সম্পূর্ণ প্রেম ও প্রতিবাদের আগ্নেয় উপন্যাস, প্রমিথিউসের পথে

সম্পূর্ণ প্রেম ও প্রতিবাদের আগ্নেয় উপন্যাস, প্রমিথিউসের পথে

Advertisemen
[সম্পূর্ণ উপন্যাস]


[সম্পূর্ণ উপন্যাস]
প্রমিথিউসের পথে
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

গাড়িটা বিবড়দা পেরিয়ে সোজা ছুটতে লাগল শিবডাঙ্গা মোড়ের দিকে দু’পাশে ঘন কাজুবাদামের জঙ্গল, মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো পোড়ো জমি। জ্যোৎস্নায় ভেজা ঠাণ্ডা বাতাস একবার করে ছুঁয়ে যাচ্ছে তনুশ্রীর তন্দ্রা মাখা দেহটা। আজ আর তার কোনও পিছুটান রইল না সুদূর ভবিষ্যতের নিকনো স্মৃতির উঠোনে দাঁড়িয়েই এবার তনুশ্রীকে দেখতে হবে মা বাবা আর ছোট বোন অনুকেসম্পর্কের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম শেকড় গুলোকেউ তনুশ্রী ছিঁড়ে ফেলে এসেছে বাড়ির বারান্দায়। এখন দুচোখ জুড়ে শুধুই নতুন মাটির গন্ধ। 
তনু, তনু, এই তনু’- অনুপের মৃদু ডাকে তনু চোখের পাতা খুলতেই দেখতে পায়, দূরের কাজুবাদাম জঙ্গলটা সারিবদ্ধ ভাবে পেরিয়ে যাচ্ছে একটা হাতির পাল। সার্কাসে বেশ কয়েকবার হাতি দেখেছে তনু। ডিসকভারির মতো চ্যানেলে বহুবার হাতির পালও দেখেছে। কিন্তু চোখের সামনে এমন জলজ্যান্ত হাতির পাল দেখছে এই প্রথমবার। হাতি গুলো প্রকৃতির ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে গভীর জঙ্গলের দিকে। অন্যদিকে তাকানোর মতো সময়টুকুও ওদের নেই। অন্যদিন হলে হয়তো তনু ভয় পেয়ে যেত। আজকে তনুর ভয় করছে না অনুপের বুকের কাছে মাথাটা এনে ফিসফিস করে তনু বল, আজ পৃথিবীর সব চেয়ে নিরাপদ বুকে আমি, আজ আর ভয় পাব না।’
অনুপ কিছু না বলে তনুর চুলে আঙুল চালাতে থাকে। গাড়িটা ডান দিকে একটু বাঁক নিতেই একটা দমকা পাহাড়ি হাওয়া তনুর চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে যায়। অনুপকে আরও একটু জোরে জড়িয়ে, দুচোখ বন্ধ করে তনু খুঁজতে থাকে তিন মাস আগের সেই শ্রাবণী দিনটাকে
বাসের জন্য তনু সেদিন অপেক্ষা করছিল তালডাংরা বাস স্ট্যান্ডে কিন্তু সেদিন হঠাৎ কী একটা কারনের জন্য বাস ধর্মঘট হয়ে যাওয়ায় একটাও বাস আসেনি বাঁকুড়া থেকেতনু সেদিন বাধ্য হয়েছিল অপরিচিত অনুপের মোটর বাইক চড়তে। সেদিন তনু নিজেও ভাবেনি কদিন পরই এই অপরিচিত ছেলেটাই চির পরিচিত হয়ে যাবে। আরেকবার চোখ তুলে তনু অনুপের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। মুচকি হেসে আবার একই ভাবে শুয়ে পড়ে। সেদিনেই প্রথম বার অনুপকে দেখেছিল তনু তারপর মাঝে মাঝেই অনুপকে দেখা যেত রাস্তায় স্কুলের দরজার বাইরে বাস স্ট্যান্ডে। যে কারনেই হোক না কেন তনুর বাসও আসত না মাঝে মাঝেই। তাই কোনওদিন রেস্টুরেন্ট কোনওদিন ইকোপার্কে দু’জনকে একসঙ্গে দেখা যেত। অনুপের ব্যাপারে কিছুই কাউকে বলেনি তনু। পাছে এক কান থেক আরেক কান হতে হতে কথাটা বাবা জেনে ফেলে। এই ভয়টাই ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। তনুর বাবা বিক্রম চৌধুরী এলাকার নামকরা খড়িমাটির ব্যবসায়ী। সেই সূত্রে এলাকার প্রায় সকলেই কম বেশি চেনে তনুকে। তাই তনু অনুপের মোটর বাইকে চড়ার আগে ওড়নাতে পুরো মুখ ঢেকে নিত। তবুও একদিন ইকোপার্কের ভেতরেই ধরা পড়ে গেল গ্রামের এক দাদার কাছে কথাটা বিক্রম বাবুর কানে ঢুকতে দেরি হয়নি। বাংলা সিনেমার নায়িকার মতোই প্রথমে তনুর কলেজ বন্ধ হল তারপর মোবাইল কাড়িয়ে নেওয়া হল। মোটকথা অনুপের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়েছিল তনুর। তনুর মা তনুকে অনেক বুঝিয়ে ছিলেন। অচেনা ছেলে, দিন-কাল ভালো নয়, তোমার বাবার একটা সম্মান আছে। আরও কত কি।
কিছুতেই কিছু হয়নি। মোবাইল না থাকলে কী হবে? তনুর ছোটো বোন অনু, মানে অনুশ্রী ঠিক পিয়নের কাজটা করেদিত। অনু না থাকলে হয়তো তনুর পক্ষে বাড়ির বাইরে পা ফেলাও সম্ভব হত না, বাড়ি ছাড়া তো দূরের কথা। আজকে সকালে অনুই অনুপের ফেসবুক মেসেজটা নিয়ে এসে দেখিয়ে ছিল তনুকে। বিকেলে ফর্ম ফিলাপের নাম করে পালিয়ে যাবার সুযোগটাও তো অনুই করে দিয়েছিল
অনুপের বুকে মাথা রেখে আজকে কত জলছবিই না ভেসে উঠছে তনুর চোখের সাদা কালো পর্দায়। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তেই ধড়-ফড় করে উঠে বসে তনু অনুপ কে জিজ্ঞেস করে, -‘ওই সেদিন বোনের ফেসবুকে যে বললে কি একটা গান শোনাবে আমাকে কই শোনালে না তো?
পকেট থেকে মোবাইলটা বের করতে করতে অনুপ ঠোঁট উল্টে বলে, -‘সবই তোমার মনে থাকে দেখছি।
-‘বারে মনে থাকবে না কেন ?’
হালকা সাউন্ড দিয়ে অনুপ মোবাইলে গানটা বাজায়, ‘আজ ফাগুনী পূর্ণিমা রাতে চল পলাইয়ে যাই।’
গানটা শেষ হলে তনু বেশ খুশি হয়ে বলে, -‘বেশ সময় উপযুক্ত গানটা তুমি কি আগাম জানতে আমরা ফাল্গুনের পূর্ণিমা রাতেই পালাব?
মৃদু হেসে অনুপ হেঁয়ালি সুরে উত্তর দেয়, -‘আমরা না জানলেও সুরজিৎ হয়তো জানত নতুবা এমন গান গাইবে কেন বলো ?
-‘তোমার না সবেতেই ইয়ার্কি বলো না তুমি কি আগেই পালানোর কথা ভেবেই রেখেছিলে?
-‘না, ঠিক ভেবে রেখেছিলাম বললে ভুল বলা হবে তবে যেদিন তোমার ফোন বন্ধ হল সেদিন থেকেই ভাবছিলাম সুযোগ পেলেই তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাব।
তনু কি একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ড্রাইভার একটা প্রশ্ন করতেই আর বলা হল না, -‘অনুপদা কিছু কেনার থাকলে এখানেই নিয়ে নাও। আর কোথাও দোকান খোলা পাবে না মনে হয়। অনুপ ড্রাইভারকে গাড়িটা সাইড করে লাগাতে বলে নেমে পড়ে রাস্তায়। তনু জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে একটা দোকানে সাজিয়ে রাখা রঙিন আবিরগুলোর দিকে। লাল আবিরের উপর চোখটা পড়তেই কেমন যেন একটা অচেনা শিহরণ বুকের ভেতরটাকে সিক্ত করে দিয়ে যায়। খানিক পরে অনুপ কেক, বিস্কুট, পোড়া মাটির দুটো হাতি-ঘোড়া, আর খুব সুন্দর পোড়ামাটির এক জোড়া মালা নিয়ে ফিরে আসে তনু কিছু বুঝতে পারার আগেই অনুপ একটা মালা তনুর গলায় পরিয়ে দিয়ে বলে, -‘জানো তনু বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির কাজের সৌন্দর্যের মতো সৌন্দর্য তুমি অন্য কোথাও পাবে না।
তনু প্রাণ ভরে অনুভব করার চেষ্টা করে মাটির পুঁতি গুলোকে ওরা যেন কত শতাব্দীর ইতিহাসের গল্প জানে। চৈতন্য সিংহ দেবের কথা শ্যামরায় মন্দিরের কথা লাল বাঁধের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা জোড়া মন্দির দুটোর কথা রাজা রঘুনাথ সিংহের কথা আরও কত কিছু   
মারুতিটা এবার কাজুবাদাম জঙ্গলটাকে দু’পাশে ফেলে ছুটতে থাকে আরেক পৃথিবীর দিকে। গাড়ির ভেতরে মান্নাদের কণ্ঠে একটা গান বেজে চলেছে হালকা সুরে, তুই কি আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে।’ ড্রাইভার কি ইচ্ছে করেই এমন একটা গান চালিয়েছে ? এই প্রশ্নের উত্তর তনুর জানা নেই। তবে গানটার সুরের হাত ধরে তনু পৌঁছে যায় তার বালিকাবেলা বিকেলের পুতুল খেলা একটা দিনে। কেবলমাত্র মেয়ের অভিমান ভাঙাতেই তনুর বাবা সেদিন জল-ঝড়কে তোয়াক্কা না করে দোকানে গিয়ে কিনে এনেছিল একটা মস্ত বড় পুতুল। হঠাৎ করে সেই দিনটার কথা মনে পড়তেই তনুর দু’চোখ কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে আসে। আর হয়তো বাবা মায়ের সাথে কোনও দিনেই তনুর দেখা হবে না। অনুপের কাঁধে মাথা রেখে তনু বাবার চওড়া কাঁধটা অনুভব করার চেষ্টা করে। না, দুটো কাঁধে কোন মিল খুঁজে পায় না তনু। দুচোখ বন্ধকরে বালিকা বেলার সেই সব দিনগুলোতে হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় তনু ঘুমের দেশে হারিয়ে যায়।
        এখনো সকালের আলো ফুটতে বেশ কিছুটা সময় বাকি আছে আর একটু পরেই পূবের আকাশে পাল তুলে নেমে আসবে নতুন দিনের আলো। অনুপ এখনো ঘুমিয়ে গাড়িটা চলছে একটা কাঁচা রাস্তার উপর দিয়ে। পাশাপাশি তাকিয়েও অনু ঠিক আন্দাজ করতে পারে না কোন জায়গা এটা। গাড়িতে তেল ভরানোর সময় তনুর ঘুমটা ভেঙেছে। এখনো গাড়িটা চলচে সেই নিজের গতিতেই। যেন গাড়ি আর ড্রাইভারের কোন ক্লান্তি নেই। ড্রাইভারটাও ভীষণ রকমের চুপচাপ তনু জানেও না ওর নাম কি? বাড়ি কোথায়? একবার ভেবেছিল জিজ্ঞেস করবে আবার কি ভেবে চুপ করে করে গেছে। গাড়ির শব্দ পেয়ে রাস্তার পাশের একটা পুকুর থেকে একদল বালিহাঁস সাঁই-সাঁই ডানার শব্দ তুলে উড়ে গেল পশ্চিম আকাশে। তনু দেখতে পেল অনেক দূরে কুয়াশার চাদরে শরীর ঢেকে ঘুমিয়ে আছে একটা পাড়াগ্রাম। সব যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে তনুর। ওর এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে ও চলেছে এক অচেনা সংসারে জীবনভর খেয়া দিতে।
অনুপের নিজের বলতে তেমন কেই নেই এক মাসি ছাড়া মা মারা গেছে ছেলে বেলাতেই। তখন অনুপ ক্লাস ফোর অনুপের সম্পর্কে এর বেশি তেমন কিছুই জানে না তনু। অনুপ ছেলেটা দেখতেও বেশ সুপুরুষ বেশ লম্বা চওড়া ছাতি আর যেটা তনুকে সব চেয়ে বেশি করে টানে তা অনুপের চোখ যেন শত জীবনের করুণ গাঁথা আছে ওই দুটো চোখে। মাঝে মাঝেই ইকোপার্কের ঝিলের ধারে বসে তনু হারিয়ে যেত অনুপের চোখে হয়তো অনুপের চোখ দুটোই তনুকে বাড়ি ছাড়ার সাহস দিয়েছে। নতুবা মাত্র তিন মাসের পরিচয়ে তনুর মতো মেয়ে এই কাজ করতেই পারত না। তনু আরেকবার তাকিয়ে দেখে অনুপের ঘুমন্ত মুখটা। ভোরের আলো অনুপের মুখে একটা শান্তির পর্দা নামিয়ে রেখেছে। মনে মনে তনু ভাবে, এর সাথেই তো সব পিছুটান ফেলে যাওয়া যায়। একটা মিষ্টি হাসির রেখাতে গালে টোল পড়ে তনুর। ক্লাস নাইন থেকে তনু যতগুলো প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছে তাতে ওর হাসিটার একটা অবদান অবশ্যই ছিল। পৃথিবীর সব করুণ প্রেমের ছবিতে কোথাও না কোথাও হাসি একটা বিশেষ স্থান নিয়েই এসেছে। তনুর হাসিটাও বেশ হৃদয় শিকারি হাসি। তনুর যে অনুপের আগে কাউকে ভালো লাগেনি তা নয় ক্লাস একাদশের মৈনাক পাত্র নামের একটা ছেলেকে তনুর বেশ ভালই লাগত। বইপোকা মৈনাকের নজর পড়লই না তনুর উপর। আজকে মৈনাকের কথা হঠাৎ মনে পড়তেই তনুর ঠোঁটে হাসিটা এসেছিল
                                               
।।দুই।।

-‘না,না সুশান্ত আমি এই ব্যাপারে বিন্দু মাত্রও জানতাম না এই কদিন আগে আমাদের পাড়ারই একটি ছেলে তনুকে ওই ছেলেটির সাথে পার্কে দেখে। তারপর আমাকে সব জানায়। আমি তনুর কলেজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম আর মোবাইলটাও দিইনি ওকে।’ -বেশ উত্তেজনার সাথেই কথাগুলো বললেন বিক্রম বাবু পুলিশ অফিসারবন্ধু সুশান্ত গাঙ্গুলিকে।
-‘আরে ওটাই তো ভীষণ ভুল করেছিলি কলেজ বন্ধ করে বা মোবাইল নিয়ে নিলেই কি আজকালের ছেলে-মেয়েদের আটকানো যায় ? বরং এই জন্যই ওরা পালানোর কথাটা ভাবল।
-‘দেখ না ভাই যা হবার তাতো হয়েইছে এখন কী করে তনুকে ফিরিয়ে আনা যায় সেই ব্যবস্থা কর। বিক্রম বাবুর চোখে মুখে একটা কান্নার ঝিলিক দেখা যায়। কাল সারারাত ঘুমোননি। সন্ধ্যা থেকে পাগলা কুকুরের মতো মেয়েকে খুঁজেছেন বিক্রম চৌধুরী। যখন কোথাও কোনও খবর পাননি তখন বাধ্য হয়েই ফোন করতে হয়েছে বন্ধু সুশান্ত গাঙ্গুলিকে।
-‘এখুনি এত ভেঙে পড়িস না বিক্রম ওরা বিয়ে করে ফেলার আগেই যদি ওদেরকে তুলে আনা যায় তাহলে পুরো ব্যাপারটাই আমাদের হাতেই থাকবে। কাল রাত থেকে তুই একবারও চোখের পাতা বন্ধ করিসনি এখন একটু ঘুমোবার চেষ্টা কর। যা করবার আমি তো করছি।
কিছুতেই শান্ত হতে পারছে না বিক্রম বাবু। তনুর মা সুমিত্রা দেবী কাল রাতেই তিন বার মূর্ছা গিয়ে এখন একটু ঘুমিয়েছে সবে। কালকে সন্ধ্যা থেকে হাজার প্রশ্নের ঝড় বয়ে গেছে তনুর বোনের উপর। না, অনু মুখ খোলেনিছোটবেলা থেকেই দিদি তার বান্ধবীর ভূমিকা পালন করে এসেছে তাই দিদির অসময়ে অনুই পাশে দাঁড়িয়েছে আজ। বাবা-মায়ের বকুনি, পাড়ার লোকের হাজার প্রশ্ন, দিদি শূন্য ঘর, সব মিলিয়ে অনুর চোখের সাদা ভাগটা বসন্তের পলাশ রঙে রাঙিয়ে আছে। অনুপকে কয়েকবার ফোন করার চেষ্টাও করেছিল অনু কিন্তু মোবাইল সুইচ অফ থাকায় দিদির কোনও খবর পায়নি এখনও। একবার করে নানান দুশ্চিন্তার মেঘ ডানা মেলে উড়ে এসে জমাট বাঁধছে অনুর মনে, -‘অনুপদা দিদির সাথে খারাপ কিছু করবে না তো ? যদি দিদিকে…! না, না অনুপদা খুব ভালো মানুষ, খারাপ কিছু করতেই পারে না।’ -আবার আত্মসান্ত্বনা মাখা যুক্তির হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে মেঘ গুলো।
        কয়েকটা বিষয় জানার জন্য সামান্য কিছুক্ষণের জন্য সুশান্ত গাঙ্গুলিকে বিক্রম বাবুর বাড়িতেই আসতে হয়েছিল। সুশান্ত গাঙ্গুলি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার পর বিক্রম বাবু চোখের জল চেপে খোলা ছাদে এসে দাঁড়ান হাতে একটা অনেক পুরানো দিনের স্মৃতিতে ভরানো পাণ্ডুলিপি। ছাদের থেকে খড়িমাটির স্তপ গুলো ছোটছোট পাহাড়ের মতো দেখা যায়। সূর্যের নরম আলোতে সাদা মাটিগুলোকে দেখে মনে হয় যেন ওরা লাল রঙ কুড়িয়েছে আঁজলা ভরে। দূরের লাল রাস্তাটার দিকে আনমনে চেয়ে থাকতে থাকতে বিক্রম বাবু চোখ থেকে টুপ করে অ্যালবামের উপর এক ফোটা নোনাজল পড়ে। তনুর একটা ছবির উপর আঙুল বোলাতে বোলাতে বিড়বিড় করে তিনি বলেন,-তোকে এতটা বিশ্বাস করে ছিলাম আর তুই এমন করলি! অনু হলে এত কষ্ট পেতাম নারে মা!
অ্যালবামটাকে বুকে জড়িয়ে হু-হু করে কেঁদে ফেলেন বিক্রম বাবু। এমন সময় কাঁধে একটা নরম হাতের ছোঁয়া লাগে। বিক্রম বাবু পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন সুমিত্রা দাঁড়িয়ে আছে বিক্রম বাবু চোখের জল মুছে জিজ্ঞেস করেন, -‘তুমি আবার অসুস্থ শরীরে উঠে এলে কেন?
স্বামীর ভেঙে পড়া চোখের দিকে তাকিয়ে সুমিত্রা দেবী কিছুই বলতে পারে না। এই অবস্থায় যে কোনও সান্ত্বনা বাক্য কাজ করে না। ঠোঁটগুলো শুধু কাঁপতে থাকে নীরব অভিমানে।
হঠাৎ করেই যেন চৌধুরী বাড়িতে একটা শুকনো ঝড় আছড়ে পড়ল। কে প্রস্তুত ছিল না এমন ঝড়ের জন্য।    

এদিকে সূর্যের কাঁচা হলুদ আলোয় অন্য আরেক জীবনে পা ফেলল তনু। জায়গাটা বেশ সুন্দর চারদিক পলাশ ফুলে লাল হয়ে আছে। পশ্চিম দিগন্ত জুড়ে শুধু খোলা মাঠ। পূবে একটা শীর্ণকায়া নদী বয়ে গেছে। নদীটার ওপারে একটা মন্দির। মন্দিরটা পেরিয়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকটা মড়া পড়ানোর শেষ চিহ্ন। তনু অনুপকে জিজ্ঞেস করে,- ওটা কি মন্দির গো ?
অনুপ তনুর বাঁ হাতটা ধরে চলতে চলতে উত্তর দেয়,- ওটা শ্মশান কালীর মন্দির কালী পূজার রাতে এখানে খুব ভিড় হয় এই খোলা মাঠটায় মেলা বসে।’
অনুপের কথার উপর ভরকরেই তনু দেখতে পায় কত লোক মেলা গিজ-গিজ করছে। কত চড়ক বসেছে। কত রকমের দোকান। কত রকমের খাবার। শুনতে পায়,- দাদা এদিকে আসুন, এদিকে, হরেক মাল দশ টাকা, দশ টাকা, দশ টাকা। এক অজানা অদেখা খুশির আনন্দে তনুর চোখদুটো ঝিকমিক করে উঠে।
-‘এই অনুপদা, তোরা তো এবার হেঁটেই ফিরবি ? আমার খুব ঘুম পেয়েছে। আমি চললাম। বিকেলে আবার দেখা হবে।’ কথাটা বলেই ড্রাইভার গাড়িতে উঠে বসে। অনুপ সঙ্গে সঙ্গে তনুর হাত ছেড়ে এগিয়ে এসে বলে,-‘কাকিমাকে বলে আসিস আজ রাতে আমাদের বাড়িতেই খাবার খাবি।’
ড্রাইভার মুচকি হেসে বলে,- বৌদির হাতের রান্না বলে কথা, না খেলে চলে। খেয়ে যাব অবশ্যই খেয়ে যাব তবে আজ নয়, অন্যদিন। আজকে সন্ধ্যায় আসব কিন্তু খাওয়া হবে নারে একটা ভাড়া ধরা আছে।’ কথাটা বলেই ড্রাইভার মারুতি নিয়ে বেরিয়ে যায় লাল ধুলো উড়িয়ে। অনুপ আর তনু পায়ে পায়ে হাঁটতে থাকে আধমরা নদীটার উপর দিয়ে মন্দিটার দিকে।
-‘একটা কথা বলব ? চলতে চলতে কথাটা বলে তনু
-‘হুম,অবশ্যই।’
তনু আলতো ভাবে অনুপের বাঁহাতে চাপ দিয়ে প্রশ্ন করে,- আমরা কোনও ভুল করলাম না তো ? কেমন যেন একটা ভয় ভয় করছে আমার
পরিচিত হাসি হেসে অনুপ বলে,- ধুর পাগলি ভয় কিসের ? আমি তো আছি।’
তনু অনুপের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলে,- সে তো জানি বাবা কিন্তু চুপ হয়ে বসে থাকবেন না। তুমি জান না বাবা ঠিক সুশান্ত কাকুকে সব বলে আমাকে তুলে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবে।
-‘ওটা শুধু তোমার বাবা বলেই নয় সব বাবা-মায়েই তাই করত।
-‘তাই তো ভয় পাচ্ছি, যদি ধরা পড়ে যাই । যদি তোমার কোনও ক্ষতি হয়ে যায়।’ একটা দুশ্চিন্তার বক্র রেখা ফুটে ওঠে তনুর কপালে।
-‘তুমি মিছি মিছি ভয় পাচ্ছ তনু আমাদের কোন ক্ষতি হবে না। তাছাড়া জীবনের সব পথগুলোই তো সরল রেখার মতো নয় জীবনে চলার পথে বাঁক আসবেই। ওই বাঁক আসার মুহূর্তটুকু তুমি শক্ত করে আমার হাত ধরে থেকো তাহলেই জীবনের সব পথ হাসি মুখে পেরিয়ে যেতে পারব আমি।’
-‘সত্যি বলছ ?’ কাঁপা কাঁপা চোখে তনু তাকিয়ে দেখে অনুপকে।
-‘সত্যি সত্যি সত্যি তিন সত্যি।’
দূরের পলাশ বনের দিকে তাকিয়ে তনু বলতে থাকে, -‘মাঝে মাঝে মা-বাবার কথা ভাবলে খুব কষ্ট হয় আমাকে আর অনুকে কত যত্ন করে মানুষ করলেন আর আজ আমরা যদি ওদেরকে একলা ফেলে নিজের নিজের জীবনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে থাকে তনু,- ‘ওদের হাতে জল তুলে দেওয়া তো দূরের কথা ওদের চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ারও কে থাকবে না। সত্যি করে বলো তো আমি কি স্বার্থপর নই ?
কী উত্তর দেবে ঠিক খুঁজে পায় না অনুপ। তনু আরও উদাসীন ভাবে বলতে থাকে,- জানি, আমি ওদের সাথে স্বার্থপরের মতোই আচরণ করলাম কী বা করতাম! জীবন তো একটাই তাই নিজের মতো করে বাঁচতে বড় লোভ হয়। না হয় একটা জীবন বাঁচার লোভে একটু স্বার্থপরই হলাম।’
        না, আর কথা বলতে পারেনি তনু অনুপের বুকে মাথা রেখে কান্নায় বোবা হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ ওরা দুজনে কালী মন্দিরে বসে দূরের পলাশ জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে পাতা ঝরা বসন্তের রূপ দেখছিল। পলাশ গাছগুলো যেন নীল আকাশে মুঠো মুঠো লাল মাখিয়ে দিচ্ছে দূরের কোন এক গাছের ডাল থেকে ছুটে আসছে কোকিলের কু-হু কু-হু সুর। মন্দির থেকে নেমে এসে এবার ওরা নদীর পাতলা জলে পা ডুবিয়ে বসে।
পায়ে করে জল নাড়তে নাড়তে অনুপ তনুকে জিজ্ঞেস করে,- ‘তনু, তোমার খিদে পায়নি ? সেই তো কালকে রাতে এক টুকরো কেক আর দুটো বিস্কুট খেয়েছ।’
তনু মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়,- না তার খিদে পায়নি। তারপর অনুপের বাঁ হাতটা কোলের উপর নিয়ে বলে,- আমার কোন ব্যাবহারে যদি কোনওদিন আঘাত পাও আমাকে গোপন কোরো না রাগ অভিমান যখন যা হবে সব খুলে বলবে। এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আমার আর কেউই রইল না। চোখ দুটো জলে ভরে আসে অনুপের অকারণেই আজ তার মায়ের ঝাপসা ছবিটা মনে পড়ে যায়।
-‘তুমি কাঁদছ অনুপ ? আচ্ছা পাগল ছেলে। আমি এমন কী বললাম শুনি যে তোমার চোখে জল চলে এলো?
-‘না না, তোমার কথার জন্য নয়। জানি না কেন হঠাৎ মায়ের কথা খুব মনে পড়ে গেল। যদি একবিন্দুও কোনওদিন সুযোগ পাই আমি তোমার মা-বাবাকে আমাদের জীবনে নিয়ে আসবই দেখো। নতুবা আমার জীবনের অভাব যে কোনওদিনও পূর্ণ হবে না। তনু অনুপের মাথাটা নিজের বুকে টেনে চুলগুলোতে আঙুল বোলাতে থাকে।
-‘জান তনু এখানেই আমার মাকে পোড়ান হয়েছিল। মা চলে যাওয়ার কয়েক বছর পরেও আমি এখানে লুকিয়ে লুকিয়ে এসে চোখের জল ফেলে গেছি কতবার। যেদিন আমার মাকে খুব মনে পড়ত সেদিন আমি এখানে চলে আসতাম। যে মন্দিরের পাশে একটা গাছের কাটা কাণ্ড দেখছ, গাছটারেই শুকনো ডাল কেটে মাকে পোড়ান হয়েছিল। আঙুল বাড়িয়ে গাছের কাটা কাণ্ডটা দেখায় অনুপ। তারপর আবার বলে,- ‘কয়েক বছর আগের একরাতে গাছের বাকি অংশটা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। এই শ্মশানের দিকে দিনের বেলাতেই তেমন কেউ আসে না তায় রাতে গাছচুরি হলে কে আর জানবে। জানি না কেন যে গাছটার জন্যও মনটা ডুকরে কেঁদে ওঠে। মাকে তেমন মনে না পড়লেও মা-এর চিতায় জল ঢালার মুহূর্তটা আমার এখনও পরিষ্কার মনে আছে।
তনুর বুকে মাথা রেখেই কথা গুলো বলে যায় অনুপ। তনু দেখতে পায় অনুপের চোখ দুটো আবার লাল হয়ে এসেছে। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। তনু আর কাঁদতে দেয় না অনুপকে। নিজের গোলাপি ঠোঁট দুটো দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে অনুপের চঞ্চল ঠোঁট দুটো। চার ঠোঁটের ভালোবাসার সেতু বন্ধনে দু’জনের ছোটছোট দুঃখের টুকরোগুলো এপার ওপার হতে থাকে সহজেই

।।তিন।।
বেলা বেড়ে যাচ্ছে দেখে দুজনে এবার উঠে দাঁড়ায়। তারপর আনমনে হাঁটতে থাকে পলাশ বনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গ্রামটার দিকে। দু’জনের কেউই আর বিয়ের ব্যাপারে দেরি করতে চায় না। দু’এক দিনের ভেতরেই একটা ভাল দিন দেখে বিয়েটা সেরে ফেলতে চায় তনু। বলা যায় না কখন সুখের ঘরে শিকারি হায়নার মতো অসুখ নেমে আসে। কথায় আছে শুভ কাজে দেরি করতে নেই, যদিও দেরি করার আর আছেই বা কী ? পুরোহিত ডেকে একটা শুভদিনে বিয়েটা সেরে ফেলা আর গ্রামের মানুষদের একটা ভোজ দেওয়া। তনু অনুপের হাতে হাত রেখে নতুন জীবনের দিকে চলতে থাকে একপা একপা করে। লাল রাস্তা জুড়ে ঝরে পড়ে আছে রক্তিম পলাশ ফুলগুলো
চারপাশটাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে দেখতে তনু বলে, -‘সত্যি তোমাদের গ্রামটা সুন্দর অনুপ তোমার মুখে যেমন শুনে ছিলাম তার চেয়েও অনেক গুন সুন্দর। তুমি ভাগ্যবান এমন গ্রামে তোমার জন্ম।
–‘তোমার তাহলে ভাল লেগেছে যাক বাবা এদিক দিয়ে তো নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে অনুপ।
-‘না ইয়ার্কি নয়, সত্যি তোমাদের রাধামোহনপুর গ্রামটা চোখ জুড়ানো
ছেলে মেয়ে দুটোকে দেখে কে বলবে এরা সমাজের মুখে পাথর দিয়ে সংসার গড়তে চলেছে। সত্যি অদ্ভুত পৃথিবী, অদ্ভুত সব নিয়ম এত প্রেম এত প্রাণ তবু স্বীকৃতির সার্টিফিকেট নেই সংসার জীবন সমুদ্রে। বসন্ত আছে ফুল ফুটেছে কোকিল ডাকছে তবুও অনুপ আর তনুর জীবনে সমাজ পালানো বিমুখ বসন্ত। হতেও তো পারত একটা স্বাভাবিক বিয়ে ? কিন্তু হল কোথায়? যারা পালিয়ে গেল প্রতারকের তকমা এঁটে তারা না হয় পালাল কিন্তু যারা পারল না বাবা মায়ের শুকনো মুখের লক্ষ্মণ গণ্ডি পার হতে ? তাদের কেউ গেল অনিচ্ছার ফুলশয্যায়। কেউ বা এক জীবন কাটাবে কোনওদিন ভোর না হওয়া অন্ধকার রাস্তায়।
-‘আচ্ছা অনুপ তালডাংরার মেস থেকে তোমার মোটর বাইকটা কীভাবে আনবে এতদূর ?
-‘এতদূর কোথায়?
-‘বাঃ দূর নয় ? পুরো এক রাত্রির রাস্তা ! 
-‘তুমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এসেছ। তাহলে আর জানবে কী ? কালকে গাড়ি খারাপ না হলে রাত্রি একটা নাগাদ বাড়ি পৌঁছে যেতাম। আরে পাগলি বিষ্ণুপুর পার হওয়ার পর আর তো আমরা জনবহুল রাস্তায় আসিনি অনেক ঘুরে ঘুরে এলাম। তোমার বাবা তো একটি যান্ত্রিক দেবতা। কোথায় যমদূত দাঁড় করিয়ে রাখবে সেই ভয়েই তো প্রায় পঞ্চাশ কিমি ঘুরে এলাম। তাতে করে আবার সোনারপুরে পিছনের টায়ার লিক হল সেখানে গেল ঘণ্টা খানেক। পল্লব গাড়িতেই টুকটাক সারানোর সব যন্ত্রপাতি রাখে তাই রক্ষা। নতুবা কালকে রাত সোনারপুরেই থাকতে হত।
-‘ওই ছেলেটার নাম পল্লব ?
-‘হুম, দুবারেও মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে না পেরে বাপের শেষ সম্বল বাহন টিকে বহন করছে ওর গাড়িটা রাস্তায় কম গ্যারেজেই থাকে বেশি। আমরা এক সাথেই পড়তাম।
-‘ওর বাড়ি কি তোমাদের গ্রামেই?
-‘না ও পাশের গ্রাম জয়নগরে থাকে আলাপ করিয়ে দেব পরে।
দু’পাশের আলু জমিগুলো পার হতে হতে গ্রামের একমাত্র পুকুরটার দিকে চলতে লাগল দুজনে। গ্রামের এক প্রান্তে অনুপের দোতালা বাড়িটা দেখা যাচ্ছে।
-‘কিরে ভাইপো ভালো আছিস ? দূরের একটা সরসে ক্ষেতে জল পাওয়াতে পাওয়াতে একজন মাঝ বয়সী লোক প্রশ্নটা ছুড়ল অনুপের দিকে
-‘হাঁ অরুণ কাকা ভালই আছি তোমার ডান পা ঠিক হয়েছে ? বিকাশ কবে আসবে কলকাতা থেকে? লোকটি এক কোদাল মাটি নালা থেকে সরিয়ে উত্তর দেয়, -‘এই বয়সে আর বাতের ব্যথা কী কমেরে বাবা বিকাশ মকর সংক্রান্তিতে এসেছিল তোর খোঁজও করছিল। এই তো আগের হপ্তা আসতে গেছে। 
-‘আর গ্রামের বাকি সব খবর ভাল তো ?
-‘ওই সব আছেরে বাপ গেল মাসে নামো পাড়ার তারিণী খুড়ো হঠাৎ মরল।
-‘সে কী! আগের বারে এসে ভালই তো দেখে গেলাম তারিণী দাদুকে।
কাজ করতে করতেই লোকটি উত্তর দেয়, -‘মানুষের জীবনটা যে চলে যাচ্ছে ওটাই তো ঢের আশ্চর্য। কে যে কবে মরবে ভগবান জানেন। তা তোর সাথে মেয়েটি কে ? বন্ধু নাকি ?
প্রশ্নটা যে আসবেই সেটা অনুপ তনু দুজনেই বুঝতে পারছিল। তবুও লজ্জায় তনুর গাল দুটোতে লাল রঙ খেলে যায়। অনুপ সামান্যতম ইতস্তত না করেই বলল, -‘হাঁ কাকা বন্ধু। সন্ধ্যায় একবার বাড়ির দিকে যদি পার তো ঘুরে যেও। কথা হবে এখন চললাম আসি।
-‘আচ্ছা বাবা সময় পেলে অবশ্যি ঘুরে যাব আজ না হলেও অন্য আরেক দিন।
গ্রামের পুকুরটা পেরোতে পেরোতে অনুপ তনুর দিকে তাকিয়ে বলে, -‘রাস্তায় বা বাড়িতে কেউ কোনও প্রশ্ন করলে চুপ থেকো যা উত্তর দেবার আমিই দেব।
-‘আচ্ছা বাবা আমি না হয় বোবালক্ষ্মী হয়েই থাকব যাকে যা বলবার তুমিই বলবে।’ কথাটা বলেই তনু হাসতে থাকে।
-‘ওই হাসির কী হল এখানে? 
-‘কিছুই না এমনি।’ আবার হাসতে থাকে তনু। তনুর হাসি মুখটার দিকে অনুপ হ্যাংলার মতো তাকিয়ে থাকে।
-‘সত্যিই ভীষণ মিষ্টি তোমার হাসিটা লোভ হচ্ছে আবার। তখন নদীর ধারে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি এখন কিন্তু চাইতে ইচ্ছে করছে তনু। 
-‘চোপ অসভ্য ছেলে কোথাকার।’ লজ্জায় রাঙিয়ে যায় তনু অনুপের কথা শুনে। দুজন দুজনকে ঠেলা ঠেলি করতে করতে চলতে থাকে রাঙা মাটির রাস্তা দিয়ে।
                                               
।।চার।।
   
-‘ওকে জিজ্ঞেস করে কোনও লাভ হবে না বাবা আমি ভাল মতোই জানি ওর দিদি মরুক বাঁচুক ও মুখ খুলবে না।’ বেশ রাগের সঙ্গেই বিক্রম বাবু কথাগুলো বললেন শ্বশুর মশাইকে। বেলা দশটা নাগাদ হাতিরামপুর থেকে বিক্রম বাবুর শ্বশুর মশাই এসেছেন এসেই জেরা শুরু করেছিলেন অনুকে। কিন্তু কেউ এখনও ছেলের নামটা পর্যন্ত অনুর কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি। দাদুভাই নাতনিকে স্কুটি কিনে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেও অনুর সেই প্রথম থেকেই এক উত্তর, -‘আমি দিদির ব্যাপারে কিছুই জানি না আমি ফর্ম ভরছিলাম দোকানের ভেতরে, পরে বাইরে এসে দেখি দিদি নেই।
সুশান্ত বাবুও নিজের মতো করে চেষ্টা করছেন কিন্তু তিনিও ছেলেটির ব্যপারে কিছুই জানতে পারেননি। এমনকি ছেলেটি কোথায় থাকত কী করত তাও না। এদিকে সুমিত্রা দেবীর শারীরিক অবস্থাও ভাল না ছাদে বিক্রম বাবুর সাথে যখন গল্প করছিলেন তখনি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যান। হয়তো সারা রাত কিছুই খেতে পারেনি তাই শরীরটা বেশ দুর্বল ছিল। বিক্রম বাবু কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। মেয়েটা যে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যাবে সেটা তিনি কল্পনাও করেননি।
-‘দ্যাখো বাবা বিক্রম, আমার মনে হয় তোমার পুলিশ বন্ধুটির মাধ্যমে তেমন কিচ্চু হবে না তার চেয়ে বরং আমাদেরই একটু খোঁজ খবর নেওয়া দরকার। তনু মায়ের কোনও না কোন বন্ধু-বান্ধব এই ব্যপারে ঠিক জানবে। তাই বাবা, সময় নষ্ট না করে একটু খোঁজ নিয়ে এলে ভাল হত না ? নতুবা সময় পেরিয়ে গেলে আর খোঁজ পেয়েও তেমন সুবিধা হবে না।’ তনুর বাড়ির দিক দিয়ে বিচার করলে হয়তো কথাটা বিক্রম বাবুর শ্বশুর মশাই মোটেই মন্দ বলেননি। কিন্তু সমস্যা হল গিয়ে, এদিকে বিক্রম বাবু চান না ঘটনাটা পাঁচ কানে ছড়িয়ে পড়ুক। আবার মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে ভাবলেই ওনার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সারা পশ্চিম বাংলা জুড়ে যা চলছে তাতে মায়ের গর্ভের ভেতর থেকে শুরু করে একলা রাস্তায় মেয়েরা কথাও নিরাপদ নয়। ছেলেটার উপর একটা তীব্র বিরক্তি ফুটে উঠল বিক্রম বাবুর চোখে মুখে।
আর দেরি না করে শ্বশুর মশায়কে সঙ্গে নিয়ে নিজেই বুলেরোটা ড্রাইভ করে বেরিয়ে পড়লেন খাতড়া কলেজের দিকে। খাতড়া কলেজে তনু দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। কলেজ গেটে নেমেই দুজনে সোজা গিয়ে ঢুকলেন প্রিন্সিপ্যালের চেম্বারে। উনাকে সব খুলে বললেন। প্রিন্সিপ্যাল স্যার দ্বিতীয় বর্ষ ইতিহাস বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী দেরকে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন তনুশ্রী চৌধুরীর ব্যাপারে কেউ কিছু জানে কি না। কিন্তু আশ্চর্য, তনুশ্রীকে একটি ছেলের সাথে মোটর সাইকেল আসা যাওয়া করতে প্রায় সকলেই দেখেছে কিন্তু ছেলেটির নাম ঠিকানা কারুরেই জানা নেই। ছেলেটি নাকি এই এলাকার ছেলেও নয়। কলেজে থেকে এর বেশি তেমন কিছুই জানতে পারলেন না বিক্রম বাবু।
        পাংশু মুখে বাড়ি ফিরে এসে স্ত্রী সুমিত্রার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বিক্রম বাবু যখন এক বর্ষা রাতের গল্প বলছিলেন তখন দর-দর করে দুচোখ বেয়ে ঝরছিল দীর্ঘ একুশ বছরের ইতিহাস, -‘জান সুমি তখন আমার যা রোজগার ছিল তাতে দুটো মেয়েকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখাটা সহজ কথা ছিল না। ওই তনুর জন্যই আমি সাইকেলে করে বস্তা বস্তা খড়িমাটি বেচতে গেছি কত সব নাম না জানা গ্রামে। বাবার দেওয়া হাত ঘড়ি, মায়ের এক জোড়া সোনার বালা, সব হাসি মুখে বিক্রি করেছিলাম । ওই তনুর ধোঁয়ায় অ্যালার্জি ছিল বলেই চিরদিনের জন্য বিড়ি সিগারেট ছেড়েই দিলাম।’
শুয়ে শুয়েই বিক্রম বাবুর ডান হাতটা ধরে সুমিত্রা দেবী বললেন, -‘তুমি এমন করে কাঁদলে আমি কেমন করে থাকি বল তো ? কেঁদো না, কেঁদো না। জানব আমি ওকে গর্ভে ধরিনি। আমাদের একটাই মেয়ে।’
–‘তুমি ভুল ভাবছ সুমি তনু চলে গেছে বলে আমি কাঁদছি না আমি কাঁদছি শুধু,- ওই পুচকে পুচকে দুটো হাত আমাকে কত সহজে একুশ বছর ধরে ঠকিয়ে গেল সেটা ভেবেই। আমাদের কোন সন্তান নেই সুমি আমাদের কোন সন্তান নেই।’ কাঁদতে কাঁদতেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে যান বিক্রম বাবু।

।।পাঁচ।।
অনুপের বাড়িটা তনুর বেশ ভালই লেগেছে দো’তলা হলুদ রঙকরা বাড়ি বড় লোহার গেট পেরিয়ে সরু মতো একটা রাস্তা ঢুকেছে বাড়ির দিকে। রাস্তাটার দুদিকে দেশি বিদেশি নানান ধরণের ফুলের গাছ লাগানো কত রকমের ফুলের বাহার। ফুল গুলোর উপর বসন্ত বাহক ছোট-বড় মৌমাছি গুনগুন করছে। বাড়িতে ঢোকার পথে ডান দিকের বাগানটার একপাশে একটা পাট কুয়ো। কুয়োটার উপর একটা ছোট মাপের পাম্প বসান আছে। বাগানের বাহার দেখেই বোঝা যায় অনুপ বেশ শৌখিন ছেলে। ঘরে ঢোকার মুহূর্তেই একজন বয়স্ক ভদ্র মহিলা বেরিয়ে এলেন একটা থালায় ধান দূর্বা প্রদীপ সাজিয়ে নিয়ে। তনু অবাক ভাবে দেখছিল মহিলাটিকে। তনু এসবের কিছুই জানত না অনুপ কিচ্ছুটি বলেনি। তবে তনুর চিনতে ভুল হয় না, মুক্তা মাসিকে । তনু অবাক হয়ে অনুপকে জিজ্ঞেস করল, -‘তুমি তো এসবের কিছুই বলনি। ইনিই মুক্তা মাসি তাই না ? অনুপ মুচকি হেসে তনুর কথায় ঘাড় নাড়ে শুধু।
এই মুক্তা মসিই দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটির সাথে সাথে অনুপকেউ দেখে আসছেউনার যত্নে ফুলের চারাগুলিও যে মাথা তুলেছে তা বুঝতে ভুল হয় না তনুর। নামের সাথে মাসি শব্দটার মতোই একটা মায়া এসে বসে গেছে চিরদিনের জন্য মুক্তা মাসির মুখে। অনুপ তখন সাত বছরের, যখন অনুপের মায়ের সাথে মুক্তা এই বাড়িতে আসে। অনুপের মা বাপের বাড়িতে গিয়েছিল অনুপকে নিয়ে শিবের গাজনে সেই সময় মুক্তা একদিন এসেছিল অনুপের মায়ের সাথে গল্প করতে। ঐদিনেই তার বৈধব্য জীবনের কাহিনি শুনিয়ে ছিল মুক্তা অনুপের মাকে। অনুপের মা সেসব শুনেই বলে ছিলেন,- আমার সাথে চল।’  না, বলেনি মুক্তা। সেই থেকে এখানেই আছে। অনুপের মা মারা যাবার পরে তিনি আর অনুপকে ফেলে যেতে পারেননি। এখন অনুপের বাবাও নেই অনুপও থাকে না বললেই চলে তাই বাড়ির পুরো দায় দায়িত্ব মুক্তার হাতেই। মুক্তা ধান দূর্বা আর একটা সোনার বালা দিয়ে আশীর্বাদ করে তনুকে তারপর প্রদীপের আলো বরণ করে নেয় বাড়ির লক্ষ্মীকে। তনু মুক্তা মাসির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই তিনি তনুর কপালে চুম্বন করে বলে, -‘দুজনে সুখে শান্তিতে থেকো মা।’ তারপর একটা সোনার বালা তনুর ডান হাতে পরিয়ে দিয়ে আবার বলে, -‘এই সোনার বালাটা তোমার শাশুড়ি মায়ের মারা যাবার আগে আমাকে দিয়ে বলেছিল, বৌমায়ের মুখ দেখে এটাই দিবি।’ অনুপও মাসিকে প্রণাম করে তনুর পিছু পিছু।
ওটা তোমার শাশুড়ি মায়ের ছবি উনাকে প্রণাম কর মা।’ দেওয়ালে ঝোলান অনুপের মায়ের ছবির দিকে আঙুল বাড়িয়ে কথাটা বলে মুক্তা মাসি। তিনজনে ছবিটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখ দুটো জলে ভরে আসে অনুপের।

পল্লবের সাথে সন্ধ্যায় কোথায় বেরিয়েছে অনুপ এদিকে মুক্তা মাসি হবু বৌমায়ের জন্য পায়েস বানাচ্ছেন রান্না ঘরে। তনু একা একাই এসে দাঁড়ায় খোলা মেলা ছাদে আকাশে টিপ পরার মতো করে চাঁদ উঠেছে দূরের পলাশ জঙ্গলটার উপর। চাঁদের আলো পড়ে পুকুরের জলের যে অংশটা ঝিলমিল করছে সেদিকে তাকিয়ে থাকে তনু। বাবা-মাকে এমন ভাবে কাঁদিয়ে আসার ইচ্ছে তারও কোনওদিনেই ছিল না হয়তো কলেজ বন্ধ করে মোবাইলটা কাড়িয়ে নেওয়াতে তনু অনুপকে হারানোর একটু বেশিই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। জ্যোৎস্না মোড়া পুকুরটার দিকে তাকিয়ে আজকে তনুর কত কথায় না মনে পড়ে যাচ্ছে। স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হওয়ায় মায়ের না খেয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শরীর খারাপের সময় মা বাবার রাত জেগে বসে থাকা বিশেষ করে মনে পড়ছে সেই সন্ধ্যাটার কথা, তখন তনুর বয়স ১১-১২ বছর হবে হয়তো। তনু বাড়িতে না বলেই গিয়েছিল পাশের পাড়ার বান্ধবী নমিতাদের বাড়ি। সেদিন নমিতার জন্মদিন ছিল। বিকেল হতে না হতেই শুরু হল ঝম ঝম করে ঝড় বৃষ্টি বাড়িতে খবর দেবার কোন উপায় ছিল না। সেদিন বিক্রম বাবু সবার বাড়ি গিয়ে গিয়ে রাত্রি ন’টা নাগাদ নমিতাদের বাড়ি এসে তনুকে খুঁজে পেয়েছিলেন। সেদিন তিনি তনুকে একটুও বকাবকি করেননি কোলে নিয়ে শুধু বলেছিলেন, -‘একবার বলে আসতে পারতে মা আমাদের কত চিন্তা হচ্ছিল ভাবো।’ সেদিন তনু প্রথম দেখেছিল বাবার ভিজে যাওয়া চোখ দুটোকে।
        তনুর ভাবানার ভেলাটা ছিন্নভিন্ন হয়ে এলোমেলো ভাসতে থাকে। একটা অপঠিত দুশ্চিন্তায় ওর বুক দুটো কেঁপে চলে অবিরাম। চাঁদটা তখন পলাশ বাগানের উপর থেকে সরে গিয়ে পুকুর পাড়ের কাছা কাছি এসে দাঁড়িয়েছে। চারিদিকে পড়ে আছে থোকা থোকা জ্যোৎস্না। একটু পাশ ফিরে তাকাতেই তনুর চোখে পড়ে একটা সবুজ পাহাড় এক মুঠো জঙ্গল পেরিয়েই পাহাড়টা। খুব বেশি হলে মাইল চারেক হবে হয়তো। পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে চঞ্চল মনটায় কোথাও যেন একটা শান্তি পায় তনু। যেন ছোটবেলা থেকেই এই পাহাড়টা ওর চেনা। আসলে কিশোরীবেলা থেকেই বন-পাহাড়-নদী, তুষার ঢাকা পর্বত-নীল সমুদ্র তনুকে টেনে নিয়ে যেত বিভূতি ভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’-এ। সে যেন দেখতে পেত সেই আগ্নেয় পর্বতটাকে পিছনে ফেলে শঙ্কর-আলভারেজ ছুটছে পশ্চিমের পাহাড়টার দিকে।
-‘তনু, এই তনু তুমি এখানে একলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছ ? ওদিকে আমি সারা বাড়ি তোমাকে খুঁজে ফিরছি। ঠিক জানতাম বাড়িতে মন বসবে না তোমার ? দুহাতে করে তনুর গালদুটোকে তালু বন্দি করে অনুপ।
হঠাৎ অনুপ এসে পড়ায় একটু ঘাবড়েই গিয়েছিল তনু। ভাবখানা এমন যেন ভাবনার ভেতরে ডুবে ডুবে কিছু চুরি করছিল। কয়েক সেকেন্ডে নিজেকে সামলে নিয়ে তনু বলে,-‘না রে বাবা জ্যোৎস্নার আলোটা খুব সুন্দর লাগছিল তাই ছাদে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
-‘মা বাবা বোনের জন্য মন খারাপ করছে তাই না ? তনুর মাথাটা বুকে নিয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করে অনুপ-‘বেশি না, একটু একটু করছে।’
-‘দাঁড়াও অনুকে একটা ফোন করি।’
ভয় পেয়ে যায় তনু, -‘না না, একদম না ওদিকে কি চলছে ভগবান জানেন। আগে ভালই ভালই বিয়েটা চুকুক।অনুপের বুকের থেকে নিজেকে আলতো ভাবে মুক্ত করে কথাগুলো বলে তনু। তারপর ছাদের এক কোনা গিয়ে দাঁড়ায়
-‘আচ্ছা তনু সত্যি বলবে, তোমার কেন আমাকে ভালো লেগেছিল ? যতবার জিজ্ঞেস করেছি তুমি বলেছ ভালবাসার কোন কার থাকে না মানলাম তেমন কারন হয়তো থাকে না। তবুও কিছু একটা ভাললাগার থেকেই তো ভালবাসাটা জন্মায় বলো ?
-‘আগে তুমি বলো তোমার কেন ভাল লাগল আমাকে ? আমি তো তেমন আহামরি কিছু দেখতেও না সেই তুলনায় তুমি আমার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর তোমার সুন্দরি মেয়ের অভাব হত না। অনুপের দিকে পিছন ফিরেই প্রশ্নটা করে তনু।
এই সব জটিল প্রেমতাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা মোটেই সহজ কথা নয় উত্তর তৈরি হবার আগেই প্রশ্ন তার রঙ বদলে নেয়। আবার আজকের দেওয়া উত্তরে কাল মন ভরে না। কত ছোট ব্যাপার মনে ধরে যায় আবার কত বড় ব্যাপার চোখেই পড়ে না। কত ছোটো জিনিসেই ভাললাগার হাত ধরে সম্পর্ককে টেনে নিয়ে যায় ভালবাসার সাগরে আবার কত বড় জিনিস মনের আঙিনায় ভাললাগাও তৈরি করতে পারে না।
-‘সত্যি বলতে আমি নিজেও জানি না কেন তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রথম বারেই আমার মনে হয়েছিল ওই দুচোখে আমার জন্য ভালবাসার ভাঁড়ার সাজান আছে আর একটা গোপন কথা বলব যদি না কিছু মনে কর ?’ 
-‘মনে করব আবার কেন বল না কি বলবে ? তনুর দু’চোখে প্রশ্ন চিহ্ন ফুটে ওঠে। 
-‘প্রথম যেদিন তুমি আমার মোটর সাইকেলে চেপেছিলে জানি না কেন আমার সারা শরীর জুড়ে কেমন একটা হচ্ছিল ঠিক বোঝাতে পারব না কিন্তু অমন অদ্ভুত অনুভূতি আগে কখনোই হয়নি।’
-‘তুমি না একটা ছাগল।’ তনুর গালদুটো লজ্জায় রাঙিয়ে যায়। চাঁদের আলোতে সেটা অনুপের দৃষ্টি এড়ায় না
-‘জানতো তনু ওই নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকার সময় যখন তুমি আমার ঠোঁটে…
-‘অনুপ ভাল হবে না বলছি এবার কিন্তু সত্যি সত্যি রেগে যাব।’
-‘আজকে রাতে স্বপ্নে আমার ঠিক ওই রোগটা আবার…
-‘তুমি এত অসভ্য জানলে আমি কোনদিনেই তোমার সাথে অন্তত বাড়ি ছাড়তাম না।’ লজ্জায় তনু ছাদের আরেকটা কোনে গিয়ে দাঁড়ায়। অনুপের কথাগুলো তনুর সারা শরীর জুড়ে একটা অচেনা শিহরণ জাগিয়ে দিয়েছে।
‘বাড়ি ছাড়তাম না’ কথাটা তনু লজ্জা পেয়ে হেঁয়ালি করেই বলেছে। তবুও ওই ছোট্ট কথার একটা টুকরো অনুপ কে আঘাত করে মন খারাপের রাজ্যে ছুড়ে ফেলে দেয়। দুজনেই বেশ কয়েক মিনিট চুপ করে থাকার পর তনুই এগিয়ে আসে অনুপের দিকে। বুঝতে পারে অনুপের কোথাও একটা খারাপ লেগেছে তাই চুপ করে গেছে। নতুবা অনুপ চুপ করে থাকার ছেলেই নয়। অন্তত এমন মুহূর্তে, প্রেম যখন শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। তনু আগেও দেখেছে অনুপের কোন কারণে মন খারাপ হলে সে চুপচাপ দূরের দিকে তাকিয়ে মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করে। ইকোপার্কে বসেও মাঝে মাঝে অনুপ এমনটাই করত। কাছে এসেই তনু দেখে, অনুপ দূরের আলোআঁধারি বাড়ি গুলোর দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে আর ওর দুই গাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে অভিমানী জলের ধারা। দু’তিন পা ছুটে এসে তনু অনুপকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। এভাবে চুপচাপ আরও কয়েক মিনিট পেরিয়ে যায়।
-‘এই ছাগল তুমি রাগ করেছ ? তনুই রাত্রির নীরবতা ভেঙে প্রশ্নটা করে। অনুপ উত্তর দেয় না দেখে তনু আবার বলে, -‘তুমি যদি কাঁদতেই থাক তাহলে আমিও কিন্তু কেঁদে ফেলব বলছি। আমি এমন কি বললাম যে তুমি এতটা কষ্ট পেলে বিশ্বাস কর আমি তোমাকে কষ্ট দেবার জন্য একটা কথাও বলিনি।’ তনুর চোখ-দুটোও এবার সজল হয়ে ওঠে
-‘তনু সত্যিই কি আমি এতটাই খারাপ যে কেউই ভরসা করতে পারে না আমাকে
-‘তুমি এমন করে বলছ কেন অনুপ ? আমি তো তেমন কিছুই বলিনি কে তোমাকে ভরসা করতে পারে না ? আমি তো তোমার ভরসাতেই বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিলাম
-‘না না তুমি কেন হবে আমি সংগঠনের কথা…
-‘কোন সংগঠন ? অনুপকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই প্রশ্নটা করে তনু।
অনুপ কথাটা পাল্টে তনুর চোখে চুমু খেয়ে বলে, ওসব কথা পরে হবে চল খাবার নিয়ে মাসি অপেক্ষা করে বসে থাকবে হয়তো কথাটা বলেই এক রকম ভাবে ছুটেই নীচে চলে যায় অনুপ। কোন সংগঠনের কথা বলতে গিয়েও চেপে গেল অনুপ সেটা বুঝতে পারে না তনু।
        আগেও অনুপ একবার কোন দলের কথা বলতে চেয়েছিল তনুকে কিন্তু সেদিনও কিছুই বলেনি, ‘থাক, পরে বলব’ বলে চুপ করে গিয়েছিল সেদিনও। সেদিন তনু কথাটা তেমন আমল দেয়নি। আজকে অনুপের আচরণটা একটু অন্য রকম লাগে তনুর চোখে। অনুপের মন খারাপ হলে সে উদাস হয়ে পড়ে ঠিক কথাই আবার তনু যখন আদর করে তখন সব উদাসী হাওয়া কেটে আলোর রেখা বেরিয়ে আসে অনুপের ঠোঁট বেয়ে। আজকে তনু লক্ষ্য করেছে শেষ দিকের কথাগুলো বলবার সময় কেমন যেন কাঁপছিল অনুপ। অনুপের দুটো চোখেই একটা ক্রুদ্ধ রেখা পরিষ্কার দেখেছে তনু। আজকে অনুপের ঠোঁটেও না ছিল কোন হাসির রেখা না ছিল কোন আলোর ঠিকানা। হঠাৎ একটা রহস্য মাখানো গন্ধ এসে যেন তনুর নাকে মুখে ঝাপটা মেরে যায়।
                                               
।।ছয়।।
মুক্তা মাসি আজকে অনেক কিছুই রান্না করেছেন। উনি চানা অনুপ বা তনু কেউ আজকের দিনে মা এর অভাব অনুভব করুক। যদিও তনু রাত্রিতে তেমন কিছুই খায় না, তবু আজকে থালা পরিস্কার করেই সব খেয়েছে। হয়তো একটু জোর করে। পাছে না খেলে মাসি খারাপ কিছু ভেবে বসে। অনুপ খেতে বসে চুপচাপ খেয়ে গেল, মুখে একটি কথাও বলল না হাত ধুয়ে উপরের ঘরে যাবার সময় শুধু বলে গেল,-‘মাসি, তনুর শোবার ব্যবস্থা দক্ষিণের ঘরটাতে করে দিও আমার আজকে অনেক কাজ আছে। কাজগুলো সেরে আমি পড়ার ঘরেই শুয়ে পড়ব। তনু আজকে তুমিও ক্লান্ত তাই বেশি রাত জাগতে হবে না আজকে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বে শুভরাত্রি। কথাগুলো বলেই সিঁড়িতে চপ্পলের শব্দ তুলে উপরে চলে যায় অনুপ।
        অনুপের এমন অদ্ভুত আচরণে মনে মনে তনু যথেষ্ট বিরক্ত হয় অনুপের বাড়িতে প্রথম রাত কাটানোর স্বপ্ন তনু অনেকবার দেখেছে। সেই স্বপ্নগুলোর সাথে আজকের রাতটার তেমন মিল খুঁজেই পেল না তনু। তনু ভেবেছিল আজকের রাতটা অনুপের মাথাতে হাত বোলাতে বোলাতে গল্প করেই কাটিয়ে দেবে না বলা সব গল্পগুলো আজকেই বলবে অনুপকে। কিন্তু তা আর হবে না।
-‘কী এত ভাবছ মা, বাড়ির জন্য মন খারাপ করছে ? তনুর থালাতে আরও অল্প পায়েস দিতে দিতে প্রশ্নটা করে মুক্তা মাসি। চমক ভাঙতেই তৎক্ষণাৎ তনু উত্তর দেয়, কোনদিন মা-বাবাকে ছেড়ে থাকিনি তো তাই আজকে একটু…
-‘মন খারাপ হওয়াটা তো অনুচিত নয় মা।’  
-‘আচ্ছা মাসিমা অনুপ আপনাকে কখন জানাল আমরা আসছি বলে ?’
-‘আমাকে তো কালকে বিকেলেই ফোন করে সব বলেছিল।’
-‘আপনিই তো অনুপকে মানুষ করেছেন কোলে পিঠে অনুপ যখনি বাড়ির কথা বলত তখনি মা আর মুক্তা মাসিরেই গল্প শুনতাম শুধু। আচ্ছা মাসিমা একটা কথা জিজ্ঞেস করব ?’
-‘কথা পরেও তো হবে মা আগে ভালো করে খেয়ে নাও এখন।’
        তনু আর কথা না বাড়িয়ে অবশিষ্ট পায়েসটুকু খেতে খেতে অনুপের হঠাৎ পরিবর্তনের কারণটা খুঁজতে থাকে। আজকে অনুপের বাড়িতে প্রথম রাত তনুর অথচ তনুর খাওয়া শেষ হওয়া অবধি অনুপ অপেক্ষাও করল না! এটাও তনুর কাছে কম অভিমানের নয়।
খাওয়া সেরে তনু বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। তাকিয়ে দেখতে থাকে ফুল গাছ গুলোকে চাঁদের আলোতে রঙবাহারি ফুলগুলোকে দারুণ দেখতে লাগছে। কয়েকটুকরো মেঘকে চাঁদের পাশ দিয়ে পায়ে পায়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে একটা ঠাণ্ডা বাতাস। তনুর মনে হল মেঘগুলো যেন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে ছিল, আর বাতাস ওদের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাড়ির পথে। পাশের রান্না ঘরের বেসিন থেকে তখনো ভেসে আসছে মুক্তা মাসির বাসন ধোয়ার টুং-টাং শব্দ। বাইরের জ্যোৎস্না জোয়ারে গা-ডুবিয়ে মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে ডাহুক-পিউকাঁহা পাখি। কত রাত তনু এই সব পাখিদের মন কাঁদানো ডাকে হারিয়ে গেছে কল্পনায় দেখা একটা নদী আর ঝাঁও গাছের জঙ্গলে। মাধ্যমিক –উচ্চমাধ্যমিক বয়সে ইতিহাস বই পড়তে পড়তে তনু অনেক রাত অবধি শুনত নানান পাখির কাকলি। সেই রাতগুলোই যেন ফিরে এসেছে অনুপের বাড়ির আঙিনায়।
-‘মা, অনেক রাত হয়ে গেছে আজকে অন্তত শুয়ে পড়বে যাও কাল থেকে তোমাদের শরীরের উপর দিয়ে অনেক ধকল পেরিয়েছে। রাত জাগলে শরীর খারাপ হয়ে পড়তে পারে।’
তনু খেয়ালেই করেনি কখন মুক্তা মাসি পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, -‘আমার এত তাড়াতাড়ি ঘুম আসতে চায় না মাসিমা সেই বিছানায় শুধু শুয়ে-শুয়ে এপাশ ওপাশ করা। তার চেয়ে কি সুন্দর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখছি।’   
এক চিলতে হেসে মুক্তা মাসি বলেন,-‘এক্কেবারে পাগলি মেয়ে জান তো মা আমারও একটা মেয়ে ছিল ওই অনুপের সম বয়সি। তালের পিঠে খাবার খুব সখ ছিল মেয়েটার। ওই লোভেই একদিন খুব ভোর ভোর উঠে ছুটেছিল তাল কুড়োতে। সেই যে গেল...’ কথাগুলো জিবে জড়িয়ে যায় মুক্তা মাসির। শাড়ির খুটে করে চোখের জল মোছে
-‘তারপর কী হয়েছিল মাসিমা ? ইতস্তত করেই প্রশ্নটা করে তনু।
-‘সেদিন ভোরেই সাপকাটি হয়ে মেয়টা মারা যায় শেষ দেখারও সুযোগ দেয়নি ভগবান এক মুখ ফ্যান নিয়ে প্রতিমা আমার তাল গাছের নীচেই মরে পড়েছিল। শেষ রাতে পড়া বলতে না পারার জন্য আমি ওকে মেরেও ছিলাম মেয়েটা মায়ের উপর রাগ করে চলেই গেল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ক্যান্সার রোগ এসে সিঁদুরটাও দিল মুছে।’ কথাগুলো বলতে বলতেই নিজের ডান হাতটা বারবার দেখছিলেন মুক্তা মাসি হয়তো নিজের ভাগ্যরেখাটাকে খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। মাসিমার মুখের দিকে তাকিয়ে তনু একটা কথাও বলতে পারে না ঠাই দাঁড়িয়ে থাকে পাথরের মূর্তির মতো
-‘যাও মা শুয়ে পড়বে যাও ভালই রাত হল।’ আবছা আলোতেও তনু দেখতে পায় মাসির চোখ বেয়ে জলের রেখা গড়িয়ে নামছে। একদিনের যৎসামান্য আলাপে দুই নারী দুই নারী বুকের কত গভীরে চলে এসেছে নিজেরাও তার পরিমা জানে না।
        অনেক চেষ্টার পরেও ঘুম আসছিল না তাই জানালা দিয়ে দূরের বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল তনু। আজকে শুধু ছোটবেলার স্মৃতিগুলো দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে নামছে। শুয়ে শুয়ে বাবার মুখটা খুব মনে পড়তে লাগল তনুর। এমন সময় দূরের পুকুর পাড়ের ওপার থেকে এক দল শেয়াল ডেকে ঠে হুক্কা হুয়া করে।
        শুয়ে-শুয়ে নড়বড় করতে করতেই কখন যে তনুর তন্দ্রা চলে এসেছিল নিজেই বুঝতে পারেনি হঠাৎ নীচের বারান্দায় কাদের কথা বলার আওয়াজ শুনেই হয়তো ঘুমটা ভেঙে গেল। ভয়ে ভয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিল তনু তেমন পরিষ্কার ভাবে না হলেও দেখল চারজন লোক দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ভয় পেয়ে যায় তনু। চোর নয় তো ?
অনুপকে পাশের ঘরে গিয়ে ঘুম থেকে তুলবে কি না এটাই ভাবছিল তনু ঠিক এমন সময় শুনতে পেল অনুপের গলার আওয়াজ। হাঁ নিচ থেকেই ভেসে এলো আওয়াজটা। তনু কান খাড়া রেখে নীচের থেকে ভেসে আসা হালকা শব্দগুলোকে কানে ধরার চেষ্টা করল।
-‘এই সপ্তাহে করতে হবে’ আর ‘আমি ছেড়ে দেব ভাবছিকথা দুটো ছাড়া আর তেমন কিছুই শুনতে পেল না তনু, অনেক চেষ্টা করেও না
        কাদের সাথে অনুপ এত রাতে কথা বলছিল ? কি করতে হবে এই সপ্তাহে ? কে কী ছেড়ে দেবে কিছুই মাথা মুণ্ডু খুঁজে পেল না তনু। কেমন যেন একটা অচেনা ভয় বুকে জাঁকিয়ে বসে গেল তনুর। অনেক চেষ্টা করেও যখন ঘুম এলো না তখন আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে চন্দনের ঘরে উঁকি মেরে দেখল তনু। ঘরের লাইটটা জ্বলছে আর ঘরের মেঝেতে মাথায় হাত রেখে চুপ চাপ বসে আছে অনুপ। গোটা মুখ জুড়ে একটা দুশ্চিন্তার প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে। একবার ভাবল কী হয়েছে অনুপকে জিজ্ঞেস করবে পরে আবার ভাবল না থাক, দুটো দিন আগে দেখি কী ব্যাপার তেমন সন্দেহ জনক কিছু দেখলে জিজ্ঞেস করা যাবেআবার পা টিপে টিপে তনু নিজের ঘরে ফিরে আসে
পরদিন সকালে যখন তনুর ঘুম ভাঙল তখন ঘড়ির কাঁটা ন’টার ঘর ছুঁই-ছুঁই করছে ফুলের বাগানে বেশ কিছু পাখি ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়ছে এদিক সেদিক। বিছানা থেকে উঠে বসল তনু ভাল করে ঘুম না হওয়ার ক্লান্তি এখনও চোখে মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বিছানাটা গুছিয়ে রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল তনু। দুহাত দিয়ে চুলগুলোকে একটু ঠিক ঠাক করতে যাবে এমন সময় পিছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ, -‘সুপ্রভাত কালকে ঘুম কেমন হয়েছে তোমার ? পিছন ফিরে তনু দেখল, একটা সাদা পাঞ্জাবির উপর মেরুন রঙের হাফ শুয়েটার চাপিয়ে পাজামার রশিটা বাঁধতে বাঁধতে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে অনুপ।
-‘সুপ্রভাত ভালই ঘুমিয়েছি। ঘুম ধরতে একটু রাত হয়েছিল এই যা। কিন্তু তুমি এত সকালেই স্নান করলে যে ? কোথাও যাবে নাকি ?’ চুলটা বাঁধতে বাঁধতে জিজ্ঞেস করল তনু।
-‘না এখন কোথাও যাব না পরে একবার বেরোব।
সকালে অনুপের চোখে-মুখে গত কালকে রাতের কোন ছাপেই খুঁজে পেল না তনু। বরং বেশ খুশি গড়িয়ে পড়ছে অনুপের চোখ মুখ বেয়ে। কোথাও কোন ভয়ের প্রতিবিম্ব নেই। নেই কোথাও সামান্যতম অন্ধকার।
-‘কী দেখছ তনু অমন করে আমার মুখে ? কয়েক পা এগিয়ে এসে প্রশ্নটা করল অনুপ।
-‘না, তেমন কিছুই না। দেখছিলাম পাঞ্জাবিতে তোমাকে বেশ মানিয়েছে।
-‘যাও ফ্রেস হয়ে নেবে। মাসি জল গরম করেই রেখেছে স্নানটাও সেরে ফেলতে পার। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তনু কিন্তু অনুপ কথাটা বলেই বাইরে বেরিয়ে গেল
        সকালের আলোয় চারদিকটা ভরে গেছে কানায় কানায়। জানালা পথে তনু দেখতে পেল পুকুরের পাশ দিয়ে এক সব্জি ওয়ালা পেরিয়ে যাচ্ছে। সাইকেলে ঝুলছে সব্জির ব্যাগগুলো পিছনের ক্যারিয়ারেও ঝুড়ি ভরতি সব্জি। তনুর চোখে ভেসে উঠল অনেক দিন আগের একটা ডোরাকাটা ছবি যখন তনুর বাবা সাইকেলে করে খড়িমাটি নিয়ে যেত দূর গ্রামের দিকে। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তনুর দু’চোখ ঝাপসা হয়ে ভাসতে লাগল ফেলে আসা স্মৃতির ভেলায়।
        আজকে সন্ধ্যার সময় তনু অনুপের পড়ার ঘরের বিছানায় বসেই হীরেন চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাতের রজনীগন্ধা’ উপন্যাসটায় চোখ বোলাচ্ছিল। অনুপ পাশেই একটা চেয়ারে বসে টেবিলে রাখা কম্পিউটারে গুগল ম্যাপ স্যাটেলাইট ভিউ খুলে মনোযোগের সঙ্গে দেখছিল কোন একটা গ্রামের ছবি। ঠিক তখনি অনুপের মোবাইলটা বেজে ওঠ। নাম্বারটা দেখেই মোবাইলটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায় অনুপ। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে চুপটি করে চেয়ারে বসে পড়ে। তনু লক্ষ্য করে আবার অনুপের চোখে মুখে একটা অস্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু ঠিক কালকে রাতের মতো নয় আজকে যেন অনুপের চোখে ভয়ের কণা মাত্র নেই। হিংস দেবতার মতো চোখ দুটো যেন কম্পিউটার টাকে গিলে ফেলবে। নাক দিয়ে বেশ জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়তে থাকে অনুপের। ভয়ে বিস্ময়ে তনুর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে হিম হয়ে যায়। অনুপের এমন ছবি তনু কখনও দেখা তো দূরের কথা হয়তো কল্পনাতেও ভাবতে পারত না। চেয়ার থেকে উঠে এসে অনুপ তনুর পাশেই বিছানার উপর ধপাস করে বসে পড়ে। তারপর তনুর কাঁধ দুটোকে ঝাঁকিয়ে বলে, -‘তনু আমরা কি সত্যি স্বাধীন ভারতের স্বাধীন নাগরিক ?
এমন প্রশ্নের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না তনু, তাই ঘাবড়ে গিয়ে বলে,- মানে ?
অনুপ আবার চতুর্গুণ উত্তেজনার সাথে বলে, -‘তুমি কি স্বাধীন ভারতের স্বাধীন নাগরিক তনু ?
তনু কিছুই বলতে পারে না। ভয়ে তখন তার ভেতরটা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। তনুর কাঁধ ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় আনুপ। জানালার বাইরে চোখ রেখে বলতে থাকে, -‘সাদা চামড়ার চাবুকে মারলেও ব্যথা লাগে কালো চামড়ার হলেও লাগে ঘরের লোক মারুক আর পরের লোক মারুক ব্যথা লাগেই। যে শেয়াল গুলো ১৫-ই আগস্ট ২৬-শে জানুয়ারি পতাকা উত্তোলন করল তারাও স্বাধীন যে বাচ্চাগুলো ওই শেয়ালের ফেলে যাওয়া খাবারের টুকরো কুকুরের সাথে ভাগ করে খেল তারাও স্বাধীন। কিছুক্ষণ উদাসীন ভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার আপন মনেই একটা কবিতা আওড়ে চলে অনুপ,-
হে আমার স্বাধীন দেশের পর্ণগ্রাফিতে ভেসে যাওয়া
পরাধীন ভারতবাসী, তোমরাই ধর্ষণ করে
দাঁড়িয়ে যাও রাস্তায় দলে দলে মোমবাতি মিছিলে
কোনওদিন কি ভেবেছিলে ? তোমার শিশ্নের চাবুকে পুড়ে
যে মেয়েটি পড়েছিল ফুটপাতে। সেও ১৫-ই আগস্ট মানিয়েছিল
গেরুয়া সাদা সবুজ পতাকা ২৬-শে জানুয়ারি, তোমারই সাথে।
কবিতাটা বলতে বলতে অনুপের চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে। তনু বুঝতে পারে অনুপের কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু সেটা ঠিক কী তা বুঝতে পারে না তবুও অনুপের কাছে এসে বলে,-‘একটু শান্ত হয়ে বস অনুপ কী হয়েছে তোমার বল আমাকে। আমার যে খুব ভয় করছে।
অনুপ আর কোন কথা বলে না। দু’বাহুর ভেতরে তনুকে জড়িয়ে নিয়ে পাগলের মতো তনুর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট দুটো ভরে দেয়। তখনও অনুপের চোখে ঝরেই চলেছে শ্রাবণের উষ্ণ নোনা জলের ধারা। এভাবে কিছু সময় পেরিয়ে যাবার পর যখন দুজনেই বাস্তবের মাটিতে ফিরে আসে, তনু বলে, -‘তোমার কি হয়েছে বলবে না আমাকে ?
অনুপ তনুকে আরও একটা চুম্বন করে বলে, -‘তোমাকে ছাড়া কাকেই বা বলব ?’
-‘তাহলে বল।’
অনুপ তনুকে বিছানায় বসিয়ে ওর মাথাটা বুকে নিয়ে বলে, -‘এখন নয় রাত্রিতে অনেক কথা বলব বিয়ে করার আগে কথাগুলো তোমার জানাও দরকার। সব শোনার পরেও তোমার যদি মনে হয় তুমি আমাকে বিয়ে করতে পারবে তাহলেই…, নতুবা তুমি যা বলবে তাই হবে।
তনু দু’হাতে করে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে অনুপকে, -‘তোমাকে বিয়ে করতে না পারলে হয়তো আমি বেঁচেই থাকব অনুপ, কিন্তু তোমার তনু সত্যি মারা যাবে।
অনুপ সোহাগে তনুর মাথায় চুমু খেয়ে বলে, -‘জানি না তনু আমি কতটা লোভী তবে এটুকু জানি আমার লোভের কারণ তোমার ভালবাসা ছাড়া দ্বিতীয় কিছু নয়। তবে তোমাকে আমার সম্পর্কে সব না জানিয়ে এখানে আনাটা ঠিক হয়নি কী জানি হয়তো হারাবার ভয়ে কিছুই বলিনি। আজকে বলব সব বলব। যদি হারিয়েও ফেলি তাও বলব। আমাকে বলতেই হবে নতুবা শান্তি পাব না।
দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ বসে থাকে। কোন শব্দ নেই আর। শুধু দুটো হৃদয় সব হারানোর ভয়ে বিপ-বিপ করতে থাকে দেওয়াল ঘড়িটার টিক-টিক শব্দের সাথে।

অনুপ নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তনু ছাদে এসে চাঁদটার দিকে তাকিয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে। কী বলবে আজকে রাতে অনুপ ? এই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে তনুর ভাবনার মেঘগুলোকে টুকরো টুকরো করে দিয়ে যায় বারবার। হাত জোড় করে তনু ভগবান কে বলে, -‘জীবনটা শুরুর আগেই শেষ করে দিও না প্রভু আমাকে শক্তি দাও আমি যেন অনুপের সব কথা সইতে পারি। সে যতই কোঠর হোক না কেন। হে ঈশ্বর আমি যেন কোন পরিস্থিতিতেই অনুপের হাত না ছাড়ি।
পিছন থেকে মুক্তা মাসি এসে তনুকে জিজ্ঞেস করেন, -‘মা তোমার শরীর ভালো আছে তো ? সন্ধ্যায় নীচেও এলে না কিছু খাবারও খেলে না। অনুপের সাথে কী কিছু…
-‘না না মাসিমা ওর সাথে আবার কী হবে বাড়ির জন্য মনটা খারাপ ছিল বিকেল থেকে তাই আর খেতে ইচ্ছে করল না।’ কথাটা মাসিকে শেষ করতে না দিয়েই উত্তর দেয় তনু।
মুক্তা মাসি একটু হেসে বলেন, -‘ও তাই, আমি ভাবলাম অনুপের সাথে কিছু...। আচ্ছা মা অনুপ তোমাকে ওর মা বাবা আর আমার ব্যাপারে কী কী বলেছে ?
-‘তেমন কিছুই না একটা কথা প্রায়েই শুনি মা মারা যাবার পর মুক্তা মাসির কাছেই আমি মানুষ। মন খারাপ হলে দেখেছি চুপচাপ মাকে মনে করে। মা এর চিতায় জল ঢালার মুহূর্তটা এখনও ওর মনে আছে। বাবার কথা কিছুই বলে না জিজ্ঞেস করলেও এড়িয়ে যায়। এই সবই টুক-টাক কয়েকটা জিনিস জানি বিশেষ কিছুই না।
-‘ওর মা প্রভাতী ছিল নারী মুক্তি আন্দোলনের খুব বড় নেত্রী একটা সময় লোকের মুখে মুখে প্রভাতীর নাম ঘুরত। সবাই বলত নতুন যুগের প্রভাতী। যেখানেই নারীর উপর অন্যায় বা অত্যাচার হত সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ত প্রভাতী।’ অবাক ভাবে তনু তাকিয়ে থাকে মাসিমার মুখের দিকে মুক্তা মাসি বলে যান, -‘অত্যাচারের খবর পেলেই প্রভাতীর চোখে যেন আগুন খেলে যেত। এখনও ওর মুখটা মনে পড়লে ভেতরে একটা সাহস পাই। কত অপরাধী শাস্তি পেয়েছে ওর হাত ধরেই।’
অনুপের মা-এর গল্প শুনে তনুর ভেতরেও কোথাও যেন একটা সাহসের বীজ পাতা মেলার জন্য মাথা তুলে দাঁড়ায় মনের মাটিতে। তনু অনুপের বাবার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিল কিন্তু অনুপ চলে আসায় আর সেটা হয়ে উঠল না।
-‘আচ্ছা তোমরা দুজনে গল্প কর আমি ততোক্ষণে তরকারিটা চাপিয়েদি।’ কথাটা বলেই ছুটে মুক্তা মাসি নীচে চলে যা
আগামীকাল দোল পূর্ণিমা আকাশ জুড়ে যেন রানী সেজে বসেছে চাঁদটা আজকে থেকেই। অনুপ তনুর পাশে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, -‘তোমার ঠাণ্ডা লাগছে না তনু ? আজকে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে কিন্তু।
তনু ঠোঁটে এক টুকরো হাসির রেখা এঁকে বলে, -‘যার ভেতরে আগুন জ্বলছে সে কী ঠাণ্ডা বাতাসকে ভয় পায়।
তনুর কথায় হাসতে হাসতে অনুপ বলে, -‘আচ্ছা তনু প্রমিথিউস কে ছিলেন জান ?
-‘না তেমন ভাবে জানি না। তবে গল্পে পড়ে ছিলাম মানুষের জন্য আগুন চুরির অপরাধে তার শাস্তি হয়েছিল।
-‘গল্পটা পুরো মনে আছে ?
-‘না পুরো মনে নেই।’ একটু ভেবে উত্তরটা দেয় তনু।
-‘শুনবে প্রমিথিউসের গল্প ?
বেশ কৌতূহলের সাথেই তনু বলে, -‘শুনব না কেন ? শুনব।
তনুর কাঁধে হাত রেখে ছাদের আরেক দিকে হাঁটতে হাঁটতে গল্পটা বলতে থাকে অনুপ, -‘প্রমিথিউস যা লাতিন উচ্চারণে প্রোমেথেউস গ্রিক পুরাণের দেবতা। তিনি ছিলেন টাইটান দেবতা ইয়াপেতুস ও ওশেনিড ক্লাইমেনের সন্তান। গ্রিক পুরাণ অনুসারে প্রমিথিউস একজন টাইটান বলতেই পার। যাকে বলা হত মানুষের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। প্রমিথিউস এবং তার ভাই এপিমেথিউসকে মানুষের জীবন ধারণের সমস্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছিল। আদেশ অনুসারে এপিমেথিউস প্রাণীদের সাহস, শক্তি, দ্রুতি এবং পালক, চুল ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক উপাদান সরবরাহ করেন। কিন্তু যখন প্রাণী কুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন উঠল তখন এপিমেথিউস ভাই প্রমিথিউসের সাহায্য চাইতে বাধ্য করা হল। প্রমিথিউস মানুষকে আর সব প্রাণী থেকে শ্রেষ্ঠতর করার জন্য তাদের সোজা হয়ে চলতে শেখালেন এবং অন্যান্য জীব থেকে মানুষকে উন্নতর বলে ঘোষণা করলেন। তারপরেই তিনি নিজে স্বর্গে যান এবং মানুষের জন্য সূর্যের কাছ থেকে মশাল জ্বালিয়ে আনেন। মানুষকে আগুন উপহার দেন। মানুষকে প্রমিথিউসের এই উপহার মেনে নিতে পারেননি দেবতা জিউস। শাস্তি স্বরূপ জিউস প্রমিথিউসকে পাহাড়ের সাথে শৃঙ্খলিত করে রাখেন এবং তার উপর বর্বর অত্যাচার চালান। একটি ঈগল রোজ এসে প্রমিথিউসের কলিজা খেয়ে যেত আর সেখানে জন্ম নিত নতুন আরেকটি কলিজা। আবার ঈগল এসে খেয়ে গেলে নতুন কলিজা জন্মাতো। এভাবেই জিউস তাকে শাস্তি দিতে থাকেন। এখানে আগুন হল বিপ্লব আগুন হল স্বাধীনতা যার কখনো মৃত্যু হয় না সেটাই প্রমেথিউস মানুষকে উপহার দিয়েছিলেন।
তনু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল অনুপের মুখের দিকে। গল্পটা বলা শেষ হলে তনু বলে, -‘অনুপ একটা কথা জিজ্ঞেস করব ?
-‘একটা কেন হাজারটা প্রশ্ন করতে পার কিন্তু এখন নয় রাত বারটার পর। আজ আমি তোমাকে জীবনের অনেক গল্প বলব। তার পরেও যদি কোন প্রশ্ন থাকে, আজীবন উত্তর দেব তার।
        কথাটা বলার পর অনুপ তনুর কপালে আলতো চুম্বন করে নীচে চলে যায়। তনু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে লাল-হলুদ আবির রাঙা মেঘের ভেতর চাঁদটা কেমন ভাবে একলা একলা রঙ খেলছে। তনুর ইচ্ছে করে চাঁদটার সাথে হাতে হাত মিলিয়ে আবির খেলতে।
                                                 
।।সাত।।
রাত্রিতে বিশেষ কিছুই খেতে পারেনি তনু। ভেতরে ভেতরে কেমন যেন একটা তোলপাড় চলছিল। গলা দিয়ে খাবারগুলো নামতেই চাইছিল না মনে হচ্ছিল যেন এখুনি বমি হয়ে যাবে । আজকে সন্ধ্যা থেকে বাড়ির কথা ভাবার তেমন সময় পায়নি তনু। একবার চাঁদের দিকে একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই এক সময় রাত্রি বারটা বাজল। তনু মনের ভেতর ঘরে অবিরাম অভিনীত হয়ে চলা নাটকের সংলাপ গুলোকে আরও একবার ভালো করে ঝালিয়ে নিল। যত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ততই যেন একটা চাপা উত্তেজনা তনুর বুকের ভেতর থেকে বুদ্বুদের মতো বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। রাত্রি বারটা বেজে সাত-আট মিনিট যখন, তখন অনুপ তনুর ঘরে এসে ঢুকল। পরনে একটা সাদা পাজামা পাঞ্জাবি মাথায় গৈরিক রঙের পাগড়ি কপালে লাল আবিরের তিলক। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে শিকারি বাঘের মতো। তনুর মনে হল অনুপ যেন মৃত্যুর মতো সুন্দর যে রূপ দৈত্য; দানব; দেবতা সবাই কে হার মানায়।
কোন রকম ভনিতা না করেই অনুপ শুরু করল তার জীবন দর্শন তার জীবন কাহিনি -‘আমি প্রভাতী দেবীর এক মাত্র সন্তান অনুপ বসু। ওরফে, উল্কা। তোমার বিশ্বাস না হতেও পারে তবুও এটাই সত্যি আমিই প্রমিথিউসবাদী- সংগঠনের প্রাণপুরুষ সুদূর আকাশ থেকে ঠিকরে পড়া একটা জ্বলন্ত উল্কা।
ভয়ে বিস্ময়ে তনুর রক্ত যেন হিম হয়ে গেল এক মুহূর্তে। সে নিজের কান নিজের চোখ কোনটাকেই বিশ্বাস করতে পারছে না কিছুতেই। বিশ্বাস করবেই বা কেমন করে দু’বছর ধরে পুলিশ যাকে কুকুরের মতো খুঁজছে। দেশের প্রতিটা ছোট বড় পত্র পত্রিকায় যার গল্প প্রতিদিন। সেই গল্পের নায়ক যে তনুর সামনে দাঁড়িয়ে!
এইতো কদিন আগেই তনুর বাবা খবর কাগজ পড়তে পড়তে ছুটে এসে যে কথাগুলো তনুর মাকে বলেছিলেন সেই কথাগুলো এখনও তনুর পরিষ্কার মনে আছে, -‘সুমি, এই সুমি এদিকে দেখে যাও তালডাংরার সেই ডাকাত চারটা মারা পড়েছে বেশ হয়েছে শালারা মরেছে। ব্যাটা ডাকাতি করে আবার বাড়ির বৌকে রেপ করা শালারা কুত্তার মতো মরেছে। বলেছিলাম না উল্কা মরতেই পারে না ওটা মিথ্যে খবর ছিল। এই তো ছবিটা দেখো চার শালার পিঠেই প্রমিথিউস লেখা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হরিরামপুরের ওই যৌনখোর পশুটাকেউ প্রমিথিউসবাদী রাই মেরেছে হয়তো সময় পায়নি পিঠে প্রমিথিউস লেখার। তুমি দেখবে মেয়ে মাংস লোভী সবকটা নেকড়ে একে একে মরবে প্রমিথিউসদের হাতে একদিন।’  
একদিকে যে পুরুষ যুবকের আদর্শ নারীর সম্মান বৃদ্ধার ভাঙাবুকে আশার আলো যার নাম মানে পূর্ণ স্বাধীনতার নেশাঅথচ আরেক দিকে যাকে দেখতে পেলেই গুলি করে মারার আদেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। সেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত মৃত্যুদণ্ডদাতা ‘উল্কা’ তনুর সামনে জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে! আরও বড় কথা সেই উল্কামানব যাকে সামনে থেকে এখনো দেখেনি কেউ সেই তনুর প্রাণপুরুষ।  
আবার বলতে শুরু করে উল্কা, -‘আমার বা আমার সংগঠনের একটাই বিধান, অন্ধকারের দমন। এই ক্ষমতার হাতবদলকে আমরা স্বাধীনতা বলে মানি না। আমরা চাই সবার বাস্তবিক সমান অধিকার মৌখিক বা লিখিত অধিকার নয়। আমরা চাই একটা শিশুও যেন এক বেলাও অভুক্ত না থাকে। একটা মানুষও যেন ঘরের অভাবে রাস্তায় রাত না কাটায় আমরা চাই প্রতিটি মেয়ের আত্মরক্ষার জন্য শারীরিক প্রশিক্ষণের পূর্ণ ব্যবস্থা। প্রতিটি বেকারের কর্ম-সংস্থান। চামড়া পাল্টে পাল্টে আসা নেতাদের হাতে নয়, আমরা চাই প্রতিটি মানুষের হাতে ক্ষমতার বণ্টন। আমরা চাই প্রতিটি ভ্রূণের নিরাপত্তা। আমরা চাই প্রতিটি নোংরা ওয়েব সাইটের ধ্বংস। আমরা চাই প্রতিটি ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড আমরা চাই বিপ্লব আমরা চাই প্রমিথিউস। এবার তুমি তোমার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পার। অনুপ ওরফে উল্কার বজ্রকণ্ঠ শোনার পর তনু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করে, -‘অপরাধীকে তার অপরাধের শাস্তি বা বিচার দেবে কে ? প্রশাসক, আইন, কানুন সব তো অন্ধ। সব তো অর্থের দাস।’
-‘বিচার ব্যবস্থা অন্ধ হলে জনগণ অন্ধ হয়ে যায় না তুমিই বিচারক তুমিই দণ্ডদাতা তুমিই প্রমিথিউস তুমি সজাগ হলেই হল। আমি যদি আমার খুনি ধর্ষক পিতাকে শাস্তি দিতে পারি তোমরা কেন পারবে না ? তুমি শুধু তোমার হাত বাড়াও দেখবে শত শত হাত তোমাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছে প্রমিথিউসের পথে।
-‘তুমি তোমার বাবাকে কী শাস্তি দিয়েছিলে অনুপ ?’
-‘না অনুপরা শাস্তি দিতে পারে না তনু অনুপরা শুধু মোমবাতি মিছিলে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াতে পারে। শাস্তি দিয়েছে উল্কা বাবাকে নয়, একজন খুনি ধর্ষক নেকড়েকে।’
ভয়ে ভয়ে তনু জানতে চায়, -‘তোমার বাবা কাকে খুন বা ধর্ষণ করেছিলেন যার শাস্তি দিয়েছিলে তুমি ?
এবার উল্কার চোখ চিরে অনুপের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোটা। উল্কার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনুপ বলতে থাকে সেই কাহিনি, -‘সেদিন সন্ধ্যায় মা মুক্তা মাসির সাথে একটা দরকারি কাজে একটু বাইরে গিয়েছিল আমি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। নীচে রান্না ঘরে খাবার করছিল বাড়ির কাজের মেয়ে ছায়া পিসি। সেই সুযোগে শয়তান ছায়া পিসিকে আক্রমণ করে বেচারির কিছুই করার ছিল না নির্মম ভাবে ধর্ষণ হওয়া ছাড়া। কিন্তু ঠিক তখন মা আর মুক্তা মাসি এসে পড়ে। আর এসেই দেখে এক বীভৎস দৃশ্য। মা তৎক্ষণাৎ পুলিশকে ফোন করতেই যাচ্ছিল পারেনি ফোন করতে। শয়তানটা মায়ের কণ্ঠ নালী কেটে দিয়েছিল ফলকাটা ছুরি দিয়ে। তখন যে আমিও জেগে গেছি। আমার সামনেই মায়ের মৃত্যু হয়েছিল সেদিন। মাকে কথা দেওয়ার জন্য মুক্তা মাসি আজও যেতে পারেনি আমাকে একলা ফেলে।
এবার কান্নায় ভেঙে পড়ে অনুপ। এমন মুহূর্তে তনুও সাহস পায়না অনুপের কাছে এসে সান্ত্বনা দিতে। কিছুক্ষণের ভেতর নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করে অনুপ-‘সেদিন থেকেই আমার প্রমিথিউসের পথে চলা শুরুএরপর যেদিন শয়তানটা মুক্তা মাসিকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে সেই দিন আমি ওর টুঁটি ছিঁড়ে নামিয়ে দিয়ে ছিলাম। শেষ দিকের কথাগুলো বলতে গিয়েই অনুপের সজল চোখ আবার হারিয়ে যায় উল্কার দাউ দাউ আগুনে, -‘জান তনু পুলিশের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে সবাই যদি অপরাধের শাস্তি দিতে এগিয়ে আসে তাহলে একদিন আর শাস্তি ব্যবস্থার দরকার পড়বে না। দরকার পড়বে না কোন উল্কার। সবাই সেদিন প্রমিথিউস সবার হাতের মশালেই জ্বলবে আগুন।
তনুর ভেতরে যখন ভয় নামের ভোরটা কেটে যাচ্ছিল এক শক্তিমান সূর্যোদয়ের নতুন আলোয় তখন সে সাহস পেয়েছিল প্রশ্নটা করতে, -‘তোমাকে দেখতে পেলেই গুলি করে মারার আদেশ তোমার ভয় করে না অনুপ ?
হাসি মুখে অনুপ বলেছিল, -‘যতবার মৃত্যু হবে আমার, হৃৎপিণ্ড পাল্টে পাল্টে ততবারেই প্রমিথিউসের মতোই ফিরে ফিরে আসব আমি। আমি যে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আছি তনুমানুষের ভালবাসার মৃতসঞ্জীবনী আমার বুক পকেটে রাখা আছে
আর কথা বাড়ায়নি তনু শুধু প্রণাম করে আশীর্বাদ চেয়ে বলে, -‘আশীর্বাদ কর যেন তোমার কুরুক্ষেত্রে নির্ভীক সৈন্য হতে পারি।
রাতে আর ঘুম আসেনি তনুর। সারা রাত শুয়ে শুয়ে খুঁজেছিল হাজার প্রশ্নের উত্তর। যার চোখে এত ভালোবাসা এত করুণা এত জল সেই চোখেই কীভাবে জ্বলে উল্কার আগুন ? হিসেব মেলেনি তনুর। হয়তো একদিন প্রমিথিউসের পথে চলতে চলতে অনিবার্য অভিযোজনে তনুর চোখেও জ্বলবে আগুন। আর সেদিন আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হবে,-যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরুপেন সংস্থিতা, নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমোঃ নমোঃ'
দোলপূর্ণিমার সকালে তনু ওর বাবাকে দুলাইনের একটা চিঠি লিখল, -‘বাবা পারলে তোমরা আমায় ক্ষমা করে দিও। আমি উল্কার জীবনসঙ্গিনী হয়ে প্রমিথিউসের পথে পা বাড়ালাম। আশীর্বাদ করো যেন আজীবন প্রমিথিউসের পথে চলে বিপ্লব আনতে পারি
[সমাপ্ত]



Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments