প্রেমের গল্প, শেষ বিকেলের বসন্ত

প্রেমের গল্প, শেষ বিকেলের বসন্ত

Advertisemen


শেষ বিকেলের বসন্ত

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়



‘আজ পনেরো দিন হল তুমি একবারও বিট্টুকে ফোন করলে না। আজকে তো রবিবার। আজকে বাড়িতেই থাকবে। আজকে তো একবার করতে পারো...’

‘আচ্ছা অনিতা ফোনটা আমাকেই কেন করতে হবে শুনি ? ও পারে না বাপের একটা খবর নিতে ?’ চিৎকার করে উঠলেন বিকাশ। সেই চিৎকারে রাগের চাইতে অভিমান বেশি।

‘ও হয়তো কাজের চাপে ভুলে...’

‘রাখতো তোমার কাজের চাপ। সংসারে আর কেউ কাজ করে না ? আমি মরলেও ও হয়তো মুখাগ্নি করতে আসবে না। মিলিয়ে নিও কথাটা। খুব ছেলের ইচ্ছে ছিল না তোমার ? আজকে দেখো খোঁজ-খবর আসা-যাওয়া সব মেয়েটাই করছে। আর ছেলে...’ গলাটা ভার হয়ে আসে বিকাশের। দুচোখের পাতায় স্মৃতির স্তূপ। ছেলে এখন কলকাতায়। কী যেন একটা কোম্পানির মোটা মাইনের চাকরি করে। নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছে। তিন বছরের একটি ছেলেও আছে ওর। দেখতে যেমন ঠিক তেমনই মিষ্টি-মিষ্টি কথা বলে। দাদান বলে ডাকে বিকাশকে। নাতির মুখে ‘দাদান’ শব্দটা শুনলে বুকটা কেমন যেন ভরে আসে বিকাশের। মেয়ের বিয়ে হয়েছে পলাশডাঙ্গা, পুরুলিয়ার এক গ্রামে। মাঝে মাঝেই এক-দুদিনের জন্য আসে। বাবার খোঁজ-খবর নিয়ে যায়।



এখন আর একাকীত্ব এক ফোঁটাও ভাল লাগে না বিকাশের। সকাল আর সন্ধা যখন কাজের মেয়েটা রান্না করতে আসে ? ওই সময়টুকুই যা টুকটাক কথা বলার সুযোগ হয়। বাকি সময়টা গল্পের বই আর অনিতার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কাটে। অনিতা চলে যাওয়ার পর ওর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে হাজার রকমের অভিযোগ করেন বিকাশ। 

জীবন যখন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে তখনই হয়তো মানুষ নিজেই নিজের উত্তরদাতা হয়, তখন প্রশ্ন শোনার বা উত্তর দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। আর পাঁচটা মানুষের মতোই বিকাশ বিশ্বাস করেন, কোনও কিছুই চিরদিন থাকে না। হয়তো তাই সকলকেই সব মানিয়ে নিতে হয়। এই যে জানালার ওপারের রাস্তাটা? এতদিন এক বুক লালধূলো নিয়ে দাঁড়িয়েছিল । আজ পিচের চাদরে ঢাকা পড়েছে। তাই বলে কি মানুষ হাঁটে না ? না গাড়ি ছোটে না ? রাস্তা ধারের সেই আম গাছটা, গ্রামের প্রায় সবার টুকরো-টুকরো শৈশব ছড়িয়েছিল যে গাছটার তলায়। একদিন পরিমলের ছেলে লোক ডাকিয়ে কটা টাকার জন্য কেটে ফেলল। কই কেউ তো প্রতিবাদ করল না। সবাই মেনে নিলো। এই তো গেল-বছর বিষ খেয়ে মরল পোদ্দারদের ছেলেটা। আজ আর কে ওর গল্প করে ? সবাই মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বিকাশ কোনও কিছুই সহজে মানিয়ে নিতে পারে না। হয়তো তাই আজও ছেলের গ্রামে ফেরার অপেক্ষা করে। মেয়ের কিনে দেওয়া মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে ছেলের ফোনের অপেক্ষা করে। সূর্য ডোবে। সন্ধা হয়। রাত হয়। কালো কুচকুচে ভয়াল রাত। আরও আরও একাকীত্বের নির্ঘুম রাত মাথার উপর অবিরাম বোঁ-বোঁ করতেই থাকে..., ছেলে বা ছেলের ফোন কোনওটাই আর আসে না।



[এক]


আজ পশ্চিম আকাশটা লাল-কালো মাখামাখি হয়ে আছে। ঝড় উঠবে মনে হয়। অনেক দূরের মাঠে ঘরমুখো গরুর পাল। কালচে মেঘে একে-একে ভেসে উঠছে বকের সারি। এবার বিকাশকে ঘরে ফিরতে হবে। আজকে অনেকদিন পর এই পুকুর পাড়টায় এসে বসেছিল বিকাশ। পুকুর পাড়টার চারদিকেই আলুর ক্ষেত। প্রচুর আলু হয়েছে এবছর। আলু ক্ষেতগুলোর সরু আল-রাস্তা দিয়েই ঘরে ফিরেতে থাকে বিকাশ। ঘরে ফিরে জানালার কাছে এসে বসে। মনিকা আজ আর আসবে বলে মনে হয় না। মনিকা না এলে রাত্রে চিঁড়া কিংবা মুড়িই খেতে হবে বিকাশকে।

নিজেই নিজের জন্য চা বানিয়ে চায়ের কাপ হাতে আবার জানালার কাছেই এসে বসে বিকাশ। ফোঁটা ফোঁটা করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে এতক্ষণে। নিঃশব্দে ঝলকাচ্ছে আকাশটা। এ-গাছ ও-গাছের সঙ্গে আলিঙ্গন করছে মাঝে মাঝে। বিয়ের প্রথম প্রথম এমন না বলে আসা বাদলা বেলায় আদর পেতো বিকাশের। জানালার ধারে চেয়ারটা টেনে অনিতাকে কোলে বসিয়ে নিতো বিকাশ। হাওয়ায় হাত বাড়িয়ে অনিতার বাঁধন ছাড়া চুলগুলো বিকাশের মুখে আছড়ে পড়ত মাঝে মাঝেই। শিহরণ জাগত বিকাশের শরীরে। নিজের হাত দুটোকে সীমানায় আঁটকে রাখতে পারত না ও কিছুতেই। হাত দুটো অনিতার শরীরে খেলত ইচ্ছে মতো। তারপর...



কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়ল মনে হয়। ভয়ংকর শব্দে চমকে উঠেছিলে বিকাশ। বিদ্যুতের ঝিলিকে মুহূর্তের জন্য বিকাশের ঘরটাও আলোকিত হয়ে উঠেছিল। খানিক আগেই লাইন গেছে। আর আসবে বলেও মনে হয় না। বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়াটা বাড়ছে বারেক্কে। হালকা চালে চায়ের কাপটা শেষ করে বিকাশ। তারপর কাপটাকে টেবিলে রেখে চোখ বুজে চেয়ারে এলিয়ে দেয় শরীরটা। জানালা দিয়ে হু-হু করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে এখন। 

‘আজকেও কথা রাখলে না তুমি ?’

‘কথাটায় কোনও যুক্তি নেই বলেই রাখার প্রশ্নও নেই। ও ফোন না করলে আমিও করব না।’

‘এত জেদ ভাল না। তুমি তো ওর বাবা...’

‘বাবা বলেই তো করিনি।’

‘আচ্ছা নাতিটার তো একটা খবর নিতেই পারো, তাতে তো তোমার মান যাবে না।’

‘বিষয়টা মানের নয়। অভিমানের। আচ্ছা অনিতা সেই দিনটা মনে পড়ে...’

‘কোন দিনটা ?’

‘সেই যে যেদিন জলঝড়ে স্কুল ফেরার পথে আটকা পড়েছিল বিট্টু। সব পাল্টে যায় তাই না অনিতা ? মানুষের মনের অভিযোজনটাই অন্যমনে নিদারুণ দাগ কাটে মনে হয়। কোনওদিন ভাবিনি আমাদের সেই বিট্টুই একদিন..., আসলে জানো তো অনিতা আমার মনটা কোনওদিনই শহুরে শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারল না। সেই কাদামাটি লাগা গেঁয়োই রয়ে গেল মনটা।’

‘এমন ভাবে ভেবো না...’

‘যেমন ভাবেই ভাবি না কেন, আসলে কষ্টের কষ্টিপাথর দিয়ে আমার কপালটা লেখা। তুমি মরে বেঁচেছ অনিতা। আমি বেঁচেও ফুরিয়ে গেছি। তাই আমার মতো বাসি পেপারের খোঁজ নিয়ে কেউ কারুর সময় নষ্ট করতে চায় না। একমাত্র তুমিই মনের ভেতর এসে রোজ পাতা উল্টে দেখো।’ 



[দুই]



‘না না এই সিদ্ধান্তটা ভুল নয়। এরপর সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখলে দুজনেই কষ্ট পেতাম। খোলা মাঠ আর নীল আকাশের নীচে বড় হয়েছি আমি। খাঁচার মন্ত্রে আমি বিশ্বাসী নই...’

‘তাই বলে...’

‘কী করতাম তুমিই বলো। টুকরো টুকরো হচ্ছিলাম আমি। একলা রাতে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দে নিজেই ভয় পেতাম। মনে হত বুকের ভেতর হাজার হাজার শেয়াল কুকুর আমার ঘুমের অপেক্ষায় বসে আছে। আমি ঘুমিয়ে পড়লে আমাকে ছিঁড়ে খাবে ওরা। একমাত্র আমি জানি কতদিন পর শান্তিতে ঘুমিয়েছি। আমি বেঁচেছি মা। রঞ্জিতা পালিয়ে গিয়ে ওর পালিয়ে যাওয়ার ভয়টা নিয়ে গেছে আমার ভেতর থেকে। এখন বুঝতে পারছি ফাঁসির অপেক্ষার চেয়ে ফাঁসিটা ভয়ংকর নয়। রঞ্জিতার সঙ্গে বাঁচার চেয়ে ওর স্মৃতিতে বাঁচাটা অনেক সহজ। তবে মাঝে মাঝে কুট্টুসের জন্য খুব মন কেমন করে। কান্না পায়। আমি জানি ও আমাকে খুব মিস করবে। ঠিক বাবা যেমন আমাকে মিস করে।’

‘তুই তো তোর বাবাকে একটা ফোন করতে পারিস।’

‘বাবাকে ফোন করতে গিয়েও পারিনি। বাবার সঙ্গে কথা বললেই আমি জানি আমি কেঁদে ফেলব। কিন্তু আমি কাঁদতে চাইছি না। আরও কয়েকটা দিন নিজেকে গুছিয়েনি তারপর বাবাকে সব বলব।’

‘তোর বাবাকে যেদিন তুই রঞ্জিতার কথা প্রথম বলেছিলি, মনে আছে তোর বাবা...’

‘মনে আছে। বাবা বলেছিল, রঞ্জিতাদের রক্তে গ্রামের রঙ থাকে না। ওরা পার্লারে যায়। বাবা ঠিকই বলেছিল সেদিন। রঞ্জিতার রক্তের কণায় কণায় শহরের... শুধু রক্তের কণায় নয় রঞ্জিতার মনেও তো পার্লারের নিপুণ শিল্প। আচ্ছা মা কোনও রঞ্জিতাই কী গোলাপ ফেলে লাল পলাশ দিয়ে নিজেকে সাজাতে চায় না ?’

মায়ের ছবিটা আর কোনও উত্তর দেয় না। বিট্টু উদাসীন ভাবে মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা কান্নার কুঁড়িগুলো দুচোখে পাপড়ি হয়ে ঝরতে চাইছে। কিন্তু বিট্টু কাঁদবে না। কিছুতেই কাঁদবে না ও।



[তিন]



আজকে একটু সকাল সকাল এসেছে মনিকা। এসেই ভাত চড়িয়ে দিয়েছে গ্যাসে। তারই গন্ধ বাড়ি ময়। আসলে সকালের গন্ধের সঙ্গে ভাতের গন্ধ মিশে বেশ একটা মাখামাখি পরিবেশ তৈরি হয়েছে এখন। এমন সময় অতীতের ডোরাকাটা দিনগুলো মনে পড়ে। তখন তো আর গ্যাস ছিল না। উনুনের মুখে ঘুঁটে আর কাঠ-কয়লা গুঁজে ভাত চড়াত অনিতা। ধোঁয়ায় ভরে থাকত ঘরটা। রান্না ঘরের দেওয়ালে-দেওয়ালে তেলচিটে কালির দাগ। ভাতের হাঁড়িতে যাতে কালি কম পড়ে তার জন্য অনিতা রোজ হাঁড়ির তলায় মাটির প্রলেপ দিত। পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে ঘষতে হত তরকারির কড়াই। খড়ের নুড়ো আর ছাই ছিল বাসন মাজার হাতিয়ার। তখন তো একশ লেবুর শক্তি এক সাবানে ছিল না। আজকে আর রান্না ঘরে ধোঁয়া দেখা যায় না। হাঁড়ি-কড়ায় পাছায় কালির ছাপও আর আগের মতো নেই। এখন ইন্ডাক্সনের যুগ। এখন বাড়ির মেয়ে-বৌ খুব একটা রান্নাও করে না, আবার কাজেও মেয়েও আসে ভ্যানেটি ব্যাগে লিপস্টিক নিয়ে। হাসি পায় বিকাশের। নিজেই নিজের মনে মুচকি মুচকি হাসে...

‘কাকু আপনার চা...’ চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দেয় মনিকা। বিকাশ কোনোক্রমে ঠোঁটের হাসিটা লুকিয়ে ফেলে। ‘আজকে বাজার গেলে চায়ের পাতা নিয়ে আসবেন। আর একবার মাত্র হবে।’

‘আমার কি আজকে আর বাজারে যাওয়া হবে ? তার চেয়ে তুই এক কাজ কর, যাওয়ার সময় টাকা নিয়ে যাস। সন্ধায় যখন আসবি তখন কিনে আনিস। ওই বরেনের দোকান থেকে নিবি। বলবি আমি ভাল চা দিতে বলেছি। নিমাই এর দোকানের চা খেয়ে ঠিক তৃপ্তি হয় না। কেমন যেন বার্লি-বার্লি ভাব।’

‘আমি তো আজকে সন্ধায় আর আসব না কাকু। তাই আপনার জন্য দুবেলার রান্না চড়িয়ে দিয়েছি। খাবার আগে একটু গরম করে নিলেই হবে।’

‘কোথাও যাবি নাকি আজকে ?’ চায়ের কাপে চুমুক দেয় বিকাশ।

‘না না যাব না কোথাও। ওই যে গলির মুখে হলদে বাড়িটা, ওই বড় আম গাছটার পাশের...’

‘হ্যাঁ নির্মল মাস্টারের বাড়ি। তুই তো মাস্টারের বাড়িতেও রান্না করিস, জানি তো। তা কোনও অনুষ্ঠান নাকি ?’

‘হ্যাঁ। উনার নাতির জন্মদিন আজ। পাঁচে পড়ল ছেলেটা। খুব মিষ্টি।’

‘ও আচ্ছা। ঠিক আছে, আমিই না হয় বিকেলের দিকে একবার বরেনের দোকান থেকে ঘুরে আসব।’ গলাটা ভারী হয়ে আসে বিকাশের। চোখের পাতায় নিজের নাতির মুখটা ভেসে ওঠে। কতদিন হয়ে গেছে আসেনি ওরা। এতদিনে ছেলেটা হয়তো...



বিকেলের দিকে ঘুরতে ঘুরতেই বেরিয়েছিল বিকাশ। যাওয়ার পথে মনে করে বরেনের দোকান থেকে চায়ের প্যাকেট কিনেছে। রায় পাড়ায় ওদিকটায় এখন আর খুব একটা যাওয়া হয় না বিকাশের। তাই আজকে ইচ্ছে করেই একটু ঘুর পথে। রাস্তায় দু’একজন পরিচিতের দেখা হলেও আজকে দাঁড়িয়ে গল্প করেনি। ‘ভাল আছেন’ ‘ভাল আছি’ আর ঘাড় নাড়া দিয়েই কাজ সেরেছে। এতক্ষণ একটু আনমনা ভাবেই হাঁটছিল বিকাশ। তাই হয়তো খেয়াল করেনি রাস্তার দুই পারের পলাশ গাছগুলোকে। এতক্ষণে থমকে দাঁড়ায়। চারদিকটা লাল হয়ে আছে। পশ্চিমের আকাশটাও আগুন রাঙা। ‘অ-পূ-র্ব...’ বিকাশের মুখ ফসকেই কথাটা বেরিয়ে আসে। আরও খানিকটা এগিয়ে এসে কচি ঘাসের উপর বসে পড়ে বিকাশ। মন কেমনের মেঘগুলো কেটে পড়ছে এতক্ষণে।



এই এখানেই তো বিকাশের শৈশবের কত স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তখন এতো পলাশের গাছ ছিল না। কয়েকটা পলাশের সাথে ঝাঁকড়া মাথা বহেড়ার মস্ত গাছ ছিল একটা। গরমের ছুটির সময় বেশ কয়েক পাড়ার ছেলে ভর-দুপুরে জড়ো হত এখানে। কত রকমের খেলা ছিল তখন। এখনকার ছেলে-মেয়েরা ওসব খেলার নামও জানে না। ‘চুকিতকিত চন্দনা পাতাকি বন্দনা, পাতাকি নড়ে চড়ে, রাবণকে বধ করে...’ সীতা-হরণ খেলায় এটাই ছিল প্রধান ডাক। ছেলেবেলার দিনগুলো ভাবতে ভাবতে নিজের মনেই হাসতে থাকে বিকাশ। এক চিলতে পড়ন্ত রোদ ওর হাসি মুখটাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।



কতদিন পর আস্ত টকটকে লাল একটা সূর্যকে অস্ত যেতে দেখছে বিকাশ। সূর্যটা আকাশে নানান রঙ ছড়িয়ে ডুবছে এখন। পড়ন্ত আলোয় পলাশ ফুলগুলোকে আরও বেশি রক্তিম লাগছে। চারদিন জুড়ে যেন লালের মেলা বসেছে। এদিকটায় চাষের জমি নেই বললেই চলে। দু-একটা বাবলা আর ইউক্যালিপটাস বাদ দিলে প্রায় পুরো জাগটা জুড়েই দাঁড়িয়ে রয়েছে লাল মাথা পলাশ। পলাশ গাছগুলোর ওপারে কয়েকটা বাচ্চা ক্রিকেট খেলছে মনে হয়। তারই ‘আউট’ ‘আউট’ শব্দ ভেসে আসছে। আউট শব্দটা মনে মনে বার দুয়েক উচ্চারণ করে বিকাশ। অকারণে কিংবা অন্তরের কারণে বিকাশের মুখটা থমথমে হয়ে আসে। উঠে দাঁড়ায় বিকাশ। অগোছালো ভাবে চলতে থাকে ঘরের পথে।



[চার]



ঢক-ঢক করে প্রায় আধ লিটার জল খেয়ে সশব্দে জলের বোতলটা টেবিলের উপর নামায় বিট্টু। মোবাইলের একটা সুইচ টিপে সময়টা দেখে। দুটো বেজে পঁচিশ। ঘুম আসছে না বিট্টুর। পুরো বাড়িটাই যেন খাঁ-খাঁ করছে। টিকটিকির টিক-টিক শব্দটুকুও কানে ধরা দিচ্ছে বিরক্তিকর ভাবে। জানালার ওপারে নিঃশব্দ রাত্রির শব্দ। দ্রুতগামী টায়ারের আওয়াজ। একটা সিগারেট ধরায় বিট্টু, তারপর মোবাইলটা পাঞ্জাবীর পকেটে নিয়ে দরজা খুলে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে আসে। অনেকদূরে নির্ঘুম কয়েকটা ফ্ল্যাট আর বড় রাস্তার দুপাসারি লাইটগুলো নাইট ডিউটি করছে। বাকি সবাই ঘুমিয়ে।

‘মা জেগে আছো ?’

‘হুম জেগেই তো আছি। তোর ঘুম আসছে না তাই না ?’

‘না। ছেলেটার জন্য...’

‘এই কদিন বরং বাড়ি থেকে ঘুরে আয়। দেখবি বেশ হালকা লাগবে।’

‘সম্পর্কগুলো হালকা হলে মনটা ভারী হয়ে থাকে তাই না মা ? ভাবো এই রঞ্জিতার জন্যই একদিন নিজের ঘর নিজের গ্রাম...’

‘অপেক্ষা কর হয়তো পরে ও ঠিক নিজের ভুল বুঝতে পারবে।’

হাসার চেষ্টা করে বিট্টু। হাসিটা দীর্ঘশ্বাস রূপে নাকমুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। সিগারেটের ধোঁয়া লাগে চোখে। ‘সত্যি বলছি মা, তুমি থাকলে তোমার কোলে মাথা দিয়ে চুপটি করে শুয়ে পড়তাম। আর তুমি আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সেই বোকা কুমীরের গল্পটা বলতে। আচ্ছা মা শেয়ালগুলো এতো ধূর্ত হয় কেন ?’

মায়ের কাছ থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে আরও একটা সিগারেট ধরায় বিট্টু। মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে। এই সময় বাবাকে কল করা ঠিক হবে কি হবে না ভাবতে ভাবতেই বাবার নম্বরটা খোঁজে বিট্টু। কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছু একটা চিন্তা করে চাপ দেয় সবুজ বোতামটায়। রাত্রির যাবতীয় ধ্যান ভঙ্গ করে রিং হতে থাকে ওপারে...

‘হ্যালো...’

‘ঘুমচ্ছিলে ?’ জিজ্ঞেস করে বিট্টু।

‘না ঘুমাইনি বল।’

‘আমি কালকে বাড়ি আসব।’

‘আচ্ছা মনিকাকে বলে দেবো চার জনের চাল ফেলতে।’ স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দেয় বিকাশ।

‘না আমি একাই আসব।’

‘জানি।’

‘তাহলে চারজন বললে যে ?’ জিজ্ঞেস করে বিট্টু।

‘তোর বোন আর পল্লব দুজনেই আসবে কালকে।’

‘হঠাৎ দুজনে ?’

‘মেয়ে জামাই আসার কোনও তিথি তৈরি হয়েছে নাকি ? ইচ্ছে হয়েছে তাই আসছে। তা তুই তো আসার কথা সকালে বললেও পারতিস তুই হঠাৎ এতো রাতে... ’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিট্টু বলে, ‘আসলে কদিন থেকেই তোমাকে ফোন করব করব ভাবছিলাম কিন্তু...’ কথাটা বলতে গিয়েও হোঁচট খায় বিট্টু। ভেতরটা কেমন যেন কুঁকড়ে আসে।

‘কিন্তুটা রঞ্জিতা তাই তো ?’

‘হ্যাঁ মানে, কদিন আগে ও এই ফ্ল্যাট ছেড়ে...’

‘শুনেছি।’

‘মানে ? কে বলল তোমায় ?’

‘বলল নয়, বলেছিল। তোর মা। তোর বিয়ের কদিন পরই তোর মা বলেছিল...’ গলাটা ভারী হয়ে আসে বিকাশের। ‘রাখাল ছেলে’ কবিতার সহজ কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারা ছোট্ট বিট্টুর অসহায় মুখের স্মৃতিটা চোখের পাতায় ভেসে ওঠে। চোখ দুটোকে সামলানোর চেষ্টা করে বিকাশ।

‘বাবা...’ এতক্ষণে বিট্টুর গলার স্বরও ভেঙে শৈশবের রূপ নিচ্ছে।

‘আয় সকাল সকাল বাড়ি আয়। কতদিন হল তোকে দেখিনি বল তো। সন্ধা বেলায় ভাবছিলাম এবার তোরা এলে দাদুভাইকে নতুন একটা জায়গায় নিয়ে যাব। জায়গাটা মনে হয় তোরও দেখা হয়নি...’

‘কোন জায়গাটা বাবা ?’

‘সে আছে একটা জায়গা। না গেলে জানবি কেমন করে। কালকে বিকেলে তোদের সবাইকে নিয়ে যাব। আমি জায়গাটার নাম দিয়েছি বেলা শেষের বসন্ত। আমি ঠিক করেছি বসন্তের বিকেলগুলো ওখানেই কাটাবো। জীবনে আবার বসন্ত আসে না আসে...’

‘এবার থেকে দেখো সারা বছর জুড়ে বসন্ত রইবে।’

‘বসন্ত তো সারা বছরই থাকে, আমরাই শুধু খুঁজে পাই না। আসলে আমরা জানি শিমূল-পলাশ মানেই বসন্ত। কিন্তু আসল বসন্ত তো অন্য খানে, সেটা পরিবার আর প্রিয়জনের ভেতর থাকে।’

‘আচ্ছা বাবা কুট্টুস...’

বিট্টুর মুখ থেকে কথাটা কাড়িয়ে নিয়ে বিকাশ বলে, ‘শুধু দাদুভাই নয়, বৌমাও ফিরবে। আসলে সম্পর্কে যখন সন্ধা ঘনিয়ে আসে কিছু মানুষ তখন আলো না জ্বালিয়ে ভয়ে পালিয়ে যায়। ওরা আবার ফিরে আসে। পাখি কি গাছের থেকে বেশিদিন দূরে থাকতে পারে ? আকাশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ওড়া যায় কিন্তু কোনও প্রান্তেই বাসা বাঁধা যায় না। তাই পাখি আবার গাছের কাছেই ফিরে আসে।’

চোখ দুটোকে আর আঁটকে রাখতে পারে না বিট্টু। স্মৃতি-ভরা চোখে বান আসছে এবার। এবার বিট্টুকে ফোন রাখতে হবে, ‘তোমার ঘুম পায়নি বাবা ?’

‘হ্যাঁ এবার একটু একটু ঘুম পাচ্ছে। তুইও ঘুমিয়ে পড়। তোকেও তো সকাল সকাল উঠতে হবে।’

‘আচ্ছা গুড নাইট বাবা।’ ফোনটা রেখে পাঞ্জাবীর হাতায় চোখের জল মোছে বিট্টু। বেশ কয়েকটা ফ্ল্যাট ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষণে। কয়েকটা মাত্র জেগে আছে। কিন্তু দূরের বড় রাস্তার লাইটগুলো ? ওরা সবাই সবার সাথে জেগে আছে। ওরা অপেক্ষা করছে। কোনও একটা গাড়ির কিংবা কোনও একজন যাত্রীর। যে হয়তো বহুকাল আগে এই রাস্তায় রাত কাটিয়ে ছিল। হয়তো এই বসন্তে নয়, হয়তো বেলা শেষের কোনও এক বসন্তে সে ফিরবে। কিংবা কোনওদিন ফিরবে না। তবুও তার ফেরার অপেক্ষায় সারারাত জাগবে লাইটগুলো। রঞ্জিতার মুখটা মনে করতে গিয়েও অপেক্ষারত বাবার মুখটা মনে পড়ে বিট্টুর। এই মুহূর্তে ওই মানুষটাই তো এক বুক বসন্ত নিয়ে বিট্টুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।



[সমাপ্ত]



B



Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments