প্রেমের গল্প, নীরবিন্দু

প্রেমের গল্প, নীরবিন্দু

Advertisemen



নীরবিন্দু

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

আজকে চার বছর পরে আবার দেখা সমুর সাথে। আমাদের মতোই পাড়া গ্রামের ছেলেছিল সমু। কিন্তু আমাদের মতো পাউডার মেখে গ্রামের গন্ধ মুছে ফেলার চেষ্টা করে নি কোনদিন। বারাসাতের আকাশে যখন বিমান উড়ে যেত তখন আমরা আড়চোখে তাকাতাম, পাছে কেউ ‘গাঁইয়া ভূত’ মনে করে। সমু ওর সরল চোখদুটো সুদূর আকাশে মেলে দিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকত। জামা কাপড়ের চাকচিক্যেও কোনদিন নিজেকে শহুরে বানানোর চেষ্টা করে নি। অবাক হয়ে দেখতাম, আমরা যেখানে উত্তর আধুনিক হবার ইঁদুর দৌড়ে পাল্লা দিতে দিতে হাঁপিয়ে যাচ্ছিলাম সেখানে ও নিজেকে কেমন ভাবে আরও সাধারণ রাখা যায় তারেই সাধনা করে যাচ্ছিল ভেতরে বাইরে। তবে হাঁ, খুব মিশুকে ছেলেছিল সমু। এক্কেবারে নির্ভেজাল। হয়তো তাই…, না সেটা এখন থাক পরে বলছি।

আমি মথুর মৃত্যুঞ্জয় আর সমু চার জনেই ছিলাম বাংলার বিভাগের ছাত্র। এক সঙ্গে থাকতাম। এক ছাতের নীচে। এক সাথেই ক্লাসে যাওয়া; আসা; বসা। তবে সমুর একটা ভাল গুনছিল, দারুণ গল্প আর কবিতা লিখত। লিখতে লিখতে কোথায় যেন ডুবে যেত। কোন নাম না জানা গ্রামে। তারপর সেখান থেকে তুলে নিয়ে আসত কত রকমের সাদা কালো ডোরাকাটা জীবনের ছবি। ওর গল্প কবিতা পড়ে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ওর ঠোঁটের কোনে সৃষ্টি সুখের আনন্দটুকু ঝুলে থাকত। ওর জীবনটা যেন একটা রামধনুর মতো ছিল। কিন্তু সেদিন জানতেই পারিনি ওর নানা রঙের জীবনেও একদিন অন্ধকারের রঙ ধরে যাবে। 

আজকে চার বছর পরে ওকে আবার দেখলাম। অনেক কথা হয়েছে, অনেক। কিন্তু সেই কথা গুলো বলার আগে আমাকে আরও একবার যেতে হবে কয়েক বছর পিছনে হেঁটে। যেখান থেকে সব শুরু হয়েছিল একদিন। তখন আমরা বারাসাত স্টেট ইউনিভার্সিটির ছাত্র। নতুন শহর আর প্রথম কলকাতা। বেশ কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। পরিবারের বেড়াজাল নেই। বাবার লাল চোখ নেই। মায়ের কুটুর কাটুর চিমটি কাটা কথা নেই। তখন আমরা প্রজাপতি। তখন আমরা সবাই রাজা। কলকাতার মেয়েদের সাদা সাদা পায়ের পাতা গুলো দেখে বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা পতকা উড়ত। স্বাধীন মনের পতকা। কলকাতায় না গেলে হয়তো কোনদিনেই ক্যালকাটাকে চেনা হত না। বারাসাতে তখনো ধর্ষণ শুরু হয়নি। তবে হবে জানতে পেরেছিলাম। গাছের নীচেই হোক কিংবা আলোছায়া রাস্তায় যেখানে সেখানে দেখা যেত চারঠোঁট এক হয়ে আছে। প্রথম প্রথম দেখতে একটু অসোয়াস্তি হত বটে কিন্তু পরে পরে নিজেদেরকে বারাসাতের জলে গুলিয়ে নিয়েছিলাম। 

পরীক্ষার প্রস্তুতুতির জন্য আমরা সেদিন চারজন মিলে এক একটা চর্যাপদ ধরে তার থেকে সমাজ জীবনের ছবি খুঁজছিলাম। আলোচনার মাঝেই বেজে উঠল সমুর মোবাইল, ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে…’ 

সমু আমাদের মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললে, ‘তোরা আলোচনা কর আমি একটু আসছি।’ কথাটা বলেই মোবাইল নিয়ে সোজা ছাতে। এখনো মনে আছে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর যখন ও কথাবলে ফিরেছিল তখন আমাদের চর্যার সমাজ জীবন শেষ। ওকে কোনদিনেই এতক্ষণ ফোনে কথা বলতে দেখিনি, সেটাও আবার রাত্রিতে ? স্বাভাবিক ভাবেই মথুর বলেছিল, ‘কী ব্যাপার কবিবর হঠাৎ চর্যা পেরিয়ে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে গিয়েছিলে নাকি ?’ সমুর মুখে তখনো সেই চির পরিচিত হাসিটা লেগেছিল। হাসি মুখেই উত্তর দিয়েছিল সমু, ‘খানিকটা সে রকমেই বলতে পারিস।’

‘তা রাধিকাটি কে শুনি ?’ আবার প্রশ্ন করেছিল মথুর। 

আমরা কেউ সিরিয়াস ছিলাম না। জাস্ট ইয়ার্কি মারছিলাম। কিন্তু সমুর মুখে যখন শুনলাম মেয়েটা আর কেউ নয় আমাদের বাংলা বিভাগের কৃতি। তখন আমাদেরও কিন্তু ভাবার পালা। কারণ কৃতি আর সমুকে মাঝে মাঝেই লাইব্রেরি কিংবা ক্যান্টিনে এক সঙ্গে দেখা যাচ্ছিল কয়েকদিন ধরে। কৃতি সমুর কবিতার ডাইরিও নিয়েছিল জানি। তাই বলে কৃতির মতো উগ্র আধুনিকা মেয়ে ঝুপ করে সমুর প্রেমে পড়বে এটা কল্পনার অতীত ছিল আমাদের কাছে। আমি জানতে চেয়েছিলাম, ‘কৃতির মতো মেয়ে তোকে প্রপোজ করল ? আই মিন কৃতি তোকে প্রপোজ করল না তুই কৃতিকে?’ আমার প্রশ্ন শুনে সমু আরও একবার মুচকি হেসেছিল মাত্র। তারপর একটু কায়দা করেই বলেছিল, ‘অবাক হয়ে যাচ্ছিস তাই তো ?’ 

‘তোর মতো মাল কৃতিকে কেন পলিকেও প্রপোজ করতে পারবে না আমি সাদা খাতায় লিখে দিতে পারি।’ বলেছিল মৃত্যুঞ্জয়। সমু তখনো সেই মুচকি মুচকি হেসে যাচ্ছিল। আমি আর থাকতে না পেরে সমুর হাত থেকে মোবাইলটা কাড়িয়ে নিয়েছিলাম। না, মিথ্যে বলেনি সমু। কল’টা কৃতিই করেছিল। যেন এই সেদিনের কথা কিন্তু দেখতে দেখতে কতগুলো দিন গড়িয়ে গেছে।

একদিন অনেক হেঁয়ালি করার পর সমু বলেছিল, ‘কৃতি আমাকে প্রপোজ করে নি। আমিও কৃতিকে প্রপোজ করি নি। আসলে আমিই একদিন কৃতিকে বলেছিলাম আমি একটা মেয়েকে ভালবাসি কিন্তু বলতে পারছি না। কৃতি রোজেই বলত নামটা বল মেয়েটার। কৃতি এও বলত আমার হয়ে ও বলে দেবে মেয়েটাকে। সেদিন রাতেও ফোন করে খুব জেদ করছিল। বারবার বলছিল তুই মেয়েটার নামটা বল আমি বুঝিয়ে বলব মেয়েটাকে। আমি ওকে অনেকবার বলেছিলাম তুই পারবি না। যখন কিছুতেই শুনল না তখন নিরুপায় হয়ে বলেই দিলাম, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যে মেয়েটাকে দেখবি তাকে বলবি সমু তাকে খুব ভালবাসে। কথাটা বলেই ফোনটা কেটে দিয়েছিলাম। পরে জেনেছিলাম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কৃতি যে মেয়েটিকে আমার জন্য প্রপোজ করেছিল ? তার উত্তর, সম্মতিসূচক।’ 

সত্যিই সমুর প্রপোজ করার পদ্ধতিকে প্রণাম না করে পারি নি সেদিন। এমন ভাবেও যে প্রপোজ করা যায় সেটা এর আগে কল্পনাতেও ভাবি নি। ভেবেছিলাম এবার প্রেমে পড়ে সমুও শহরের গন্ধ মাখবে। কিন্তু সমু যেমনটা ছিল ঠিক তেমনেই রয়ে গেল। সেই জামা, সেই প্যান্ট আর সেই হাসি। তবে হাঁ সমু না পাল্টালেও পাল্টাল ওর গল্প কবিতা। গ্রামের নগ্ন মানুষের ভিড় ঠেলে উঠে এলো কলকাতার লাল-হলুদ কাঁচা প্রেমের গল্প। বেশ ভাল ভাল প্রেমের গল্প লিখছিল সমু তখন।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সমু কৃতির সঙ্গে ঘুরে বেড়াত বারাসাতের আলোআঁধার গলি গুলোতে। কোনও কোনও দিন সকালেই দুজন বেরিয়ে যেত গান্ধিঘাট কিংবা দক্ষিণেশ্বর। সিনেমা টিনেমায় যাওয়ার গল্প অবশ্য কোনদিন শুনিনি ওর মুখে। আশ্চর্য হয়ে যেতাম কৃতির পরিবর্তন দেখে, মেয়টা যেন রাতা রাতি পাল্টে যাচ্ছিল। জিন্স প্যান্ট থেকে এক্কেবারে তাঁতের শাড়ি না হলেও চুড়িদার পর্যন্ত পরিবর্তন দেখেছিলাম! ভাবা যায় না। ওদেরকে এক সঙ্গে দেখতেও কিন্তু বেশ লাগত। কৃতির পাশে সমুকে সবাই মেনেও নিয়েছিল। শুধু গল্প কবিতা নয় সমুর আরও একটা গুনের কথা না বললে ওর সম্পর্কে অসম্পূর্ণ বলা হয়ে থাকবে। আসলে সমুর ওই গুণের কথা আমরা কেউ জানতাম না তখনো।

সেদিন ছিল শিক্ষক দিবস। সমু যখন স্টেজে উঠল ভেবেছিলাম কোনও কবিতা আবৃতি করে শোনাবে হয়তো। কিন্তু যা শুনেছিলাম তা কবিতা নয়, সুর। বাঁশের বাঁশির সুর। একটার পর একটা করুণ সুর তুলেছিল সমু সেদিন। অডিটোরিয়ামের প্রায় হাজার ছাত্র ছাত্রী মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভাসছিল সমুর সুরের ভেলায়। শুধু আমরা না পরে জেনেছিলাম কৃতিও সমুর এই গুণটার ব্যাপারে কিছুই জানতো না। তারপর থেকে যে যখন সুযোগ পেত সে তখনই সমুকে চেপে ধরত, ‘সেই, সেই গানের সুরটা বাজা না সমু- ‘আমার খুশির দিন গুলি ভেসে গেছে আমারই চোখের জলে।’ না বলত না সমু। সাধ্য মতো সকলকে খুশি করত ও। 

গল্প কবিতার সাথে সুর মিশে স্বপ্নের মতো দিন কাটছিল ওদের। গল্প, কবিতা, বাঁশি ছাড়াও সমুর রুমমেট হওয়ার আরেক উপকারিতা ছিল আমাদের। কৃতির হাতের তৈরি পোলাও কিংবা মাংস। কৃতি যখন যা পাঠাতো চার জনের জন্যই পাঠাতো। মাঝে মাঝে নিজে এসেও আড্ডা দিয়ে যেত আমাদের সাথে।

বিশেষ করে বারাসাতের কালীপূজোর দিন গুলো খুব মনে পড়ে। এখন মনে হয় ওই দিন গুলোতে আমরা ছিলাম জলের মাছ। এখন যেন কারা জোর করে ডাঙায় তুলে দিয়েছে। দেখতে দেখতে একটা ঘোরের ভেতর দিয়ে কেটে গেল বারাসাতের দিন গুলো। সময় হল বাড়ি ফেরার। ডাকবাংলো, কলোনিমোড় এসব ছেড়ে যাবার কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠত। তবুও সবাইকে একে একে ফিরে আসতে হল নিজের ঠিকানায়। সমুকে ট্রেনে তুলতে গিয়ে কৃতির কান্না দেখে আমাদেরও খুব কষ্ট হয়েছিল ওদের জন্য সেদিন। সমুর মুখের চির পরিচিত হাসিটা; সেই মুহূর্তে ম্লান হয়ে এসেছিল। সেদিন হাওড়া থেকে খড়্গপুর পর্যন্ত আমরা চার জন এক সঙ্গে এসেছিলাম। সাঁতরাগাছি পার হলে মথুর সমুকে রিকোয়েস্ট করে বলেছিল, ‘সমু এখন ভিড়টা একটু কমেছে আবার কবে দেখা হবে না হবে সেই গানটা একবার শোনা না প্লিজ।’ নিরাশ করে নি সমু। সরল চোখ দুটোকে জানালার বাইরে বিছিয়ে উদাসীন ভাবে সুর তুলেছিল বাঁশিটায়। গানটা শেষ হতেই আপন মনে বাঁশিটা আরও একটা সুর ধরেছিল, ‘আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে…’ সমুর চোখ দুটোতে জোয়ার আসতে চাইছিল বারবার। তবুও সমু নিজেকে সামলে নিয়েছিল সেদিন।

বাড়ি ফেরার পরেও আমাদের যোগাযোগ ছিল কয়েকমাস। তারপর যে যার মতো হারিয়ে গেলাম জীবনের জলকাদায়। আজকে প্রায় চার বছর পর আবার দেখা। কিন্তু এই সমু আর নেই যে আমার সেই সমু। গাল ভর্তি দাড়ি, চোখে চশমা, পাজামা পাঞ্জাবী। প্রথম দেখায় আমি চিনতেই পারি নি। সমুই ডাকল আমাকে। আমি কোম্পানির একটা জরুরি কাজে গিয়েছিলাম মুকুটমনিপুর। সেখানেই দেখা হয়ে গেল ওর সাথে। যোগাযোগের তাগিদ যখন কেউই দেখাই নি তখন অভিমান কারুরেই ছিল না। পড়ন্ত বিকেলে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে বসলাম ফাঁকা মাঠে, ঘাসের বিছানায়। জানতে চাইলাম ‘কী করছিস এখন ?’

‘যা করতাম তাই। সেই গল্প কবিতা আর বাঁশি। তবে বাঁশিতে আর তেমন সুর আসে না। হয়তো বাঁশির ভেতরটা ভেঙে গেছে।’

আমি বাঁশির গল্পে না গিয়ে জানতে চাইলাম, ‘এতে তোর সংসার চলে কেমন করে ?’ 

আমার কথা শুনে সমু মুচকি হাসল। সেই সেদিনের হাসি। তারপর বলল, ‘চলে যায় কোনও রকমে।’ 

কথাটা বলেই বেজে উঠল ওর সেই মোহন বাঁশি, ‘আয় আরেকটি বার আয়রে সখা প্রাণের মাঝে আয়।’ কারু মুখেই কোনও কথা নেই। নীরবে সবুজ ঘাসের উপর সুর ছুটে যাচ্ছে। আর সমুর বন্ধ দু’চোখের পাল্লা ঠেলে শিশির গড়িয়ে নামছে বিন্দু বিন্দু করে।

হঠাৎ সমুর এমন বাঁশি বাজানোতে খানিকটা অবাক হয়ে গেলাম। অবাক হয়ে গেলাম ওর চোখের জল দেখে। ওর বাঁশি থামলে আমি জানতে চাইলাম, ‘কৃতি কেমন আছে ?’

এক কথায় উত্তর দিল সমু, ‘জানি না’

‘জানি না মানে ?’

‘জানি না মানে আমার জানা নেই।’

‘কেন তুই তো কৃতিকে ভালবাসতিস তুই জানবি না তো কে জানবে ?’ খানিকটা উত্তেজিত হয়েই প্রশ্নটা করলাম এবার আমি। 

সমু আবার হাসল ওর পরিচিত হাসি। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিল আমার প্রশ্নের, ‘কৃতি সময়ের চোরা স্রোতে হারিয়ে গেছে। যদিও ভাল ও শোভনকেই বাসত। আমি ছিলাম বলির পাঁঠা। তবে হাঁ ও যে আমাকে ভালবাসে নি তা কিন্তু নয়। আসলে যে সময় যেটা হয় সেই সময়ের জন্য সেটায় সত্যি। যখন ও আমার সাথেছিল তখন ভালবেসেছিল। আজকে ওসব কথা থাক। অনেকদিন হয়েগেছে কৃতি শোভনকে বিয়ে করেছে।’ 

সমুর কথার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। কে এই শোভন ? কেনই বা কৃতি সমুর সাথে এমন করল ? এই সব প্রশ্ন গুলোর উত্তর মেলাতে গিয়ে আরও হাজার প্রশ্নের জালে জড়িয়ে পড়ছিলাম আমি।

‘তুই থাক বললেই তো আর থাকা যায় না। আমি জানতে চাই। আমার জানা উচিৎ।’ আমার গলাটা যে ভারী হয়ে এসেছে নিজেও বুঝতে পারলাম এবার। সেই হারিয়ে যাওয়া দিন গুলো মনের ভেতরে কড়া নেড়ে যাচ্ছে বারবার।

আমার আবেগ আর উত্তেজনা দেখে অনিচ্ছাতেও আমার সব প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে দিল সমু নিজেই, ‘কৃতি কোটিপতি বাপের একমাত্র মেয়েছিল। স্কুল জীবন থেকেই ভালবাসত শোভন নামের একটা ছেলেকে। পাগলের মতো ভালবাসত। কিন্তু কৃতির বাবা মা রাজি ছিল না এই সম্পর্কে। তাই জোর করেই কৃতিকে বারাসাত পাঠিয়েছিল পড়াশুনার জন্য। যাতে কৃতি শোভনের সাথে দেখা করতে না পারে। ওর বাড়ির লোকের ধারনা ছিল মেয়ে কলকাতায় গিয়ে শোভনকে ভুলে যাবে। আসলে কিন্তু সেটা হয় নি। কৃতি একটা সুযোগ খুঁজছিল শোভনকে বিয়ে করার। কৃতি ভাল মতোই জানতো ওর বাবা মা আমার মতো মাটির ঘরের ছেলের সাথে কিছুতেই বিয়ে দেবে না ওর। হয়েও ছিল তাই। কৃতির মা আমার কথা শোনার পরেই ঠিক করেছিল শোভনের সাথেই ওর বিয়ে দেবে। শোভন আর যাই হোক আমার মতো হাভাতে ঘরের ছেলেছিল না তো। যখন আমাদের সম্পর্কে সন্দেহের শিশু জন্মনিল তখন সব বলেছিল কৃতি আমাকে। আমি আর আটকে রাখার চেষ্টা করি নি। চেষ্টা করলেও হয়তো পারতাম না।’ কথা গুলো বলতে বলতে সমুর চোখদুটো ছলছল করছিল। 

আমি জানি সমু মিথ্যে বলবে না। কিন্তু অবাক লাগছিল এটা ভেবেই যে কৃতি এমন নোংরা খেলা খেলছিল সমুকে নিয়ে। আর আমরা কেউ এক বিন্দুও টের পাই নি। ভাবতে অবাক লাগছে বারাসাত বিদায় কালের কৃতির সেই চোখের জলটাও মিথ্যেছিল বলে। একজনকে পাওয়ার লোভে কৃতি সমুর সাথে, আমাদের সাথে যে অভিনয়টা করে গেল তাতে ওর অনেক বড় পুরষ্কার পাওয়া উচিৎ। সিনেমার পর্দায় যারা অভিনেতা অভিনেত্রীর কাজ করে কৃতির মতো মারাদোনার কাছে তারা তো চারাপোনার সমান। 

সমুকে বললাম, ‘তুই তাহলে ভালবেসে কিছুই পেলি না কষ্ট ছাড়া!’ 

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সমু বলল, ‘পাই নি কেন বলব, অনেক পেয়েছি। যে মুহূর্তটুকু ও আমার ছিল সেটা তো আমারই। সেটাই কী কম বড় পাওয়া। তাছাড়া পেয়েছি গল্প, গান, কবিতা আর দু’চোখের মাঝে নীরব নীরবিন্দু।’ কথাটা বলেই আবার হাসল সমু। সমুর সাথে দেখা না হলে জানতেই পারতাম না, ‘যারা শুধু দিলে পেলে না কিছুই’ তারা ওই না পাওয়া টাকেই আঁকড়ে ধরে কত কিছুই না পায়। আসলে আমরা যারা কিছু পাওয়ার লোভে দিনরাত ছুটে বেড়াই তারা জানতেই পারি না, না পাওয়ার ভেতরেও কত কিছু পাওয়া খেলা করে।

হঠাৎ করেই সমু এবার জিজ্ঞেস করল, ‘কবি নীরবিন্দুর নাম শুনেছিস ?’ 

‘হাঁ, শুনব না কেন। উনার লেখা কবিতার বই আছে আমার বাড়িতে।’

‘তাহলে এখনো বাংলা সাহিত্যের প্রতি টান আছে দেখছি।’

কেন জানিনা সমুর কথায় আমার মনে হল ও আমাকে ব্যাঙ্গ করছে। যতই আমি কোম্পানির কাজ করি না কেন তবুও তো বাংলার ছাত্র। আমি বললাম, ‘আজকের দিনে কবি নীরবিন্দুর নাম কে না জানে। এইতো কদিন আগেই এক বিখ্যাত পত্রিকার সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের…’ 

মাথাটা হঠাৎ ঝিম-ঝিম করে উঠল আমার। পত্রিকার পাতাটা ভেসে উঠল চোখের পাতায়। হাঁ, হু-বু-হু মিলে যাচ্ছে সেই বারাসাতের দিন গুলোর সাথে পত্রিকার লাইন গুলো। সেই বৌদির হাতের রান্না। বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাওয়া। লালি সিনামা হলের সামনের কালীপূজা। এক জায়গায় এও তো বলেছেন কবি নীরবিন্দু, ‘ওরা তিনজন আমার কবিতা নয় আমার বাঁশি শুনতেই বেশি ভালবাসত।’ তবে কি আমাদের সমুই… 

আমি কবি নীরবিন্দুকে হয়তো তেমন ভাবে চিনি না কিন্তু আমি তো সমুর চোখের থেকে ঝরতে থাকা নীরবিন্দু গুলোকে চিনি। সেই বিন্দু বিন্দু নীরে কত প্রাণ আছে, কত গান আছে, কত না বলা অভিমান আছে আমি জানি। হাঁ এটা ভাবতে অবাক লাগছে বইকি, আমাদের সেই সমু আজকের বিখ্যাত কবি নীরবিন্দু। আর আমি তাঁর সামনে বসে আছি। হয়তো কৃতি সমুর জীবন থেকে না গেলে ও কোনদিনেই নীরবিন্দু হতে পারত না। তবে এটুকুও বুঝতে পারছি কবি নীরবিন্দু হবার জন্য সমু কত রাত একলা একলা নীর ফেলে গেছে। কী জানি চোখের পাতায় আরও কত নীর জমানো আছে ওর। 

সমুকে ছেড়ে আসার আগে একবার ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘একটা কথা রাখবি সমু।’ হাসি মুখে সমু বলল, ‘বল, রাখার মতো হলে কেন রাখব না।’ 

‘শেষ একবার শোনাবি সেই গানটা।’

কথা রেখেছিল সমু। বেজেছিল ওর মোহন বাঁশি বাতাস কাঁদিয়ে, ‘আমার খুশির দিন গুলি ভেসে গেছে আমারই চোখের জলে।’ বাঁশিতে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে হয়তো কৃতির ঠোঁট দুটো চোখে ভাসছিল সমুর তাই বারবার চোখের জমানো ব্যথা গুলো গড়িয়ে পড়ছিল ঠোঁটের উপর। তাতেই হয়তো সমুর সুরটা যেন আরও বেশি করুণ শোনাচ্ছিল আমার কানে। শোনাবে নাই বা কেন, আজকে যে সমুর সুরে কৃতি ছিল না আজকে তো সমুর সুরে নীরবিন্দু মিলেমিশে একাকার হয়েছিল। 



[সমাপ্ত]
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments