ধূসর জীবনের গল্প জলডুবি

ধূসর জীবনের গল্প জলডুবি

Advertisemen
www.amarsahitya.com
জলডুবি
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়
mukutmonipur www.amarsahitya.com

জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে সুবিমল জেঠু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বললেন, ‘তখন তো আর মোবাইল বা ইন্টারনেট ছিল না। অনেক কষ্টে এক ভাই এর হাত দিয়ে তোমাদের জেঠিমার কাছে চিঠি পাঠালাম। চিঠিটা তোমাদের জেঠিমা বোকার মতো চালের হাঁড়িতে লুকিয়ে রেখেছিল...’
‘চিঠি পড়তে পারত জেঠিমা ?’ জেঠুকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
‘তা আরও পারত না! ক্লাস ফোরে বিত্তি পেয়েছিল তোমাদের জেঠিমা। এখানে উঠে আসার পর একটা সময় নিয়ম করে বাসুলী মেলায় রামায়ণ মহাভারত পড়তে যেত। সবাই শুনত মন দিয়ে। এখন আর সেই সব দিন কোথায় ? মানুষ তো বাঁচতে ভুলে বাঁচার জন্যে ছুটছে। তা সেদিন রাতেই চিঠিটা হাতে পড়ল আমার শাশুড়ির। উনি অবশ্য পড়াশুনা জানতেন না। কিন্তু শ্বশুর ? ...’ এবার মুচকি মুচকি হাসলেন জেঠু, ‘সবই নিয়তি। উনি চিঠিটা এনে আমার জেঠুর হাতে ধরিয়ে দিলেন।’
‘তারপর ?’
‘তারপর আর কি, বকাবকি রাগারাগি করে শেষ পর্যন্ত বিয়ে দিয়ে দিলেন জেঠু। বাবাও খুশি হয়েছিলেন। আসলে সেই সময়টা ছিল বড় আবেগের। আমাদের অতগুলো গ্রাম জলের তলায় চলে যাবে সেই দুঃখেই দিন কাটত তখন। কে কোথায় হারিয়ে যাবে, আর কোনওদিন দেখা হবে কি না! এই সব নিয়েই তো দিন কাটছিল। প্রেম-ট্রেম নিয়ে বিশেষ ভাবার সময় কারুরই তেমন ছিল না। জেঠু বিয়েটা দিয়েছিলেন দুটো পরিবারকে বেঁধে রাখার জন্য।’
‘বিয়ের কতদিন পর ওখান থেকে এখানে এলে ?’ জিজ্ঞেস করল মল্লিকা।
‘মাস তিনেক পর। তখন অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। অনেকেই কোথায় যাবে ভেবে ভেবে অস্থির। কাজ শুরু হয়েছে কংশাবতীতে বাঁধ দেওয়ার। বারবার সরকারের লোক এসে তাগাদা দিচ্ছে...’
‘আচ্ছা সরকার এমনি এমনি তো তুলে দেয়নি, জমিজমা ঘর-বাড়ির দাম দিয়েছিল নিশ্চয় ?’
‘সে তো অনেকদিন আগেই দিয়েছিল রে মা। কিন্তু সেই টাকা তো কবেই শেষ। সরকারি টাকা পাওয়ার পরেও কুড়ি বছর ছিলাম ওখানে। যখন এখানে উঠে এলাম তখন হাতে কিছুই নেই। আমরা কয়েক ঘর এখানে এসেছিলাম। বাকিরা যে যেদিকে পেরেছে চলে গেছে। জানিস তো মা...’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন জেঠু, ‘চোখের সামনে ডুবতে দেখেছি ঘর-বাড়িগুলোকে। এখানে এসেও মন ওখানেই পড়ে থাকত। শৈশব-যৌবন সব তো ওখানেই কেটেছে। আজও চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারি রাস্তার কোথায় কোথায় পাথর বেরিয়েছিল। কোন পুকুরের কোন কোনাটায় কোন গাছটা ছিল। এখন সব জলের তলায়। আজ মুকুটমনিপুরের দিকে তাকিয়ে সবাই সৌন্দর্য খোঁজে। পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা দেখে। হানিমুন করতে যায়। কিন্তু ওই জলের তলায় আমাদের গ্রামছিল। আমাদের বেড়েওঠা ছিল। ধান-গম-আঁখ-আলুর জমি ছিল। কত প্রিয়জনের শেষ স্মৃতি ছিল, শ্মশান ছিল...’ জামার হাতায় চোখের জল মোছেন সুবিমল জেঠু। ‘আমার জেঠুর আর এখানে আসা হয়নি। আমার বিয়ের কয়েক সপ্তাহ পরেই একদিন হার্টফেল করে মারা গেলেন জেঠু। আসলে নিজের মাটি ছেড়ে যেতে হবে, এই দুঃখটা উনি মানতে পারেননি।’
আমরা দুজনে কিছুই বলতে পারি না। নির্বাক ভাবে তাকিয়ে থাকি উনার মুখের দিকে। উনার ঘোলাটে চোখে এখন কতকাল আগে ছেড়ে আসা নিজের গ্রাম জেগে আছে।

খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে উনি আবার শুরু করলেন, ‘এখানে যখন উঠে আসি তখন চারদিক জুড়ে শাল আর সেগুনের জঙ্গল। সাঁওতাল আর বাউরীদের কয়েকটা মাত্র ঘর। মাইলের পর মাইল হেঁটে হাটে যেতাম। দিনের বেলাতেও শেয়াল ডাকত তখন। নেকড়ে আর হায়নার ভয়ে প্রায় প্রতিটা রাত ঘুম হত না। এখানে আসার মাস ছয়েক পর অনেক কষ্টে কোনওরকমে বাঁশের বেড়া দিয়েছিলাম। তবুও শান্তি ছিল না। সুযোগ পেলেই বাঁশের বেড়া টপকে হায়নাতে ছাগল-ভেড়া তুলে নিয়ে যেত। হাঁস-মুর্গীর তো কথাই ছিল না। এখনো মনে আছে এক রাতে বনবেড়াল এসে আটটা হাঁস মেরেছিল। আস্তে আস্তে সময় বদলেছে। ঘরবাড়ি বেড়েছে, লোকজন বেড়েছে। সেই শাল-সেগুন চোখেও পড়ে না আর। নেকড়ে হায়না সব রূপকথা মনে হয়। এই নারায়ণপুর দেখলে কেউ কল্পনা করতেও পারবে না চল্লিশ বছর আগে নারায়ণপুর কেমন ছিল।’
‘আচ্ছা জেঠু একটা কথা বলব ?’
কয়েক সেকেন্ড উনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু যেন পড়ার চেষ্টা করলেন, ‘হ্যাঁ বলো।’
‘তুমি তো আমাদের কাছে আমাদের সঙ্গে থাকতে পারো।’
কেমন যেন ম্লান হয়ে এলো এবার উনার মুখটা। বেশ কিছুক্ষণ জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হাসার চেষ্টা করেও হাসতে পারলেন না হয়তো, ‘বাড়ি ছাড়তে আমার কষ্ট হত না যদি তোমাদের জেঠিমা বেঁচে থাকত। আসলে এই বয়সে তোমাদের জেঠিমার স্মৃতিটুকুও ছেড়ে যেতে হবে বলেই কষ্ট হচ্ছে।’
‘আচ্ছা বিরেনদা তো তোমাকেও নিয়ে যেতে পারত!’
‘নিয়ে যেতে চাইছিল। আমিই যেতে চাই না। বারবার ঘর ছাড়া হতে ভাল লাগে না।’
‘তুমি বৃদ্ধাশ্রমে গেলেও তো ঘর ছাড়তেই হবে। বিরেনদা তো শুনলাম বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছে অনির্বাণ রায়কে। অনির্বাণ বাবু...’
‘রড-সিমেন্টের দোকান খুলবে। জানি আমি।’
‘তাহলে ?’
‘আচ্ছা জেঠু আমরা না হয় রক্তের কেউ নই তবুও তোমাকে আমাদের কাছে রাখতে এতটুকুও দ্বিধা হবে না বিশ্বাস করো। তোমার ভেতর আমি আমার বড় কাকাকে খুঁজে পাই। ভাবতে ভাল লাগে, এখানেও আমাদের কেউ আছে। আমরা যদি তোমার নিজের হতাম তাও থাকতে না তুমি ?’ মল্লিকার গলাটা ভারী হয়ে এসেছে এবার।
চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে মল্লিকার মাথায় হাত রাখেন সুবিমল জেঠু। নিজের মনেই বিড়বিড় করেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর পকেট থেকে একটা রূপোর কাজললতা বের করে মল্লিকার হাতে দিয়ে বলেন, ‘এটা যত্ন করে রেখে দিও। এটা তোমাদের জেঠিমার স্মৃতি। আমি বুড়ো মানুষ কোথায় হারিয়ে ফেলব...’
[দ্বিতীয় অধ্যায়]

[১]
সেদিন সুবিমল জেঠু দুচোখ জল নিয়েই আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আর দেখা হয়নি। হ্যাঁ আমরা সম্পর্কে উনার কেউ ছিলাম না। কিন্তু আমাদের নিঃসঙ্গ জীবনে উনি অনেকটা অংশ জুড়ে ছিলেন। প্রথম যখন নারায়ণপুরে শিক্ষক হয়ে উনাদের পাড়ায় ভাড়াটিয়া হয়ে আসি তখন উনিও আমাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করে কথা বলতেন। আমিও বলতাম। সেটা ‘তুমি’ হয়েছিল ভেতরের টানেই। উনি চলে যাওয়ার পর আমি আর মল্লিকা কেমন যেন মুচড়ে গিয়েছিলাম। তবে উনি বৃদ্ধাশ্রম যাননি। উনি কোথায় চলে গেছেন কেউ জানে না। আমাদের বাড়ি থেকে যাওয়ার পরদিন থেকেই উনি নিখোঁজ। আসলে উনাকে খোঁজারও কেউ ছিল না। তখন বিরেনদা আর বৌদি বিদেশের স্বপ্নে বিভোর... হয়তো আপদ বিদেয় হওয়ায় আরামই পেয়েছিলেন ওরা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুবিমল জেঠুও ধূসরস্মৃতি হয়ে গেল একদিন। হার্ডওয়ারের দোকান হয়ে যাওয়া উনাদের বাড়িটার পাশ দিয়ে যেতে যেতে উনাকে মনে পড়ত। আবার কাজের চাপে ভুলেও যেতাম। মানুষ তো সম্পর্কের খোলস ছাড়তে ছাড়তেই বাঁচে। আমি বা মল্লিকা কেউই তার বাইরে নই।
‘বাবু আপনার চা...’ চায়ের ভাঁড়টা হাতে নিতে গিয়ে চমকে উঠে ছিলাম আমি। আবেগ আর উত্তেজনায় কেঁদেই ফেলেছিল মল্লিকা। টেবিলের ওপারে চায়ের ভাঁড় হাতে সুবিমল জেঠুকে কোনওদিন দেখব কল্পনা করিনি। প্রায় দুবছর পর দেখা। কালচিটে দাগ পড়া ধুতি, ফুলহাতা ময়লা পাঞ্জাবী, কাঁধে ময়লা গামছা। কাঁপা-কাঁপা হাতে চায়ের ভাঁড় নিয়ে দাঁড়িয়ে।
সুবিমল জেঠু কোথায় কোথায় যেতে পারেন সেই নিয়ে অনেক অলিক অঙ্ক মিলিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু সেদিন একবারও মাথায় আসেনি উনার একমাত্র আশ্রয় মুকুটমনিপুরের কথা। কিন্তু একটু গভীর ভাবে ভাবলেই বুঝতে পারতাম মুকুটমনিপুর ছাড়া উনার আর কোথাও যাওয়ার ছিল না। যাওয়ার নেই।
[২]
এখন মুকুটমনিপুর ড্যামের উপর দাঁড়িয়ে আছি আমরা তিনজন। ঠাণ্ডা হাওয়া সুবিমল জেঠুর পাকা চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে। ঘোলাটে চোখে উনি তাকিয়ে আছেন শান্ত জলের দিকে। এখন জলের বুকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি ভাসছে। উড়েও যাচ্ছে কেউ কেউ। সুবিমল জেঠু অনেকক্ষণ ধরে কিছু একটা খুঁজছেন। মরিয়া হয়ে খুঁজছেন। আমি আর মল্লিকা উনার মুখের দিকে তাকিয়ে উনাকে পড়ার চেষ্টা করছি। পড়তে পারছি না কিছুতেই।
হঠাৎ কেন যেন হাসলেন উনি। তারপর দূরের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললেন, ‘ওই যে এক ঝাঁক বালিহাঁস ভাসছে ? ওখানে আমাদের গ্রাম ছিল। আর ও...ই যে দূ...রে একটা বোট ভেসে যাচ্ছে, ওটা ছিল তোমাদের জেঠিমার বাপের বাড়ির গ্রাম। আর ওই যে একটা কি যেন পাখি ডুব দিল না ? ওখানে একটা মস্ত বটগাছ ছিল। ওখানে আমাদের পাঠশালা ছিল। আর ওই যে...’ নিজের মনের আয়নাতেই সব খুঁজে খুঁজে পাচ্ছেন উনি। আমার আর মল্লিকার চোখে কিছুই ধরা পড়ছে না। আমাদের চোখে শুধুই অনন্ত জল জেগে আছে। কোনও গ্রাম নেই, কোনও পাঠশালা নেই, কোনও বটগাছ নেই।
দুচোখে শান্তির রেখা টেনে দূরের দিকে এখনো তাকিয়ে আছেন উনি। জানি না আরও কোন কোন যায়গাগুলো উনার চোখে ধরা পড়ছে এখন। হয়তো উনি প্রতিদিন এখানে দাঁড়িয়ে নিজের গ্রাম; নিজের শৈশব আর হারিয়ে ফেলা দিনগুলোকে হাতড়ে বেড়ান। যেদিনগুলো জলের তলায় ডুবে আছে। যেদিনগুলোকে স্মৃতির জাল ফেলে তুলে আনতে হয়। 
আজ অকারণে বিরেনদা আর বৌদির অকৃতজ্ঞ মুখ দুটোই বারবার মনে পড়ছে আমার। দিনের সূর্য মুকুটমনিপুর ড্যামের জলে ডুবছে এখন। আমরা তিনজন দূরের লাল জলের দিকে নির্বাক ভাবে চেয়ে আছি। আর কিছুক্ষণ পরই সন্ধার আস্তরণ পড়বে জলের উপর। তারপর সুবিমল জেঠু চাইলেও আর উনার গ্রাম বা গ্রামের স্মৃতিগুলোকে খুঁজে পাবেন না। ওগুলো তলিয়ে যাবে অন্ধকার জলের তলায়।
মল্লিকার সঙ্গে লজে ফিরে এলাম আমি। উনাকে কিছুতেই আনতে পারলাম না ড্যামের ধার থেকে। উনি কিছুতেই আসবেন না এখন। এখন নাকি গ্রামের দুর্গা মন্দিরে সন্ধা আরতির সময় হয়েছে। উনার বিশ্বাস এই সন্ধা আরতির সময় কোথাও যেতে নেই।
                                                                            [সমাপ্ত]


Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments