিকে এগিয়ে যায়। এই কোনাটায় মান্ধাতা আমলের টিনের দুটো বাক্স আছে... 



আজ বেশ কয়েক বছর পর চামড়ার ব্যাগটা টিনের বাক্স থেকে বের করে গোকুল। এই ব্যাগটার কথা গোকুল ছাড়া আর কেউ জানে না। টিনের বাক্সটাও সর্বক্ষণ তালা মারাই থাকে। চামড়ার ব্যাগটা বগলদাবা করে ঘরের উঠোনে বেরিয়ে আসে গোকুল। এখন চারদিকটা অন্ধকারে ডুবে আছে। রাতের ঝিঁঝিঁ ছাড়া কেউ জেগে নেই আর। ধীরে ধীরে ব্যাগের চেনটা খুলে টাকার বান্ডিলটা বেরকরে গোকুল। গন্ধ শোঁকে। গোকুলের কেন যেন মনে হয় এই টাকাগুলোতে রক্তের গন্ধ আছে। এই টাকাগুলোর গন্ধেই বাক্সটার কাছে মাছি ভনভন করে। আসলে গোকুল জানে এগুলো পরের টাকা। এই টাকায় ওর কোনও অধিকার নেই। টাকার বান্ডিলটা নামিয়ে কান দুটোকে প্রাণপণ শক্তিতে চাপা দেয় গোকুল। বেশ কয়েকবার জোরে-জোরে ঝাঁকায় মাথাটা। তারপর আসতে আসতে হাত দুটোকে সরিয়ে নেয় কান থেকে। না, কেউ নেই... কেউ চিৎকার করেনি... কোনও ট্রেন নেই... কোনও লাশ নেই... কিন্তু ব্যাগটা? ব্যাগটা তো আছে। কুড়িহাজার টাকাটাও আছে...



আজকে আর ভিক্ষের থলি নিয়ে বেরোতে ইচ্ছে করছিল না গোকুলের। মাথাটা কেমন যেন ভার হয়ে আছে। কিন্তু থলি হাতে পাঁচ দুয়ার না ঘুরলেও তো নয়। পাঁচটা পাপীপেট তো খাবার ছাড়া কিছুই চেনে না। অগত্যা বাধ্য হয়েই পেরেকে ঝুলিয়ে রাখা থলিটা হাতে নেয় গোকুল। ইচ্ছে থাক বা না থাক ভিক্ষে তো ওকে করতেই হবে, এটাই নিত্যদিনের নিয়তি। থলি হাতে গোকুল বাইরে বেরোতে গেলে পিছন থেকে মালা ডাক দেয়, ‘বলি শুইনছ...’

না শুনতে পাওয়ার ভঙ্গিতেই দুচোখ প্রশ্ন নিয়ে ফিরে তাকায় গোকুল। ‘বইলছিলম যে এই কদিন না হয় নাইবা গেলে। বিয়াই-দের গাঁয়ের লোক দেইখলে পাঁচ কতা বইলব্যেক।’

‘তা বিয়াইদের গাঁয়ের কোন ভাতার ভাত আইন্যে দিব্যেক শুনি ?’ বিরক্তিতে দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে গোকুল।

‘না মানে কাইল জামাই বইলছিল...’

‘জামাই!’ এবার বেশ অবাক হয়েই মালার কাছে আসে গোকুল, ‘কাইল জামাই আইচিল বইল্যে বল নাই ত।’

‘আইচিল আর কুতায়। ওই আস্যেই চইল্যে গেল।’

‘উটা আসা লয় ?’ হাতের ব্যাগটা ছুঁড়ে দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্চা আমি কী ঘরের মাইন্দার ?’

‘তুমার অল্পতেই বড ঝাল, জামাই আইচিল ত কী হৈল ?’

‘না না আসার কতাটা লয়, জামাই আইচিল কাইল আর আমি জাইনত্যে পাচ্চি আইজ। ইটা কেমন কেমন লয় ?’

‘আইচিল টাকা দিতে বুইজল্যে...’ কথাটা বলেই শাড়ির আঁচলের গিঁট খুলে একথোক টাকা বেরকরে মালা। ‘তুমাই জামাই বইল্যেচে এই কটাদিন ঘরেই থাইকত্যে। আমাদের না থাক উয়াদের ত সম্মান আচে।’

গোকুল কী বলবে খুঁজে পায় না। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সকালের বাতাসে ভিক্ষে করতে যাওয়া থলিটা গড়াগড়ি খায় উঠোনে। 



[চার]

এই এলাকাটার বদনাম আছে। লোকে আজও বলে, ডাইনিডেরার শ্মশান দিনেও জাগে। শ্মশান ডাক না দিলে গাঁয়ের এদিকটায় তেমন কেউ আসে না। দিনের বেলাতেই কেমন যেন গা-ছম-ছম করে। আদ্যিকালের কয়েকটা বট আর কয়েকটা শ্যাওড়া গাছ ছাড়া বিঘার পর বিঘা ফাঁকা মাঠ। আধুনিক সভ্য-সভ্যতা পায়ের ছাপ ফেলতে পারেনি এদিকে। মদের বোতলটা হাতে নিয়েই একটা বট গাছের নীচে বসে গোকুল। ছিপি খুলে পরপর কয়েটা চুমুক দিয়ে একটা বিড়ি ধরায়। মদের সঙ্গে সুসম্পর্ক না থাকায় গলাটা কেমন যেন চিনচিন করে ওঠে। মায়ের মুখটা মনে পড়ে গোকুলের। এই শ্মশানেই তো ওর মা পুড়েছিল একদিন। ঠিক কোনখানে মায়ের চিতাটা বানানো হয়েছিল মনে করার চেষ্টা করে গোকুল। মনে পড়ে না, সব কেমন যেন অচেনা বলে মনে হয়... 

মদের বোতলটা ফাঁকা করে বিড়ি টানতে টানতেই বটের ছায়ায় এলিয়ে পড়েছিল গোকুল। হঠাৎ বমির চোটে ঘুমটা ভাঙে। খানিকটা সরে এসে বমি করে গোকুল। নাকমুখ দিয়ে হড়হড় করে ঝাঁঝালো বমি বেরিয়ে আসে। শরীরটাকে কেমন যেন ন্যাতপ্যাতে মনে হয়। মাথাটাও ভার হয়ে আছে। তবুও আরাম... তবুও শান্তি...

‘শালা ভিখারির বেটা ভিখারি আমি ? টাকা দেখায়, টাকা ? শালা হবু জামাই...’ হো-হো করে হাসে গোকুল। হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে। ‘লে শালা লে তর টাকায় আমি মুতি...’ পাঁচ হাজার টাকার বান্ডিলটা মাটিতে ফেলে টলতে টলতে টাকাগুলোর উপর পেচ্ছাব করে গোকুল।

টাকাগুলোর উপর পেচ্ছাব করেও শান্তি হয়নি গোকুলের। পায়ে করে নোটগুলোকে উড়ানোর চেষ্টা করেছিল। ভেজা টাকা গোকুলের কথা না শোনায় ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছিল গোকুল। হয়তো আবার ঘুম এসেছিল ওর। 

‘গোকুল ওহে গোকুল...’

‘কন শালা-র‍্যে...’ পাস ফিরে লোকটাকে দেখেই চমকে উঠে গোকুল। এতো সেই লোকটা। এই লোকটাই তো বহুবছর আগে ট্রেনে কাটা পড়েছিল। কিন্তু রক্ত কই ? আর শরীরটাই বা জোড়া লাগল কেমন করে। আশ্চর্য, লোকটার হাতে হুবহু গোকুলের ভিক্ষে করা ব্যাগটা আছে। 

‘টাকাটা নিতে এলাম।’

‘টা টা টাকা ? কন টাকা ?’ ভয়ে বিস্ময়ে গলা কাঁপে গোকুলের।

‘সেই কুড়ি হাজার টাকাটা। তোমার মেয়ের বিয়েই দিন তো আমার মেয়েরও বিয়ে। মরলেও তো বাপ হিসেবে একটা কর্তব্য আছে আমার। তুমি তো বাপু ভিক্ষে করে খাও, কিন্তু ওই টাকাগুলো আমার গায়ে-গতরে খাটা টাকা। তুমি বাপু আমার ব্যাগটা ফিরিয়ে তোমারটা নাও...’ গোকুলের দিকে কয়েক পা এগিয়ে আসে লোকটা।

হঠাৎ দমকা হওয়ায় ঘুমটা ভেঙে যায় গোকুলের। ধড়ফড় করে উঠে বসে গোকুল। ঘামে সারা শরীর ভিজে গেছে। চারদিকটা ভাল করে দেখে, না কেউ কোথাও নেই। পশ্চিমের আকাশে মেঘ ধরেছে। ঝড় উঠবে মনে হয়। পেচ্ছাবে ভেজা টাকাগুলো এতক্ষণে শুকিয়ে উড়ছে নিজেদের মতো। অকারণেই কান্না পায় গোকুলের, চোখের পাতায় মায়ের শুকনো ঠোঁটটা ভেসে ওঠে। চোখের জল মুছে একটা একটা করে নোট কুড়িয়ে কুড়িয়ে রাখে গোকুল। রক্তেই ভিজুক আর পেচ্ছাবেই ভিজুক পরিশ্রমের টাকা নিজের দাম একই রাখে। কিন্তু ভিক্ষের টাকায় সেই দাম কোথায় ? 



[পাঁচ]

পড়ন্ত বেলায় যখন গোকুল ঘর ঢুকল ততক্ষণে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝড়টা আসব আসব করেও আর আসেনি। ঘরে ঢুকেই বিরতিকে জিজ্ঞেস করে গোকুল, ‘তর মাইতর দিদি কই-র‍্যে ?’

‘টুকু পিসির কাচে সেলাই কত্ত্যে গেইছ্যে।’

‘সেলাই ? কী সেলাই ?’ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করে গোকুল।

‘আমি অত জানি নাই।’

‘আর তর মা...’

‘আমি জানি নাই। ইস্কুল থেইক্যে আইসে দেইখলম ভাত বাইড়্যে ঢাক দিয়া আচে, ঘরে কেউ নাই।’

‘তাহল্যে বললি যে ছায়ি সেলাই কত্ত্যে গেইছ্যে ?’

‘উ-ত ডেলি সকালে যায়। আইজক্যেই শুদু দুপুর‍্যে গেইছ্যে।’

‘কবে থেইক্যে সেলাই কত্ত্যে যায়?’ বিরতির কথাটা যেন বিশ্বাস হয় না গোকুলের।

‘অত জানি নাই।’ প্রশ্নে প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে পালিয়ে যায় বিরতি। 

গোকুলের সব কেমন যেন অচেনা এলোমেলো মনে হয়। পরিচিত মুখগুলো সব কেমন যেন পালটে পালটে গেছে। এমন পালটে যাওয়া সময়ে বাইরের দমকা বাতাসেও মনের ভেতর ঝড় ওঠে। দুচোখে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়।



পরেরদিন রোদ রাঙানো সকালে বেরিয়ে পড়ে গোকুল। প্রতিদিনের নিত্যসঙ্গী থলিটাকে আজকে আর সঙ্গে নেয়নি ও। সেই পরিচিত পথঘাট; মাঠ; পুকুর; গরুরপাল পেরিয়ে এসে নির্মলপুরের রাস্তায় দাঁড়ায় গোকুল। আজকে নিজেকেও কেমন যেন অচেনা বলে মনে হয় নিজের কাছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে একটা বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়ায় ও। গলার ভেতর কাঁটার মতো আঁটকে থাকা ‘হ-রে কৃষ্ণ’ বুলিটাকে কোনও রকমে গিলে নিয়ে দরজায় টোকা দেয়। গোকুলের পরিচিত এক মহিলা দরজা খুলে গোকুলকে দেখতে পেয়ে বলেন, ‘ও তুমি, আমি ভাবলাম... দাঁড়াও বাছা চাল আনছি।’

‘না না চাল-পয়সা কিচুই লাইগব্যেক নাই।’

গোকুলের কথায় অবাক হয়েই হয়তো মহিলা জিজ্ঞেস করেন, ‘তাহলে ?’

‘একটা কাইজ দিবেন বামুন বৌদি ? আপনাদের ঘরে ত হরেকরকম কাইজ থাকে।’

ভদ্রমহিলা দু’চোখ বিস্ময় নিয়ে গোকুলের মুখের দিকে তাকান। পরে হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞেস করেন, ‘খামার বাড়ির আগাছাগুলো পরিষ্কার করতে পারবে ?’

‘পাইরব বৈকি। কই কুতায় দেখ্যাই দেন...’ পারবে বলার জন্যেই রেডি ছিল গোকুল। আসলে ওর আজ কাজ চাই। কাজ যেমন হোক, যাই হোক।

কাজ করার অভ্যাস নেই বলেই সমস্যা হচ্ছিল গোকুলের। তবুও নিজের সাধ্যের অতিরিক্ত চেষ্টা করেই কাজটা করেছে ও। মাটিমাখা হাতে একশ চল্লিশ টাকা নেওয়ার সময় কেমন যেন অচেনা শিহরণ হয় গোকুলের মনের ভেতর। একবার টাকাগুলোকে একবার মাটিমাখা হাত দুটোকে ভালভাবে দেখে গোকুল। ওর মনে হয় এগুলো পরিচিত ভিক্ষেমাগা সেই হাত দুটো নয়। এই হাতদুটো যেন নতুন হাত। এই হাতদুটো খেটে খেতে জানে। 

পড়ন্ত বিকেলের রোদে ঝলমল করতে করতে ঘরের পথে পা বাড়ায় গোকুল। আজ হাতে কোনও থলি নেই আজ দুহাত ভর্তি মাটির গন্ধ আছে। পরিবার নিয়ে হাঁটার জন্য নতুন একটা পথ আছে। সেই পথে কেউ ভিক্ষে করে না। সেই পথে কোনও ট্রেন এক্সিডেন্ট নেই। কোনও চিৎকার নেই। সেই পথে গোকুল পরের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখে।



[সমাপ্ত]
Active Search Results
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments