গল্প, দংশন

গল্প, দংশন

Advertisemen


দংশন

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়



এই নদীটার নাম গন্ধেশ্বরী। সারাবছর ধুঁকতে-ধুঁকতে বয়ে চলে। এই নদীটার ছোটার কোনও তাড়া নেই। কোনও দায় নেই। তবুও এই নদীটাকে দেখেই মৈনাক কবিতা লেখে। আঞ্চলিক গান বাঁধে। মনটা যখন অকারণ মনকেমনের আকাশে ভেসে বেড়ায় ? তখন মৈনাক এই মরতে মরতে বেঁচে থাকা নদীটার কোলে বসেই আকাশকুসুম কল্পনা করে। চোখের সামনে সূর্যটা লাল হতে হতে হারিয়ে যায়। নদীর চরে অন্ধকার নামে। তবুও মৈনাকের ঘর ফিরতে ইচ্ছে করে না। নদীর ওপারে কয়েক ঘর বাউল আছে। ওরাও নদীটার মতোই ধুঁকতে ধুঁকতে নিজের ধারায় বইছে। ওরা সন্ধা-বাতাসে একতারা উঁচিয়ে গান গায়। আজকেও গাইছে,-

‘ওরে পাগলা মন আমার প্রেমের কি আর নাম থাকে ?

মনেতে মনেতে পাক লেগে যখন প্রেম পাকে

হৃদয়পুরের লোক তখন,- তারে বিরহ নামে ডাকে’


[এক]

‘এই পাগলা তুই এটার কথা বলতিস ? এটাকে নদী বললে তো পুরো নদী সমাজটাকেই খিস্তি মারা হবে। এটাতে তো কাগজের নৌকাও ভাসবে না...’

‘নৌকাকে ভাসানোর দায় তো নদীর নয়। এই যে তুই পরীক্ষা দিলি, তোকে পাশ করানোর দায় কি পরীক্ষকের ?’

‘ওটার সাথে এটার কী সম্পর্ক শুনি!’

‘আমি নদী হলে নিজের চলার ছন্দটাকে এভাবেই উপভোগ করতে চাইব। তাতে কে মাছ পেল না; কার নৌকা ভাসল না সেই দায় আমি কেন নেবো। জমাট ঘিলুটাকে একটু নরম করলেই বুঝতে পারতিস কেন পরীক্ষা আর পরীক্ষকের কথাটা বললাম। আর তুই তো নদীর জল মাপতে আসিসনি।’

‘নদীর জল মাপতে না এলেও... ছাড় তোর ওই পাতলা ঘিলুতে ওসব ঢুকবে না। তা কোন যায়গায় তোর কবিতা আশ্রম শুনি ?’

‘কবিতা আশ্রম নয়, কবিতা কানন। এই নদীটার এপার জুড়ে যেখানে সেখানে আমি কবিতার বীজ পুঁতেছি। আমি বিশ্বাস করি, আমার প্রতিটা কবিতাই এই মরা নদীটার জল পেয়েই বেঁচে আছে। আসলে জানিস তো পলি, মায়ের মৃত্যুর পর থেকে এই নদীটাই আমাকে কোল দিয়েছে। এই নদীটার সাথেই আমি মন খুলে গল্প করতে পারি। মাঝে মাঝে মনে এই নদীটাই যেন ছুটছে আমার শিরায়। আমার ধমনীতে।’ 

পলি কিছু বলতে গিয়েও মৈনাকের চোখের দিকে তাকিয়ে আর বলতে পারে না। মৈনাক নদীর ঝিলমিলে চোখ পেতে আছে। মৈনাকের শৈশব এখন চোখের ভেলায়। নদীর ঝিলমিলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মায়ের ঝাপসা মুখটা মনে পড়ে ওর। সকালের সূর্যের মতো লাল সিঁদুরের টিপ পরত মা। পায়ে আলতা পরত। মাথায় ঘোমটা দিত। মা কেমন দেখতেছিল আজ আর মনে পড়ে না মৈনাকের। মনে পড়ার কথাও নয়, মৈনাকের মা যখন শ্মশান নিয়েছিল ? তখন মৈনাক তিন-চার বছরের বেশি নয়।

পলি এগিয়ে এসে মৈনাকের হাতটা ধরতেই চমক ভাঙে মৈনাকের। ‘মায়ের কথা ভাবছিলি তাই না ?’ জিজ্ঞেস করে পলি।

‘ঠিক মায়ের কথা নয়। মাকে মনে পড়ার মতো স্মৃতিও নেই আমার কাছে। শৈশব হাতড়ে হাতড়ে যতটুকু হাতে পেয়েছি তাতে একটা মেয়ে-মূর্তি বানানো গেলেও মায়ের-মূর্তি বানানো যায়নি।’ কয়েক সেকেন্ড উদাসীন বিরতি নিয়ে আবার বলে, ‘মাঝে মাঝে মায়ের উপর খুব রাগ হয় জানিস।’

‘কেন ? তুই তো নিজেই বলিস, তোর মাতাল বাবা...’

‘না না মায়ের চলে যাওয়া নিয়ে আমার কোনও অভিমান নেই... আমি শুধু এটাই ভাবি মা আমার কথা ভাবল না কেন ?’

‘সেটা আমিও ভেবেছি। কিন্তু এলোমেলো ভাবনায় উত্তর পাইনি।’ মৈনাকের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে পলি। মৈনাক কিছু বলে না। পলির চুলে আঙুল ডুবিয়ে নদী-বুকের দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থাকে। 



পলি যাওয়ার পরেও বেশ কিছুক্ষণ মৈনাকের বুকের ভেতর পলির স্কুটির আওয়াজটা ভেসে বেড়ায়। তারপর নদীর কুলকুল শব্দ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। এখন পশ্চিম পিছনে রেখে পাখিরা ঘরে ফিরছে। আকাশে তারই সাঁই-সাঁই সুর...


[দুই]

জানালার ওপারে বারবার আধখানা চাঁদটার দিকে তাকিয়েও মনের মতো কোনও লাইন মাথায় এলো না মৈনাকের। শব্দগুলো যেন উড়ন্ত শিমূল তুলার মতো, কিছুতেই ধরা দিতে চাইছে না আজ। বেশ কয়েকবার বেশ কয়েকটা লাইন লিখেও কেটে ফেলেছে মৈনাক। এখন মোবাইলের স্ক্রিনে দশটা বাজতে দশ। খাতা কলম রেখে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে মৈনাক দেখে, বাবা এখনো বাড়ি ফেরেনি। হয়তো আজকেও চোলাই গিলে কোথাও... একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৈনাক আবার চাঁদটার দিকে তাকায়। মায়ের মুখটা মনে করতে গিয়ে সেই সিঁদুরের টিপটাই মনে পড়ে।

বাড়ির সদর দরজা খুলে বেরিয়ে আসে মৈনাক। আজ গাছে-গাছে পাতায়-পাতায় বসন্তের চাঁদ লেগে আছে। বাতাসে মাধবীলতার গন্ধ। আর কদিন পরেই দোলপূর্ণিমা। তারপরই ধারা পরব। মেলা বসবে শুশুনিয়া পাহাড়ের নীচে। কিছু একটা মনে পড়তেই মৈনাক আরও কয়েক পা এগিয়ে এসে একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ায়। এখান থেকে আগুনের মালা পরা শুশুনিয়া পাহাড়টাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মেলার আগে গ্রামের লোকেরা পাহাড়ে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় আগুন লাগায়। যাতে পাহাড়ি পশুগুলো পাহাড়ের পিছনে পালিয়ে যায়। একটা সময় শুশুনিয়া পাহাড়ে প্রচুর হায়না আর বন শুয়োর ছিল। এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। আগে পাহাড়ে আগুন লাগানোর পর হায়নাগুলো পাশাপাশি গ্রামে ঢুকে পড়ত। প্রায় দিনই ছাগল ভেড়া গায়েব হত তখন। এখন ওসব রূপকথার গল্প। এখন পাহাড়টা বাঁদর-হনুমানের দখলে। কিছু সংখ্যক হায়না থাকলেও থাকতে পারে, তবে ওরা আর লোকালয়ে আসে না।

পাহাড়টা থেকে মুখ ফিরিয়ে ঘুমন্ত পাড়াটার দিকে চাইতেই মৈনাকের চোখ পড়ে বাপের রিক্সাটার উপর। তালগাছটার নীচে রিক্সাটা রেখেই মদ গিলতে গেছে মনে হয়। ‘বাপ না হয়ে যদি...’ গালিটা দিতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয় মৈনাক। বাপকে গালি দেওয়ার উপায় নেই মৈনাকের। এই ‘বাপ’ নামের লোকটাই তো ওকে ভাত দেয়। লোকটা নেশায় চুর হয়ে থাকলেও কোনওদিন মৈনাকের গায়ে হাত দেয়নি। নিঃশব্দে মৈনাকের চাহিদা মিটিয়ে গেছে। যেদিন মৈনাকের জন্য মোবাইলটা এনেছিল সেদিনও কোনও কথা বলেনি লোকটা। মৈনাক যখন বাড়ি ছিল না, তখন চুপচাপ মৈনাকের বিছানায় নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল মোবাইলটা। এই চিরদিন দেখে আসা অচেনা লোকটাকে নিয়ে ভাবতে বসলে কোনও কূল পায় না মৈনাক। লোকটা যেন হাসি-কান্না সুখ-দুঃখের অন্যপারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা জ্যান্ত ফসিল। 

সদরদরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় মৈনাক। আবার কপাটটা খুলে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে রিক্সাটার কাছে। ‘যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে...’ রিক্সার সামনের চাকাটার কাছে, তাল গাছটার আড়ালে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে লোকটা। বহুদিন আগে মৈনাককে কে যেন বলেছিল, ‘তোর বাপের বাঁশিতে নদী কাঁদত।’ এর আগে কোনওদিন লোকটাকে বাঁশি বাজাতে শোনেনি মৈনাক...


[তিন]

‘আমি সত্যিই ভাবিনি তুই আসবি।’ পলির চোখে চোখ রেখেই কথাটা বলে মৈনাক। 

‘আসব না কেন ? এখন তো আর পড়ার চাপ নেই। রেজাল্ট বেরিয়ে কলেজে ঢুকতে ঢের দেরি আছে। চল ওই বট গাছটার নীচে গিয়ে বসি।’

‘একটা বিশেষ দরকারে তোকে আজকে আসতে বললাম। আসলে...’

‘আসল নকল পরে শুনব; তার আগে একটা কথা বলত এই যে লোকগুলো পাথর কেটে-কেটে মূর্তি বানাচ্ছে, মেলা পেরিয়ে গেলে এরা এইসব মূর্তি বিক্রি করে কোথায় ?’

‘আরে পাগলী এই পাথরশিল্প শুশুনিয়ায় আজকের নয়। সেই চন্দ্রবর্মণের সময় থেকে চলে আসছে। এইসব মূর্তিগুলো দেশের বাইরেও যায়। শুশুনিয়াতে একাধিক পাথরশিল্পী রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার পেয়েছেন। তার ভেতর নয়ন দত্ত তিন-তিনবার। দাঁড়া একবার তোকে নিয়ে যাব উনার বাড়ি। মাইরি বলছি উনার হাতের কাজ দেখলে হতবাক হয়ে যাবি।’

‘সে না হয় পরে একদিন নিয়ে যাস। তার আগে আমাকে একবার শিলালিপিটা দেখিয়ে নিয়ে আসিস, ওটা বাংলার দ্বিতীয় প্রাচীন তাই না ?’

‘হ্যাঁ। ওই লিপিটা থেকেই তো জানা গেছে আর্যরা ভারতের পশ্চিম দিক থেকে এসেছিল।’

‘সত্যিই অদ্ভুত না ? কত বছর আগেকার ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আচ্ছা তুই যেটা বলবি বলে আমাকে ডাকলি সেটাই তো শোনা হল না...’

‘দেখ তো কথায় কথায় ভুলেই গিয়েছিলাম।’ শুশুনিয়ার প্রসঙ্গ পাল্টে যেতেই মৈনাকের চোখে মুখে মেঘ জমা হয়। ব্যাপারটা হয়তো মৈনাক নিজেও বুঝতে পারে, তাই নিজের থমথমে মুখের উপর স্বাভাবিকতার প্রলেপ টানার চেষ্টা করে বলে, ‘কালকে রাতে একটা অদ্ভুত জিনিশ দেখেছি জানিস।’ মৈনাকের গলাটাও ভারী হয়ে আসে এবার।

‘অদ্ভুত জিনিশ মানে ? কেমন জিনিশ সেটা ?’ প্রশ্ন করতে করেতেই পলি মৈনাকের কাছাকাছি সরে এসে বসে।

‘কালকে রাতে লিখতে বসেছিলাম কিন্তু কিছুতেই কিছু লিখতে পারছিলাম না, দরজা খুলে ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম...’

‘এই প্লিজ প্লিজ... আমার ভাই এমনিতেই ভয়টা একটু বেশিই। তোর এসব কেত্তন শুনলে একা টয়লেট যেতেও পারব না তখন।’

‘আমি কোনও ভূতের গল্প বলছি না। ভূতের গল্প হলে তোকে শোনানোর জন্য এখানে ডাকতাম না।’

‘আচ্ছা সরি, রাগ করছিস কেন ? তুই তো জানিস আমি একটু ভীতু।’

‘কালকে রাতে লোকটা বাঁশি বাজাচ্ছিল জানিস...’

‘কোন লোকটা ?’

‘আমি যে লোকটার...’

‘দেখ মনি, উনি তোর বাবা। তাই অন্তত আমার সামনে যখন উনার গল্প বলবি তখন উনাকে ‘লোক’ বলে সম্বোধন করিস না। আমার শুনতে ভাল লাগে না। তা উনি রাতে হঠাৎ বাঁশি বাজাচ্ছিলেন কেন ?’

একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৈনাক বলে, ‘আমি ছোটবেলায় কার কাছে যেন উনার বাঁশি বাজানোর গল্প শুনেছিলাম। কিন্তু তুই নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস করতে পারবি না! আমার মনে হচ্ছিল, বাঁশিটা যেন কাঁদছে। কোনও সাধারণ বাঁশি-ফোঁকা লোকের পক্ষে এমন সুরে বাঁশি বাজানো... অসম্ভব, কিছুতেই সম্ভব না।’

‘কোনও লোকগীতি ?’

‘মোটেই না। ‘যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে’ এই গানটা। আমি লিখে দিতে পারি, আঁতিপাঁতি কোনও বাঁশিওলা বাঁশের বাঁশিতে এই সুর তুলতে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলবে।’

‘আচ্ছা উনার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে তো দেখতে পারিস।’ মৈনাকের হাতটা শক্ত করে ধরে পলি।

‘তুই যাবি আমার সঙ্গে ?’ পলির চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে মৈনাক।

‘কোথায় ?’

‘যেখানে ওই লোকটার, আই মিন আমাদের আসল গ্রাম।’

‘তোদের আসল গ্রাম ? কই আগে বলিসনি তো ? আমি তো জানতাম...’

‘আমার গ্রাম নয়। আমি ওখানে জন্মাইনি। ওখানে আমার ঠাকুরদার বাড়ি ছিল। যাবি আমার সঙ্গে ?’

‘যা...ব কিন্তু জায়গাটা কোথায় ?’

‘বলব আজকে রাতে ফোনে সব বলব।’


[চার]

এই গ্রামটার নাম আলোছায়াপুর। গ্রামটায় ঢুকতে না ঢুকতেই ডান দিকে মস্ত একটা পুকুর। মনে হয় ভাল মাছ চাষ হয়, তাই সারা পুকুর জুড়েই বাঁশ দেওয়া আছে। দেখলেই বোঝা যায় একটা সময় শাল-সেগুন দিয়ে মোড়া ছিল গ্রামটা। তারই কিছু বংশধর এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারদিকে। প্রাচীন শাল-সেগুন বলতে এই শিব মন্দিরের কাছের গাছগুলোই। স্কুটি থেকে নেমে, লাল মাটির রাস্তার দুপাসারি ঘরগুলোর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে পলি বলে, ‘দেখ এই মন্দিরটা থেকে পুরো গ্রামটাকে আঁকা ছবির মতো মনে হচ্ছে। ঠিক যেন তুলি দিয়ে কেউ সবুজ দ্বীপের বুকে লাল রাস্তা এঁকে দিয়েছে। এত সবুজ আমি এর আগে দেখিনি...’

‘আমিও। প্রাচীন আশ্রমগুলো এমনই শান্ত আর সবুজ ছিল মনে হয়। তাকিয়ে দেখ, দূর-দূরান্ত কোথাও কোনও ইঁটের বাড়ি আকাশে গুঁতো মারার জন্য উঠে আসেনি। যতদূর দেখতে পাচ্ছি মাটির দেওয়ালে খড়ের মাথা নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে বাড়িগুলো।’

‘আচ্ছা তুইও তো এখানে প্রথমবার, তাহলে কার কাছ থেকে কী ভাবে খবর পাবি ? তুইও কাউকেই চিনিস না তোকেও কেউ চেনে না।’

‘একজনের নাম আমি জানি, মলয়। ঘুমের ভেতর বাবা মাঝে মাঝেই স্বপ্নে এই নাম ধরে ডাকত...’

‘এই গ্রামটায় জাদু আছে। আমি প্রথমবার তোর মুখে বাবা শব্দটা শুনলাম।’ 

মৈনাক কী বলবে খুঁজে পায় না। কীসের যেন আনন্দে ওর চোখ দুটো মিটমিট করে হাসছে। বাবা বলে ডাকতে না পারার বোবা একটা যন্ত্রণা ওর বুকেও যে ছিল সেটা মৈনাক নিজেও বুঝতে পারে। 



হালকা চালে স্কুটিটা এসে দাঁড়ায় গ্রামের মনসা মন্দিরের কাছে। স্কুটি থেকে নামতে গিয়ে দুজনেই খেয়াল করে, কল-তলায় দাঁড়িয়ে কয়েকটা বাচ্চা আর কয়েকটা বউ ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে হাঁ করে। এমন উন্নত প্রজাতির আগন্তুক গ্রামে খুব একটা আসে বলে মনে হয় না। মনসা মেলার প্রাঙ্গণে বসে যে কয়েকজন তাস পিটছিল ওরাও এর ওর মুখ চাইছে। সবার চোখে মুখের ভাব, এরা আবার কার বাড়িতে এলো ?। বিশেষ করে পলির পোশাকটাই সবার দৃষ্টি টেনে রেখেছে। থ্রি-কোয়াটার জিন্স পরা হাতকাটা হাইহিল মেয়ে যে টিভির বাইরেও থাকতে পারে সেটাই মনে হয় বিশ্বাস হচ্ছে না ওদের।

মৈনাক মন্দিরের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা মলয় বাবুর বাড়ি কোনটা বলতে পারবেন ?’

কয়েক সেকেন্ড সবাই চুপচাপ। কলতলায় দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাগুলো এখন স্কুটির সামনে দাঁড়িয়ে। ‘মলয় মানে ওই যে ছবি আঁকে ? মলয় লায়েক তো ?’ তাস হাতে বসে থাকা বয়স্ক লোকটি মৈনাককে জিজ্ঞেস করেন।

মৈনাক কিছু না ভেবেই বলে, ‘হ্যাঁ উনার বাড়িটাই খুঁজছি ?’

ভদ্রলোক মৈনাককে আরেকবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলেন, ‘ছবি কিনবেন ?’

‘হ্যাঁ’ ছোট করেই উত্তর দেয় মৈনাক।

‘এই রাস্তা দিয়েই সোজা চলে যান, গ্রাম থেকে আরও প্রায় পোয়া মাইল দূরে গিয়ে দেখবেন একটা কাঁচা রাস্তা ডানদিকে নেমে গেছে। ওই রাস্তা দিয়ে কয়েক মিনিট গেলেই নদীর পাড়ে ওর বাড়ি।’

‘নদী ?’ মৈনাকের অজান্তেই মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে শব্দটা।

‘কংসাবতী নদী।’

‘আচ্ছা, ধন্যবাদ।’



এদিকটা যেন আরও বেশি সবুজ। রাস্তার দুপাশে বোরোধানের চাষ। পাটের ক্ষেত। আমের বাগান। চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ। ঠাণ্ডা হাওয়ায় পলির চুলগুলো ফুরফুর করে মৈনাকের চোখে মুখে উড়ে এসে পড়ছে। পলির কোমরটা আলতো করে জড়িয়ে ধরে মৈনাক। পলি কিছু বলে না। এমন পরিবেশে মনে মনে কথা হয়, মুখ নীরবতা পালন করে।

রাস্তার একটা শাখা যেখানে ডান দিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে এসে স্কুটিটাকে দাঁড় করায় পলি। দুজনেই নেমে এসে একটা ধানজমির পাশে দাঁড়ায়। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। অনেক অনেক দূরে গিয়ে সমস্ত সবুজ নীল দিগন্তে মিশেছে। ঢেউ খেলছে ধান গাছগুলোর মাথায়। মৈনাককে আলতো করে জড়িয়ে ওর বুকে মাথা রাখে পলি। এই প্রথমবার মৈনাকের ঠোঁটে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে ওর। এমন প্রকৃতির বুকে দাঁড়িয়ে মনে মনে ছোঁয়া লেগেই শরীরে দাবানল জ্বলে...


[পাঁচ]

ভদ্রলোকের পুরো বাড়িটা মাটির। বাড়ির বাইরে কাঁচা বাঁশের বেড়া দেওয়া। বাড়ির দেওয়ালে প্রাচীন ভাস্কর্যের ঢঙে নানান ছবি আঁকা। পথেঘাটে রোজ দেখতে পাওয়া ফুল গাছগুলোকেই যত্ন করে বাড়ির উঠোনের চারপাশ জুড়ে লাগিয়েছেন উনি। সঙ্গে কয়েকটা বেগুন লাউ আর লঙ্কার গাছ। বেশ কয়েকবার, ‘ভেতরে আসতে পারি ?’ জিজ্ঞেস করেও কোনও উত্তর না পেয়ে টিনের দরজা ঠেলে বিনা অনুমতিতেই ভেতরে ঢুকেছে মৈনাক আর পলি। কিন্তু ভেতরে কেউ নেই। মাটির বারান্দায় রঙ তুলি আর অসম্পূর্ণ একটা ছবি বোধ হয় ভদ্রলোকের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে।

‘আসাটা বেকার গেল নাকি ?’ জিজ্ঞেস করে পলি।

‘না না, ছবিটা দেখ এখনো অসম্পূর্ণ আছে। উনি আশেপাশেই থাকবেন মনে হয়।’

‘আচ্ছা ইনি যদি সেই লোকটা না হয়, যাকে তুই খুঁজছিস...’

‘ইনি ছাড়া অন্যকেউ হবে না। এমন লোকেই অমন লোকের বন্ধু হতে পারে।’

‘আমিও ঠিক সেটায় ভেবেছি। চল না বাড়ির পিছন দিকটা ঘুরে দেখে আসি, যদি ওদিকে গিয়েছেন...’

বাড়ির পিছনের দরজাটা খুলে বেরিয়ে আসে দুজনেই। এদিকেও সবুজের মেলা। তবে এদিকে বোরোধানের চাষ হয়নি। এদিকটায় শুধুই সবুজ মাঠ আর বাঁশের জঙ্গল। বাঁশ জঙ্গলগুলোর পাশ দিয়েই পায়ে হাঁটা একটা রাস্তা চলে গেছে সামনের দিকে। কিছুদূর এগিয়ে আসার পরেই ওদের চোখে পড়ে নদীটা। কংসাবতী নদী। নদীর দুটো পারে বাঁশ আর কলার গাছ প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে। ওরা আরও সামনের দিকে পা বাড়াতে গেলে পিছন থেকে একটা ভারী গলার আওয়াজ ভেসে আসে, ‘আর সামনের দিকে যেও না। এই সময় ওদিকটায় সাপের খুব উপদ্রব হয়।’

‘সাপ’ শব্দটা শুনেই মৈনাকের হাতটা খপ করে চেপে ধরে তুলি। তারপর দুজনে এক সঙ্গেই পিছন ঘুরে দেখে, কাঁচাপাকা লম্বাচুল-দাড়িওলা একজন মানুষ ওদের থেকে কয়েক মিটার দূরে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। উনিই যে মলয় বাবু সে বিষয়ে এরা দুজনে নিশ্চিত। ভদ্রলোক বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাকে। কোথাও বেরিয়েছিলেন মনে হয়।

‘আপনিই কি...’

ভদ্রলোক মৈনাককে থামিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ আমিই মলয় লায়েক।’

‘আমি...’

‘তুমি মিলনের ছেলে তাই তো ?’

‘হ্যাঁ কিন্তু... আপনি...’

‘তোমার বয়সে তোমার বাবাও ঠিক এমন দেখতে ছিল। মেয়েটি নিশ্চয়...’

‘আমার বন্ধু।’

‘বন্ধু না, বান্ধবী।’ ভদ্রলোক নিজেই নিজের কথায় হাসেন। ‘চলো ভেতরে চলো। আমি কয়েকটা রঙ কেনার জন্য বেরিয়েছিলাম। ফিরে তোমাদের গাড়িটা চোখে পড়ল। তা আমার বাড়ির সন্ধান পেলে কেমন করে ?’

‘ওই গ্রামের একজনকে জিজ্ঞেস করার উনি...’

‘ও তোমরা তাহলে গ্রামের ভেতরের রাস্তা দিয়ে এসেছ। যাই হোক, তা মিলন এখন কেমন আছে ?’

‘বাবা ভালই আছে...’

‘লাস্ট যখন তোমার বাড়ি গিয়েছলাম তখন তুমি অনেক ছোট, এই এতোটা হবে...’ ভদ্রলোক ডান হাতের সাহায্যে মৈনাকের উচ্চতা দেখান।



ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকে দুজনকে বসার জন্য একটা খাটিয়া পেতে দেন। নিজে কাঠের চেয়ারে বসেন। ‘আমার বাড়িতে তোমাদের আপ্যায়নের জন্য কিন্তু কিছুই নেই। তবে চাইলে চা খাওয়াতে পারি। দুপুরে ডাল আলুসেদ্ধ ভাত।’

‘না না আমরা কিছুই খাব না, সন্ধার আগেই ওকে বাড়ি পৌঁছাতে হবে। তবে এখন একটু জল পেলে ভাল হত।’

‘একমিনিট। আমি আনছি।’

ভদ্রলোক মাটির কলশি থেকে দুগ্লাস ঠাণ্ডা জল নিয়ে এসে দুজনের হাতে দিয়ে আবার চেয়ারে বসেন। ‘তুমি তোমার বাবার ব্যাপারে জানতে এসেছ তাই তো ?’

মৈনাক জলের গ্লাসটা নামিয়ে ভদ্রলোকের দিকে দুচোখ আশা নিয়ে তাকিয়ে বলে, ‘আসলে উনার বিষয়ে উনি নিজে কিছুই বলেন না। ছোটবেলায় কার কাছে যেন শুনেছিলাম উনার বাঁশিতে...’

‘হ্যাঁ নদী কাঁদত।’

‘আপনিই কি তাহলে...’

‘হ্যাঁ আমিই তোমাকে বলেছিলাম। কথাটা মনে আছে দেখে বেশ ভাল লাগল। তা এখনও কি মিলন বাঁশি বাজায় ?’

‘না এখন বাজায় না। কিন্তু সেদিন রাত্রে হটাৎ...’

‘অনেক বছর আগের কথা...’ ভদ্রলোক সামান্য বিরতি নিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে নেন। ‘তখন গ্রামে গ্রামে যাত্রা নাটক হত। কলকাতা থেকে বড় বড় শিল্পীরা আসতেন পালা গাইতে। সে বছর যোগেন ব্যানার্জী এসেছিলেন। পরপর দুদিন পালাছিল। দ্বিতীয় পালার দিন বিকেলে উনি ঘুরতে ঘুরতে গিয়েছিলেন নদীর দিকে। গিয়েই হতবাক, চারদিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে আসছে নদীর একটা ঘাটে। নদীটাও যেন দাঁড়িয়ে পড়েছে। সেদিন যোগেন বাবু অবিশ্বাস্য এক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন। নদীর বালির উপর শুয়ে একটা ছেলে আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছে। ওকে ঘিরে উড়ছে ঝাঁক ঝাঁক পাখির দল। যোগেন বাবু ছুটে এসে যাত্রা দলের সবাইকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ঘটনাটা দেখিয়ে ছিলেন। তারপর যা হয়, নদীর বালিতে শুয়ে শুয়ে বাঁশি বাজানো ছেলেটার নক্ষত্র হতে বেশি সময় লাগেনি। যোগেন বাবুর প্রতিটা যাত্রাপালার শুরুতে আর শেষে তোমার বাবাকে বাঁশি বাজিয়ে শোনাতে হত। একবার মালদায় খুব ঝামেলা হয়েছিল দর্শকদের টিকিট না পাওয়া নিয়ে। স্টেজে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার উপক্রম। সবাই ভয়ে জড়সড়। হাজার হাজার দর্শককে সেদিন তোমার বাবার বাঁশির সুর শান্ত করে দিয়েছিল। সেই সময়ের বেশ কয়েকটা সিনেমার গানেও তোমার বাবার বাঁশির সুর ছিল...’ ভদ্রলোক ঘুমিয়ে পড়া বিড়িটাকে আগুন দেখিয়ে আবার জাগিয়ে নেন।

‘তারপর কী হল?’ ধৈর্য রাখতে না পারে না পলি।

‘তারপরের ঘটনা তোমরা বিশ্বাস করবে কি না জানি না...’

‘বিশ্বাস অবিশ্বাস আমাদের উপর ছেড়ে দিন, আপনি বলুন। আমার জানা দরকার...’ উত্তেজনায় মৈনাকের গলাটা ভারী হয়ে এসেছে।

‘এর পরের গল্প বলার আগে তোমাদেরকে একটা ছবি দেখাই দাঁড়াও...’


[ছয়]

কয়েক মিনিট পর ফিরে এসে ভদ্রলোক মৈনাকের হাতে একটা আঁকা ছবি দিয়ে বলেন, ‘এখানে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে চিনতে পারছ?’

মৈনাক ছবিটা হাতে নিয়েই অবাক হয়ে যায়। ছবির তিনজনই ওর চেনা। পলিও চিনতে পারে তিনজনকেই।

‘যদিও হাতে আঁকা ছবি, তবুও খুব একটা সমস্যা হবে না। বলতে পারবে কোনটা কার ছবি ?’ একটু রহস্যময় ভাবেই জিজ্ঞেস করেন ভদ্রলোক।

‘এটা আপনি, এটা বাবা কিন্তু এখানে আমার ছবি এলো কেমন করে ? এটা তো অনেক পুরানো ছবি...’ মৈনাক কয়েক হাজার প্রশ্ন নিয়ে ভদ্রলোকের চোখে চোখ রাখে।

‘আমিও তো সেটাই ভাবছি। এটা কেমন করে সম্ভব ?’ মৈনাকের হাত থেকে নিজের হাতে ছবিটা নেয় পলি।

‘একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলেই বুঝতে পারতে... যাই হোক আমার মনে হয় এখন তোমার সব জানা উচিৎ। ওটা তোমার ছবি নয়। ওটা যার ছবি তার নাম, অনিল। অনিল গরাই। আমাদের গ্রামেরই ছেলে, আমাদের বন্ধু। সাহিত্যের ছেলেছিল অনিল। ও সাহিত্য চাষ করত বলেই সুন্দরি প্রজাপতিরা আসত ওর কাছে রসালাপ করতে। সত্যি... অনিল কথাও বলত চমৎকার। একদিন প্রেমে পড়ল অনিল। মুসলিম মেয়ের প্রেমে। ফতেমা খাতুন। অনিলের চেয়ে একক্লাস জুনিয়র। প্রেম পাপড়ি মেলার আগেই কেমন করে যেন...’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ভদ্রলোক। ‘যখন অনিল খুন হয়েছিল তখন বর্ষাকাল। অনিলের মুখটা থেঁতলে দিয়েছিল...’

‘খুন ? কে খুন করেছিল ?’ জিজ্ঞেস করে পলি। মৈনাকের মুখে টুঁশব্দও নেই আর। ওর সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

‘কে তা আজও কেউ জানে না। জানার চেষ্টাও করেনি কেউ। বর্ষার সময়ছিল বলেই মিলন তখন বাড়িতে। ফতেমাকেও মারার চেষ্টা করেছিল ওই খুনিটা। পারেনি। মিলন বাঁচিয়ে দিয়েছিল। রাতারাতি ফতেমাকে কলকাতায় নিজের কোয়াটারে রেখে এসেছিল মিলন। কেন জান ?’

পলি বা মৈনাক কারুর মুখেই কোনও সাড়াশব্দ নেই। কেন মিলন ফতেমাকে বাঁচিয়েছিও সেটা জানাও ওদের পক্ষে সম্ভব নয়। 

‘ফতেমা নিজের গর্ভে অনিলের সন্তান ধরে রেখেছিল বলেই। কয়েকমাসের ভেতরেই শয়তানটা কীভাবে যেন মিলনের সন্ধান পেয়ে গেল। মিলন চাইলে টাকার জোরে ফতেমাকে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দিতেই পারত। সেটা ও পারেনি। প্রত্যেক শিল্পীর ভেতর একজন প্রেমিক বাস করে। নিজের অজান্তেই বন্ধুর সন্তান গর্ভে ধরে রাখা ফতেমাকেই ভালবেসে ফেলল মিলন। হয়তো প্রাকৃতিক নিয়মে একসঙ্গে থাকতে থাকতে এটা হয়েই যায়। পরপর বেশ কয়েকবার মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার পর কলকাতা ছেড়ে দিল মিলন। ছেড়ে দিল বাঁশিটাও। ফতেমাও একটা জীবন বাঁচার লোভেই হয়তো হিন্দু বধূর সাজ নিয়েছিল। কিন্তু বাঁচতে পারেনি ফতেমা। এক নক্ষত্র পতনের কারণ হয়ে বাঁচতে পারেনি মেয়েটা। ফতেমা আত্মহত্যা করে মিলনকে আবার আকাশের রাস্তা করে দিতে চেয়েছিল। চেয়েছিল মিলন আবার নিজের জগতে ফিরে যাক। আবার সুর তুলুক বাঁশিতে। কিন্তু ফতেমা আত্মহত্যা করেও মিলনকে আর নক্ষত্র বানাতে পারেনি। ইচ্ছে করেই আকাশ ছেড়েছিল মিলন। মিলন চাইলে আবার কলকাতায় ফিরে যেতে পারত। কেন যায়নি আমিও ঠিক জানি না। তবে আমার মনে হয় কিছু মানুষ নামযশে বাঁচার চাইতেও স্মৃতিতে বাঁচতে বেশি ভালবাসে।’

‘আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করব...’ কয়েক ঝাঁক কান্না মৈনাকের গলায় দোল খাচ্ছে এখন। সময় পেলেই দুচোখ বেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

‘আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি, কিন্তু... আমি জানি তুমি কী জিজ্ঞেস করবে। তুমি জিজ্ঞেস করবে কেন আমি তোমাদেরকে এই গল্প শোনালাম ?’

‘হ্যাঁ, কেন শোনালেন আপনি ?’ এতক্ষণে মৈনাকের চোখের কোনায় জল জমা হয়েছে।

‘আসলে আমিও স্মৃতিতে বাঁচতে ভালবাসি। এবার তোমাদেরকে যে গল্পটা বলব সেটা আরও ভয়ংকর। যেটা শুনলে তোমাদের মতো কচিকাঁচারাও হার্টফেল করতে পারে...’

‘আর নতুন করে শোনার কিছুই নেই, যা শুনলাম সেটা...’

‘সেটা কিছুই নয়। এবার যেটা শুনবে সেটা গিয়ে মিলনকে শুনিও, বেচারা শান্তি পাবে।’ এবার বেশ রহস্যময় হাসি হাসেন ভদ্রলোক। হাসির পর একটা বিড়ি ধরিয়ে আবার শুরু করেন, ‘অনিলকে আমিই মেরেছিলাম, পাথর দিয়ে ওর মুখটাকে...’

‘হোয়াট ?’ মৈনাক চিৎকার করে উঠে। মৈনাকের হাতটা চেপে ধরে পলি।

‘পাগলের মতো ভালবাসতাম আমি ফতেমাকে। কিন্তু অনিল কাব্য দিয়ে কেড়ে নিয়েছিল ওকে। শালার সব কাব্য তাই ঘুচিয়ে দিয়েছি। ভেবেছিলাম অনিল মরলে আর কোনও বাধা থাকবে না। শালা তুই ফতেমার পেটের ভেতর থেকে বাধা দিলি। তোকে শেষ করেই ছাড়তাম, কিন্তু শালা মিলন... ওই শালা বারবার বেঁচেছে আমার হাত থেকে...’

‘পলি পালিয়ে চল এখান থেকে, কোথাকার কোন পাগলের পাল্লায় পড়েছে...’

‘তোর বাপ শালা পাগল...’ মৈনাক আর পলিকে দুহাত দিয়ে আগলে ধরার চেষ্টা করে লোকটা। পারে না। মৈনাক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। এক সেকেন্ড সমন নষ্ট না করেই পলি স্কুটিটা স্টার্ট করে।

‘তোর পালক বাপকে গিয়ে বলিস, তোর মা ওর জন্য গলায় দড়ি দেয়নি। গলায় দড়ি দিয়েছিল আমার জন্য। ফাঁকা ঘরে আমিই তোর মাকে জোর করে...’ অদ্ভুত ভাবে খিলখিল করে হাসে লোকটা। তারপর আবার বলে, ‘একটা মেয়ে যদি বিয়ের আগে পেট করিয়ে অন্য মরদের সঙ্গে সংসার করতে করতে আবার রেপ হয় তাহলে কী আর বাঁচে ?’ পাগলের মতো আবার হাসে লোকটা।

আর সহ্য হয় না মৈনাকের। ছুটে গিয়ে লোকটার টুঁটি চেপে ধরে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠে লোকটা। প্রাণপণ চেষ্টায় মৈনাকের হাত দুটোকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। 

‘মনি ছাড় ওকে, মরে যাবে লোকটা...’

‘মরুক, ওকে মেরেই ফেলব...’ মেরেই ফেলব বলতে গিয়ে কিছু একটা মনে পড়ে মৈনাকের। এক ঝটকায় ছেড়ে দেয় লোকটার গলাটা, তারপর প্রাণপণ শক্তিতে কামড় বসায় ওর ডান হাতের চারটা আঙুলে। মড়মড় করে শব্দ হতেই ছেড়ে দেয় মৈনাক। বাঁহাত দিয়ে ডান হাতটাকে চেপে যন্ত্রনায় কুঁকড়ে বসে পড়ে লোকটা। মৈনাক কয়েক পা পিছিয়ে এসে বলে, ‘দুটো দুটো খুন করে তুই যখন নিজেই স্বীকার করছিস তখন আইন তোর মতো পাগলকে কী আর শাস্তি দেবে! এমনকি বাবার বাঁশির আকাশটা তোর জন্যেই তো গেছে। আমি তোকে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর শাস্তি দিলাম। তোর ছবির আকাশটা আমি কেড়ে নিলাম। আর চাইলেও ছবি আঁকতে তুই পারবি না। এরপর চরম একাকীত্বে তিলতিল করে মরতে মরতে তুই বুঝবি, স্মৃতিতে বাঁচতে কেমন লাগে। তুই ছবি আঁকার জন্য ছটফট করবি কিন্তু তোর আঙুল আর সাড়া দেবে না।’ 

দুচোখ জল নিয়েও কীসের যেন আনন্দে হাসতে থাকে মৈনাক। ওর হাসির শব্দটা ঢেউ হয়ে সবুজের উপর ছড়িয়ে যায়। পশ্চিমের আকাশে লাল হয়ে এসেছে সূর্যটা। মৈনাক স্কুটিতে চাপতে গিয়ে একবার সূর্যটার দিকে তাকায়। মায়ের মুখটা মনে করে কিছু যেন বিড়বিড় করে বলে। দমকা হাওয়ায় সেই বিড়বিড় শব্দগুলো আর শোনা যায় না।
[সমাপ্ত]







Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments