প্রেমের গল্প, অবেলার অতিথি

প্রেমের গল্প, অবেলার অতিথি

Advertisemen

অবেলার অতিথি

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

‘তারপর তুমি কী বলেছিলে ?’ আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করল তনু। বাসটা সবে কমলপুর পেরিয়েছে। এখনো ঘণ্টা খানেকের রাস্তা। জানালা ধারের সিটে বসা আমার বরাবরের অভ্যাস ছিল। বিয়ের পর ওটা তনুর দখলে চলে গেছে। হালকা বাতাসে তনুর চুলে সুর লাগছে বারবার। ভুরভুর করে শ্যাম্পুর গন্ধ বেরিয়ে আসছে। জানালার ওপারে যতদূর দেখা যায় শুধু সবুজ ধানের ক্ষেত। হাওয়ার ঢেউ খেলছে ধান গাছ গুলোর মাথার উপর। আমি তনুর চোখের দিকে একবার তাকিয়ে বললাম, ‘কী আর বলব, বলেছিলাম আমার পক্ষে এখন বিয়ে করা অসম্ভব। টিউশনের টাকায় টেনে হিঁচড়ে সংসার চলে। এখনো বোনটার বিয়ের কিছু ব্যবস্থা করতে পারিনি। এমন অবস্থায় কেমন করে বিয়ে করি ?’

‘আচ্ছা তোমরা ছেলেরা বিয়ের প্রসঙ্গ এলেই সাংসারিক হয়ে ওঠো কেন ? প্রেম করার সময় এগুলো খেয়াল থাকে না ?’ 

কেন জানি না শিপ্রার জন্য তনুর দরদটা একটু বেশি বলেই মনে হয় আমার। মাথায় ঢোকে না আমার পূর্ব প্রেমিকাকে এতোটা মাথায় চড়িয়ে নাচার কী আছে। নাকি ও ভেতরে ভেতরে পুড়তে থাকে বলেই আমার ভেতর থেকে আমার পুরানো সম্পর্কের গভীরতা মাপার চেষ্টা করে ? মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না তনুকে। কখনো কখনো মনে হয় আমার সঙ্গে শিপ্রার বিয়ে না হওয়াতে তনুর কষ্টটাই যেন বেশি। অথচ আমি দিব্যি আছি। শিপ্রার কথা মনে পড়লেও এখন আমার তেমন কিছুই মনে হয় না। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে তনু আবার জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার আজকেও মনে পড়ছে না শিপ্রার কথা ?’

এবার সত্যিই হাসি পেয়ে গিয়েছিল আমার। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘তেমন ভাবে মনে পড়ছে না বলেই তো কষ্ট হচ্ছে।’

‘যার নিজের বৌয়ের কথাই মনে পড়ে না তার আর প্রেমিকার কথা কী মনে পড়বে। শক্তি-সুনীল-জয় গোস্বামীর বাইরেও যে একটা পৃথিবী আছে সেটা তো তুমি কবেই ভুলে গেছ।’

আমি আর প্রতীবাদ করলাম না। শুধু তনুর উড়ন্ত চুল গুলোকে একটু সরিয়ে ওর মুখটার দিকে চাইলাম। তনু আলতো ভাবে ওর মাথাটা আমার কাঁধে রেখে নিশ্চিন্তে চোখ বুজে রইল।

দুই

তনুই ফেসবুকে খুঁজে বের করেছে শিপ্রাকে। আমি ঠিক জানিও না ওদের দুজনের ভেতর কী কী কথা হয় বা হয়েছে। তবে এটুকু জানি ওরা দুজন দুজনকে প্রায় সব কথায় বলে। তনুর মুখেই শুনেছি শিপ্রার বর প্রশান্ত আজও জানে না শিপ্রা আমার প্রথম প্রেমিকা। প্রশান্ত শুধু এটুকুই জানে তনু শিপ্রার ফেসবুক বান্ধবী। তনুই বেশ কয়েকদিন ধরে শিপ্রার বাড়ি যাবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। কী জানি আমাকে শিপ্রার সামনে দাঁড় করিয়ে তনু কোন ইতিহাস জানতে চাইছে। তবে তনুর এই ছোটছোট ঈর্ষা গুলো আমার বেশ ভালই লাগে। তনুকে বিয়ে করার আগেই আমি ওকে শিপ্রার ব্যাপারে প্রায় সবই বলেছি। তবুও তনুর জিজ্ঞাসা আর কৌতূহলের যেন শেষ নেই। ও সব সময় চেষ্টা করে গল্পের ভেতরকার টুকরো টুকরো গল্প গুলোকে খোঁজার। আমিও এটা বেশ উপভোগ করি।

শিপ্রার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল কলেজে। আমরা দুজনেই ছিলাম বাংলা বিভাগের স্টুডেন্ট। প্রথম বছরটা শিপ্রা আমার শুধুই বান্ধবী ছিল। তারপর খুব ভাল বান্ধবী। তারপর যা হয় আরকি। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার্কে বা সিনেমা হলে বসে থাকার মতো প্রেম ছিল না আমাদের। টুকটাক হাত ধরে হাঁটা। ছোট-খাটো স্বপ্ন দেখা। দুয়েকটা চিঠি লেখা। দু’একবার চুমু খাওয়া, এটুকুই। কলেজের গণ্ডি পার হতে না হতেই শুরু হল শিপ্রার বিয়ের তোড়জোড়। আমিও সেই সময়টায় একটা চাকরির জন্য প্রচুর খাটাখাটি করেছিলাম। কিন্তু রূপমের একটা চাকরি চাই বললেই তো আর কেউ টুক করে রূপমকে একটা চাকরি দিয়ে দেবে না। বেশ কয়েকটা ভাল ভাল ছেলেকে নিজেই রিজেক্ট করেছিল শিপ্রা। তারপর একটা সময় প্রশান্তর সঙ্গে ওর বিয়েটা হয়েই গেল। আমি তখন কলকাতায় মাস্টার ডিগ্রি করছি। শিপ্রার বিয়ের খবর শুনে আমার চোখ ছলছল করেছিল। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই চোখের জল শুকিয়েও গিয়েছিল। একরকম ভাবে শিপ্রাকে ভুলতেই বসেছিলাম। ভুলতে বসা বলতে নিয়মিত মনে না পড়ার কথা বলছি। মাস্টার ডিগ্রি কমপ্লিট হওয়ার আগেই মাস্টারি পেয়ে গেলাম। তারপর স্কুল আর লেখালেখির ভিড়ে শিপ্রা কোথায় যে তলিয়ে গিয়েছিল তার কোনও খবরও ছিল না আমার কাছে। মাঝেমধ্যে যখন কবিতার ছন্দ বা গল্পের প্লট কিছুতেই ধরা দিত না তখন রঙিন গ্লাসে কয়েক চুমুক দেওয়ার পর উদাসীন আকাশের দিকে তাকিয়ে শিপ্রাকে খুঁজতাম। তনু জীবনসঙ্গিনী হয়ে আসার পর সেটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর পাঁচজন বাঙালীর মতোই হিসেবের খাতায় মুখ গুঁজে জীবন চলে যাচ্ছিল নিয়ম মাফিক। এরই ভেতর একদিন তনু ফেসবুকে শিপ্রাকে খুঁজে বার করে।

বাসটা নিজের খেয়ালেই ছুটছে। তনু নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে আমার কাঁধে মাথা রেখে। ওর চুল গুলো উড়ে এসে বারবার আমার মুখে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আমি জয় গোস্বামী হলে অবশ্যই এই লাইনটা লিখতাম,- পাগলী তোমার সঙ্গে বাসের সিটে কাটাবো জীবন। বাসের সিটে বসে ঘুমন্ত বৌয়ের মাথা কাঁধে নিয়ে আমি কল্পনায় অনেক জীবন কাটিয়ে দিয়েছি। আমি বরাবরেই ট্রেনের চেয়ে বাস জার্নিটাকে বেশি পছন্দ করি। তাই আজকেও তনু যখন ট্রেনের কথা বলেছিল আমি এক কথাতেই না বলে দিয়েছিলাম। আর একটু পরেই পুরুলিয়া ওভারব্রিজ। তারপর গোশালার মোড় তারপরই রাঘবপুরের মোড়। রাঘবপুরেই নামতে হবে, তনু বলেছে। আমি জানতাম শিপ্রার বিয়ে হয়েছে পুরুলিয়ায়। কিন্তু পুরুলিয়ার ঠিক কোথায় সেটা জানতাম না।

তনুর হাতে ধরে থাকা মোবাইলটা বাজছে। মোবাইলের স্ক্রিনে ফুটে উঠছে শিপ্রা কলিং। বাধ্য হয়ে তনুর ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলাম। ওভারব্রিজ পার হচ্ছে বাসটা এখন। এবার উঠে দাঁড়াতে হবে। মধুবনে বেশ ভিড় হয়ে গেছে বাসটা। নতুবা রাঘবপুর ঢোকার মুখে সিট ছাড়া যেত।

তিন

প্রশান্ত এসে দাঁড়িয়েছিল রাঘবপুর মোড়ে। আমাদের দুজনকে বাস থেকে নামতে দেখেই চিনতে পেরেছে। তনুর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে প্রশান্ত নিজেই গাড়িতে চাপিয়ে দিল। প্রাচীন প্রথা অনুসারে জিজ্ঞেস করল আমাদের আসতে কোনও সমস্যা হয়েছে কি না। প্রথম দেখাতে ভালই লাগল ছেলেটাকে। তবে আমার কল্পনার সঙ্গে প্রশান্তের চেহারাটা মিলল না। আমি এতদিন ভেবেছিলাম প্রশান্ত হয়তো যথেষ্ট সুপুরুষ চেহারার অধিকারী হবে। কিন্তু দেখছি তেমন কিছুই নয়। বেশ সাদামাটা গোলগাল শ্যামলা চেহারা। কোনওরকম আভিজাত্যের বালাই নেই। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সদ্য দাড়ি কামিয়ে এসেছে। একটা সময় এই ছেলেটাকেই ঈর্ষা করেছি ভাবতেই হাসি পেয়ে গেল আমার।

ট্যাক্সিটা সাহেব বাঁধ পেরিয়ে একটা গলির মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল এবার। আমরা তিনজনেই নামলাম। প্রশান্ত ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে, ‘আমার সঙ্গে আসুন দাদা’ কথাটা বলেই আমার হাত থেকে ব্যাগটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে একটা বাংলোতে ঢুকল। এই বাংলোটা শিপ্রাদের ? কেন জানি না বিশ্বাস হল না আমার। যদিও আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছুই আসে যায় না। বিভিন্ন রঙের নুড়ি পাথর দিয়ে সাজানো রাস্তা। দুপাশে ফুলের বাগান। বাগানের মাঝে বেশ কয়েকটা মাঝারি মাপের আমের গাছ। একটা গাছ মুকুলে ভরে আছে। বারোমেসে গাছ হয়তো। বাগানটার এদিক ওদিক বেশকিছু ছোটছোট পাখি ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করছে। অকারণ আমার ভেতর থেকে পোড়া-পোড়া একটা গন্ধ বেরিয়ে আসতে লাগল।

চমৎকার পাথর বসানো বাংলো। সিঁড়ির বাঁকে বাঁকে ফুলের টব। তাতে ফুল ফুটেও আছে। কলিং বেলের আওয়াজ পেয়েই দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে শিপ্রা। আগের চেয়ে একটু মোটা হয়েছে ও। সামান্য বয়সের ছাপ পড়েছে চোখে মুখে। আর বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়নি। হাঁ একটু ফর্সাও হয়েছে হয়তো। বেশ কয়েক বছর পর শিপ্রাকে দেখলাম। ও কিন্তু তাকালও না আমার দিকে। তনুর হাত ধরে টেনে নিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকল। 

শিপ্রার চেয়ে তনুকেই বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। তবুও কোনও এক অপঠিত কারণে আমি ভেতরে ভেতরে পুড়েই চলেছি। কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারলাম না। আমাদেরকে ঘরে বসিয়ে দিয়ে, ‘আমি এখুনি আসছি’ বলেই প্রশান্ত টুক করে কোথায় বেরিয়ে গেল। প্রশান্ত বেরিয়ে যেতে তনুকে নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে গেল শিপ্রাও। আমি একলা বসে বাথরুমের দরজাটা কোনদিকে খুঁজতে লাগলাম। ভাবতেই অবাক লাগল এই সেই শিপ্রা যাকে কলেজ জীবনে নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসতাম। ওকে দেখে মনেই হল না যে; কোনও কালেও আমাকে চিনত বলে। কী জানি হয়তো তনুর চোখে কিছু ধরা পড়ে যাবার ভয়েই শিপ্রা আমার চোখে চোখ মেলাতে পারল না। নিছক ভদ্রতার খাতিরেও একটা কথা বলল না শিপ্রা। ভেতর ঘর থেকে ওদের দুজনের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। আর এদিকে আমি সোফায় বসে দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দে বিরক্তিকর প্রহর গুনছি। 

চার

সন্ধ্যার সময় ছাদে এসে সিগারেট হাতে একা একা দাঁড়ালাম। বিকেলে আমি আর প্রশান্ত ঘুরতে বেরিয়ে ছিলাম সাহেব বাঁধের দিকে। সে আরেক যন্ত্রণা। একটু বেশিই বৌপাগল মনে হয় ছেলেটা। ওর সব গল্পের গলিগুলোই এসে মিশে যাচ্ছিল শিপ্রার গল্পে। শিপ্রা এই। শিপ্রা সেই। শিপ্রা না থাকলে এই হত। শিপ্রা না গেলে ওই হত। শিপ্রা শিপ্রা করে কান পাকিয়ে দিয়েছিল মাইরি। ওর সঙ্গে হাঁটতে আমার একটুও ভাল লাগছিল না। আসলে কেন জানি না আমার বাইরে যাওয়ার ইচ্ছেই ছিল না। প্রশান্তই জোর করে নিয়ে গিয়েছিল। সারা রাস্তা শুধু মনে মনে খিস্তি দিয়েছি ওকে। পরিস্থিতির কাছে মানুষ কতটা অসহায় হতে পারে সেটা আজকে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছি। শিপ্রার তনুকে বৌদি বলাটা পর্যন্ত কানে বাজেনি আমার কিন্তু বিকেল বেলায় শিপ্রা যখন আমাকেও...। না থাক কিছু কথা অসম্পূর্ণ থাকাই ভাল। তাতে অন্তত নিজের অবশিষ্ট মানটুকু বজায় থাকে।

সিগারেটটা শেষ হওয়ার আগেই ওই সিগারেটের আগুনটা দিয়েই আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে নিলাম। শিপ্রা ওর মেয়ের নাম রেখেছে কবিকল্পা। আর এই কবিকল্পা নামটাই আমাকে বর্তমান থেকে ছিঁড়ে বারবার অতীতে ফেলে দিয়ে আসছে। কেন শিপ্রা ওদের মেয়ের নাম কবিকল্পা রাখল সেটা বড় কথা নয়। আসলে নামটা আমার পছন্দের নাম। আমিই শিপ্রাকে একদিন বলেছিলাম আমাদের মেয়ের নাম কবিকল্পা রাখার কথা। তাই বারবার মনে হচ্ছে শিপ্রা ওদের মেয়ের নাম কেন কবিকল্পা রাখল ?

আমার লেখা সব গল্প কবিতার প্রথম পাঠক ছিল শিপ্রা একদিন। ও আমার গল্পের চেয়েও কবিতাগুলোকেই বেশি ভালবাসত। তাই আমি ঠিক করেছিলাম আমাদের মেয়ে হলে কবিকল্পা নাম রাখব। নামটা শিপ্রার খুব পছন্দ হয়েছিল। একটা সময় কবিকল্পা নামটা নিয়ে কতই না খুনসুটি করেছি দুজনে। এখনো মনে আছে কবিকল্পাকে নিয়ে আমাদের ভেতর যে দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়েছিল তাতে আমার দায়িত্ব ছিল কবিকল্পাকে স্কুলে দিয়ে আসা আর রাতে ঘুম পাড়ানো। মনে হচ্ছে এই সেদিনের গল্প। অথচ দেখতে দেখতে কতগুলো বছর কেটে গেছে। 

ওই পুচকি মেয়েটা যখন প্রশান্তকে বাবা বাবা করে পাগল করে তুলেছিল তখন যে কারণেই হোক না কেন আমি একটু বেশি বেশি করেই পুড়ছিলাম তুষের আগুনে। প্রশান্ত পাশের বাড়ি থেকে ওদের মেয়েকে নিয়ে আসার আগে পর্যন্ত আমি জানতাম না শিপ্রার মেয়ে আছে। তারপর যখন পুচকিটা আমার কোলে বসে নিজের নাম বলল ? তখন থেকে শুধুই মনে হচ্ছে কী যেন একটা হারিয়ে ফেলেছি। সেটা খুঁজে পাচ্ছি না কিছুতেই। 

শিপ্রা বা তনু দুজনের কাউকে দেখেই একবারও মনে হয়নি ওরাও আমার মতো পুড়ছে বলে। দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এক বাড়িরই দু’বউ। কে বলবে ওরা কাল পর্যন্ত ফেসবুক ফ্রেন্ডছিল। কিংবা দুজনেই হয়তো আমার মতো...। সত্যিই মেয়েরাই পারে মুখ বিকৃত না করেও বুকের দাবানল গিলে ফেলতে। কত সহজে ওরা দুজন দুজনকে মেনে নিয়েছে। এতকাল ভেবে এসেছিলাম কোনওদিন শিপ্রার সঙ্গে তনুর দেখা হলে ওরা দুজনেই পুড়বে ভেতরে ভেতরে। কিন্তু এখন দেখছি ওদের পোড়ার কোনও দায় নেই যাবতীয় পোড়াটুকু শুধুই আমার। 

ছাদের উপর দাঁড়িয়ে কয়েকটা সিগারেট ফোঁকার পর চুপিসারে নীচে নেমে এলাম। কবিকল্পা বিছানায় বসে নিজের খেয়ালে রংপেন্সিল দিয়ে সাদা পাতার উপর বাড়ি বানাচ্ছে। আর সোফায় বসে শিপ্রা তনুকে একটা এ্যালবাম থেকে কীসব ছবি দেখাচ্ছে। তনু হাতের ইশারায় কাছে ডাকল আমাকে। তারপর এ্যালবামটা আমার কোলের উপর নামিয়ে রেখে বলল, ‘দেখো কীসুন্দর না ননিতালের প্রকৃতিটা ? শিপ্রা আর প্রশান্ত ননিতাল গিয়েছিল হানিমুনে।’ 

আমার মুখ দিয়ে কোনও শব্দই বার হল না। তনু হয়তো ইচ্ছে করেই আমাকে আরও বেশি বেশি জ্বলাতে চাইছে। তনু জানে একদিন শিপ্রার সঙ্গে আমার ননিতাল হানিমুনে যাবার কথা হয়েছিল। তনুরও খুব ইচ্ছে ছিল ননিতাল হানিমুনে যাবার। যাওয়া হয়নি কেবলমাত্র আমার জন্যই। আমিই চাইনি শিপ্রার সঙ্গে দেখা স্বপ্নের ভেতর তনুকে জড়াতে। অথচ তনু আমার সঙ্গে দেখা প্রতিটা স্বপ্নই পূরণ করিয়ে নিয়েছে প্রশান্তকে দিয়ে। নিজের অতীতকে গোপন রাখার এই একটা সুবিধা। তনুকে যদি আমি শিপ্রার ব্যাপারে কিছুই না বলতাম ? তাহলে হয়তো আমিও তনুকে নিয়ে ননিতাল হানিমুন মানাতে যেতেই পারতাম।

তনু যতই আমার চোখের সামনে শিপ্রার হানিমুনের এক একটা ছবি তুলে ধরছে ততই যেন কলেজ জীবনের এক একটা দিন আমার চোখের সামনে খুলে খুলে পড়ছে। আমি যে পুড়ছি সেটা ভালমতোই বুঝতে পারছে তনু। তবুও তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে আমার এই পোড়াটাকে। হয়তো তনুর ওপাশে বসে আমার মতোই শিপ্রাও পুড়ছে ভেতরে ভেতরে। কিন্তু সুন্দর ভাবে সেটা গোপন করে যাচ্ছে। আচ্ছা তনুও কি পুড়ছে ? আমি আড়চোখে একবার চাইলাম তনুর দিকে। না, ওর চোখ দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই।



খাবারের জাঁকজমকে আতিথেয়তার বিন্দুমাত্র ফাঁক ফোঁকর রাখেনি শিপ্রা। ছোট-খাটো জিনিসের জন্যেও বারবার বাজারে ছুটেছে প্রশান্ত। তনুর মুখেই শুনেছি প্রশান্তের দুটো রাইস মিল আছে। কিন্তু ওকে দেখে বোঝার উপায় নেই। এক্কেবারে সাদামাটা ছেলেটা। সত্যি বেশ ভাল আছে শিপ্রা। হয়তো আমাদের চেয়েও একটু বেশিই ভাল আছে। সাজানো বাগানের মতো ওদের পরিবার। শ্বশুর শাশুড়ি কেউ বেঁচে নেই। কোনও ঝঞ্ঝাট বা পিছুটান কিছুই নেই।

পাঁচ

আমার সঙ্গে খুনসুটি করতে করতে কখন যে তনু ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল করিনি। আমার ঘুম আসছে না কিছুতেই। রাত্রির খাওয়াটা একটু বেশি হয়ে গেছে হয়তো। বিছানায় পড়ে পড়ে শুধু এপাশ আর ওপাশ করে চলেছি। মাথার উপর অনিচ্ছায় পাখাটা ঘুরছে। জানালা দিয়ে মাধবীলতা ফুলের গন্ধ ঢুকছে ভুরভুর করে। তনুর নিষ্পাপ মুখটার দিকে চাইতেই কেমন যেন হু-হু করে উঠল বুকের ভেতরটা। তনুকে কখনই ঠকাইনি আমি। তবুও শিপ্রাকে দেখার পর থেকেই মনে হচ্ছে তনুকে শুধু ঠকিয়েই এসেছি এতদিন। বুকের ভেতর কোথাও না কোথাও শিপ্রা ছিল। এতদিন আমি ভেতর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখতে চাইনি বলেই হয়তো দেখতে পাইনি। আজকে শিপ্রাকে দেখার পর থেকে শুধুই মনে হচ্ছে জীবনটা অন্যরকম হলেও তো পারত। শিপ্রাকে না পাওয়ার ব্যথাটা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠছে আজ। এতদিনের ছাইচাপা আগুনটা যেন দমকা বাতাসে বেরিয়ে পড়েছে। আমি মনটাকে যতই তনুর আঁচলে কেন্দ্রীভূত করতে চাইছি মনটা যেন ততই শিপ্রার কাছে গিয়ে মাথা ঠুকছে। 

আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে আবার ছাদে এসে দাঁড়ালাম। থকথকে অন্ধকার পড়ে আছে ছাদের উপর। হাওয়ায় আমার হাতের সিগারেটটা বেশি বেশি পুড়ছে। অন্ধকারটা চোখের ভেতর একটু ধাতস্থ হতেই দেখতে পেলাম শিপ্রাকে। ছাতের একটা কোনায় দাঁড়িয়ে আছে শিপ্রা। কাঁদছে ? হয়তো বা! সারাদিনে সরাসরি একটাও কথা বলেনি শিপ্রা আমার সঙ্গে। এমনকি এক গ্লাস জলের জন্যও জিজ্ঞেস করেনি একবার। আমাকে দেখতে পেয়েছে শিপ্রা। দ্রুত পায়ে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। 

আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে শিপ্রা বলল, ‘এই ভাবে তনুকে ঠকাচ্ছিস কেন ? নীচে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। আর প্লিজ কিছু মনে করিস না তোদের এমন ভাবে আসাটা কী ঠিক হল ? তোরা দুজনের কেউই একবার ভাবলি না এতে আমার জীবনের উপর কেমন প্রভাব পড়বে ?’ শিপ্রার শেষের দিকের কথাগুলো কান্নার সাথে জড়িয়ে যাচ্ছিল। 

আমি কী বলব ঠিক করার আগেই শিপ্রা নীচে পালিয়ে গেল। শিপ্রা নীচে চলে আসার পরেও আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। শিপ্রার কথাগুলোই মাথার ভেতর ঠোক্কর খাচ্ছে। আমি তনুকে ঠকাচ্ছি কি না জানি না। তবে শিপ্রা ঠকাচ্ছে। প্রশান্তকে নয় নিজেকেই ঠকাচ্ছে শিপ্রা। আমি যখন নীচে নেমে এলাম তনু তখনো একই রকম ভাবে ঘুমিয়ে। আমার দুচোখের পাতায় একবারের জন্যও ঘুম এল না। কলেজ জীবনের দিনগুলোই ভেসে বেড়াতে লাগল চোখের ভেতর সারারাত ধরে।



সকালে আমাদেরকে রাঘবপুর পর্যন্ত ছাড়তে এসেছিল শিপ্রাও। বাড়ি থেকে বার হওয়ার সময় শিপ্রা তনুর হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়েছে। প্রশান্ত বারবার বলেছে, শিপ্রাকে নিয়ে আমাদের বাড়ি আসবে। আমি জানি ওরা আসবে না। কোনওদিনেই আসবে না। শিপ্রাকে কেউ না চিনুক আমি তো চিনি। বাসটা পুরুলিয়া ওভারব্রিজ পার হচ্ছে এখন। তনু জানালার ধারের সিটে বসে শিপ্রার দেওয়া প্যাকেটটা খুলছে আস্তে আস্তে। প্যাকেটটা আমার পরিচিত। আমি জানি প্যাকেটটার ভেতর আমার একটা কবিতার ডাইরি রাখা আছে। কিন্তু এই ডাইরির কোনও কবিতা আর একটা কবিকল্পার জন্ম দিতে পারবে না। 

[সমাপ্ত]



Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments