গল্প, শয়তানের মুখোশ

গল্প, শয়তানের মুখোশ

Advertisemen


শয়তানের মুখোশ

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়
mukhosh- www.amarsahitya.com












‘বাবা এ বাবা দমে জ্বালা কইরছ্যে। ইটা ঢুইকব্যেক নাই। ছোট বঠে। বাবা এ...’

‘দেখছিস মাপ লিচ্চি তবু কানের গড়াটায় সেই ঘ্যেনের ঘ্যেনের কচ্চিস। টুকু দাঁড়া ন, মাপটা লিয়েলি।’

‘বাবা এ বাবা...’ এবার ঘুমটা ভেঙে যায় দুলালের। এখন ঘরময় অন্ধকার দাঁত বিছিয়ে খিলখিল করে হাসছে। বিছানা থেকে উঠে লাইটটা জালায় দুলাল। অন্ধকারের দাঁতগুলো যে যার মতো ঘরের দেওয়ালে লুকিয়ে পড়ে। ঘামে শরীরটা ভিজে গেছে দুলালের। মাটির কলশি থেকে গ্লাসে জল গড়িয়ে ঢক-ঢক শব্দে জলটা গিলে নেয় দুলাল। বাতাসী আলুথালু শরীর বিছিয়ে ঘুমোচ্ছে এখন। ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে বাতাসীর চুপসে যাওয়া বুকদুটো বেরিয়ে পড়েছে বাতাসের খোঁজে। বালিশের তলা থেকে বিড়ির বান্ডিল আর দেশলাইটা নিয়ে একটা বিড়ি ধরায় দুলাল। বিড়ির ধোঁয়ায় ঘরটা আরও গুমোট হয়। দুলালের কানে স্বপ্নে শোনা কথাগুলো আবার ভিড় করে আসে...




এক

ভাদ্রমাসের মাঝামাঝি থেকেই কাজের চাপ বাড়তে থাকে দুলালের। এই দুটো মাস নিঃশ্বাসটাও গুনে-গুনে নিতে হয় ওকে। বাতাসী কাজে তেমন পটু না হলেও দুলালকে যথেষ্ট সাহায্য করে। মুখোশ গুলোকে সময় মতো রোদে দেওয়া, পরিমাণ মতো রোদ পাওয়ার পর সেগুলোকে তুলে ঘরে রাখা। দোকানে দোকানে গিয়ে অর্ডার নিয়ে আসা। সময় মতো অর্ডারের মাল দোকানে দিয়ে আসা। বাতাসী না থাকলে দুলালের একার পক্ষে সবদিক সামলানো সম্ভব হত না।

পুরুলিয়ার মাহাত পাড়ায় গিয়ে দুলাল মাহাতোর নাম বললে যে কেউ ওর ঘরটা দেখিয়ে দিতে পারবে। রাজ্যপাল আর মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বেশ কয়েকবার পুরষ্কার পেয়েছে দুলাল। সে বছর দুর্গা পূজার সময় বাথানির মাঠে মরা মহিষ বানিয়ে শকুন নামিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল দুলাল। সেদিনের পর থেকে ছেলে বুড়ো সবাই ওকে এক নামে চেনে। তবে দুলাল মাটির কাজে খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। ছৌনাচের মুখোশ বানাতেই ও বেশি ভালবাসে। সারা বছর ধরেই মুখোশ বানাতে হয় ওকে। দুর্গা পূজার আগের কটা মাস খুব কাজের চাপ পড়ে যায়। নানান জায়গা থেকে অর্ডার আসে।

প্রতিদিনের মতো আজকেও দুলাল সকাল সকাল নিজের কাজ নিয়ে বসেছিল। আপন মনে রঙ করছিল একটা মুখোশে। বাতাসী মুখোশের সাইজ অনুযায়ী পেপার কাটছিল দুলালের পাশে বসেই। ঠিক এমন সময় একটা লোক ঢুকল ঘরের ভেতর। অদ্ভুত চেহারা লোকটার। কাঁচাপাকা চুল, গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, ঠোঁটের কোনায় হাসির রেখা ঝুলে আছে। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ। পরনে আলখাল্লা ধরণের এক পাঞ্জাবী। দুলাল কিছুক্ষণ চেয়ে দেখল লোকটাকে তারপর বলল, ‘পূজার আগে আর লতুন অর্ডার লিব নাই।’ লোকটা কিছুই বলল না। হাসি মুখে তাকিয়ে রইল একটা মুখোশের দিকে। কথাটা বলার পর দুলাল ভেবেছিল লোকটা হয়তো কিছু বলবে। লোকটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দেখে দুলাল এবার জিজ্ঞেস করল, ‘কীসের মুখশ চাই ?’

এবার উত্তর দিল লোকটা, ‘আমি মুখোশ কিনতে আসিনি।’

‘তাহলে কী জন্যে আইচেন ?’ জিজ্ঞেস করল দুলাল।

‘এমনি।’

লোকটার কথার মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না দুলাল। আর কথা না বাড়িয়ে বাতাসীকে চোখের ইশারায় ঘরের ভেতর ঢুকতে বলে আবার নিজের কাজে মনদিল। বাতাসী কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইল দুলালের মুখের দিকে। তারপর চুপচাপ ঘরের ভেতরে চলে গেল। হাতে ধরে থাকা মুখোশটায় রঙ দেওয়া হলে দুলাল তাকিয়ে দেখে লোকটা নেই। কখন বেরিয়ে গেছে। লোকটার মতিগতি বোধগম্য হল না দুলালের। এমন তো কত লোকেই আসে-যায় ওসব নিয়ে বিশেষ কিছু ভাবার সময় হয় না দুলালের। আজকের এই লোকটাকে দেখে কেমন যেন একটা খটকা লাগল ওর।

হাতের রঙ করা মুখোশটাকে উঠোনের রোদে নামাতে গিয়ে দুলাল খেয়াল করল সদর দরজার কোনায় একটা প্যাকেট পড়ে আছে। প্যাকেটটা কুড়িয়ে থমকে গেল দুলাল। একবান্ডিল পাঁচশ টাকার নোট রাখা আছে প্যাকেটটার ভেতর। বুকটা ছ্যাঁক করে উঠল দুলালের। কোনও বদ মতলব নিয়ে আসেনি তো লোকটা ? নিজেই নিজেকে প্রশ্নটা করল কয়েকবার। কোনও উত্তর পেলো না। একবার ভাবল প্যাকেটটা নিয়ে গিয়ে লোকাল থানায় দিয়ে আসবে। শেষ পর্যন্ত সাহস হল না দুলালের। পুলিশের চক্করে পড়লে বিপদের সম্ভাবনাই বেশি। শেষ পর্যন্ত অনেক চিন্তা ভাবনা করে প্যাকেটটা ঢুকিয়ে রেখে দিল একটা মুখোশের ভেতর। যদি লোকটা আবার আসে তাহলে ওকে ফিরিয়ে দেবে...




দুই

নানান কাজের চাপে টাকার প্যাকেটটার কথা মাথাতেই ছিল না দুলালের। মনে পড়ল মুখোশটা বিক্রি করতে গিয়ে। মুখোশটা হাতে নিয়েও টাঙিয়েই রেখে দিল দেওয়ালে। বেশ কিছুদিন হল পূজা পেরিয়ে গেছে। এখন কাজের তেমন চাপ নেই বললে চলে। দুলাল ভেবেছিল লোকটা হয়তো আবার কিছু দিনের ভেতর কোনও কুপ্রস্তাব নিয়ে আসবে। কিন্তু লোকটা সেই যে গেল আজও এলো না। প্যাকেটটার কথা দুলাল বাতাসীকেও বলেনি। দুলাল জানে বাতাসী টাকার গন্ধ পেলে সেটা শেষ না করে শান্তিতে বসবে না।

দিন দিন কাজের পরিমাণ যতই কমছিল ততই বেশি বেশি মনে পড়ছিল টাকার প্যাকেটটার কথা। শেষ পর্যন্ত দুলাল যখন নিশ্চিত হল লোকটা আর আসবে না তখন হাত দিল টাকার প্যাকেটটায়। ওই টাকা খরচা করে ঘরের চাল ডাল যেমন এলো ঠিক তেমন ভাবেই মুখোশের জন্য রঙ তুলিও এলো। বিনা পরিশ্রমের টাকা খরচা করতে বিশেষ সময় লাগল না। মাস দুয়েকের ভেতরেই দুলাল শেষ করে ফেলল টাকাগুলো। টাকাটা শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর আবার হাজির হল লোকটা। লোকটা যে আবার কোনদিন আসবে সেটা আর কল্পনা করেও দেখেনি দুলাল। লোকটাকে দেখার পরেই দুলাল মনে মনে ঠিক করে নিল লোকটা টাকার কথা বললে টাকাটার কথা পুরোপুরি অস্বীকার করে দেবে। কিন্তু আশ্চর্য, লোকটা টাকার কোনও কথাই বলল না। সেদিনের যেমন নীরবে বেরিয়ে গিয়েছিল ঠিক তেমন ভাবেই বেরিয়ে গেল আজকেও। তবে আজকে আর কোনও টাকা রেখে গেল না লোকটা।

এবার বেশ চিন্তায় পড়ল দুলাল। কে এই লোকটা ? কেন আসে ওর কাছে ? কী করাতে চায় ওকে দিয়ে ? নিজেই নিজেকে প্রশ্নে প্রশ্নে অস্থির করে দুলাল। কিন্তু উত্তরগুলো কিছুতেই ধরা দিল না ওর হাতে। শেষ পর্যন্ত বাতাসীকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল দুলাল। ওর একার পক্ষে আর চাপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তবে বাতাসীকে বলেও বিশেষ কিছুই লাভ হল না দুলালের। বাতাসী এমন কোনও পথ বলতে পারল না যে পথে ভাবলে মানসিক শান্তি পায় দুলাল।




আজকে আর রাতজেগে কাজ করতে ইচ্ছে করছিল না দুলালের। বেশ কিছুদিন হল শরীরটাও সাথ দিচ্ছে না ওর। বাতাসীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমটা ভাঙল আবার সেই স্বপ্নটা দেখে। অনেক চেষ্টা করেও আর ঘুম এলো না ওর। শেষ পর্যন্ত ঘরের কপাট খুলে বাইরে বেরিয়ে আসতে হল ওকে। একটা বিড়ি ধরিয়ে বসল ঘরের বারান্দায়। আজকে আকাশ জুড়ে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখা মুখোশগুলো। ঘরের পিছন দিকের বাঁশ বাগান থেকে ডাহুকের ডাক ভেসে আসছে। এমন রাত মানুষের মনে নেশা ধরিয়ে দেয়। দুলালের ভেতরটাও আপন খেয়ালে গুনগুন করে ওঠে, 

‘আইজ চাঁদ চইল্যেছে আকাশ গায়ে জোছনা বিছ্যায়ে

আইজ বুকের ভেতর প্রেমের খেলা দুবুক লাচ্যাইয়ে।

তুই ঘর ভিতরে ঘুমাই আছিস আমি বেকার বাজাই বাঁশি

আর কবে বুঝবি লো তুই আমি কীসের লাইগ্যে আসি ?’ দুলাল গানটা থামিয়ে দিতেই দরজার বাইরে থেকে গানের পরের লাইন দুটো ভেসে আসে,

‘ওলো সখী তুই উঠার আগেই ভোর হইয়্যে যায় পাছে

আয়-না-গো তুই বাতাস হইয়্যে আমার বুকের কাছে।’ 

গানের শেষ দুটো লাইন শুনে দুলাল অবাক হয়ে যায়। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কে এই গান গায় ? এই গান তো দুলালের বানানো গান। এই গান অন্যকারু জানার কথা নয়। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে গিয়ে বাইরের দরজাটা খুলল দুলাল। দরজাটা খুলেই দেখল সেই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলোয় দুলাল পরিষ্কার দেখতে পেল লোকটা হাসছে। সরাসরি জিজ্ঞেস করল দুলাল, ‘এতো রাইত্যে কী জন্যে আইচেন ?’

‘একটা মুখোশ চাই আমার।’

‘না আমি আপনারে কোনও মুখশ দিব নাই।’

লোকটা হাসতে থাকে। নিস্তব্ধ রাত্রিতে ভয়ংকর শোনায় সেই হাসির শব্দ। দুলাল নিজের কান দুটোকে প্রাণপণে চাপা দিয়ে চিৎকার করে বলে, ‘আমি দিব নাই মুখশ। কোনও মুখশ দিব নাই।’

লোকটা হাসি মুখেই বলে, ‘মুখোশটা বানিয়ে ফেল দুলাল বানিয়ে ফেল। ওই মুখোশটা তোকে বানাতেই হবে।’ কথাগুলো বলেই লোকটা ষ্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। দুলাল কান দুটোকে চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করে কপাট কোনে দাঁড়িয়ে থাকে। লোকটাকে আর দেখা যায় না। বাতাসী দুলালকে টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে এসে কপাট বন্ধ করে দেয়।




তিন

পরেরদিন সকাল সকাল বাতাসী কয়েকটা মুখোশ নিয়ে বাজারে বেরিয়ে পড়ে। এই মুখোশ গুলো রমেন গাঙ্গুলি অর্ডার দিয়েছিল। মুখোশগুলো কলকাতায় যাবে। আজকে বাজারে আরও একটা কাজ আছে বাতাসীর। দুটো কাজ সেরেই ও ফিরবে। বাতাসী বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পর ভাঙা আলমারিটা থেকে দুলাল একটা মুখোশ বের করে। আজ অনেক বছর পর দুলাল আবার বের করেছে মুখোশটা। সেদিন সারারাত কাজ করেও মুখোশটা শেষ করতে পারেনি দুলাল। সেই রাতের পর আর হাত দেওয়া হয়নি মুখোশটায়। আজকে যে ভাবেই হোক মুখোশটার অসমাপ্ত কাজটা ওকে শেষ করতে হবে। গতকাল রাতেই দুলাল বুঝতে পেরেছিল লোকটা কোন মুখোশটা নিতে চায়। আজ থেকে সাত বছর আগে একজন লোক এসেছিল দুলালের কাছে। একটা শয়তানের মুখোশ বানাতে বলেছিল দুলালকে। কাজটা নিয়েছিল দুলাল কিন্ত শেষ করতে পারেনি।

মুখোশটায় রঙ করতে করতে দুলাল শুনতে পায়, ‘বাবা এ বাবা দমে জ্বালা কইরছ্যে। ইটা ঢুইকব্যেক নাই। ছোট বঠে। বাবা এ...’

মাঝে মাঝে রঙতুলি ফেলে কান দুটোকে চাপা দেয় দুলাল। কয়েক মিনিট পর কান ছেড়ে আবার কাজে মন দেয়। প্রায় ঘণ্টা খানেক এভাবে চলার পর মুখোশটার কাজ শেষ হয়। একটা অদ্ভুত আনন্দ হয় দুলালের ভেতর। এর আগে কোনও মুখোশ বানিয়ে এতোটা আনন্দ হয়নি ওর। যেমন বানাতে চেয়েছিল অবিকল তেমনই মুখোশ বানিয়েছে দুলাল। 

মুখোশটা দুহাতে নিয়ে দুলাল এটাই ভাবছিল কতক্ষণে লোকটা আসে। ও এলেই ওর হাতে মুখোশটা ধরিয়ে দিয়ে বিদায় করবে ওকে। মুখোশটা কমপ্লিট হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর সেই লোকটা দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাসি মুখে দুলালকে জিজ্ঞেস করে, ‘হয়েছে ?’

‘হইচ্যে। কিন্তু এই মুখোশটা লিয়ে যাবার পর আর আসা চইলব্যেক নাই আমার বাড়ি।’ দুলাল বলে।

লোকটা কোনও কথা না বলে মুচকি হেসে দুলালের কাছে এগিয়ে আসে। দুলাল শক্ত করে ধরে রাখে মুখোশটা। কয়েকপা পিছিয়ে গিয়ে দূরের থেকেই মুখোশটা দেখায় লোকটাকে। লোকটার পছন্দ হয়েছে বুঝতে পারে দুলাল। লোকটা হাসি মুখে অস্ফুট সুরে বলে, ‘শয়তানের মুখোশ।’




যখন বাতাসী ঘরে ঢোকে তখনো দুলাল লোকটার সঙ্গে গল্প করছে। আজকে বাতাসীর সঙ্গে আরও একজন এসেছে। 

পুলিশ ? 

না পুলিশ নয়, মনরোগ বিশেষজ্ঞ। বিশিষ্ট মনরোগ বিশেষজ্ঞ সুবিমল সরকার। সুবিমলকে বাতাসী আঙুল বাড়িয়ে দেখায় দুলাল কেমন ভাবে নিজেই নিজের সঙ্গে গল্প করছে। শুধু তাই নয় দুলাল গল্প করছে সম্পূর্ণ দুরকম ভাবে। একটা ওর নিজের ভাষা অন্যটা শহরের। বাতাসী দুলালের কাছে যেতে চাইলে সুবিমল বাধা দিয়ে ফিসফিস করে বলে, ‘উনাকে মুখোশটা দিতে দিন।’ 

দুলালের কল্পনায় সৃষ্টি লোকটা যখন কথা দেয় ও আর আসবে না তখন দুলাল মুখোশটা শূন্যে তুলে ধরে। তারপর লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। বাতাসী আর সুবিমল সরকার মিলে দুলালকে ঘরের ভেতর নিয়ে আসে। সুবিমল বলে, ‘ভয়ের কিছু নেই। আশা করি আজকের পর আর এই সমস্যা হবে না। তবে ওই মুখোশটা যেন ওর চোখে আর না পড়ে। পারলে ওটাকে পুড়িয়ে দেবেন।’




চার

বাতাসী উঠোনে গিয়ে মুখোশটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে যায়। অবিকল নিজের মুখোশ বানিয়েছে দুলাল। কাঁচাপাকা চুল, গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, ঠোঁটের কোনায় হাসির রেখা ঝুলে আছে। মুখোশ হাতে নিয়ে বাতাসী সুবিমলের সামনে তুলে ধরে। মুখোশটাকে দেখার পর কয়েক মিনিট চিন্তা করে সুবিমল। কোনও একটা হিসেব মেলানোর চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পর সুবিমল বাতাসীকে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা দুলাল বাবু নিজের মুখোশ বানালেন কেন? আপনার কী মনে হয় ?’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাতাসী বলে, ‘যেদিন রাইত্যে আমাদের ছেল্যাটাকে সাপে কাইট্যে ছিল সেদিন একটা লোক আইছিল একটা অর্ডার লিয়ে। একটা শয়তানের মুখশের অর্ডার। সেই অর্ডারের কাইজটাই রাইত্যের বেলায় কচ্চিল দুলাল। আমি ঘুমাচ্চিলম। তাতাই আমাকেও তুইল্যেছিল, উঠিনাই। উয়ার বাপও কাইজ ছ্যাইড়ে উঠে নাই। যখন জাইনত্যে পাইল্লম তাতাইকে সাপে কাইট্যাছে, তখন সব শেষ। সেদিন থ্যেকেই তাতাই এর বাপ ক্যেমন যেন হইচ্যে।’

‘আচ্ছা সেদিন আপনি টাকার বান্ডিলটা কোথায় রেখেছিলেন ?’

‘ওই কপাট কুনট্যায়।’ আঙুল বাড়িয়ে দেখায় বাতাসী।

‘দুলাল টাকাগুলো নিয়ে কোথায় রেখেছিল বলতে পারবেন ?’ 

‘একটা মুখশের ভিতর‍্যে। দাঁড়ান লিয়ে আসচি।’

বাতাসী মুখোশটা নিয়ে এসে সুবিমলের হাতে দেয়। সুবিমল মুখোশটা বেশ কিছুক্ষণ নাড়া চাড়া করার পর বলে, ‘আচ্ছা এই মুখোশটার ভেতর আরেকটা ছোট্ট মুখোশ কেন আছে ?’

এবার চুপ করে যায় বাতাসী। কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা পুরানো ব্যথাটা চোখের পাতা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়। বাতাসীকে চুপ করে থাকতে দেখে সুবিমল বলে, ‘আমাকে মুখোশ রাখার ঘরটায় একবার নিয়ে চলুন।’

না বলতে পারে না বাতাসী। মুখোশ ঘরে নিয়ে আসে সুবিমলকে। ঘরটায় ঢুকে অবাক হয়ে যায় সুবিমল। সারা ঘরটা জুড়ে কয়েকশ মুখোশ রাখা আছে। দেব-দেবীদের মুখোশ থেকে শুরু করে পশু-পাখি কিছুই বাদ নেই। কিন্তু একটা দেওয়াল জুড়ে ঝুলছে অদ্ভুত কিছু মুখোশ। প্রতিটা মুখোশের ভেতর একটা করে ছোটছোট মুখোশ আছে। একটা মুখোশকে হাতে নিয়ে ভেতরের ছোট মুখোশটাকে বের করার চেষ্টা করে সুবিমল। পারে না। বড় মুখোশটার ভেতর ছোট মুখোশটাকে এমন ভাবেই ঢোকানো আছে যে দুটোকে আলাদা করা যাচ্ছে না কিছুতেই। সুবিমল অবাক চোখে বাতাসীকে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি নির্ভয়ে বলতে পারেন। আমি কাউকে কিছু বলব না। কেন বড় মুখোশটার ভেতর ছোটটাকে লুকিয়ে রাখেছে দুলাল বাবু ?’

শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছে বাতাসী বলে, ‘তাতাইকে সাপে কামড়্যায় নায় ?’

‘তাহলে ?’

‘সাতবছর আগে সেদিন যে লোকটা আইছিল সে বইল্যেছিল...’

‘শয়তানের মুখোশ বানাতে। তারপর ?’

‘মুখশটা মাপে ঠিক হচ্যিল নাই। তাতাই এর বাপ তাই তাতাইকে মুখশটা পর‍্যাই মাপটা ঠিক করত্যে গ্যেইছিল...’ কান্নায় বাতাসীর কথা গুলো ঠোঁটের ফাঁকে ফাঁকে জড়িয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে ভেতরের কান্নাটাকে গিলে ফেলার চেষ্টা করে বাতাসী বলে, ‘তাতাই বারবার বইল্যেছিল, দমে জ্বালা কইরছ্যে। ইটা ঢুইকব্যেক নাই। ছোট বঠে। উয়ার বাপ কথাগুল্যান কানেই দিল নাই। আর খুলত্যে পার‍্যে নাই মুখশটা। মাছের মতো ছটপট্যাই ছটপট্যাই মইর‍্যে ছিল তাতাই...’ নিজেকে আটকাতে পারে না বাতাসী। সাতবছর ধরে জমিয়ে রাখা চোখের জল আজ আর কোনও বাধা মানতে চাইছে না।

সুবিমল একটা মুখোশকে টেনে ছেঁড়ার চেষ্টা করে। পারে না। প্রতিটা কাজগের মুখোশের ভেতর টিনের পাত দেওয়া আছে। সুবিমল খেয়াল করে দেখে সব মুখোশগুলোর গঠন এক নয়। অধিকাংশ মুখোশের পিছিন দিকটায় কিছু নেই, ফাঁকা। গোটা কুড়ি-পঁচিশ মুখোশ আছে যেগুলোর পিছনটাও সুন্দর ভাবে বানানো। তবে আশ্চর্যের বিষয় এই কুড়ি-পঁচিশটা মুখোশ শয়তানের মুখোশ।

সুবিমল সরকার আগে তো একজন মানুষ, পরে ডাক্তার। ওর বাড়িতেও বছর পাঁচেকের একটা মেয়ে আছে। তাই ওর পক্ষে দুলাল কিংবা বাতাসীর যন্ত্রণার জায়গাটা বোঝা কঠিন নয়। এতক্ষণে সুবিমল বুঝতে পারে, কেন দুলাল শয়তানের মুখোশে নিজের রূপ এঁকেছে। কেন শয়তানের মুখোশের ভেতর একটা করে ছোট্ট মুখোশ ঢোকানো রয়েছে।




দুলাল এখনো অচেতন ভাবে বিছানায় পড়ে আছে। সুবিমল দুলালের নাকের কাছে আঙুল নিয়ে গিয়ে দেখে গরম নিঃশ্বাস পড়ছে কি না। না নিঃশ্বাস স্বাভাবিক। এখন কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছে না দুলাল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সুবিমল বাতাসীকে বলে, ‘চিন্তা করবেন না। দুলাল বাবু ওই বাজে স্বপ্নটা বা ওই লোকটাকে আর কখনই দেখবে না। তবে হাঁ জ্ঞান ফেরার পর উনি যদি কাঁদেন তো উনাকে মন খুলে কাঁদতে দেবেন আজকে।’ কথাটা বলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গিয়েও আবার একবার ফিরে আসে সুবিমল, ‘আরেকটা কথা। শয়তানের ওই মুখোশটা, যেটা দুলাল বাবুর নিজের মুখের আকৃতি, সেটা যেন আর দুলাল বাবুর চোখে না পড়ে। ওটাকে দূরে কোথাও পুড়িয়ে দিয়ে আসুন কিংবা মাটি চাপা দিয়ে আসুন।’

সুবিমল চলে যাওয়ার পর বাতাসী দরজায় কোনায় দাঁড়িয়ে দুলালের মুখটা একবার উঁকি দিয় দেখে। কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করে। তারপর মুখোশটা নিয়ে বাড়ির পিছন দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। আর কোনদিন দুলালের চোখে পড়বে না শয়তানের মুখোশটা।

                                    [সমাপ্ত]






Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments