গল্প, মরাচাঁদ

গল্প, মরাচাঁদ

Advertisemen

মরাচাঁদ

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

মরাচাঁদ
চাঁদের আলোয় চকচক করছে কাটারিটা। এখন কেউ কোথাও নেই। পাড়ার কুকুরগুলোও ঘুমিয়ে গেছে মনে হয়। ঠিক এই সময়টার অপেক্ষাতেই এতগুলো বছর কাটিয়েছে লুবা। লব বাউরি। এক রাত আগেও যার নাম ছিল ‘কয়েদি নম্বর ১৩৭’। 

[এক]

শীতের সন্ধা। হালকা কুয়াশায় ঘোলাটে হয়ে আছে চাঁদ। পাতলা আলোয় যতদূর দেখা যায় শুধু ফাঁকা ধানের খেত। পুকুরটার কাছের কয়েকটা জমিতে কেবল আলু আর সরসে লাগানো আছে। আলুর চারা মাথা বের করেনি এখনো। পুকুরটার কোনায় যে নালা কাটা রয়েছে তাতে তেলতেলে কাদাজলের দাগ। আলুর খেতেই জলের ঝাপটা দিয়েছে কেউ মনে হয়। এ বছর শীত বেশ তাগড়া। এমনটা থাকলে আলু-সরসে দুটোরই ফলন মন্দ হবে না। পোকা লাগবে না গাছে। ইঁদুরেও মাটি খুঁড়বে কম।

এতক্ষণ একটা আলু জমির আলের উপর বসে এলোমেলো ভাবনায় ডুবছিল-উঠছিল লুবা। ‘কইরে শালা তোর এখনো হয় নাই ?’ কথাটা কানে আসতেই ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ায় ও। ফোঁস ফোঁস করে বিড়িটায় কয়েকটা টান দিয়ে গনগনে বিড়িটা জলের নালাটার দিকে ছোড়ে। বিড়ির জ্বলন্ত টুকরোটা আনুমানিক মাপ পেরিয়ে গিয়ে পড়ে। 



এদিকে লুবার ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে বোতল খুলে ফেলেছে কালু। চোখের সামনে দিল-সে’র বোতল নামিয়ে জিবকে আর কতক্ষণই বা অপেয় রাখা যায়। তাই বাধ্য হয়েই...

‘জাইনতম শালা তুই ঠিক শুরু করে দিবি।’

‘আর একটু দেরি কল্লে শেষও কইরে দিতম। কখন গেছিস খেয়াল আছে ? শালা বইসে বইসে পিছনে শিকড় গজায় গেল। আর দাঁড়ায় না থাইকে নিজের গ্লাসটা তুল।’ গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়ে কথাগুলো বলে কালু। 

নামিয়ে রাখা গ্লাসের মদটা এক চুমুকে শেষ করে লুবা জিজ্ঞেস করে, ‘হ্যাঁরে মাস্টারের জমিটায় আলু কারা লাগাইছে ?’

‘কারা আবার হারুরাই লাগাইছে। তা তুই কি শালা এতক্ষণ আলুর জমি পাহারা দিচ্ছিলি ?’

‘না রে মাস্টার বইলেছিল ইবছর আমাকে ভাগে দিবেক। পরে আর রা কাড়ে নাই। শালা মাস্টারের কথার কনই দাম নাই মাইরি...’ আরও একটা গ্লাস খালি করে নামিয়ে রেখে বলে, ‘গতবার ধানের বেলাতেও বইলেছিল...’

‘তোর বইলেছে না শালা, ভাগে চাষ কইরবার আর লোক পাইস নাই। উ শালা জল পাম করার, সার ছড়াবার কন টাকাই দিবেক নাই। ওই বিকালে দিব সকালে দিব বলেই যাবেক। সাধে কি নেপলারা ধানের জমি ছাইড়ে দিল। ভালই হইছে উহার জমিতে লাগাইস নাই। দে দে আমাকেও একটা বিড়ি দে...’ বিড়িটা ধরিয়ে ধোঁয়া ছুড়তে ছুড়তে বলে, ‘তোকে বলাও লয়, তোর শালা আবার পেটে কিছুই থাকে নাই।’

‘কি বলাও লয় ?’ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে লুবা।

‘তোকে বইল্লে তুই ত সারা গাঁয়ে বইলে বেড়াবি।’

‘অঁ ওই টুসুর কেসটা ? উটা শালা সবাই জানে।’

‘টুসুরটা লয়।’

‘তাহলে ?’

‘আগে বল কাহুকে বলবি নাই, তবে বইলব।’

‘হঁ রে বইলব নাই, বল।’

‘দেখ বইলব নাই বললি কিন্তু...’ বিড়িটা টানতে টানতেই অন্ধকার চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয় কালু। বলা যায় না কোনও ঝোপের আড়ালে কেউ পায়খানা বসে থাকতেও পারে। ‘শুধু টুসু লয়, হারুর বড় বিটি পদ্দর সাথেও মাস্টারের লটরপটর আছে। কাহুকে বলিস না কিন্তু। ওই সেদিনের বড় জলটার রাইতে আমি ঘুগি আইড়তে বড় বাঁধের নামটায় গেইছলম। মা কালী বইলছি, আমি নিজে উহাদিকে অত রাইতে ওইখানে দেইখেছি।’

‘গল্প কইচ্ছিল ?’ জিজ্ঞেস করে লুবা।

‘তর মাথাতে শালা... অত জলের রাইতে গল্প কইত্তে বড় বাঁধের নামকে যাবেক ?’

‘তা বইলে ওই জলে কাদাতেই ? তুই শালা কি দেইখতে কি দেইখেছিস তার নাই ঠিক।’

‘এই জন্যেই শালা তোকে কিছু বইলতে নাই। জল ত সন্ধাতেই ছাড়াই গেইছল। উহারা গেইছল দশটার পর। ওই যে তপনাদের খেতের আঁইড়ে কাল পাথরগুলা আছে নাই ? ওই পাথরগুলার উপরে...’ 

‘শালা এই মাস্টার দেখবি কন্দিন মাইর খাইয়ে মইরবেক। শালা বুড়াইতে বইসেছে তবু শালার শখ মিটে নাই। লে ঢাল ঢাল। গাইদে ঠাণ্ডা লাইগছে, ঘর পালাব ইবার।’

‘আইজকে শালা ঠাণ্ডাটা বেশি লাইগছে। অন্যদিন খওয়ার পর অত ঠাণ্ডা লাগে নাই। আর হেঁ রে দুলালদের ঘরের ঠিকাটা তরা পাইছিস ?’

‘আমাদিকেই ত বইলেছিল, পরে আর কথা হয় নাই। কেনে ঢুকবি নাকি আমাদের সাথে ?’

‘তপনাকে বইলে দেখবি ত যদি ঢুকায়। এই সঞ্জয় শালার সমুয়ে পয়সা দিতে ফাটে। শালা গতর খাটাই কাইজ কইরেও যদি সমুয়ে পয়সা না পাই ত কাইজটা কইরেই লাভটা কী ? সেই কবে কাইজ কইরেছি বামুনডিতে আর টাকা দিয়েছে আগের সপ্তাহে।’

‘না তপনার উসব নাই। ডেলির ডেলি টাকা দিয়ে দিবেক। কিন্তু কাইজ কামাই কইল্লে সবাইকার সামনেই গাইদে মুকখালি কইরবেক।’

‘আমার কাইজে ফাঁকি...’ কথাটা বলতে গিয়েও চুপ করে যায় কালু। আঙুলের ইশারায় লুবাকেও চুপ করতে বলে। পুকুর ঘাটের বটগাছটার নিচে কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে।

‘মাছ চোর লয় ত ?’ ফিসফিসে গলায় জিজ্ঞেস করে লুবা।

‘না না ভাল কইরে শুন। মনে হইচ্ছে কোনও মেয়ালোক কাঁইদছে।’

‘হঁ ত ঠিকেই বইলেছিস। মনে হইচ্ছে মুখ চাপা দিয়ে কাঁইদছে। লে আর একটু আছে শেষ কর ত। তারপর চল দেখি কি বেপারটা। ঠেকায় না পইড়লে এই রাইতের বেলায় কনও মেয়ালোক পুকুর ঘাটে আইসবেক নাই গেরেন্টি।’



মদের গ্লাস দুটো খালি করে উঠে দাঁড়ায় দুজনে। কুয়াশা আর জ্যোৎস্না জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে এখন পুকুরের জলের উপর। পুকুরের মাঝে চাঁদের ঝলমলে সর পড়েছে। শিকারের খোঁজে মরা বাবলা গাছটার ডালে ঘাপটি মেরে বসে আছে একটা রাতচরা পাখি। অনেক দূরের কোনও গ্রামে ঠাণ্ডার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে কয়েকটা কুকুর। একে অপরের গায়ে গা ঢলিয়ে এগিয়ে যায় লুবা আর কালু। ওদের সারা শরীর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নেশা এখন। আর নেশায় পিছলে পিছলে যাচ্ছে দুজোড়া পা।

[১]

আজ আকাশটা বেশ ঝলমলে। সকালের সোনালি রোদ গড়িয়ে পড়ছে খড়ের চাল বেয়ে। উঠোনের মাচায় দুলতে থাকা লাউগাছের কচি পাতাগুলো চকচক করছে এখন। পাতার ভিড় ঠেলে দুএকটা লাউ লুকোচুরি খেলছে আলোর সঙ্গে। চায়ের গ্লাস হাতে খাটে আনমনে বসে আছে লুবা। ওর দৃষ্টি এখন অনেক দূরের নীলে ডুবে আছে। এদিকে লুবার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ছটফট করছে খুকি গাই এর বাছুরটা। খুকি গাইটা খড় খাচ্ছে আপন মনে।

‘ইবাবা বসেই রইলে যে, গাই দুইবে নাই ? খুকির বাছুরটা ঝাপাইচ্ছে কখন থেইকে।’ মুক্তার কথায় চমক ভাঙে লুবার। চায়ের গ্লাসটা খালি করে লুঙ্গিটা আরেক পাট তুলে টিনের মগটা নিয়ে বাছুরটার দিকে এগিয়ে যায়। দড়িটা খুলতেই বাছুরটা কয়েক পাক চক্কর কেটে চোঁ করে ছুট্টে যায় মায়ের দিকে। তারপর চবক-চবক করে বাট টানতে থাকে। মুখে দুধের ফ্যান গড়িয়ে পড়ে। লুবা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাছুরটার মুখের দিকে। যেন বাছুরটার মুখে দিয়ে দুধরাঙা জ্যোৎস্না গড়িয়ে পড়ছে।

‘তুমার কি হইছে বল ত ? বাছুরটা ত সব দুদ শেষ কইরে দিল। ছুটকি ইবার কি খাবেক ?’ মুক্তার প্রশ্নের কোনও উত্তর দেয় না লুবা। চুপচাপ গোয়াল ঘরে ঢুকে বাছুরটাকে টেনে বাঁধে। খুকির বাটে হাত লাগায়। ঠিকই বলেছে মুক্তা, চারটা বাটেই ফাঁকা। বিকেলে চা করার মতোও পড়ে নেই আর। মুক্তা লুবার সামনে এসে দাঁড়ায়। খেঁকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারে না। দরজায় কালু এসে দাঁড়িয়েছে।

‘কই রে কাইল বিকালে যাব বইলেও যে গেলি নাই।’

‘শরীরটা ভাল লাইগছিল নাই বইলে আর গেলম নাই। একে শীতকাল তায় আবার পালন।’

‘কেনে কাইল থেইকেই ত ভাত পাচ্ছিস।’

‘অমন সিজা-ঘাটা ভাত খাইয়ে কি আর ভোগ মিটে ?’

‘সে আর কি করবি, পালন ত কত্তেই হবেক। তোদের নিজেদের ভায়াদ। আর ত ছটা দিন। তারপর তেল-মশলা সব খাইতেও পাবি মাইখতেও পাবি।’

‘এই শীতে ছটা দিন কম লয়। ছদিনে ছদশা হইয়ে যাবেক।’

‘কিছুই হবেক নাই। তাহলে ইস্টেসনে শুয়া লোকগুলা মইরেই শেষ হইয়ে যাইত। আর হঁ যেটা বইলতে আইলম, তুই যাবি কি আইজকে ? দরকার আছে। একটা আলোচনা না কইল্লে...’

‘দেখ আর আলোচনা কইরে কিছুই হবেক নাই। যা হবার হইয়ে গেছে।’

‘আস্তে কথা বল। অমন ষাঁড়ের মত চেঁচালে যা হবার লয় তাও হইয়ে যাবেক।’

[২]

এদিকটায় তেমন কেউ আসে না। এটা গ্রামের এক প্রান্তের শ্মশান কালীর মন্দির। লোকজন আসে না বলেই চারদিকটা ঝোপঝাড়ে ভর্তি। মন্দিরটারও পলেস্তারা খসে গিয়ে ইটের দাঁতপাটি বেরিয়েছে। এদিক সেদিক শালিকের বাসা। দেওয়ালের ফাটলে সাপের খোলস। পচা ডিমের উৎকট গন্ধ। তবুও বেশ নিরাপদ এই মন্দিরটা। এখানে কান পেতে কথা শোনার কেউ নেই।

‘দেখ ভাই আমার সংসার আছে উসব পুলিশ-টুলিশের ল্যাঠায় আমি জড়াতে যাব নাই। আমার এক কথা, আমি কিছু দেখিও নাই শুনিও নাই, জানিও নাই...’ বিড়বিড় করতে থাকে লুবা।

‘তর শালা বইলেছে নাই, সত্তি তর মাথায় কিছুই নাই। আমি বইলছিলম পদ্দকে যে মাস্টার নিজের হাতে টুঁটি টিপে মাইরেছে সেটা তুই আর আমি ছাড়া কেউ জানে নাই। সবাই জানে কার নাই কার কাছে পেট করাই গলাই দড়ি লিয়েছে। কিন্তু পদ্দ গলায় দড়ি লিয়েছিল কি ?’

‘তাতে কি হইছে ?’ জিজ্ঞেস করে লুবা।

‘মাস্টার মাইরে পরে গলায় দড়ি বাঁইধে পলাশ গাছের ডালে ঝুলাইছে।’

‘তুই শালা সেদিন আমার মুখ-ঘাড় চিপে না আটকাই রাইখলে মা কালী বলছি মাস্টারের শাদ্ধ কইরে দিতম।’

‘ছিঁড়তিস।’ আঙুলের অশ্লীল ঈশারা করে কালু, ‘উহারা লেখাপড়া জানা লোক, পরে দেখতিস কোটে বিচার হৈত তুই আর আমি মিলে মাইরেছি আর মাস্টার বাঁচাতে আইসেছিল। আর সেদিন বাঁচাবার মত কিছু ছিলও ত নাই। আমরা যখন শিয়াকুইল ঝোপগুলার কাছে আইছি তখন মাইরে ঝুলাই দিইছে।’

‘বাপ-কাকারা ভিনু হইছিল বইলে হারুদের সাথে আমাদের রা নাই ঠিকেই। কিন্তু রক্তের সম্পকটা ত মুইছে যায় নাই। হারুটার কথা ভাইবলে...’ আবার বিড়বিড় করে লুবা। 

‘এখন আর রক্ত ধুইয়ে-ধুইয়ে জল খাত্যে হবেক নাই। বলছি কি শুন। বলছি যে, মাস্টারের কাছকে চল ভাল টাকা আদায় করা যাবেক। এখন সব গরম আছে, ভয়েই দিয়ে দিবেক। কদিন পর সব ঠাণ্ডা হইলে আমড়া চুষবি।’ আবার আঙুলের ঈশারা করে কালু।

‘আমি ত আগেই বইলেছি উ পাপে আমি নাই। অমন পাপের টাকা আমার হজমও হবেক নাই। তর হজম হবেক তুই গিলবি যা।’

‘বকাচদার মত কথা বলিস না। ওই পাপ-পুণ্যি দিয়ে হাঁড়িতে ভাত ফুইটব্যেক নাই। পাপ-পুণ্যি সব বড় লোকের। গরীবের পেটটাই সব। এমনিতেও পদ্দ আর ফিরবেক নাই। লুকাই লুকাই টাকা লিলে কেউ জাইনবেকও নাই। খেয়াল কর কদিন বাদেই মকর পরব। কত খরচ।’ 

‘অমন টাকায় খাউয়ার চাইয়ে না খাইয়ে মরা ভাল। আমি ভাবছি হারুকেই সব বইলেদিব শালা।’

‘ভুইল করেও বইলতে যাইস না। ডাহা মরবি। তখন কেউ বাঁচাবেক নাই। আমিও কিছু দেখি নাই বইলেদিব। শালা হারুকে বইল্লে পুলিশ ছাইড়বেক আমাদিকে ? কুথাকার জল কুথায় গড়াবেক টের পাবি নাই।’



সেদিন আর কথা বাড়ায়নি লুবা। চুপচাপ ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিল। বিকেলের দিকে শুরু হয়েছিল টিপটিপ বৃষ্টি। হুলহুলে ঠাণ্ডা বাতাস। মাঝ রাতের দিকে হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ার শব্দ। লুবা ভেবেছিল কালুই হবে হয়তো। কিন্তু দরজা খুলে চমকে উঠেছিল লুবা। থকথকে অন্ধকার আর বৃষ্টিতে দাঁড়িয়েছিল পুলিশগুলো। দরজা খুলতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দুজন পুলিশ...

[দুই]

এবার লুবাকে দোষী প্রমাণ করার জন্য কোনও সাক্ষীর প্রয়োজন হল না। ও নিজে এসেই ধরা দিল থানায়। ধরা দেওয়ার আগে কয়েক মিনিটের জন্য দেখা করেছিল মুক্তার সঙ্গে। মেয়েদের খবর নেওয়া হয়নি। কেন যেন ইচ্ছেও করেনি ওর। কিংবা ইচ্ছেগুলোই মরে গেছে বহুকাল আগে। মুক্তার হাতে কয়েক বান্ডিল নোট গুঁজে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। জেলের ভেতরকার রোজগার ছিল ওগুলো। তবে লুবা খেয়াল করে দেখেছে সেই গাই-বাছুর-গোয়াল কিছুই নেই আজ আর। এই ঘরটাই যেন সেই ঘরটা নয়।

ঘণ্টা খানেক আগেই কোট থেকে জেলে চালান করেছে লুবাকে। এবার চিরদিনের জন্য মুক্তি। দু-দুটো খুন করেছে ও। কাটারি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন। আজ আর কোনও জ্বালা নেই ওর। কোনও অভিমান নেই। মাস্টারের গলায় কোপ বসানোর সময় লুবাকে বেগ পেতে হয়নি। এক চোটেই ফাঁক। মুন্ডুহীন ধড়টা ঝটপট করছিল বিছানার উপর। মুণ্ডুটা গড়াগড়ি খাচ্ছিল মেঝেতে। কালুকে মারার সময় বেশ বেগ পেতে হয়েছে। দরজা খুলেছিল কালু নিজেই। কাটারি হাতে লুবাকে দেখে হাউমাউ করে ছুটেছিল। প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিল। ক্ষমা চেয়েছিল বারবার। কালুর কান্না শুনে ঘুম থেকে উঠে এসেছিল ওর বউ। চৌদ্দ বছর আগেকার সব দোষ নিজের মুখে স্বীকার করেছিল কালু। কিন্তু লুবার কানে কিছুই ঢুকছিল না। ওর কানে তখনো বেজেই চলছিল চৌদ্দ বছর আগে কোর্টে দাঁড়িয়ে বলা কালুর কথাগুলো।

বেশ কয়েকবার কোপ বসাতে হয়েছিল কালুর ঘাড়ে। উঠোনে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছিল ওর বউ। লুবার মন এতটুকুও নরম হয়নি। কিন্তু ধড় থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া কালুর রক্ত মাখা মুণ্ডুটায় থুথু দিতে গিয়েও পারেনি লুবা। কোনও এক অতীত অজ্ঞাত টানে কিছুতেই কালুর মুখে থুথু দিতে পারেনি ও। কেন যেন খুব কান্না পাচ্ছিল ওর। অকারনেও বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোটবেলার দিনগুলো। 



এখন ঘড়ির কাঁটায় সময় কত হয়েছে কে জানে। অনেক উপরের ঘুলঘুলি দিয়ে চাঁদের মরামরা আলো ঢুকছে এখন। বাইরের বড় লোহার গেটটা খোলার শব্দ হচ্ছে। লুবা জানে ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আসছে ওরা। লুবার কত কিছুই না মনে পড়ছে এখন। সেই রাতের জ্যোৎস্নায় ডুবে যাওয়া পদ্দর বড় বড় চোখ দুটো। পদ্দর ঠোঁটের কোনা বেয়েও সেদিন যেন জ্যোৎস্নার ফেনা গড়িয়ে পড়ছিল। ঠিক যেমন জ্যোৎস্না গড়িয়ে পড়ছিল কালুর গলা থেকে গলগল করে। মুক্তার নিষ্পাপ মুখটাও মনে পড়ছে আজ। ওই মেয়েটা কেবলমাত্র লুবাকে বিয়ে করার অপরাধেই সব হারিয়ে সংসারের বদলে শ্মশান পেয়েছে।

‘কয়েদি নম্বর একত্রিশ...’ এবার ডাক পড়েছে ওপারের। আর জাগলে চলবে না। আর কিছু মনে করাও চলবে না। তবুও তো কত কিছুই না মনে পড়ছে। দুচোখ বেয়ে মনে পড়ছে। আরও বেশি বেশি করে মনে পড়ছে এখন। চৌদ্দ বছর আগের নিরপরাধ নিজের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতেও ইচ্ছে করছে খুব। কিন্তু সময় নেই আর।  

                                    [সমাপ্ত]
মরাচাঁদ গল্পটি কেমন লাগল জানাবেন।

Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments