ভয়ংকর ভূতের গল্প, আসলে ভূত বলে কিছু...

ভয়ংকর ভূতের গল্প, আসলে ভূত বলে কিছু...

Advertisemen
http://www.amarsahitya.com
আসলে ভূত বলে কিছু...
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়
ভূতের গল্প, আমারসাহিত্য.কম

“যাবজ্জীবেৎ সুখম্ জীবেৎ ঋণং কৃত্বা ঘৃতম্ পিবেৎ। ভস্বীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ।”
অর্থাৎ যতদিন বাঁচবে সুখে বাঁচো দরকার হলে ঋণ করেও ঘি খাও। দেহের মরণের পরেই আত্মার বিলুপ্তি ঘটে। চার্বাক দর্শনের এই মতবাদটি আজকে সকাল থেকে বেশ কয়েকবার পড়েছেন শ্রীমন্ত বাবু। পড়তে পড়তে কখনো হেসেছেন কখনো বা গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়েছেন। আসলে প্রায় বার’বছর হয়ে গেল শ্রীমন্ত বাবু ভূত বা আত্মার পিছনে ছুটছেন। কিন্তু ভূত তাঁকে ফাঁকি দিয়েছে। গত মাসেই তিনি একটি বই প্রকাশ করেছেন নিজের রিসার্চের উপরে ভিত্তি করে, ‘আসলে ভূত বলে কিছু নেই’। কিন্তু আজকে একটি দৈনিক পত্রিকায় তিনি দেখলেন পুরুলিয়া জেলার অন্তর্গত পুঞ্চা থানার কাছে লৌলাড়া নামের একটি এলাকার কথা। সেখানে একটি জমিদার বাড়িতে নাকি ভূতের আসা যাওয়া  আছে। খবরটি পড়ার পর থেকেই শ্রীমন্ত বাবু ভাবছিলেন লাস্ট বারের মতো চেষ্টা করবেন কি না। এমন অনেক বাড়ি অনেক শ্মশানে তিনি একলা রাত্রি কাটিয়েছেন কিন্তু কোথাও ভূতের চিহ্ন মাত্র পাননি। তাই একরকম ভাবে নিরাশ হয়েই তিনি বইটি লিখে ছিলেন। আজকে আবার যখন ভূতের গন্ধ পেলেন তখন থেকেই মনটা কেমন আইঢাই করছে। ভূতের নেশাটাও একটা ভয়ঙ্কর নেশা। যাকে একবার ওই নেশায় ধরে তার নিস্তার পাওয়া মুস্কিল। ভূতের সামান্য গন্ধেও পেট ফাঁপতে থাকে। একবার সেই এলাকায় না যাওয়া পর্যন্ত যেন শান্তি নেই।
(বিজ্ঞাপন) 
 
একটা সিগারেট ধরিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন শ্রীমন্ত বাবু। তারপর নিজেই বিড়বিড় করে বললেন, ‘হতেও পারে চার্বাক দর্শনটা ভুল। না, শেষ একবার দেখেই আসা যাক।’ এই, ‘শেষ একবার দেখেই আসা যাক’ করে করে বহু এলাকায় তিনি রাত কাটিয়েছেন। আরেকবার শেষ চেষ্টা করতে তিনি তাহলে যাবেন লৌলাড়ায়!
ল্যাপটপে গুগল ম্যাপ খুলে ভালোভাবে যাওয়ার উপাই গুলো তিনি সেই রাত্রেই দেখে নিলেন। ধর্মতলায় সকাল সকাল বাস ধরে লালপুর। সেখান থেকে সোজা বাস ধরে লৌলাড়া। তেমন ঝামেলা নয়। দু’দিন বাদেই তো অমাবস্যা। ভূত বাবাজীদের জন্য উপযুক্ত লগ্ন। শ্রীমন্ত বাবুও অমাবস্যার দিনটিতেই সকাল সকাল বার হবেন বলে ঠিক করলেন। পরের দিন সকালে বাজার গিয়ে কয়েকটা মর্টিন, এক বোতল কার্বলিক অ্যাসিড, কিছু শুকনো চিঁড়া ভাজা, এক প্যাকেট বিস্কুট, সিগারেট, লাইটার, টর্চের নতুন পাঁচটা ব্যাটারি প্রভৃতি টুকটাক জিনিশ কিনে আনলেন। অনেক জায়গাতেই রাত কাটাতে গিয়ে সাপ আর মশার উপদ্রব ভোগ করেছেন তিনি। তাই আগাম কিছু জিনিসের ব্যবস্থা করে নিলেন যাতে পরে সমস্যায় না পড়তে হয়।    
সকাল নটা নাগাদ বাস ধরে শ্রীমন্ত বাবু লৌলাড়ার দিকে যাত্রা করলেন। যখন লালপুরে বাস থামল তখন বেলা দুটো। বসন্তের বেলা খুব একটা বড় হয় না ঠিকেই তবে গরমের প্রাদুর্ভাব দুপুরের দিকে বেশ ভলোই থাকে। বিশেষ করে বাঁকুড়া পুরুলিয়ায় গরমটা একটু বেশিই এইসময়। লালপুরেরই একটা হোটেলে মাছ ভাত খেয়ে শ্রীমন্ত বাবু পুঞ্চাগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। বেশি সময় অপেক্ষা তাঁকে করতে হল না। একটি মান্ধাতা আমলের ঝড়ঝড়ে মার্কা বাস এসে দাঁড়াতেই শ্রীমন্ত বাবু সেটায় চেপে জানালা ধারের একটা সিট দখল করে বসে পড়লেন। পথে যেতে যেতে  তিনি দেখছিলেন দু’পাশের রক্তিম পলাশ ফুল গুলোকে। মাঝে মাঝে রাস্তা এপার ওপার করছে ছোট বড় নেউল। পুরুলিয়ার এইসব অঞ্চলে নেউল খুব দেখা যায়। কিছু দূর আসার পরে চোখে পড়ল একটা জলাশয়ে জল পান করছে দুটো শেয়াল।
(বিজ্ঞাপন, বইটা অবশ্যই পড়ুন)

বেশ রুক্ষ পাথুরে এলাকা। শ্রীমন্ত বাবু জানালার বাইরেই চোখ রেখে পুরো রাস্তাটা কাটিয়ে দিলেন। বাস যখন লৌলাড়া পৌঁছোল তখন বিকেল চারাটা বেজে কয়েক মিনিট হয়েছে মাত্র। যতদূর দৃষ্টি যায় পুরো এলাকাটা খাঁ খাঁ করছে। দু’একটা দোকানপাট থাকেলও সেগুলি বন্ধ। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক করার পরে তিনি দেখলেন বেশ কিছুটা দূরে একটা পানের দোকান খোলাই আছে। বট গাছের আড়ালে দোকানটি। তাই প্রথমে চোখে পড়েনি। দোকানে গিয়ে দেখলেন একটি কম বয়েসী ছেলে আপন মনে পান সাজছে। শ্রীমন্ত বাবুও মিঠা পাতায় বিনা খয়ের তুলসী দিয়ে একটা পান বানাতে বললেন। তারপর পানটা মুখে পুরতে পুরতেই জিগ্যেস করলেন, ‘আচ্ছা ভাই বলি জমিদার বাড়িটা কোনদিকে বলতে পারবে?’ 
প্রশ্ন শুনে ছেলেটি কিছুক্ষণ শ্রীমন্ত বাবুর মুখের দিকে চেয়ে রইল তার পর বলল, ‘কেন বলুন তো?’ 
শ্রীমন্ত বাবু হালকা হেসে বললেন, ‘তেমন কিছুই না, ভূত ধরতে এসেছি আরকি। ওই ওঝারা যেমন সাপ টাপ ধরে আমিও তেমনি ভূত ধরি।’ 
শ্রীমন্ত বাবুর ঠাট্টা ছেলেটির মোটেই ভালো লাগল না। তবুও সে শান্ত ভাবেই বলল, ‘দেখুন স্যার ওখানে না গেলেই কি নয়, দু’দিন আগেই ওখানে আপনার মতো একজন গেছেন কিন্তু…’ 
শ্রীমন্ত বাবু ছেলেটিকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বললেন, ‘দ্যাখো ভাই একটু পরেই সূর্য অস্ত্র যাবে, তাই বেলা থাকতেই আমাকে ওখানে যেতে হবে। কলকাতা থেকে আসছি জমিদার বাড়ি যাব বলেই। তাই রাস্তাটা বলে দিলেই সুবিধা হয়, এই আরকি।’ 
ছেলেটি আর তেমন কিছু না বলে আঙুল বাড়িয়ে একটা কাঁচা রাস্তা দেখিয়ে বলল, ‘যখন একান্তই যাবেন তখন আর কথা বাড়িয়ে লাভ কি, ওই কাঁচা রাস্তা দিয়ে মাইল দুই পথ হাঁটতে হাঁটতেই জমিদার বাড়িটা দেখতে পাবেন, তবে সাবধান কিন্তু।’ 
শ্রীমন্ত বাবু মুচকি হেসে বললেন, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই, আমি চললাম দেরি হয়ে যাচ্ছে। কালকে সকালে আবার দেখা হবে।’
দু’পাশের পলাশ আর যজ্ঞ ডুমুরের জঙ্গল ভেদ করে কাঁচা রাস্তা দিয়ে শ্রীমন্ত বাবু হনহন করে হাঁটতে লাগলেন। রাস্তাটার উপরে মাঝে মাঝেই ঘাস গজিয়ে উঠেছে দেখেই তিনি বুঝতে পারছিলেন এই রাস্তায় তেমন বিশেষ কারুর যাতায়াত নেই। বেশ কিছুদূর হাঁটার পরেই একটা বাড়ির ছাত পলাশ গাছের আড়াল ভেদকরে চোখে পড়ল। হয়তো ওটাই জমিদার বাড়ি। সূর্য লাল সিঁদুর টিপের মতো হয়ে আছে,। অস্ত্র যেতে আর বেশি সময় নেই। শ্রীমন্ত বাবু হাঁটার গতি আরও একটু বাড়িয়ে দিলেন। হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়ল একটা খরগোশ ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমের জঙ্গলটার দিকে। লৌলাড়ার প্রাকৃতিক রূপ দেখতে দেখতে হাঁটতে শ্রীমন্ত বাবুর বেশ ভালোই লাগছিল। মনে মনে নিজেই বললেন, ‘বেশ মায়া মেশানো এখানের প্রকৃতি।’ কাঁধের ব্যাগটা ডান দিক থেকে বাম দিকে করে চলতে লাগলেন তিনি।
যখন শ্রীমন্ত বাবু জমিদার বাড়ির গেটের কাছে এসে দাঁড়ালেন তখন সূর্য আধখানা ডুবেছে । পশ্চিম কোন পলাশ ফুলের রঙে সারা আকাশ ভরিয়ে তুলেছে নববধূর সাজে। শ্রীমন্ত বাবু জমিদার বাড়ির বাইরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে দেখলেন, বেশ পুরনো দিনের চুনসুরকির দোতলা বাড়ি। দেওয়ালের কোথাও কোথাও প্লাস্টার ছেড়ে দাঁতের মতো ইঁট বেরিয়ে আছে। কোথাও আবার দেওয়ালের ফাটল বেয়ে ঝুলছে বট গাছের চারা। তবে একটা সময় যে বেশ চাকচিক্য ছিল সেটা দেখলেই বোঝা যায়। শ্রীমন্ত বাবু লোহার গেটটা খুলে বেড়ের ভেতরে ঢুকলেন। বেশ বড় প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বাড়িটা। বেড়ের ভেতরেও পলাশ গাছের ঝোপঝাড়ে ভর্তি। দোতালার উপর থেকে কয়েকটা পায়রা বকম্ বকম্ করতে করতেই দেখতে লাগল আগন্তুককে।
(বিজ্ঞাপন)

শ্রীমন্ত বাবু মনে মনে ঠিক করলেন একবার চারপাশটা ঘুরে দেখবেন। অনেক ভূতুড়ে জায়গায় আবার জ্যান্ত মানুষ ভূতের খুব উপদ্রব থাকে। চারপাশটা ঘুরে এসে বাড়ির কোনায় অল্প অল্প করে কার্বলিক অ্যাসিড ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন যখন ঠিক তখনই পিছন থেকে অপরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘নমস্কার।’এমন নির্জন এলাকায় মানুষের কণ্ঠ শুনে চমকেই উঠলেন তিনি, ‘কে, কে আপনি?’ বলতে বলতে পিছন ঘুরে দেখলেন উনার মতোই পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর বয়সী একজন ভদ্রলোক। ঠিক উনার পিছনেই দাঁড়িয়ে। বেশ সুপুরুষ লম্বা চওড়া চেহারা। চুলে সামান্য পাক ধরেছে, গায়ের রঙ বেশ ফরসা। ভদ্রলোক হাসতে হাসতে  বললেন, ‘আমার নাম মতিলাল হালদার, আমি ভূতের উপর রিসার্চ করছি গত তিন বছর ধরে। গত পরশু দিন এখানে এসেছি।’ শ্রীমন্ত বাবুও হাতজোড় করে নমস্কার জানালেন। মনে মনে ভাবলেন দোকানের ছেলেটি এই ভদ্রলোকের কথাই তাহলে বলতে চাইছিল। 
মতিলাল বাবু জানতে চাইলেন, ‘আচ্ছা আপনার পরিচয়?’ 
শ্রীমন্ত বাবু হাসি মুখে উত্তর দিলেন, ‘আমার নাম শ্রীমন্ত ঘোষ, আমিও ভূত নিয়েই বেশ কয়েক বছর রিসার্চ করছি।’
‘আপনিই কী তাহলে- আসলে ভূত বলে কিছু নেই- এই বইটির লেখক?’
‘আপনি কী বইটি পড়ে দেখেছেন?’
‘আরে বেশ কয়েকবার পড়েছি, আমাদের জন্যই তো লেখা। “ফাল্গুনী পূর্ণিমা” নামের চ্যাপ্টারটি তো আমার দুর্দান্ত লেগেছে। তা আপনি কী ধরেই নিয়েছেন ভূত বলে কিছুই নেই।’
‘দেখুন ধরে নিয়েছি বললে ভুল বলা হবে, ধরেই যদি নিতাম তাহলে এখানে আসতাম না নিশ্চয়।’
‘হাঁ সেটাও অবশ্য ঠিক কথা।’
দু’জনের আলাপ চলতে চলতেই সন্ধ্যা গড়িয়ে এল জমিদার বাড়ির উপর। দূরের থেকে ভেসে আসতে লাগল শেয়ালের সন্ধ্যা মাতানো সুর। মতিলাল বাবু বললেন, ‘চলুন দোতলার একটা ঘর পরিষ্কার করে আমি থাকার জায়গা করেছি। সেখানে দু’জনেরই থাকা যাবে। অন্ধকার সিঁড়িগুলো দেখে উঠবেন কিন্তু।’
সিঁড়ির উপর টর্চের আলো ফেলে দুজনেই উপরের দিকে উঠতে লাগলেন। উঠতে উঠতেই চোখে পড়ল বহু পুরানো আমলের একটা ভাঙা দেওয়াল ঘড়ির উপর। ঘণ্টার কাঁটা কবেই ভেঙে গেছে। মিনিটেরটা ঝুলছে। বাড়ির কোন গুলো মাকড়শার জাল আর ঝুলে ভর্তি। সারা সিঁড়ি জুড়ে একটা ভ্যাপসা গন্ধ ছড়িয়ে আছে। শ্রীমন্ত বাবু ব্যাগ থেকে কার্বলিক অ্যাসিডটা বের করে সিঁড়িতেও অল্প ছিটিয়ে দিলেন। এই সময়েই সাপের উপদ্রবটা একটু বাড়ে। বাইরে এবার ধীরে ধীরে অন্ধকার রাজত্ব করতে শুরু করল।
 
দুজনে বসে গল্প করতে করতেই রাত্রি ন’টা বাজল। বাড়িতে অস্বাভাবিক কিছুই নজরেও পড়ল না, কানেও এলো না। দু’জনেই নিজের নিজের অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন দু’জনকে। মতিলাল বাবুকেও ভূত দর্শন দেয়নি। দু-এক জায়গায় তিনি গন্ধ-টন্ধ পেলেও চোখে কিছুই পড়েনি। গত বছর রঘুনাথ পুরের এক পোড়ো বাড়িতে রাত কাটাতে গিয়ে বরং চোরের পাল্লায় পড়ে হাতের ঘড়ি থেকে শুরু করে টাকাপয়সা সবেই গিয়েছিল, একথা বললেন তিনি। গল্প করতে করতেই দু’জনে রাত্রির আহার সেরে নিলেন। ঘরটাতে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে মুখোমুখি বসেই গল্প করছিলেন দুই ভূত বিশারদ। এমন সময় জানালা দিয়ে একটা চামচিকা ঘরে ঢুকল। তারপর এদিক সেদিক কিছুক্ষণ ঘুরপাক খেয়ে যে পথে ঢুকেছিল সেই পথেই বেরিয়ে গেল আবার। আরও বেশ কিছুক্ষণ গল্প করার পর দুজনে নিজের নিজের জায়গায় শুয়ে পড়লেন।
কখন যে চোখ লেগেছিল কারুরেই খেয়াল নেই। হটাৎ নিচের থেকে একটা কুকুরের গলার আওয়াজ শুনে দুজনেরই ঘুম ভেঙে গেল। মতিলাল বাবু জিগ্যেস করলেন, ‘শুনতে পেলেন কুকুরের আওয়াজটা?’ শ্রীমন্ত বাবুও সম্মতি জানিয়ে বললেন হাঁ তিনিও শুনতে পেয়েছেন। শ্রীমন্ত বাবুর কথা শেষ হতে না হতেই নিচের ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত্রি বারটা বাজল এবার। দুজনে ঘড়ির শব্দ শুনে বেশ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কুকুরটা ঠিক তখনই আরেকবার ঘেও ঘেও করে সারা জমিদার বাড়ি কাঁপিয়ে তুলল। মুহূর্তে আবার সব শান্ত। আবার সব চুপচাপ। শ্রীমন্ত বাবু ফিসফিস করে বললেন, ‘চলুন নিচের থেকে দেখে আসি ব্যাপারটা কী!’ 
মতিলাল বাবু বাধা দিয়ে বললেন, ‘দাঁড়ান কুকুরটা আরেকবার ডাকুক তার পরেই গিয়ে দেখব। আগে দেখেনি কোথা থেকে ডাকটা আসছে।’ 
অল্প সময়ের ভেতরেই দু’জনে বেশ আন্তরিকতা তৈরি হয়েছে। কিছুক্ষণ আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া না গেলেও নিচের থেকে ভুর-ভুর করে পোলাও আর মাংসের গন্ধ ভেসে আসতে শুরু করল এবার। যেন নিচে বিয়ে বাড়ির আয়োজন চলছে। শ্রীমন্ত বাবু মতিলাল বাবুর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘আগের দুটো রাতেও কী এমন সব অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছিল?’ 
মতিলাল বাবু যেন কোথায় মগ্ন হয়েছিলেন তাই একটু হচকচিয়ে বললেন ‘হাঁ, কী বললেন গত দুই রাতে? না, না কিচ্ছু হয়নি এইসব।’
শ্রীমন্ত বাবু এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ভূত ভাইপোর দেখা তাহলে আজকে রাতে পেলেও পেতে পারি।’ 

ঠিক এমন সময় কুকুরটা নিচের থেকে আরেকবার চিৎকার করে উঠল। দু’জনেই দু’জনের দুটো পাঁচ সেলের টর্চ নিয়ে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলেন। বাইরে বেরিয়েই শ্রীমন্ত বাবু অবাক হয়ে গেলেন বারান্দার সোজাসুজি যে ঘরটা আছে সেটার বন্ধ কপাটের ফাঁক থেকে আলোর ক্ষীণ রেখা বেরিয়ে আসতে দেখে। দুজনে গুটি গুটি পায়ে ঘরটার দিকে এগিয়ে যেতেই শুনতে পেলেন নূপুরের আওয়াজ। হাঁ, ঘরের ভেতর থেকেই আসছে আওয়াজটা। দরজার কাছে গিয়ে কিছু একটা ভাবলেন শ্রীমন্ত বাবু, তারপর যে ফাঁক দিয়ে আলোটা আসছে সেই ফাঁকে চোখ রেখে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলেন। আবছা আলোতেও দেখা গেল একটা নারী মূর্তি নাচ করে যাচ্ছে আপন ছন্দে। আরেকটা লোক বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে সেই নাচ দেখতে দেখতে সুরা পান করছে। আর এক সেকেন্ড দেরি না করেই দুড়ুম করে দরজায় এক লাথি মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল দরজার পাল্লাটা ছেড়ে পড়ল। ভেতরে ঢুকে দুজনে সারা ঘরে টর্চের আলো বোলাতে লাগলেন। কিন্তু কোথায় সেই নারী মূর্তি! কোথায় সেই শুয়ে থাকা লোকটা! কোথায় বা আলো! সারা ঘরটাই শূন্য। তবে শ্রীমন্ত বাবু অনুভব করলেন কারা যেন ভেতরে আছে। তাদের দেখা না গেলেও তাদের উপস্থিতি বেশ বোঝা যাচ্ছে। শ্রীমন্ত বাবুর শুধুই মনে হতে লাগল যেন কতক গুলো অদৃশ্য চোখ তাকে দেখছে। দু’কানের পাশ দিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল এবার। এই ঘরেও ভুরভুর করে খাবারের গন্ধ এসে ঢুকছে। এমন সময় কুকুরটা নিচের ঘর থেকে আবার ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে দু’জনে ছুটে নিচে নামলেন। 
চারিদিকটা অন্ধকারে ভরে আছে। টর্চের আলো পড়তেই একটা বিশাল আকারের কুকুর দেখতে পেলেন দুজনেই। যেমন তার চেহারা তেমন তার দাঁত। মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা। কিছুক্ষণ বড়বড় চোখ করে দাঁড়িয়ে রইল কুকুরটা তারপর নিজেয় চলে গেল একটা ঘরের দিকে। কুকুরটা দেখে আর শ্রীমন্ত বাবুর মুখে কথা ফুটল না। পিছন থেকে মতিলাল বাবু বললেন, ‘কী শ্রীমন্ত বাবু কুকুর টাকে দেখে কিছু বুঝতে পারলেন! রক্তের দাগছিল ওর মুখে। কিন্তু কুকুরটা রক্ত পেল কোথায়?’ 
ভয়ে ভয়ে শ্রীমন্ত বাবু বললেন, ‘সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’
মতিলাল বাবু বললেন, ‘চলুন উপরে চলুন আরেকটা জিনিশ দেখাই। আপনি যখন দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরটা দেখছিলেন আমি তখন দেওয়ালে ঝোলানো একটা ছবি দেখলাম!’ 
ভয়ার্ত কৌতূহলের সাথে শ্রীমন্ত বাবু জিগ্যেস করলেন ‘কার ছবি?’ মতিলাল বাবু কোনো উত্তর না দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে সোজা উপরের দিকে উঠতে লাগলেন। 
   
শ্রীমন্ত বাবুকে ঘরে বসতে বলে একাই ছবিটা আনতে গেলেন মতিলাল বাবু। আপাতত যা যা দেখেছেন তাতেই শ্রীমন্ত বাবুর বিস্ময় কাটছে না। কে নাচ করছিল? কেই বা শুয়েছিল? ভেতরে ঢুকতেই তারা কোথায় অদৃশ্য হল? কুকুরটার মুখে রক্তই বা এল কেমন করে ? কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি। এমন সময় বাইরের থেকে একটা কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো ছবি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন মতিলাল বাবু। ছবিটা শ্রীমন্ত বাবুর হাতে দিয়ে বললেন, ‘ছবিটা দেখে বলুন এবার বই লিখলে কী নামে লিখবেন?’  ছবিটা হাতে নিয়ে তাতে টর্চের আলো ফেলতেই শ্রীমন্ত বাবুর শিরায় শিরায় একটা ভয়ের স্রোত বয়ে গেল। 
এ তিনি কী দেখছেন! মতিলাল বাবু একটা আরাম কেদারায় বসে আছেন। উনার ডান হাতটা একটা বিশালাকার কুকুরের মাথায় নামানো। ছবিটার নিচে বড় বড় করে লেখা, “জমিদার মতিলাল হালদার। জন্ম- ১২৪১-১২ই আষাঢ়। মৃত্যু ১২৯৩-১৭ই চৈত্র।” এর পরেই মতিলাল বাবু পিশাচের মতো ভয়ঙ্কর ভাবে হেসে উঠলেন। ভয়ে বিস্ময়ে শ্রীমন্ত বাবুর দু’চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। এ তিনি কার সাথে রাত কাটাচ্ছিলেন!
পরেরদিন সকালে পুলিশ এসে জলটল দিতেই চেতনা ফিরল শ্রীমন্ত বাবুর। এখনো তিনি দু’হাতে ছবিটা আঁকড়ে ধরেই আছেন। পুলিশের সাথে সেই পান দোকানের ছেলেটিও এসেছে। সেই একটা আধ খাওয়া আধ পঁচা লাশের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল, ‘এই লোকটাই তো তিন দিন আগে এখানে এসেছিল।’ কম বয়েসি পুলিশটি বললেন, ‘যে রাতে এসেছিলেন সেই রাতেই উনি মারা গেছেন বলেই মনে হচ্ছে, এটা কালকে রাতের খুন নয়। লাশটা কদিন ধরে কোন হিংস জন্তু ছিঁড়ে খেয়েছে।’ কারুর মুখেই আর কোনো কথা নেই। 
শ্রীমন্ত বাবুই একমাত্র জানেন কোন জন্তু খেয়েছে ওই লোকটার শরীরটা। কিন্তু তাঁর কিছু বলার মতো শক্তি নেই এখন। মতিলাল বাবুর চেহারাটা যেন চোখে সেঁটে রয়েছে। এখনো আগের রাতের বিস্ময় কাটেনি। বাড়ি গিয়ে তাঁকে যে আরও একটা বই লিখতে হবে ভূতের উপর। কী জানি তিনি এবার বইটার কী নাম দেবেন!
                                [সমাপ্ত]
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments