গল্প, টোপ

গল্প, টোপ

Advertisemen

টোপ
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়



‘প্রিয়

?

তোমার নাম জানি না তো কী নাম লিখব ? তাই জিজ্ঞাসা চিহ্ন দিলাম। তবে আমি মনে মনে তোমার একটা নাম দিয়েছে। সেটা কোনওদিন সামনে দাঁড়িয়ে বলব। অবশ্য সুযোগ পেলে। অন্তত তুমি যদি সুযোগ দাও। আর যদি সুযোগ না দাও তাহলে তো আর কিছু...। আমার এই এক দোষ কোন কথা বলতে গিয়ে কোন কথায় হারিয়ে যাই। যদিও এই প্রথম কোনও মেয়েকে চিঠি লিখছি তাই অল্প বেশিই নার্ভাস। পরে-পরে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। অনেক ভণিতা করলাম এবার সোজাসুজি কাজের কথায় আসি। কাজ বলতে ওই আসল কথায় আরকী।



আমি পলাশ। পলাশ আচার্য। সদ্য এম-এ কমপ্লিট করে বেকারদের আড্ডায় নাম লিখিয়েছি। তাই পাতি বেকার নই, তরুণ বেকার। উদীয়মান বেকারও বলতে পার। কাজের চেষ্টা শুরু করেছি। তবে তুমিও তো জান যে চেষ্টা+টাকা = চাকরি। এখন বাড়ি-বাড়ি গিয়ে দুএকটা টিউশন করাই। নিজের হাত খরচা চলে যায় তাতে। আমি জানি তুমি কী ভাবছ... আসলে তোমার জায়গায় অন্য কোনও মেয়ে থাকলেও হয়তো তাই ভাবত। সত্যি বলতে রোজ-রোজ ওই গলিটায় গিয়ে তোমার টিউশন ছুটির অপেক্ষা করে করে আমি ক্লান্ত। তুমি কবে থেকে আমাকে খেয়াল করেছ জানি না। আমি তোমার পিছনে মাস তিনেক হল পাক খাচ্ছি। এবার ভাবলাম বলেই ফেলি, তাই...। তোমার হাতে চিঠি দেওয়ার মতো সাহস জুটল না বলেই সাইকেলের ঝুড়িতে রেখে এলাম। যদি তোমার উত্তর না হয় তাহলে...। আর গলিটায় আসব না। কালকে যদি তুমি সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে গলিটা পার হও তো জানবো তোমার উত্তর হ্যাঁ। নতুবা... ইতি

পলাশ (বসন্তের সখা)’ 

[এক]

বারবার পড়ার মতো তো কিছুই ছিল না চিঠিটায়। তবুও মেঘলা বারবার পড়েছে চিঠিটা। কখনও ছাদের কোনায় দাঁড়িয়ে। কখনও বই এর ভেতরে ঢুকিয়ে। কখনও একলা আনমনা জানালায় বসে। কখনও খাঁ-খাঁ বৈশাখের দুপুরে বাড়ি পিছনের আম গাছটার নীচে বসে। কেন মেঘলা বারবার চিঠিটা পড়ে বা পড়ত কিংবা পড়বে সেটা আমাদের ভাবার বিষয় নয়। ভাবলেও কূল পাওয়া যাবে না। এক-জনের সঙ্গে অন্যের মতের মিল নাও হতে পারে। তবে আমার অনুমান আর অভিজ্ঞতা যেটা বলে সেটা হল, ওই চিঠিটাই ছিল মেঘলার মনে প্রথম পুরুষের সুর প্রথম প্রেমের সুর। তবে আমার ভাবনাটাই যে ঠিক হবে এমনটাও তো নয়। মেঘলারাই জানে না ওদের মেঘলা মনের সঠিক খবর তার আমি বা আপনি কী করে জানব।

এখন জানালার ওপারে, বৃষ্টি। রাত। বিদ্যুতের ঝিলিক। সোঁদা মাটির গন্ধ। স্মৃতি। মন খারাপ। না না কাব্য করছি না, আসলে মেঘলার জীবনের যাবতীয় কিছু জানালার ওপারে হারিয়ে গেছে। তাই মেঘলা, রাত জেগে বৃষ্টির শব্দ শোনে। ওর চোখের পাতায় ঘুমের গন্ধ এসে স্বপ্নের বীজ বোনে না আর। নির্ঘুম রাতের রাস্তাটা খুবই লম্বা। কিছুতেই যেন শেষ হতে চায় না। আদি অনন্তকাল ধরে বয়ে চলে এক একটা রাত। আসলে কষ্ট পাওয়ার রাতগুলো দীর্ঘদিনের বোঝা বয়ে নিয়ে বেড়ায়। তাই তেমন রাতের সফর লম্বা না হয়ে যায় কেমন করে।

হঠাৎ দমকা হাওয়া এসে মেঘলার মুখে এক ঝাপটা জল ছুঁড়ে দিতেই ও বর্তমানে ফিরে আসে। বৃষ্টির শব্দে আর সোঁদা মাটির গন্ধে মেঘলা হয়তো অতীতের গলিতে পথ হারিয়ে ছিল। ওর খেয়ালই ছিল না চুড়ি কাঁদছে। দেখলেন তো কেমন অবাক করে দিলাম। আরে না মশায়, অবাক কিছুই করিনি। আসলে আমি নিজেই চুড়ির গল্প লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম। চুড়ি হল গিয়ে মেঘলার মেয়ে। সাত মাসের ফুটফুটে মেয়ে। মেঘলার মেয়ে! শুনে অবাক হলেন তাই তো। ঠিক ধরেছি, আপনি এটাই ভাবছেন কী ফালতু গল্পরে বাবা। মেয়েটার বিয়ের গল্প না বলেই সোজা মেয়ে! অবাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রথমে আমিও অবাক হয়েছিলাম। তবে হ্যাঁ এটাও ঠিক, চিঠির গল্প থেকে এক ঝাঁপে চুড়ির গল্পে আসাটা আমার উচিৎ হয়নি। কী আর করা যাবে এসেই যখন গেছি...। আসলে মেঘলার আজও বিয়ে হয়নি। তবুও ও মা। যেটা ভাবছেন ঠিক সেটাই। কুমারী মা। এবার হয়তো গল্পটা ধরতে পেরেছেন। প্রথমে মেঘলার প্রেমে পড়া। তারপর ঘোরাঘুরি। তারপর জড়াজড়ি। তারপর গড়াগড়ি। তারপর চুড়ি। ধুর মশায় এই গতানুগতিক খিচুড়িটাই যদি গল্প হবে তাহলে লিখতে বসলাম কেন ? আজকালের বাজারে কুমারী মায়ের অভাব নেই। কি ঠিক তো ? শালা ঠিক জানতাম মনে মনে আমার কথাটাকেই সমর্থন করবেন। এই পাবলিকগুলো না মাইরি ছাপা অক্ষর পকাপক বিশ্বাস করে নেয়। আজকালের বাজারে কুমারী মায়ের অভাব নেই ? কই পাঁচটা কুমারী মায়ের নাম টপ করে বলুন তো। কুন্তিকে নিয়ে পাঁচজনের নাম বলতে ঘাম বেরোবে তার বলে কী না..., বেশি না ভেবে এবার মন দিনে চুপচাপ গল্পটা পড়ুন।



[দুই]

একবারের জন্য হলেও মেঘলা ভেবেছিল টিউশন থেকে বেরিয়ে সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে গলিটা পার হবে। আসুক না প্রথম প্রেম অন্ধকার গলির মুখে। পল্লবী পাপিয়াদের মতো একটা মিষ্টি বয়-ফ্রেন্ড থাকলেই বা ক্ষতি কী ? তাছাড়া ছেলেটাও তো দেখতে শুনতে...। কিন্তু পারল না মেঘলা। ভেতর ঘরে বসে কে যেন মেঘলাকে পারতে দিল না কিছুতেই। অনিচ্ছাতেই পায়ের চাপ পড়ল প্যাডেলে। স্বাভাবিক গতির থেকে সামান্য কম গতি নিয়েই সাইকেলটা গলি পার করে রাস্তায় উঠল। গলির এক্কেবারে শেষ প্রান্তে ল্যাম্পপোস্টের নীচে পাতলা আলোয় দাঁড়িয়ে ছিল পলাশ নামের ছেলেটা। অদ্ভুত ভাবে তাকিয়েছিল মেঘলার দিকে। কে যেন ওর মনের ভেতর ফিসফিস করে বারবার বলেছিল, মেঘলা হেঁটেই আসবে পুরো গলিটা। হেঁটেই আসবে ও...। আসলে ওই ছেলেটাকে যে বলেছিল মেঘলা হেঁটে আসবে সেই মেঘলাকে সাইকেলে চড়িয়ে দিয়েছে। ওটাই তো প্রথম প্রেম। দরজায় প্রথম প্রেম কড়া নাড়লে ছেলেরা প্রেমের অনুকূলে হাঁটে, মেয়েরা প্রতিকূলে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতেই একদিন মোহনায় দুকূল মেলে। ততদিন অপেক্ষা করতেই হয়।



পরেরদিন টিউশন এসে মেঘলা দেখল ছেলেটা গলির মুখে নেই। সেদিন টিউশন শেষে হেঁটেই গলিটা পার হল মেঘলা। কিন্তু ছেলেটা ছিল না। এরপর সপ্তাহের তিনটা দিনই মেঘলা টিউশন ছুটির পর গলিটা হেঁটেই বড় রাস্তায় উঠে আসত। কোনওদিন বান্ধবীদের সঙ্গে তো কোনওদিন একা। কিন্তু ছেলেটাকে দেখা গেল না আর।



সেদিন দোতলায় পড়ার ঘরের জানালার কাছে বসে মেঘলা বারবার পলাশের চিঠিটা পড়ছিল। চিঠিটার শেষ দিকের একটা লাইন মন কেমনের সুর তুলেছিল ওর মনে, ‘যদি তোমার উত্তর না হয় তাহলে...। আর গলিটায় আসব না।’ তাহলে কি সত্যিই ও আর কোনওদিন আসবে না ? দেখা হবে না আর ? বারংবার নিজেকে প্রশ্ন করছিল মেঘলা। সান্ত্বনা দিচ্ছিল নিজেই নিজেকে। হঠাৎ এমন সময় জানালা পথে মেঘলার চোখ পড়ল ঘরের নীচের চা-দোকানটায়। হ্যাঁ সেই ছেলেটাই। নিজের অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল মেঘলার ঠোঁটের কোনে। চায়ের গ্লাস হাতে মেঘলার জানালায় চক্ষুজাল পেতে বসে রয়েছে ছেলেটা। দুম করে চপ-মুড়ির খিদে পেয়ে গেল মেঘলার। কিন্তু এখন চপটা পাবে কোথায় ? চপ... চপ... চপ... হ্যাঁ ওই নীচের গোপাল কাকুর দোকানেই পাওয়া যাবে। অতএব...

এই প্রথমবার উজ্জ্বল আলোয় ছেলেটাকে দেখল মেঘলা। এতদিন আলো-আঁধার গলির মুখেই ঝাপসা-ঝাপসা দেখে এসেছে ওকে। বেশ ছিমছাম চেহারা। গায়ের রঙ ফর্সা আর কালোর মাঝে। চোখে চশমাটা দেখে হঠাৎ করেই মেঘলার খেয়াল হল, ছেলেটা সবদিন চশমা পরে না। হাতে চপের ঠোঙাটা নিয়েও কিছুক্ষণ দাঁড়াল মেঘলা। ভাবখানা এমন যেন আরও কিছু নেবে। ‘আর কী নিবি-রে মেঘা ?’ জিজ্ঞেস করল গোপাল নামের ওই দোকানদার। দোকানদারের মুখে মেঘা নামটা শুনে ছেলেটা আড়াআড়ি ছেড়ে সোজাসুজি ভাবে তাকাল মেঘলার দিকে। মুহূর্তের ভেতর ঠোকাঠুকি হয়ে গেল চার চোখে। ‘আর... আর... আর কিছু না কাকু, থাক তখন কালকে সকালে নিয়ে যাব।’ বলেই দোকান থেকে বেরিয়ে গেল মেঘলা।



সেদিনের পর মাঝে মাঝেই মেঘলা দেখত ছেলেটা চায়ের দোকানে এসে বসেছে। কিন্তু ওই টিউশনের গলি মুখটাতে আর দেখা যেত না ওকে। যেদিন ছেলেটা চায়ের দোকানে আসত না সেদিন কেমন যেন মনকেমন করত মেঘলার। রাগ হত ছেলেটার উপর। অভিমান ঝরত বালিশে কিংবা টেডিতে। এভাবেই চলল আরও কয়েক মাস। সম্পর্ক সেই থমকেই রইল জানালার এপারে-ওপারে। গল্প আর আদর চলল বালিশ আর টেডির সঙ্গেই।



সেই দিনটার কথা মেঘলার আজও খুব মনে পড়ে। কান্না পায়। কাঁদেও মাঝে-মাঝে। সেদিন মেঘলা নিজেই একটা চিঠি লিখে নিয়ে গিয়েছিল। না ঠিক চিঠি নয়, চিরকুট। সেটায় শুধু লেখাছিল, ‘পারলে কাল সকালে কালীবাড়িতে এসো।’ এই একটুকরো লাইন লেখার আগে পাতার পর পাতা চিঠি লিখেছিল আর ছিঁড়েছিল মেঘলা। কিছুতেই নিজের ভেতরের কথাগুলো লিখতে পারছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় কথা বেশি লিখে ফেলছে। শেষে ভোররাতে শুধু লিখেছিল দেখা করার কথা। এক বুক উত্তেজনায় আর ঘুম আসেনি সেদিন। টেডিটাকে জড়িয়ে সকালে কী বলবে না বলবে তারই প্র্যাকটিস করেছিল ভোররাতটুকু।

[তিন]

কয়েক মিনিটের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছিল বৃষ্টি। তারপর আবার ফোঁটা-ফোঁটা, একটু পরেই ঝমঝম। জানালার পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকছে বাতাস। কখনও বিদ্যুতের ঝিলিক। এই বৃষ্টিভেজা রাতগুলো জাগতে মেঘলার বেশ ভাল লাগে। আসলে ওর নাম আর চোখের সঙ্গে বৃষ্টির বৈধ সম্পর্ক। কিছুক্ষণ হল চুড়ি ঘুমিয়েছে। ঘুমোতে ঘুমোতেই একটা মাই একহাতে ধরে আরেকটা মাই চুষছে মেয়েটা। মাঝে-মাঝে তারই চুকচুক শব্দ। 



মেঘলার পায়ে কোনও শব্দ নেই। জমাট ভাবে শান্ত হয়ে আছে পা-দুটো। তবুও মেঘলা এখন হাঁটছে। একলা একটা গলি দিয়ে হাঁটছে ও। গলিটা পেরিয়ে গেলেই একটা মন্দির। বহুকালের প্রাচীন মন্দির। কয়েকটা বট গাছের নীচে প্রায় ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটা। পলেস্তারা খসে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে জিরজিরে ইঁটের পাঁজরা। পাঁজরার ফাঁকে-ফোঁকে আগাছা গুঁজে চড়ুই এর বাসা। শালিকের সংসার। মন্দিরটা মেরামত করার কথা কেউ ভাবে না। যে যার মতো আসে। পূজা দেয়। মন্দিরের স্থায়িত্ব নিয়ে গল্প করে। চলে যায়। মন্দিরটা তবু দাঁড়িয়েই থাকে। এই মন্দিরটাকে এলাকার লোকে কালীবাড়ি নামে ডাকে।

মেঘলা যখন কালীবাড়ির প্রাঙ্গণে ঢোকে সূর্য তখনো তার রাত্রির রক্তিম পোশাক খোলেনি। সারারাত অনিচ্ছায় চুপচাপ থাকা কাকগুলো ক্যাঁ-ক্যাঁ করেই চলেছে। তবুও পরিবেশটা যেন শান্ত। নীরব। বাতাসে পরিচিত ধূপের গন্ধ। মেঘলার হাতে পূজার সামগ্রী। শরীরে লাল-পাড় সাদা শাড়ি। লাল ব্লাউজ।

পূজা দেওয়ার পর মেঘলা যখন মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছে ঠিক তখন ওর চোখ পড়ল ছেলেটার উপর। স্পিড বাড়ল হৃৎপিণ্ডে। সেই পরিচিত লাল-কালো টিশার্ট আর নীল জিন্স পরে এসেছে ও। চোখের চশমাটা নেই এখন। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল মেঘলা। দাঁড়াল কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে। আরও আরও স্পিড নিচ্ছে হৃৎপিণ্ড।

‘কিছু বলবে ?’ শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল ছেলেটা।

মেঘলার মুখে কোনও উত্তর নেই। মনের নাট্যশালায় দাঁড়িয়ে বারবার অভ্যাস করা ডাইলগগুলো গুলিয়ে যাচ্ছে যেন। কী বলবে? কিন্তু কিছু তো একটা বলতেই হবে। ডান-পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুল ঘষতে ঘষতে ভোররাতে সাজিয়ে রাখা শব্দগুলোকে আরেকবার খোঁজার চেষ্টা করল মেঘলা।ওরা কিন্তু ধরা দিতে চাইছে না, লুকোচুরি খেলায় মেতেছে ওরাও আজ।

‘হঠাৎ ডাকলে যে ?’ আবার জিজ্ঞেস করল ছেলেটা।

‘না, এমনি। মানে মন্দির আসলে...’ উল্টোপাল্টা শব্দগুলো নিজের ইচ্ছেতে টুপটাপ ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে লাফিয়ে পড়ছে।

‘এই মন্দিরটায় এলে মনটা বেশ শান্ত মনে হয়।’ 

‘হ্যাঁ সেই জন্যই...’ অকারণে একটু হাসার চেষ্টা করল মেঘলা। ঠোঁট সাথ দিল না ওর।

‘বিকেলের দিকে কখনো এসো, নীরব শান্তির সৌন্দর্য দেখতে পাবে।’

‘মাঝে মাঝে আসি বিকেলে।’ মেঘলার মনে তিড়িং-বিড়িং করতে থাকা শব্দগুলো শান্ত হচ্ছে এবার।

‘কই দেখিনি তো ?’

‘আসি বলতে আসতাম আরকি। এখন আর আসা হয় না।’ 

‘ও আচ্ছা। তা পূজা দিলে প্রসাদ দিলে না যে ?’

এবার বেশ অপ্রস্তুত হল মেঘলা। মেয়েলি-লজ্জা নামক প্রসাধনটা হুমড়ি খেয়ে পড়ল দু-গালে। রাঙিয়ে উঠল গাল দুটো। কয়েক-পা এগিয়ে এলো মেঘলা, ‘এমা... সরি সরি।’ হাতে কয়েক কুচি ফল আর একটা লাড্ডু নিয়ে এগিয়ে দিল ছেলেটার দিকে। প্রথমবার ছোঁয়া লাগল দুটো হাতে। ছ্যাঁকা লাগল দুটো মনে।

টুকটাক কথা ছোঁড়াছুঁড়ি আর লোফালুফি করতে করতেই মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলো ওরা। মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এসে মেঘলার খেয়াল হল ও স্যান্ডেল পরে নেই। স্যান্ডেল দুটো পড়ে আছে সিঁড়ির কোনায়। অতএব পুনরায়... 



[চার]

বাদলা আকাশটা কেটেছে খানিক আগে। ছেঁড়া-ফাটা মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদের ঝিলিক ঢুকছে ঘরের বারান্দায়। সকালের পেপার হাতে নিয়ে চেয়ারে শরীর এলিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে রয়েছেন সত্যপ্রিয় হালদার। রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। এখনো থলি হাতে বাজারে যখন ঢোকেন তখন সবাই স্যার বলেই সম্বোধন করে। চাকরির থেকে অবসর নেওয়ার পরেও মেজাজটা সেই পুলিশি রয়ে গেছে। বাড়িতে একটা এত বড় ঘটনা ঘটল, তবুও কেউ কিছু বলতে সাহস পায়নি। আসলে হাঁড়ি পোড়ার খবর বাড়ির লোকে বলে না বেড়ালে বাইরের লোকেও সাহস পায় না।

আপনি এখন কী ভাবছেন আমি জানি...। ধুর যা ভাবছেন ভাবুন, আমি অমুক লোকের তমুক স্টাইলে গল্প লিখতে পারি না মশায়। আমি আমার গল্পের চরিত্রগুলোকে ইচ্ছে মতো গল্পের প্রয়োজনে নিয়ে আসি। এই যে সত্যপ্রিয় হালদার ইনি আবার কে ? যদি এই প্রশ্ন করেন তো বলব ওই মাথা নিয়ে এই গল্প না পড়াই ভাল। গল্পের যেমন জাত থাকে তেমন পাঠকেরও একটা জাত থাকা উচিৎ। সল্পবিজ্ঞান পড়ে কল্পবিজ্ঞান পড়া যেমন উচিৎ নয় তেমন ভাবেই কাঁচা মাথা নিয়ে পাকা মাথা গল্প পাঠের পাকামি করাও উচিৎ নয়। রাগ করলেন তাই তো ? আসলে সত্যপ্রিয় বাবুর অবস্থাও ঠিক আপনার মতো। রাগ হলেও উপায় নেই। আসলে নিজের উপর যখন মানুষের রাগ হয় তখন দাঁত কিড়মিড় করা ছাড়া উপায় কিছুই থাকে না।

পেপারটা টি-টেবিলে রেখে চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন সত্যপ্রিয়। জানালার ওপারে এক রিকশা ওয়ালা এক বুড়িকে নিয়ে উড়তে উড়তে গলিটা পেরিয়ে গেল। গোপালের দোকানে ভিড়টা পাতলা হয়ে এসেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সত্যপ্রিয়। সেই ছেলেটার মুখটা মনে পড়ছে। কয়েকটা চড় মারার পরেও হাসছিল ছেলেটা। হাসছিল না ব্যাঙ্গ করছিল কে জানে। তবে সত্যপ্রিয় জানেন ওই ছেলেটা স্বাভাবিক হাসি হাসছিল না। আরও একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সত্যপ্রিয়র নাকমুখ দিয়ে। টি-টেবিলে পড়ে থাকা সিগারেটের প্যাকেটটা থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে নিতে যাওয়ার সময়...

‘বাবা তোমার চা...’ মেঘলা এসে দাঁড়ায়। একবার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চায়ের কাপটা টেবিলে রেখেই ফিরে যাওয়ার জন্য পিছু ফেরে মেঘলা।

সত্যপ্রিয় ডাকেন, ‘মনা...’

বাবার ডাকে থমকে দাঁড়ায় মেঘলা। ছোটবেলায় বাবারই দেওয়া এই নামটা হারিয়ে গিয়েছিল কয়েক বছর আগে। মেঘলা মুখে মুখে খুঁজত এই নামটা, কিন্তু কেউ ডাকত না ওকে আর এই নাম দিয়ে। নামটা আবার বাবার মুখে শুনে চোখ ছলছল করে আসে মেঘলার। ঠোঁটে ঠোঁট চাপা দিয়ে কান্নাটাকে গিলে মেঘলা বলে, ‘কিছু বলবে ? চুড়ি একলা ঘরে ঘুমোচ্ছে।’

‘ও...! আচ্ছা। যা তাহলে।’ 

সত্যপ্রিয় ভেবেছিলেন মেঘলা হয়তো দাঁড়াবে। বলবে, না না বলো কী বলবে। মেঘলা দাঁড়ায় না। বেরিয়ে যায়। বাবার মুখে নিজের হারিয়ে যাওয়া নামটাকে খুঁজে পেয়ে কান্নাটাকে আগলে রাখতে পারছে না ও। 

সত্যপ্রিয় সিগারেটটা ধরিয়ে জানালার ওপারে চোখ পেতে বসে থাকেন। রাস্তায় কত চেনা-অচেনা নাম, মনে না পড়া মুখ, আসে-যায়। দুপুরের দিকে রাস্তা ফাঁকা হয়ে আসে। গোপালও দোকান বন্ধ করে ঘর চলে যায়। গলির বাঁকে কোনও কোনওদিন স্কুল কলেজের দু-একটা ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করে। ওরা চলে গেলে জানালার ওপার-এপার দুই শূন্য হয়ে পড়ে থাকে।



[পাঁচ]

এখন চোখ আর মাথার উপর দিয়ে রাত হেঁটে যাচ্ছে। ‘এখন কটা বাজে ?’ নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলেন সত্যপ্রিয়। উত্তর দেওয়ার আজ আর কেউ নেই। বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এলেন সত্যপ্রিয়। অনেক দূরের আকাশে জোনাকির মতো কয়েকটা নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে। ‘ওরা নক্ষত্র ?’ আবার নিজেকে প্রশ্ন করলেন সত্যপ্রিয়। ‘গ্রহও তো হতে পারে...’ একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে দু-ঠোঁট ঠেলে বেরিয়ে এলো উত্তর। চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে; টেবিলে পড়ে থাকা সিগারেটের প্যাকেটটা হাতড়ে হাতে নিলেন। কিন্তু পুরো টেবিল হাতড়েও লাইটারটা পেলেন না কিছুতেই। ছোটর সময় মেঘলা ওর মায়ের কথায় লাইটার আর দেশলাইগুলো লুকিয়ে রাখত। লাইটারটা খুঁজে না পেয়ে হঠাৎ করেই মনে পড়ল সেই নানা রঙের দিনগুলো। আজ বহুদিন হল স্বাগতা চলে গেছে। কোনও নেশা ছিল না তবুও মাথায় বাসা বেঁধেছিল ক্যান্সার। আবার একটা দীর্ঘশ্বাস...

এমন সময় দূরের আকাশে তারা খসল একটা। সত্যপ্রিয়র মুখ দিয়ে নিজের অজ্ঞাতেই বেরিয়ে এলো কয়েকটা শব্দ, ‘মেয়েটার ভাল হোক।’ একটা সময় স্বাগতা বলত। ছাদে বসে একান্ত আলাপচারিতার সময় তারা খসতে দেখলেই স্বাগতা এই কথা বলত। ‘কী হয় এসব বলে ?’ আজ আর এই প্রশ্নের ‘মেয়ের মঙ্গল হয়’ উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। আজ নিদারুণ রাত। এমন ঘনান্ধকার রাতে তারারাও পথ ভুল করে।

চেয়ার থেকে উঠে পাশ ফিরতেই চোখ পড়ল ঘরের উঠোনের কোনাটার। হালকা আলোর আভা। মানে মেঘলার ঘরে এখনো লাইট জ্বলছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য কিছু একটা ভাবলেন সত্যপ্রিয়। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলেন দোতালায়। হ্যাঁ আলো জ্বলছে মেঘলার ঘরে। একবার ভাবলেন নীচে ফিরে যাবেন, পরের মুহূর্তে অন্যকিছু ভেবে উঁকি দিলেন মেঘলার দরজায়। না, জেগে নেই মেঘলা। মা-মেয়ে দুজনেই ঘুমিয়ে আছে। নিঃশব্দে মেয়ের ঘরে ঢুকলেন সত্যপ্রিয়। মেঘলার ডান হাতে একটা কাগজ। বাঁহাত চুড়ির মাথার কাছে। একবার মেয়ের মুখের দিকে আরেকবার নাতনির মুখের দিয়ে চাইলেন সত্যপ্রিয়। নাতনির মাথায় হাত বোলাতে গিয়েও থামলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর নাতনির মাথায় হাত রেখে কিছু একটা বললেন বিড়বিড় করে। বাইরে বেরিয়ে আসার সময় লাইট বা দরজা কোনওটাই বন্ধ করলেন না।



বাবা বেরিয়ে যেতেই বিছানায় উঠে বসল মেঘলা। দুচোখ উপচে জল গড়িয়ে পড়ছে। কেউ না জানুক মেঘলা তো জানে বাবার উপর ওর এতোটা অভিমান মানায় না। পলাশ যখন ধরা পড়ল চুড়ি তখন গর্ভে এসেছে। সেই পলাশ...! গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা! গোপাল কাকুর দোকানে বসে থাকা ছেলেটা...! বিশ্বাস হয় না মেঘলার। কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। সেদিন কালীবাড়ির পর প্রেম ডানা মেলেছিল স্বপ্নের আকাশে। প্রেমের পাখি একবুক আকাশ পেয়ে উড়েছিল নিজের খেয়ালে। কোনওদিন নদীর চরে তো কোনওদিন শাল-মহুয়া জঙ্গলের বুকে ছিল ওদের যাওয়া আসা। ভাসতে কার না ভাল লাগে ? প্রেমের পানসি চড়ে নিজের ছন্দে ভেসেছিল মেঘলা। একদিন সব বিশ্বাস সব ভালবাসা পুড়িয়ে পুলিশ প্রমাণ করল পলাশ আচার্য মাওবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। আসল নাম হিন্দোল দেশমুখ।



[ছয়]

প্রতিদিনের মতো আজকেও বেজার মুখে পেপার নিয়ে বসেছিলেন সত্যপ্রিয়। মেঘলা চা নিয়ে আসতেই বললেন, ‘মনা তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।’

‘আমার সঙ্গে কথা!’ খানিকটা ব্যঙ্গাত্মক ভাবেই শব্দগুলো বেরিয়ে এলো মেঘলার ঠোঁট দিয়ে।

সত্যপ্রিয় অবাক হলেন না এতে। বরং মেঘলার এই আচরণটাকেই স্বাভাবিক বলে মনে হল আজ। নিজের কণ্ঠ স্বাভাবিক রেখেই উনি বললেন, ‘হিন্দোল কে এরেস্ট করার জন্য...’

‘প্লিজ বাবা আমি আর অতীত ঘাঁটতে চাই না।’ 

‘কিন্তু আমি তো চাই। আর আমার মনে হয় তোমারও পুরোটা জানা উচিৎ।’

‘আজ আর আমার কিছুই জানার নেই। জেনেও লাভ নেই। পলাশ যে দোষী, আই মিন হিন্দোলের দোষ কিন্তু আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। তাই এটা তো পরিষ্কার যে তুমি ভুল নও। তুমি একজন পুলিশ অফিসারের কাজ নিখুঁত ভাবেই করেছিলে।’

‘সেটা কি একজন পুলিশ অফিসারের কর্তব্য নয় ?’

‘আমি তো বলছি না নয়। তুমি যে ভাবে আমাকে মোহোরা বানিয়েছিলে সেটা তোমার জায়গায় অন্যকোনও পুলিশ থাকলে মনে হয় পারত না। বিবেকে বাঁধত। তুমি বিবেক শূন্য হয়ে আমাকে বলি দিয়েছিলে। একজন পুলিশ বাবার মেয়ে হয়ে আমার তো গর্ব হওয়া উচিৎ। কিন্তু কেন জানি না বাবা আমার তোমাকে নিয়ে গর্ব হয় না, তোমার জন্য দয়া হয়...’

‘তুই পুরোটা না জেনেই...’

‘কী জানি না বাবা ? তুমি চাইলে আমাকে বাঁচাতে পারতে না ? পারতে বাবা ঠিক পারতে। তুমি অনেক আগেই জেনেছিলে ওই ছেলেটা ক্রিমিনাল। আই মিন মাওবাদীদের একজন। ওর কথা বাদ দাও, যে নিজের দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অতগুলো মানুষকে ডুবিয়ে দিতে পারে তার কাছে একটা মেয়েকে ডোবানো বিরাট কিছু নয়। কিন্তু তুমি? তুমি কেবল পলাশকে মানে ওই ছেলেটাকে টার্গেট করে পুরো দলটাকে ধরতে চাইলে। তাই আমাকে আর সাবধান করার প্রয়োজন মনে করলে না।’

‘তুই বিশ্বাস কর...’ এতক্ষণে গলা ভাঙতে শুরু করেছে সত্যপ্রিয়র।

‘বিশ্বাস ? এর পরেও যদি বিশ্বাস করতে বলো তাহলে তো বিশ্বাস শব্দটার উপর থেকেই বিশ্বাস উঠে যাবে। কী চমৎকার গল্প না বাবা, একজন তোমাকে টার্গেট করে আমার মুখ থেকে জানছে তুমি কখন কবে কোথায় ডিউটি যাচ্ছ। কাদের সঙ্গে যাচ্ছ। আর তুমি? তুমি ভুল তথ্য দিচ্ছ এটা জেনেই যে, ছেলেটা আমাকে মোহোরা করেছে। তুমি আমাকে সাবধান না করে আমাকেই... ভাবতে পারি না বাবা সত্যিই ভাবতে পারি না। বাবা শব্দের মানেটাই বদলে দিয়েছো তুমি। আমি চুড়িকে কেন জন্ম দিয়েছি জানো ?’

অদ্ভুত চোখে একমুখ বিস্ময় নিয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকান সত্যপ্রিয়।

‘মেয়েটা আমার ভুল নয়, আমার স্বপ্ন। ও তোমার ভুল। মেয়েটাই আমাকে সারা জীবন বাঁচার স্বপ্ন দেখাবে আর তোমাকে তোমার ভুলটা মনে করাবে।’ আর কথা বলতে পারে না মেঘলা। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।



মেঘলা বেরিয়ে যাওয়ার পরেও সত্যপ্রিয় চুপচাপ বসে থাকেন। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতোও কিছুই নেই উনার কাছে। দুচোখ উপচে স্মৃতি আর নোনাজল মাখামাখি হয়ে গড়িয়ে পড়ছে এখন। যে কাজের জন্য একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে প্রচুর সম্মান পেয়েছিলেন সেই কাজের জন্যই আজ একজন বাবা হিসেবে কাঁদছেন। ঠিক জানতাম এবার মেঘলার খোঁজ করবেন। ও হয়তো পুরনো সেই চিঠি পড়তে পড়তে পলাশ আর হিন্দোলের ভেতরকার আসল মানুষটাকে খুঁজছে। যাকে কেউ কোনওদিন খুঁজে পায় না।

[সমাপ্ত]

B
Active Search Results
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments