আঞ্চলিক গল্প, একূল ভাঙে...

আঞ্চলিক গল্প, একূল ভাঙে...

Advertisemen
www.amarsahitya.com
একূল ভাঙে...
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়
কূল- www.amarsahitya.com

সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত একটানা বিরক্তিকর বৃষ্টির পর বর্ষার মেঘ সবে ক্ষান্ত হয়েছে। ঘর পিছনের পানাডোবাটা থেকে ব্যাঙগুলো ডেকেই চলেছে এক নাগাড়ে। দাওয়ায় বসে বিড়ি টানছিল বরুণ। হয়তো ধানের জমিটুকু নিয়ে আকাশ কুসুম ভাবছিল। আর ভাববে নাই বা কেন ? এবছর ধানের ফলন ভাল না হলে ভাগে চাষ করা জমি টুকুও হাতছাড়া হবে। বরুণ ভাল মতোই জানে এমন টানাটানির সংসারে যদি বিপিন মাস্টারের দেওয়া ভাগচাষের জমিটুকুও হাতছাড়া হয় তাহলে পরের বছর কী অবস্থা দাঁড়াবে। বিপিন মাস্টারের জমিটুকু আছেই বলেই না মেরেকেটে মাস সাতেক চলে ?
ফোঁস-ফোঁস করে বেশ কয়েকটা জোরে টান দিতে আধমরা বিড়িটা আবার প্রাণ ফিরে পায়। ঘরের দাওয়াতে বসেই বরুণ তুলসীকে জিজ্ঞেস করে,- ‘হ্যাঁগো ঘরের পচ্চিম কুনটায় জল পইড়ছে ?’
ঘরের ভেতর থেকে উত্তর আসে,- ‘আইজকে বেশি পড়েক নাই। টোপা টোপা দুধের পারা পইড়েছে। কাইলকে সকালে আরও বেশি কইর‍্যা দুটি পুয়াল গুঁইজে দিবে ক্ষণ।’
বরুণ আর বিশেষ কিছু জিজ্ঞেস করে না। এই বর্ষার দিন গুলো ওকে প্রতি বছরেই চালায় খড় গুঁজে মাথা বাঁচাতে হয়। অবাধ্য বৃষ্টি তবুও ফোটা ফোটা করে ঝরতেই থাকে। গরীবের চোখের জলের মতো খড়ের চালা ভেদ করে গড়িয়ে পড়া জল প্রলেপ দিয়ে বেশিদিন আটকে রাখা যায় না। ও জল আটকাবার নয়। বাড়ির সদর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে বরুণ। পশ্চিম কোনে এখনো থেকে থেকে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছে। রাতের দিকে হয়তো আবার বৃষ্টি নামবে। অন্ধকার জলকাদা রাস্তায় চবক-চবক শব্দে পা ফেলে বরুণ এগিয়ে যায় কার্তিকদের বাড়িটার দিকে।
কার্তিকের বাড়ির উঠোনে টিমটিম করে একটা বাল্ব জ্বলছে। বাল্বের আলোটা বাঁচিয়ে দরজার একটা কোনায় গিয়ে দাঁড়ায় বরুণ। কার্তিকের ঘর থেকে ভেসে আসা মাছ পোড়ার গন্ধটা বেশ কয়েকবার শুঁকে দেখে। মন্দ লাগে না বরুণের। কার্তিকদের দরজার কোনায় দাঁড়িয়ে বরুণের মনে পড়ে বছর দশেক আগের দিনগুলো। তখনো বাদলকে ক্যানসারে ধরে নি। কী জলজ্যান্তই না ছিল ছেলেটা। পাড়ার নেপাল মাস্টার বরুণকে স্কুলে ডেকে একবার বলেছিল,- ‘এ ছেলে বড় হয়ে বাপের নাম, গাঁয়ের নাম উজ্জ্বল করবে বরুণ। আমার কথাটা মিলিয়ে দেখিস।’
না, নেপাল মাস্টারের কথাটা মিলে যায় নি। বড় আর হয়নি বাদল। ছোট-স্কুল থেকে বড়-স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর বাদলের ক্যানসার ধরা পড়ে। বরুণকে সর্বস্বান্ত করে মরেছিল বাদল। জমিজমা থেকে শুরু করে হালের জোড়া বলদ এমনকি ঘরের হাঁস মুর্গীগুলোও বিক্রি করতে হয়েছিল বরুণকে। কিছুতেই কিছু হয়নি। বরুণ চলে যাবার পর তুলসীও কেমন যেন হয়ে গেছে। একলা পুকুর ঘাটে বসে আপন মনে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে। সময়ে ডাকলেও সাড়া পাওয়া যায় না।
-‘বরুণ না কে-রে ? তা বাইরে দাঁড়ায় আছিস যে ভিতরে আয়।’ ঘরের ভেতর থেকেই কথা গুলো বলে কার্তিক। বরুণ সাত তাড়াতাড়ি লুঙ্গির কাছায় চোখের জল মুছে বলে,- ‘হঁ-ব খুড়া। ভাইবলম টুকু ঘুইর‍্যা আসি খুড়ার ঘর থেইক্যা।’
- ‘সেটা না হয় ভালই কইর‍্যাছিস আইছিস। তা কপাট কুনটায় দাঁড়ায় ছিলিস ক্যান ? বর্ষার সময় পোকা-মাকড় লতা-পাতা কুতায় কী লুকায় থাইকব্যেক।’
কার্তিকের কথায় লজ্জিত বরুণ কী উত্তর দেবে খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ লাইটটার নীচে গিয়ে দাঁড়ায়। মাথার উপর নানার ধরণের পোকা ভন ভন করতে থাকে। বরুণের হাবভাব দেখে কার্তিক কী যেন ভাবে তারপর রান্না ঘরের দিকে মুখ করে বলে,- ‘বরুণকে পুয়াটেক চাল আইন্যা দাও। মনে হয় দুলোকেই সকাল থেইক্যা কিচুই খায় নায়। মুক খানা শুকাই চুন হইচ্যে। আর পাত পড়া মাছও টুকু দিবে।’
বরুণ হয়তো ভাত দিতে মানা করে দিত। ওর বাড়িতে আজকে ভাত হয়নি এমন তো নয়। বরুণ যে ভাতের জন্য এসেছে তাও নয়। মানা করতে পারল না কেবল মাত্র পাত পোড়া মাছের লোভে। বরুণের ঘরে শেষ কবে মাছের আঁশটে গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল সেটা মনে হয় পাড়ার সুটকে বেড়ালটাও বলতে পারবে না। বরুণ বাল্বটার নীচে চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে কার্তিক নিজেই কাছে ডাকে বরুণকে। তারপর ধুতির কড়ছ থেকে দুটো বিড়ি বের করে একটা নিজে ধরিয়ে অন্যটা বরুণের হাতে দেয়। দুটো জ্বলন্ত বিড়ির গন্ধে রান্না ঘরের মাছ পোড়ার গন্ধটা কোথায় তলিয়ে যায়। খানিকক্ষণ পরে কার্তিকের বউ বরুণের জন্য শাল পাতার ঠোঙায় কিছুটা চাল আর একটা বাটিতে কয়েকটা মাছ পোড়া এনে দিয়ে বলে,- ‘তোর বউকে বলবি সকালে বাটিটা যেন আইন্যা দেয়।’
কার্তিকের বউ বরুণের পাড়ার সম্পর্কে কাকিমা হয়। বরুণ কোনও দিন কিছু চাইলে বরুণকে খালি হাতে ফেরায়নি কার্তিকের বউ। কখনো চাল কখনো ডাল কখনো পুকুরের দুটা মাছ কখনো ক্ষেতের দুটা বেগুন যখন যেটা তখন সেটাই বরুণের হাতে তুলে দিয়েছে। কেউ কিছু বললে বলেছে, -‘তা গরীব মানুষ দুইটা খাইলেক-বা।’ 
কার্তিকের বউ এর কথায় ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় বরুণ। তারপর আপন মনে জ্বলন্ত বিড়িটায় পরপর কয়েকটা টান দিয়ে বলে,-‘হাঁ খুড়া ই-বচর মনে হয় লালসন্ন ধানটা ভাল হবেক নাই। তার চাইয়া যদি বড়ান বুইনতম তো ভাল ফলন দিতেক।’ কিছুক্ষণ কার্তিকের সম্মতির অপেক্ষা করারপর বরুণ আবার বলে,- ‘ই-বচর বহালের ধান জলে পঁইচবেক তার চাইয়ে বাইদের ধান বুইনলে ঢের ভাল ছিল।’
কার্তিক সম্মতি জানিয়ে বলে,- ‘উটা তো হবারেই ছিলেক। বারবার বহালে ধান হবেক আর বাইদ গুলাইন ফ্যালফ্যালাই ভাইলে থাইকবেক সেটা কী আর হয়-রে ? উ-বছর দেখলি তাও তোর মনে নাই। তার চাইতে বলছি শুন, ইসব জমির লাইগ্যা না খাইট্যা কুতাও কারখানায় টারখানায় কাম করবি যা। আর কিছু না হোক দুবেলা দুমুঠা খ্যাইতে তো পাবি। শালা ইখানের জমিতে আবার ভাগে চাষ...’ কথাটা শেষ না করেই কার্তিক নিভে যাওয়া বিড়িটা আবার ধরিয়ে নেয়। 
বরুণ কি বলবে খুঁজে না পেয়ে চুপ করে থাকে। আর কেউ না জানুক বরুণ তো জানে ওকে কারখানার কাজে নেবার জন্য কোনও মালিক বসে নেই। নিজের ঘর দুয়ার ছেড়ে অনেক দূরে কোথাও পালিয়ে গেলে হয়তো কিছু কাজ জুটলেও জুটে যেত। কিন্তু বরুণ পেটের দায়ে নিজের গ্রাম ছাড়তে নারাজ। মাঝে মাঝেই বরুণ ওর বাপের বলা কথাটা মনে করে। তখন বরুণের বয়স আর কতই বা হবে ? বছর দশের বেশি নয়। বরুণের বাপ মাঝে মাঝেই বরুণকে বলত,- ‘যে নিজের গাঁয়ে ভাত জুটাইতে পারেক নাই উআকে পরের গাঁ পরের মাটিও ভাত দিবেক নাই। আর যদি পরের গাঁ ভাত দেয় তো দেখবি কদিন বাদে উআর মানটাও যাবেক জানটাও যাবেক।’
কার্তিকের ঘর থেকে ফিরে এসে শাল পাতার ঠোঙায় মোড়া চাল গুলোকে মাটির হাঁড়িতে রেখে দিয়েছিল বরুণ। তুলসী ভাত বেড়ে বরুণের অপেক্ষায় বসেছিল। বহুকাল পর দুজনে আজ মাছ পোড়া দিয়ে ভাত খেয়েছে। খাবার সময় বরুণ তুলসীর মুখে এক চিলতে হাসি দেখেছে আজ। শেষবার তুলসীকে কবে হাসতে দেখেছিল সেটা মনেও পড়ে না বরুণের। পাশাপাশি কাঁথায় শুয়ে দুজনে কতই না গল্প করেছে আজ। গল্প করতে করতে তুলসী কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি বরুণ। তুলসীর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে উপচে পড়া স্মৃতিতে চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসে বরুণের।
মাঝ রাতের দিকে আবার শুরু হয় মুশল ধারায় বৃষ্টি। ফোটা ফোটা করে জল পড়তে পড়তে একটা সময় ঘরের পশ্চিম কোনায় জল জমা হয়। জমা জল গড়িয়ে এসে বরুণের কাঁথাটা খুঁজতেও বিশেষ সময় নেয় না। বরুণ আর তুলসী একটু একটু করে সরে গিয়ে ঘরটার পূর্ব দিকের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে।  কাঁথার কোন গুলো তবুও ভিজতে থাকে। আরও কাছাকাছি সরিয়ে আসে দুজনে। তুলসীর ডাগর বুক দুটো বরুণের বুকের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে পড়ে। শিহরণ জাগে শরীর দুটোতে। তুলসীর পিঠে হাত বোলায় বরুণ। আজ কত বছর পর শরীর দুটোতে আবার নেশা লাগছে। একটা সময় তুলসীর শরীরে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে ডুবিয়ে ফেলে বরুণ। বাইরের বৃষ্টির শব্দ আর কানেও আসে না।
সকালের দিকে বৃষ্টিটা একটু কমলে আবার ঘরের চালায় উঠে খড় গুঁজে বরুণ। খড় গোঁজা হলে চালার উপরে বসে অনেক দূরের একটা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাহাড়টার উপর মেঘ গুলো যেন চরে বেড়াচ্ছে। অন্তত এমনটায় মনে হয় বরুণের। পাহাড়টার উপর মেঘের খেলা দেখতে বেশ ভাল লাগে ওর। কেমন যেন একটা নেশা ধরে। পাহাড়টার নাম মনে করার চেষ্টা করে বরুণ। মনে পড়ে না। মেঘ গুলো এখন সরে সরে যাচ্ছে। উঁকি দিচ্ছে ঝলমলে নীল আকাশ। আর কদিন পরেই আকাশে বাতাসে উৎসবের একটা পরিবেশ ছড়িয়ে পড়বে।
আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ বিপিন মাস্টারের ঘর থেকে ইউরিয়ার বস্তাটা কাঁধে নিয়ে জমির দিকে পা বাড়ায় বরুণ। সূর্যের হলদে নরম আলোতে সবুজ গাছ-পালা গুলো ঝলমল করছে এখন। হালকা বাতাসে দোলা দিচ্ছে কচি ধানের শিষ গুলো। সারের ভারী বস্তাটা কাঁধে নিয়ে একটানা বেশি দূর যাওয়া সম্ভব নয়। একটা পলাশ গাছের তলায় দাঁড়িয়ে গলার গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মোছে বরুণ। লুঙ্গির কড়ছ থেকে একটা বিড়ি বের করে বেশ কয়েকবার দুই আঙুলে রগড়ে নেয়। তারপর বিড়ির মাথায় কয়েকবার ফুঁ দিয়ে ধরায় বিড়িটাকে। হালকা বাতাসে বিড়ির ধোঁয়াটা এদিক সেদিক উড়তে থাকে।
       ধান ক্ষেতটার সামনে এসে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বরুণ। হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে মাথা দোলাচ্ছে কচি ধান গাছ গুলো। একটা অদ্ভুত আনন্দ হয় বরুণের। সব ঠিকঠাক থাকলে ফলন মন্দ হবে না। কাঁধের গামছাটাকে মাথায় পাগড়ির মতো করে বেঁধে ধানের জমিতে নামে বরুণ। মুঠো মুঠো ইউরিয়া ছড়াতে থাকে। ধান গাছ গুলোর ছোঁয়াতেও কেমন যেন একটা আনন্দ আছে। ইউরিয়া ছড়াতে ছড়াতেই ক্ষেতের আগাছা গুলোকে উপড়ে ফেলে বরুণ। সারা শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হয়।
দেখতে দেখতেই দিন কেটে যায়। ধান গাছের সবুজ রঙ হলুদ হয়ে আসে। ধানের ভারে গাছ গুলো মাথা নামিয়েছে এখন। আর একটা জল হলেই...। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে বরুণ। সাদা সাদা তুলার মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে শরতের আকাশে। বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা আপাতত নেই। চারদিক কাশ ফুলে ভরে আছে। আর মাত্র কদিন, মা আসছেন। 
তুলসীর পাশে গিয়ে বসে বরুণ। তুলসী মুড়ি ভাজতে ভাজতেই জিজ্ঞেস করে,- ‘বইসাল্যা যে ? আইজ মাটির কাইজে যাবে নাই ? সকাল বেলা পুতির বাপ  বইলতে আইছিল। ঘর পিছে একজন কইর‍্যা কাজ পাবেক।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বরুণ বলে,- ‘সবেতেই চালাকি ? শালা উহাদের প্যেট কিছুতেই ভইরবেক নাই। গেল বার শালারা বইল্ল সাত কুড়ি পনের টাকা হিসাবে কাইজ আইচে। পরে শুইনলেক ন-কুড়ি কইর‍্যা আইছিল। খা শালারা খা উপরে সব বিচার হবেক। উখানে কারুর বাপের চালাকিটা চইলবেক নাই দেখবি।’
-‘তুমি মনেক ঝগড়া লাইগতে যাইক না। তকন যেটুকু বা দিচ্চিল তাও দিবেক নাই।’
-‘হঁ দিবেক নাই। কাইজটা কি উয়াদের বাপের বটে নকি ? কাইজ সরকারে দিচ্চে।’
-‘তুমার সরকারের মুয়ে ঝাঁটা মারি। তুমার লাজ নাই তাই সরকার সরকার কইর‍্যা চেঁচাও। ক্যান বিম্লির বাপের সিমিটের ঘর থাইকতেও ইন্দিরা বাস দিলেক। সরকারের লোক গুলাইনের কি চোক নাই। বলচি চল ইখান থেইক্যা পালাই যাব। বাপের কতাটা ধইর‍্যা বইসে থাইকলে না খাইয়ে মইরবে। কেনে পদু কি কইলকেতা যাইয়ে টাকা কামাই করেক নাই। পদু কি এমন শিক্কিত বটেক শুনি ? পেটটায় পা দিলেও অ-আ-ক-খ বার হবার লয়...’
তুলসীর এই এক দোষ একবার বলতে শুরু করলে ওকে আটকানো দায়। অগত্যা বরুণ আর কথা না বাড়িয়ে ঘরের কোনা থেকে কোদালটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
ফরেস্ট পুকুরটায় আজকে যেন মেলা বসেছে। এমনিতে এদিকটায় লোকজনের তেমন যাতায়াত নেই বললেই চলে। আজ থেকে মাটি-কাটার কাজ শুরু। পুরো সপ্তাহ ধরেই কাজ চলবে। তবে নামের একশ দিনের কাজ। হিসেব করে দেখলে চল্লিশদিন পার হয় না। এই পুকুরটা কাটা হয়ে গেলে আবার কবে কাজ জুটবে বরুণ নিজেও জানে না। তখন এর ওর বাড়িতে কাঠ কেটে, বাগান পরিষ্কার করে, গরুর ঘাস এনে দিয়ে ওকে কোনও রকমে সংসার চালাতে হয়। তুলসী তো খুব একটা মন্দ বলে না, পেটের টানে যারা গ্রাম ছেড়েছিল তাদের আর যাই আজ আর হোক ভাতের অভাব নেই। কিন্তু বরুণ পারেনি। হাজার অভাবেও বরুণ গ্রাম ছেড়ে যাবার কথা ভাবতেই পারে না। 
বিকেল সন্ধার দিকে বরুণ ঘরে ঢুকেই দেখে, তুলসী উঠোনে চাটাই পেতে চুপচাপ বসে আছে। ওর দৃষ্টি ঠিকরে গিয়ে পড়ছে অনেক দূরে একলা দাঁড়িয়ে থাকা তাল গাছটার মাথার উপর। তুলসীকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বরুণ কোদালটা উঠোনে নামিয়ে রাখে। তুলসীর পাশে গিয়ে বসে। বরুণের হাতটা শক্ত করে ধরে তুলসী। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। বরুণ কোনও কথা বলে না। আলতো ভাবে তুলসীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বাদলের মুখটা আজ সকাল থেকে বরুণেরও খুব মনে পড়ছিল। একটা চাপা যন্ত্রণায় বরুণের চোখ দুটোও ঝাপসা হয়ে আসে। দেখতে দেখতে কত গুলো বছর পেরিয়ে গেল তবুও...
পাশের বাড়ি থেকে শাঁখের সুর ভেসে আসতেই সম্বিৎ ফেরে তুলসীর। ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ায়। বরুণের ঘরেও সন্ধা প্রদীপ জ্বলে। শাঁখ বাজে। ঘরের চৌকাঠে জলের ধারা পড়ে। তারপর...? সন্ধা প্রদীপ নিভে যায়। মন্থর গতিতে অন্ধকারের ভেতর ডুবতে থাকে বরুণের ঘরটা। টিমটিম করে জ্বলতে থাকা কেরোসিনের পাতলা আলোতে জমাট অন্ধকার কিছুতেই কাটে না।              
সারাদিন খাটাখাটির ফলে শুয়ে পড়তে না পড়তেই বরুণের চোখ ঘুমে জড়িয়ে গিয়েছিল। একটা দুঃস্বপ্নের চোটে যখন ঘুমটা ভাঙল তখনো ভোর হয়নি। দূরের জঙ্গল থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। উঠে বসে বরুণ। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে।  তুলসী নিশ্চিন্তে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে আছে। বসে বসে স্বপ্নটাকে আরেকবার মনে করার চেষ্টা করে বরুণ। গাঁয়ে কাঁটা দেয়। অন্ধকার হাতড়ে বিড়ির বান্ডিল আর দেশলাইটা খুঁজে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে বরুণ। উঠোনে দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ধরায়। বাদলের মুখটা আবার ঝপ করে মনে পড়তেই কেমন যেন ভয় ভয় করে ওর। এমন সময় ডানায় সাঁই সাঁই শব্দ তুলে মাথার উপর দিয়ে কয়েকটা রাতচরা পাখি জঙ্গলটার দিকে উড়ে যায়। বরুণ মাথার উপর পাখি গুলোকে খোঁজার চেষ্টা করে। অন্ধকারে কিছুই চোখে পড়ে না।
এ বছর কম বেশি সবারেই ধান ভাল হয়েছে। উঁচু-নিচু প্রায় সব জমিতেই ফলন হয়েছে। আর কদিন পরেই বরুণ ঘরে ধান তুলবে। ছাতা মাথায় সেদিন কার্তিকের সাথে এসেছিল বিপিন মাস্টার। কিছু একটা বলতে চেয়েছিল বরুণকে কিন্তু এবছরের ধানের ফলন দেখে কিছুই বলতে পারেনি। কার্তিক বরং বলেছিল,- ‘ই-বচর বাইদ বহাল সব জমিতেই সনা ফইল্যাচে। না বরুইণা তোর চারপুয়া কপাল বটেরে-ব। বাকি জমি গুলাইনের চাইয়ে তোর ধান ঢের বেশি হইচে বটে।’
বরুণ মনে মনে ঠিক করেছিল দুর্গা পূজার আগেই ঘরের মাথায় খড় চাপাবে। প্রতিবছর ধান কাটার আগে কেউ না কেউ খড় বিক্রি করে। এবছর যে দুয়েকজন বিক্রি করেছিল ? প্রত্যেকেই চড়া দামে। বরুণ হাত লাগাতে পারেনি। আর কদিন পরেই নতুন ধানের গন্ধে ঘর ভরে উঠবে। তখন না হয় নতুন খড় চাপানো যাবে। তাছাড়া এখন তো আর বৃষ্টির ভয়টাও নেই।
পড়ন্ত বিকেলে রায়দের পুকুর পাড়ে বসে আজ আকাশ কুসুম ভাবছিল বরুণ। মাথার উপর দিয়ে থোকা থোকা সাদা মেঘ পশ্চিম দিকে ভেসে যাচ্ছে। দূরের জঙ্গলের সবুজ আর আকাশের নীল মিলেমিশে যেন একাকার হয়ে আছে। আজকে মনটা ভাল নেই বরুণের। আর ভাল থাকবেই বা কেমন করে ? এত ভাল ফলন দেওয়ার পরেও যদি বিপিন মাস্টার বলে...। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বরুণ। আনমনে একটা বিড়ি ধরিয়ে টানতে থাকে। বিপিন মাস্টারের জমিটা অন্যকেউ আবাদ করলে সত্যিই ভীষণ সমস্যায় পড়বে বরুণ। সারা বছরের আশা বলতে তো ওই জমি টুকুই। দশ বছর বুকে বুকে আগলে এখন যদি...। আর ভাবতে পারে না বরুণ। চোখ দুটো ভার ভার মনে হয়। 
-‘সেই কখন থেইক্যা পুকুর পাড়টায় বইস্যা আছ যে ? দুপুরে ভাত গুলাও খাইলেক নাই ?’
তুলসী কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারেনি বরুণ। হঠাৎ করে তুলসীর গলার শব্দে চমকে উঠেছিল ও। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় বরুণ তারপর দূরের জঙ্গলটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলে,- ‘ও...ই বনটার পাশে একটা মাঠ আছে দ্যাখ।’ 
-‘উটা আর দেইখবার কি আচে ? পুকুর দিকে আল্যেই তো দেখি।’
-‘ওই জঙ্গলটার পর থ্যেইকা আমাদের গাঁ শেষ। তুই ঠিক কতাই বলতিস। এই গাঁয়ে থ্যাইকা আর কিচুই হবার লয়।’
-‘হঠাৎ কইর‍্যা আজ বড গাঁ ছাইড়বার কতা বইলছ যে ? কারুর সাতে কী কিচু হইচে ?’
-‘হবেক আর কী ?’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বরুণ, ‘ইটা তো হবারেই ছিলেক। বিপিন মাস্টার বইল্ল পরেরবার থ্যেইকা জমিটা অন্যকাহুকে দিয়ে চাষ করাব্যেক।’ কথা গুলো বলতে বলতে বরুণের চোখের পাতায় জল জমা হয়।
-‘ক্যেনে অন্যকাহুকে দিয়ে ক্যেনে করাব্যেক ? ইবচর তো মেলা ধান হইচে।’
-‘ইমনটায় হয়রে তুলসী ইমনটায় হয়। যখন জমিটায় চাষ হচ্ছিলক নাই তখন আমাকে দিলেক। আর ইখন মেলা ধান হইচ্চে ইখন আর বরুণ্যাকে কীসের দরকার বল ? দিন রাইত খ্যাইট্যা জমিটারে একদিন...’ কান্নায় কথা গুলো জড়িয়ে যায় বরুণের। তবুও বলে যায় বরুণ,-‘কেউ না জানুক তুই আর আমি তো জানি কেমন কইর‍্যা ওই জমিটারে ধান লাগাইবার মত কর‍্যাছিলম। শালা নিজের ছ্যেইলার মত তিল তিল কইর‍্যা জমিটারে বানাই ছিলম...’ আর কথা বলতে পারে না বরুণ। দীর্ঘ দশ বছরের জমানো ব্যথা এক সঙ্গে হু হু করে বেরিয়ে পড়ছে আজকে। তুলসী আঁচল দিয়ে চোখের জল মোছে। শক্ত করে ধরে বরুণের হাতটা।
বাড়ি ফেরার পরেও স্বাভাবিক হতে পারছিল না বরুণ। বুকের ভেতর ঘরে কী যেন একটা অবিরাম বেজেই চলেছে। এবছর এতো ভাল ফলন দেওয়ার পরেও যে বিপিন মাস্টার এমন কথা বলতে পারে কল্পনাতেও ভাবেনি বরুণ। ওর ভয়ছিল পাছে ভাল ফলন না হয়। কিন্তু ভাল ফলন হয়েই তো...। প্রথমটায় নিজের কানকেও বিশ্বাস হয়নি বরুণের। কিন্তু বিশ্বাস অবিশ্বাস দিয়ে তো আর সথ্য মিথ্যার পরিবর্তন হয় না। বাস্তবটা যতই কঠিন হোক না কেন সেটা তো আর অবাস্তব হয়ে যায় না কিছুতেই। বিপিন মাস্টারের সামনেই চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছিল বরুণের। দাঁতে দাঁত চেপে কান্নাটাকে গিলে নিয়েছিল বরুণ। সত্যিই এই গ্রামে আর বরুণের জন্য কিছুই রইল না।  
তখন মধ্যরাত্রি সবে পেরিয়েছে যখন একটুকরো চাঁদ উঠেছে পুকুরটার ওপাশে। হালকা হিমের হাওয়ায় ভর করে ভেসে যাচ্ছে দুটো ছায়া মূর্তি। গ্রামের মাঠটা পেরিয়ে জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে ওরা হাঁটছে ষ্টেশনের দিকে। ওরা সব স্বপ্ন সব স্মৃতি পিছনে ফেলে অন্ধকারে গাঁ ঢাকা দিকে হাঁটছে আলোর খোঁজে। মাটির খোঁজে।
এবারের ধানের ভাগ টুকুও আর নেয়নি বরুণ। রাগে ঘেন্নায় অভিমানে নিজের প্রাপ্য অর্ধেক ধান টুকুও ছেড়ে দিয়েই ও বেরিয়েছে তুলসীর হাত ধরে। শহর কলকাতায় গিয়ে একদিন হয়তো বরুণ নিজেকে নিজের ভেতর খুঁজে পাবে না আর। নিজের শৈশব আর ছেলে বাদলের স্মৃতি টুকুও সময়ের ধুলায় ঢাকা পড়ে যাবে একদিন। কিন্তু বরুণ জানে কলকাতা সব কিছুর বিনিময়ে দুবেলা দুমুঠো ভাত দেবে ওদেরকে। আজ ওটুকুরেই বড় দরকার। পথ হাঁটতে হাঁটতে বরুণ বলে,-‘বিপিনের জমিটা কে চাষ কইরব্যেক জানিস?’
-‘না আমি কেমন কইর‍্যা জাইনব ?’
-‘কাত্তিক খুড়া।’ বরুণের মুখে কার্তিকের নামটা শুনে অদ্ভুত ভাবে তুলসী তাকায় বরুণের দিকে। অন্ধকারে বরুণের চোখের জল তুলসীর চোখে ধরা পড়ে না। বিশ্বাস হয় না তুলসীর, তবুও অবিশ্বাস করার উপায় নেই ওর কাছে।
অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে তুলসী বলে,-‘একটা কতা বইল-ব ?’
-‘বল না কি বলবি ?’
কথাটা বলার আগে বরুণের হাতটা শক্ত করে ধরে তুলসী তারপর আমতা আমতা করে বলে,- ‘এই দুমাস আমার শরীদ খারাব হয় নাই। মনে হয় আমি আবার...’ লজ্জায় কথাটা শেষ করতে পারে না তুলসী।
বরুণ তুলসীকে বুকে জড়িয়ে বলে,- ‘ইবার দেখিস মা লক্ষ্মী ঘরে ঠিক আইসবেক। ইটা তো আর পরের জমি লয়।’
অন্ধকারের ভেতর গা ডুবিয়ে ভালবাসা ভরকরে ওরা ষ্টেশনের দিকে হাঁটতে থাকে। চাঁদের পাতলা আলোতে ওদেরকে ঠিক দেখা যায় না। গ্রামের গন্ধ, পাকা ধানের গন্ধ পেরিয়ে ওরা এখন হাঁটছে জীবনের আরেক গলির দিকে।
                                   [সমাপ্ত]
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments