আমি রাই

আমি রাই

Advertisemen


আমি রাই

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়




পৃথিবীতে এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়, যারা ভূতে অবিশ্বাসী হয়েও ভূতে ভয়পান। আমি চরম অবিশ্বাসী লোককে একলা রাতে পথ হাঁটার সময় কিংবা বাথরুম যাওয়ার সময় ভয়ের চোটে জোর গলায় গান গাইতে শুনেছি। অনেকে আবার আত্মার অস্তিত্ব মানলেও ভূতকে স্বীকৃতি দিতে চান না। কেউ কেউ তো মুখের উপর বলেই দেন, ‘ভূত বলে কিছু নেই, ভূত হল মনের ভ্রম।’ ভূতের ব্যাপারে আমরা প্রায় যে কথাদুটো শুনি, ১) আমি ভূত বিশ্বাস করি না ২) আমি ভূত ভয় পাই না। কথা দুটো একটু ভাল করে খেয়াল করলেই বুঝতে পারা যায় যে, যে ভদ্রলোক ভূতে বিশ্বাস করেন না বা যিনি ভয় পান না, তিনিও কিন্তু ভূতের উপর অবিশ্বাস করছেন না পুরোপুরি। তারমানে কিছু একটা আছে। আর যেটা আছে সেটাকেই আমরা...
৭-ই জুলাই-২০০৭


সেদিন সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি। তবুও এই বৃষ্টিতেই পুঞ্চা যেতে হবে। আগামী নয়-ই জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে বি-এ পার্ট-টু এর ফাইনাল পরীক্ষা। আমাদের পাসকোর্সের সিট পড়েছে পুঞ্চায়। জায়গাটার নাম শুনেছি আগে কিন্তু কখনো যাওয়া হয়নি। সময় মতো স্নান আর খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়লাম। কথার মাথা খেয়ে খড়বনা বাস স্ট্যান্ডে বিশ্বজিৎ আর শ্রীমন্ত যখন এলো তখন ঘড়ির কাঁটা আমাদের অপেক্ষা না করেই একটা বাজতে দশ। পাক্কা পঞ্চাশ মিনিট লেট। চোখের সামনেই পুরুলিয়া পুরুলিয়া করতে করতে দুটো ফাঁকা বাস চলে গেছে ইতিমধ্যে। যাই হোক কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পরই বাস পেয়েছিলাম বলেই... নতুবা পুঞ্চা পৌঁছানো সেদিন আর সম্ভব হত না। দুটো বেজে কুড়ি-পঁচিশ নাগাদ পৌঁছলাম লালপুর। সৌভাগ্য বসত মিনিট দশেকের ভেতরই পেয়ে গেলাম পুঞ্চা যাওয়ার একটা মিনিবাস।


ভাঙা পিচের তালিমারা রাস্তা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছিল বাসটা। না ঠিক ছুটছিল নয়, হাঁটছিল। তবে বাদলা বেলায় বাসের দুলকি চালটা খুব একটা মন্দ লাগছিল না। দুপাসারি ডুমুর আর পলাশের জঙ্গল। যত্রতত্র ছড়িয়ে রয়েছে সবুজ টিলা। নাম না জানা ছোট পাহাড়। পলাশের ফাঁকে উঁকি দেওয়া কয়েকটা করে টালিমাথা মাটির ঘর। ঘুরেফিরে চোখে পড়ছিল ভয়ার্ত ডাহুক-ডাহুকী। ছুটন্ত নেউল। দুএকটা করে উদাসীন শেয়াল। উদাসীন বললাম কারণ, বাস বা বসের ফাটা-বাঁশ হর্ন কোনটাকেই বিশেষ গ্রাহ্য করছিল না শেয়ালগুলো। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা বাতাসে মাঝে মাঝেই চোখ লেগে যাচ্ছিল। তবে বাসের লম্ফঝম্পে নিদ্রিত নেত্র মিজ্জিত থাকার বিশেষ সুযোগ পাচ্ছিল না।
[দুই]


বাস বাবাজী যখন পুঞ্চায় পৌঁছলেন তখন বেলা বিশেষ নেই বললেই চলে। মেঘলা আকাশের ওপারে সূর্য আছে না গেছে সেটাও বোঝা ভার। বাস স্ট্যান্ডে নেমেই দেখলাম আদিত্য চায়ের ভাঁড় হাতে একটা দোকানের সামনে বসে রয়েছে। ওর লালপুরে দাঁড়ানোর কথাছিল। পুরুলিয়া থেকে সরাসরি পুঞ্চার বাস পেয়েছিল বলেই অপেক্ষা করেনি। আমদেরকে নামতে দেখেই চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুক দিয়ে ভাঁড়টা ফেলে এগিয়ে এলো ও। এসেই যা বলল তাতে আমাদের মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। ‘সব লজ বুক হয়ে গেছে। কোনও লজেই একটাও রুম খালি নেই।’ আদিত্যর কথা শুনে কয়েক সেকেন্ড আমাদের মুখ দিয়ে একটা কথাও বার হল না। আসলে কী বলব সেটাই খুঁজে পেলাম না। ভারী ভারী ব্যাগ কাঁধে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে ভিজছিলাম আমরা। মাথা কাজ করছিল না। ‘তাহলে থাকব কোথায় ?’ জিজ্ঞেস করল শ্রীমন্ত।


‘মামার বাড়িতে আসার মতো সন্ধার গড়ায় গড়ায় এসে থাকার জায়গা খুঁজলে কোথায় পাবি ? তিন তিনটা কলেজের সিট পড়েছে এখানে। আরও জায়গা থাকে ?’ আদিত্যর কথা শুনে চুপ করে গেল শ্রীমন্ত। ‘এই দোকানের মালিক বলছিল একটা সরকারি ঘর আছে...’


আদিত্যকে শেষ করতে না দিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় ? ভাড়া কত নেবে ?’


‘ভাড়ার ব্যাপার জানি না। তবে ঘরটা নাকি বড় রাস্তার উপরেই। এই বাজার পেরিয়ে কয়েকশ মিটার গিয়ে বাঁহাতে পড়বে।’


‘কলেজের দিকে ?’ জিজ্ঞেস করল বিশ্বজিৎ।


‘হ্যাঁ। তবে ফাঁকা জায়গায়। কাছাকাছি কোনও ঘর নেই...’


শ্রীমন্ত সাততাড়াতাড়ি বলল, ‘তাতে কী ? চল দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে দেখি।’


আদিত্য কিছু একটা বলতে গিয়েও যেন বলল না। চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ওর নাকমুখ দিয়ে।
[তিন]


ঝোপঝাড় আর স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার ছড়িয়ে থাকলেও ঘরটা মন্দ নয়। ঘরের বাইরেটা বিরাট প্রাচীর দিয়ে বেড়া দেওয়া। রেলিঙের মস্ত গেট। গেট দিয়ে ঢুকেই ডান হাতে প্রাচীন একটা দৈত্যাকার গাছ। কি গাছ অন্ধকারে ঠিক চেনা যায় না। অনেকটা ঠিক অশ্বত্থ গাছের মতো। গাছটা পেরিয়ে গিয়ে সান বাঁধানো জলের কল। ইলেকট্রিকের পোষ্ট। তাতে একটা আধমরা বাল্ব অনিচ্ছায় জলছে। ঘরের ভেতরে তিনটা রুম। দুটোতে তালা ঝোলানো। সরকারি জিনিশপত্র থাকলেও থাকলে পারে। আর যেটাতে আমাদের থাকার কথা সেটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দু-দুটো টিউব লাইট। সঙ্গে পায়খানা বাথরুম। একটা টেবিল, দুটো চেয়ার। ঘরটার দায়িত্বে থাকা লোকাল পঞ্চায়েত প্রধান মল্কু মাহাত কদিনের জন্য শ্বশুর বাড়ি গেছেন বলেই বরাত জোরে ঘরটা জুটে গেল। ঘরের চাবি ছিল ওই দোকানদারের কাছেই। ভাড়া, দৈনিক একশ টাকা। এত সস্তায় একটা ঘর পাব এটা আশাও করিনি। যদিও এই ঘর ভাড়া দেওয়ার জন্য নয়, তবুও দৈনিক একশ টাকা বিনা পরিশ্রমে পাওয়ার লোভ...। সে যাই হোক মোটের উপর মাথা গোঁজার মতো ভাল একটা ঘর আমরা পেলাম এটাই আনন্দের।


ঘরের ভেতরকার টেবিল চেয়ার বাইরের বারান্দায় বের করে ঘরটা ভাল করে ঝাঁট দিয়ে বিছানা পেতে দিয়েছিলাম। হোটেল থেকে খাবার খেয়ে ফিরতেই দশটা বাজল। আজকে আর কারুরই তেমন পড়ার মুড ছিল না। তাই বসে বসে গল্প করছিলাম। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিটাও বেড়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। গল্প করতেই করতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল ছিল না। ঘুমটা ভাঙল শ্রীমন্ত ঠেলা দিতে। ধড়ফড় করে উঠে বসতেই আদিত্য হাতের ইশারায় শব্দ করতে বারণ করল। প্রথমটায় কিছু বুঝতে না পারলেও খানিক বাদেই বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা কী। বাইরের কলে কেউ জল নিচ্ছে। তা লোকাল লোকজন জল নিতে আসতেই পারে, কিন্তু এতো রাতে ! তাছাড়া বাইরের গ্রিলে তালা লাগানো রয়েছে। আর ফুট দশেকের প্রাচীর টপকে কেউ নিশ্চয় এতো রাতে জল নিতে আসবে না। আরও কিছুক্ষণ কান খাড়া করে রইলাম। দূরের জঙ্গল থেকে ভেসে আসা শেয়ালের ডাক আর টিউবওয়েলে পাম্প করার শব্দ ছাড়া কিছুই কানে এলো না। রাতের ঝিঁঝিঁরাও এই বাদলা রাতে ঘুমিয়ে পড়েছে হয়তো।


‘কপাট খুলে দেখবি ?’ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল আদিত্য।


‘চল দেখি বাইরে...’ কথাটা শেষ করার আগেই থমকে গেলাম। বেশ কয়েকটা কুকুর একসঙ্গে ঘেউ-ঘেউ করে উঠল বড় গেটটার বাইরে। শ্রীমন্তর হাতে হাত লাগতেই বুঝতে পারলাম আমরা কখন যেন একে অপরের কাছাকাছি চলে এসেছি। ভেতরে ভেতরে ঘামছি আমরা। কুঁকড়ে যাচ্ছি। কেউ জল নিতে এলে এতক্ষণ সময় লাগার কথা নয়। ওদিকে বাইরের গ্রিলটা ঝাঁকাতে শুরু করেছে কুকুরগুলো। ওরা ভেতরে ঢুকতে চাইছে।
৮-ই জুলাই


পরেরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন ঝলমলে রোদে ভরে আছে বাইরেটা। হঠাৎ করে দেখলে মনেই হবে না যে গতকাল সারাদিন-রাত বৃষ্টি হয়েছে। গতরাতে ভোরের দিকে একে অপরের গা-ঘেঁষে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালের মিষ্টি রোদে রাতের ভয়টা কাটতে সময় লাগল না। মনগড়া নানান ব্যাখ্যায় উবে গেল মনের ভয়টা। কলের পাড়ে দাঁড়িয়েই নিশ্চিন্তে ব্রাশ করলাম। তবে সকালের খাবার খেতে গিয়ে গ্রিলের বাইরে কুকুরের পায়ের ছাপগুলো কারুরই দৃষ্টি এড়াল না। আরেকটা খটকা লাগল হোটেলে খাওয়ার টেবিলে বসে। খাবার দিতে দিতে হঠাৎ করেই হোটেলের একটা ছেলে সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল, ‘রাতে তোমরা ঘুমিয়েছিলে!’


‘কেন ? ঘুমাব না কেন ?’ জিজ্ঞেস না করে পারিনি। 


‘না না এমনি জিজ্ঞেস করলাম।’


ছেলেটা যতই বলুক, ‘এমনি জিজ্ঞাস করলাম।’ তবুও একটা ভয় একটা আতঙ্কের ছাপ ওর চোখে মুখে ধরা পড়ছিল পরিষ্কার ভাবে। বারবার মনে হচ্ছিল কিছু একটা লুকোচ্ছে ছেলেটা।
[চার]


রাতের খাবার খেয়ে এসে সুবোধ বালকের মতো পড়তে বসেছিলাম চারজনই। পরীক্ষার চাপটা এমন ভাবে মাথায় জুড়ে বসেছিল যে বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম গত রাতের ঘটনাটা। মনে মনেই পড়ছিলাম আমরা। হঠাৎ আদিত্য চাপা গলায় বলল, ‘একটা আওয়াজ পাচ্ছিস ?’ আদিত্যর কথায় পড়া ফেলে কান দুটোকে সজাগ করলাম। ‘কীসের আওয়াজ ?’ জিজ্ঞেস করলাম ওকে।


‘কান্নার।’


‘কন্নার ? কই কোথায় ?’


বেশ কয়েক মিনিট কানখাড়া করে বসে থেকেও কিছুই শুনতে না পেয়ে আবার পড়া শুরু করতে যাব ঠিক এমন সময় পরিষ্কার শুনতে পেলাম কান্নার আওয়াজ। মনে হল আমাদের রুমটার বাইরে বসেই কোনও মেয়ে কাঁদছে। এত রাতে এই সরকারি বাংলোর বেড়ের ভেতর ঢুকে কোনও মেয়ে কাঁদতে আসবে না। ‘চল দেখি না ব্যাপারটা কী, রোজ রোজ এমন তামাশা হলে তো...’ শ্রীমন্তকে ধমকে থামিয়ে দিল বিশ্বজিৎ, ‘কালকে পরীক্ষা আছে পড়। যে কাঁদছে কেঁদে মরুক। কোথায় কাঁদছে কেন কাঁদছে সেটা দেখে কোনও লাভ নেই।’ 


বিশ্বজিৎ এর গলার আওয়াজ পেয়েই হয়তো থেমে গেল কান্নাটা। কিন্তু আমাদের আর পড়া শুরু করা হল না। কান্নাটা থামাতে না থামতেই ঝুপ করে অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরের ভেতর। রাত্রে লাইন কাটলে কী করব সেই ভাবনাটা মাথায় ছিল না বলেই ক্যান্ডেল কেনা হয়নি। রাত্রির এখনো অনেক বাকি তাই টর্চের ব্যাটারি পুড়িয়ে বই পড়া সম্ভব নয়। টর্চও মাত্র দুটো, একটা বিশ্বজিৎ এর আরেকটা আদিত্যর। আমি আর শ্রীমন্ত টর্চ নিয়ে আসিনি। 


ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে আছে। ঠিক এমন সময় যে কারণেই হোক না কেন ভয়ানক বেগে পায়খানা পেয়ে গেল আমার। সত্যি বলতে একমিনিট আগেও পায়খানা পাওয়ার পূর্বাভাষ পাইনি।


আদিত্যর টর্চটা নিয়ে পায়খানা ঘরে ঢুকলাম। পায়খানা ঘরের দরজাটা বন্ধ করার সাহস জুটল না আমার। নামমাত্র আসতে করে ভেজিয়ে দিলাম। টর্চটা জালিয়েই রেখেছিলাম। বলাই বাহুল্য পায়খানা সারতে দু-মিনিটও সময় লাগেনি আমার। পায়খানা সারার পর উঠে দাঁড়িয়েছি এমন সময় চোখ পড়ল ভাঙা ঘুলঘুলিটায়। এলোমেলো রক্তভেজা চুল আর ক্ষতবিক্ষত মুখের একটা মেয়ে ঘুলঘুলি বেয়ে বাথরুম ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছে। ওর দূরত্ব আমার চেয়ে কয়েক হাত মাত্র। আমার বিকট চিৎকারে কেঁপে উঠল বাড়িটা...


আমি জ্ঞান না হারালেও পুরোপুরি জ্ঞানও ছিল না আমার। যখন খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে ওদেরকে পুরো ঘটনাটা বললাম তখন ওদের চোখ-মুখও শুকিয়ে এসেছে। শ্রীমন্ত বলল, ‘এখানে আর না। চল ব্যাগ গোছা।’ ব্যাগ গোছা বললেই তো আর টর্চ জেলে ব্যাগ গোছানো সম্ভব নয়। অনেক জিনিশ এদিক সেদিক ছড়িয়ে রয়েছে। তাছাড়া এত রাতে যাব-ই বা কোথায় ? একে অপরের হাতে হাত রেখে চুপচাপ বসে রইলাম। ভোরের অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই।
মুক্তি


ঘড়ির কাঁটা যখন তিনটার ঘর ছুঁই-ছুঁই ঠিক তখন পরিষ্কার মেয়েলি কণ্ঠে ভেসে এলো, ‘এ ঘরের দরজাটা খুলে দিন, আমি রাই। প্লিজ খুলুন না এ ঘরের দরজাটা। আমি রাই।’ এরপর আবার সেই করুণ কান্না। প্রায় ভোর পর্যন্ত শুনেছিলাম ওই কান্নার আওয়াজ। 


সূর্য ওঠার আগেই ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হয়ে গেলাম আমরা। সাহস করে ঘরের দরজাটা খুললাম। না, তালা বন্ধ ঘর দুটো ছাড়া কেউ কোথাও নেই। ব্যাগ কাঁধে একে একে বাইরে বেরিয়ে এসে দরজায় তালা মারতে যাব, ঠিক এমন সময় আদিত্য বলল, ‘এক মিনিট দাঁড়া।’ কথাটা বলেই ভেতরের বারান্দায় ঢুকল আদিত্য। সজোরে লাথ মারল আমাদের রুমের মুখোমুখি রুমটার দরজায়। হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল একটা কপাট। কপাটটা ভাঙতেই ও বলল, ‘যা খুলে দিলাম।’


আমরা কেউ কিছুই বললাম না। চুপচাপ এসে দাঁড়ালাম গ্রিলের দরজাটার সামনে। মনে হল নাম না জানা প্রাচীন গাছটা আমাদেরকে বিদায় জানাচ্ছে। আমি আরেকবার ফিরে চাইলাম বাড়িটার দিকে। আমার ভেতরটা এখনো কুঁকড়ে আছে। আমি স্বাভাবিক হতে পারছি না কিছুতেই। 
[পাঁচ]


গ্রিলে তালা ঝুলিয়ে চললাম পুঞ্চা বাজারের দিকে। আশা করি থাকার একটা বন্ধবস্ত ঠিক হয়ে যাবে। আমরা চারজনেই সেই হোটেলটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার হাত থেকে চাবিগুলো নিয়ে আদিত্য বলল, ‘দাঁড়া আমি যাই।’


বললাম, ‘টাকাটা নিয়ে যা।’


‘রাখ লাগবে না।’ বলেই সশব্দে পা ফেলে হোটেলটায় ঢুকল আদিত্য। কথা নেই বার্তা নেই সাপটে চড় বসিয়ে দিল সেই লোকটার গালে। তারপর চাবির গোছাটা লোকটার হাতে দিয়ে কিছু একটা যেন বলল। বাইরে দাঁড়িয়ে ঠিক শুনতে পেলাম না। ও বাইরে বেরিয়ে আসতেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘হঠাৎ লোকটাকে...’


‘শয়তানটা জেনেশুনে টাকার লোভে... ওকে রাস্তায় ফেলে পেটালেও দোষ নেই। কালকে বিকেলে আমি সেই একবার এসেছিলাম না চা খেতে ? তখন আগের রাত্রের টিউবওয়েল পাম্প করার কথাটা বলেছিলাম। সুন্দর বলে দিল, ওই কলটায় অমন হয় ভয়ের কিছুই নেই। চল গতকাল একটা বাড়ির খোঁজ পেয়েছি। হাইস্কুলটার ওদিকে।’


আমরাও আর কথা বাড়ালাম না। আদিত্যর পিছু পিছু সোজা গিয়ে হাজির হলাম একটা বাড়ির সামনে। কলিংবেল টিপতেই এক বয়স্ক কপাট খুলে বললেন, ‘বাবু একটু আগেই বেরিয়েগেলেন। খানিক বাদে আসুন।’ বয়স্ক মানুষটি দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন, আদিত্য তাড়াতাড়ি বলল, ‘শুনুন উনিই বলেছেন বাড়িতে না থাকলে যেন অমলকে বলি...’


‘আমিই অমল। আপনারা কি ঘর ভাড়ার ব্যাপারে এসেছেন ?’


‘হ্যাঁ উনিই কাল বলেছিলেন...’


‘আগেই তো আসতে পারতেন। ওই ভূতুড়ে বাড়িতে কেউ থাকে! ভালই হয়েছে চলে এসেছেন, খানিক আগেই তো বাবুর মুখে শুনলাম মল্কু ঘরে ফেরার পথে বাইক এক্সিডেন্ট করেছে। অবস্থা ভাল না। বাবু তো তাই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলেন। আসুন ভেতরে আসুন।’ দরজার একপাশে স্বরে গিয়ে উনি নিজের মনেই বিড়বিড় করে আবার বললেন, ‘এত এত পাপ যাবেটা কোথায়...’


বাড়ির ভেতরটা বেশ চকচকে। চারদিক ফুলের টব দিয়ে সাজানো। বাড়ির দরজা জানালা থেকে শুরু করে সিঁড়ি পর্যন্ত সুন্দর কাঠের সুনিপুণ নকশা। বাড়ির কারুকার্যে মোহিত হয়ে এতক্ষণ খেয়াল করিনি। একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে সোফায় আধশোয়া হয়ে রংপেন্সিল দিয়ে আপন মনে ছবি আঁকছে। আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম ওর কাছে। ও একটা ছুটন্ত মেয়ের ছবি আঁকছে, অনেক দূরে দরজা খোলা একটা ঘরও আছে। আমি জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, ‘এটা কীসের ছবি গো ?’ মেয়েটি ছবিতে রঙ দিতে দিতেই মুখ না তুলে বলল, ‘মুক্তির।’


অবাক হয়ে বললাম, ‘আরে বাঃ চমৎকার এঁকেছ তো। তোমার ছবির হাত খুউ...উব সুন্দর। তা তোমার নাম কি ?’


মেয়েটি এবার আমার দিকে হাসি মুখে চাইল, ‘আমি রাই।’


মেয়েটির মুখ থেকে ওর নাম শোনার আগেই কয়েক-পা পিছিয়ে এসেছি আমি। এই মুখ আমার চেনা না হলেও পুরোপুরি অচেনা নয়। এই মুখের অদল আমি এই জন্মে ভুলব না। কলকল করে ঘামতে শুরু করেছি আমি। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। এই বাড়িতে থাকাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিছুতেই সম্ভব নয়।



[সমাপ্ত]
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments