আঞ্চলিক প্রেমের গল্প, শেষে উড়ে আসে ছাই।

আঞ্চলিক প্রেমের গল্প, শেষে উড়ে আসে ছাই।

Advertisemen
www.amarsahitya.com
শেষে উড়ে আসে ছাই
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


বৃষ্টিটা একটু ধরতেই হাল কাঁধে নিয়ে বেরিয়েছিল রমেন। রমেনের জমি বলতে তো ওই শোলের বিঘা দুই। গত কয়েক বছর ধরে তপনদের
তিন বিঘার মতো জমি ভাগে চাষ করছিল রমেনেই। এই বছর তপন নিজেই চাষ করছে। যদিও তাতে রমেনের বিশেষ কিছুই আসে বা যায় না। কারণ লালস্বর্ণ ধান ছাড়া ওই সব জমিতে তেমন কোনও ধানেরই ভাল ফলন হয় না। আর লালস্বর্ণ ধানের খরচাটাও মোটা রকমের। ভাগে চাষ করে তেমন পড়তাও পড়ে না।
বাড়ি ফিরেই রমেন কমলাকে জিজ্ঞেস করে, ‘হ্যাঁগো বলি কানাইয়া ইউরিয়ার বস্তাটা আইন্যা দিইছ্যে বাজার থেইক্যা?’  
রমেনের বউ কমলা উনুনে জ্বাল দিতে দিতেই উত্তর দেয়, ‘দ্যখো আপনা মুরাদ না থাইকল্যা চাষ বাস ছাইড়্যা দ্যাও। উসব পরের ভরসায় হবার লয়। আষাঢ়ের পনের পার কইর‍্যা এত দিনে বীজতলার জমিটাতে হাল দিল্যা। কবেই আর বীজ বার হইব্যা কবেই বা লাগাইব্যা।’ কথাগুলো বলতে গিয়েই হাঁপিয়ে উঠে কমলা। দীর্ঘদিন ধরে শরীর খারাপ থাকার জন্য মেজাজটাও কেমন যেন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে কমলার। 
হাঁ এবার একটু দেরি হয়েছে ঠিকই তবুও কমলার কথাটা হজম হল না রমেনের। নিজেই কলশি থেকে এক গ্লাস জল ঢেলে ঢক ঢক করে খেয়ে খৈনি রগড়াতে রগড়াতে গামছা কাঁধে বেরিয়ে গেল পুকুরের দিকে।
পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে রমেন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল মেঘের রঙ পাকা জামের মতো হয়েছে। আবার বৃষ্টি এল বলে। খৈনির পিক ফেলতে গিয়ে চোখ পড়ল কানাই এর বউ ভাদুর উপর। সদ্য ডুব দিয়ে ঘাটে উঠে হাঁটুর উপর কাপড়টা তুলে জল নিগড়ে নিচ্ছিল ভাদু। কয়েক পা পিছিয়ে গেল রমেন। পিছু ফিরে একবার দেখে নিল। না, কেউ কোথাও নেই। রমেনের নজর গিয়ে আবার ধাক্কা লাগল ভাদুর দু’হাঁটুর উপর। ভাদুও মাথা তুলতেই দেখতে পেল রমেন তার দিকেই শকুনের মতো তাকিয়ে আছে। কাপড়টা ছেড়ে দিল ভাদু। পরিবেশটা সরল করতে মুচকি হেসে রমেন ভাদুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কানাইয়া কি বাজার যায় নাই ? সকালে ইউরিয়া কিনার টাকা লিল কিন্তু তারপর আর পাত্তাই নাই যে।’ 
ভাদু ভিজে গামছাটা বুকে জড়িয়ে বলে, ‘সাবির বিটির শরীদ খারাব উয়াকে দ্যাইখতে গোপীনাথপুর গ্যেইছে। কাইল আইসব্যেক।’ সাবিত্রী কানাইয়ের ছোটবোন। ওর মেয়ে টুকির অনেক দিন হল শরীর ভাল নেই। কিছু বাড়াবাড়ি হয়েছে হয়তো তাই কানাই ছুটে গেছে।
ভাদু ঘাট থেকে চলে যাবার পর কয়েকটা ডুব দিয়ে রমেনও বাড়ির পথে পা চালায়। ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই শুরু হল টুপটাপ বৃষ্টি। তারপর ঝমঝম। বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলল বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়ার দাপট। মাঝে কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার বিকেল থেকে শুরু হল গুড়ি-গুড়ি বৃষ্টি। ভাত খাবার পর রমেন ভেবেছিল বৃষ্টি থামলে একবার বীজতলাটা ঘুরে আসবে। সেটা আর হল না। 
বেশ শীত-শীত করছিল বলেই একটা কাঁথা ঢাকা নিয়ে সন্ধ্যা-সন্ধ্যি শুয়ে পড়েছিল রমেন। কমলা পাশে বসে জিজ্ঞেস করল, ‘বলি জ্বর আসে নাই তো ? এখুনি কাঁথা উইড়্যা শুইল্যা যে ?’ 
রমেন কোনও উত্তর না দিয়ে জড়িয়ে ধরল কমলাকে তারপর বলল, ‘তুই তো বিশ্বাস করিস নাই কমলি কিন্তু পাহাড়বনার কৈবর‍্যাজের ওই ওষুধ খাইয়েই তো বুধার বউ পুয়াতি হ্যইলেক।’ 
কমলা কোনও উত্তর দিল না। সে ভাল মতো জানে যখন ডাক্তার বলে দিয়েছে তখন কবিরাজের ওষুধেও আর বাচ্চা হবে না। এই মা হতে না পারাটা কমলারও যথেষ্ট যন্ত্রণার জায়গা। তবে কমলার যে কবিরাজের ওষুধ খেতে ইচ্ছে করে না; তা নয়। বরং উল্টোটাই। আসলে ছোটবেলায় কমলার ভাইকে সাপে কেটেছিল। কমলার বাবা কারু কথা না শুনে বিষ ঝাড়তে গিয়েছিল কবিরাজের কাছে। কমলার ভাই আর ফেরেনি। তাই কবিরাজের কাছে যেতে কমলার কেমন যেন ভয় ভয় করে। রমেনের মুখে আবার কবিরাজের কথা শুনতেই কমলার দুচোখে জল জমা হয়ে আসে মরা ভাইটার জন্য। 
পুকুর ঘাটে বাসন ধুতে গিয়ে কমলা শুনেছে পাড়ার মেয়ে বউরা তাকে ‘বাঁজি’ বলে। কমলাও বোঝে অভাবের সংসারেও একটা শিশুমুখ অনেকটা খুশির প্রলেপ দিত। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নয়। হাজার চিন্তায় কমলা দিন-দিন যত শুকিয়ে দড়ি হয়েছে ততই পুড়েছে তলপেট না ভরার আগুনে। 
রমেন বুঝতে পারে কমলার অবস্থাটা তাই আরও জোরে বুকে জড়িয়ে ধরে তাকে। তারপর বিছানায় শুয়িয়ে কমলার শাড়ি সায়া দুটো আলতো ভাবে তুলে দেয় কোমরের উপর। হাত বোলায় কমলার রুগ্ন করুণ উরু দুটোতে। কমলার শরীরটা কেঁপে উঠে শিহরনে। হ্যারিকিনের পাতলা হলুদ আলোতে রমেনের চোখ কমলার হাঁটুর উপর পড়তেই তার চোখে ভেসে উঠে পুকুর ঘাটে দেখা ভাদুর দু’হাঁটু উপরের অংশটুকু। সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় বসে পড়ে রমেন। কীযেন ভেবে নিয়ে বলে, ‘তুই ভাতটা বসা কমলি। আমি বরং একবার দেইখ্যা আসি কানাইয়া ইউরিয়াটা আইন্যাছে কি না...’ 
রমেন বিছানা থেকে নেমে পড়লে কমলাও শাড়ি-সায়া দুটো টেনে নামিয়ে দেয় নিচে। কমলা সবেই বোঝে কিন্তু কিছুই বলতে পারে না। সে ভাল মতো জানে শরীর দিয়ে রমেনকে সে কোনও দিনেই তৃপ্তি দিতে পারবে না আর। তাই ভাদুর কাছে বারবার রমেনের ছুটে যাওয়াতে সে কোনও দিনেই বাধা দেয়নি। চোখ দুটো আবার জলে ভরে আসে কমলার। স্বামীর উপর সব বিষয়েই তার জোর খাটে কিন্তু শরীর বিষয়টা তার নাগালের বাইরে এখন। শরীর যতই কমলার সাথ ছেড়েছে ততই রমেনের চোখ পড়েছে ভাদুর উপর। কমলা শুধু পুড়েছে সব হারানোর আগুনে।
[দুই]
রমেন ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে সারা গ্রামটাই আবছা আঁধারে ঢাকা। কেউ কোথাও নেই। কুলির রাস্তা দিয়ে জল গড়িয়ে যাচ্ছে মাস্টারদের পুকুরটার দিকে। গুড়ি-গুড়ি বৃষ্টির দানাগুলো জলে গোলাকার তরঙ্গ তৈরি করছে আপন মনে। দূরের খাল-বিল আর ডোবাগুলো থেকে হরেক রকম সুরে ব্যাঙ ডাকছে। রমেন আনমনে পা বাড়ায় কানাই এর বাড়ির দিকে। বর্ষার একটা নেশা কাজ করছে রমেনের বুকে। এই নেশা থামানো কমলার সাধ্যের বাইরে। 
কানাই এর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই বুকটা কেমন যেন করে উঠে রমেনের। সে তো শুনেছে কানাই আজ বাড়ি ফিরবে না। কিন্তু যদি পাড়ার কেউ দেখে ফেলে ? পা টিপে টিপে কানাই এর ঘরের উঠোনে ঢোকে রমেন। মৃদু সুরে ডাকে, ‘ভাদু, ওই ভাদু।’ ভেতর থেকে কোনও সাড়া শব্দই আসে না। রমেন ভাদুর রান্না ঘরের বন্ধ দরজার কাছে গিয়ে আবার ডাকে, ‘রাগ করিস লাই ভাদু ইবার ধান বিইক্যা ঠিক পাল্যাইব দ্যেখিস।’ 
ভেতর থেকে ভাদুর গলার ঝাঁঝ ভেসে আসে এবার, ‘আজ তিন বছর ধইর‍্যা তুর এক কথাই শুইনত্যাছি। যতদিন না শাঙা কুরছিস আর কিছুই পাবি নাই। শরীদের ভুখ লাগল্যেই ভাদর মাসের ভুলার মতন ছুইট্যে আসিস। ভাল মতন বুঝি তুর চালাকি গুল্যাইন।’ 
কিছু না পাওয়ার গন্ধেই রমেনের জিবে অনেক কিছু পাবার আশায় লালা ঝরতে থাকে। রমেন সুরটা আরও নরম করে, ‘হাঁ মানছি বটে তিন বছর কথা রাইখত্যে পারি নাই। কিন্তু একবার ভাইব্যা দ্যাখ, গেল দু’বছর জলের অভাবে ধান কুত কম হইল্যেক। লতুন ঘর বাইন্ধত্যে কুত খুরচ। হাতে টাকা না থ্যাইকল্যা পল্যাই কুনোই লাভ নাই।’
ভাদু আর একটি কথাও বলে না। আবার ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়। রমেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকে। মিনিট পনের পরে ভাদু যখন দরজা খোলে তখন রমেনের পুরো শরীর ভিজে জল গড়িয়ে পড়ছে। রমেনের ভেজা শরীরটা দেখে ভাদুর ভরাট বুকেও কেমন যেন ঢেউ খেলে যায়। অভিমানে রমেন ফিরে চলে যেতে গেলে ভাদু তার হাত ধরে রান্না ঘরের ভেতরে ঢোকায়। রমেন ভাদুর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সরে যায় কাঠের জ্বলন্ত উনুনটার দিকে। ভাদু আবার কাছে এগিয়ে এলে রমেন বাধা দিয়ে বলে, ‘ভাদু এখন থাক, তুর ব্যাটা দেইখ্যা ফ্যেইলবেক।’ 
ভাদু হাত দুটোকে উপরের দিকে তুলে আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে বলে, ‘শালা ভূতের মুখে রাম নাম। সেদিন ঘুমন্ত বাপ ব্যটার সামনে থ্যেইক্যা যখন হাত ধইর‍্যা ইখানটয় আনলি তুখুন তুর ভয়ও কর‍্যেক নাই শরমও লাগ্যেক নাই। দ্যেক রমনা আজকেই কিন্তুক শেষ বার। পরেরবার শাঙা কুরার পরেই পাবি।’ 
রমেন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সে কিছু বলার আগেই ভাদু তার ভেজা শরীরটা বুকে জড়িয়ে নিজের ঠোঁট দুটো দিয়ে রমের ঠোঁট দুটোকে কামড়ে ধরে।
বৃষ্টি আর ব্যাঙের চিৎকারে ভাদুর কানেও আসে না পাশের ঘর থেকে ‘মা, মা’ করে এক নাগাড়ে ডেকে যাওয়া শিশুটার কান্নার শব্দ। শরীরের জ্বালা, অঝোর বৃষ্টি আর ব্যাঙের শব্দে হারিয়ে যায় শিশুর অসময়ের কান্না টুকুও। 
বৃষ্টি ভেজা রমেনের ঠাণ্ডা শরীরটা থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরে। একটা সময় রান্নাঘরের ভেতরকার ঝড় আর বাইরের বৃষ্টি দুটোই শান্ত হয়ে আসে। শুধু ব্যাঙগুলো আর বাচ্চাটা তখনো গুমরাতে থাকে অন্ধকারে।            
[তিন]
অঘ্রাণের মাঝামাঝি। রমেনের ধান-ঝাড়া ধান-বেচা দু’ই শেষ। এবার স্বর্ণধানের দাম ভাল থাকায় রমেন প্রায় দশ হাজার টাকার ধান বিক্রি করেছে। আর তার কোনও চিন্তা নেই। এবার হয়তো সে সুযোগ পেলেই ভাদুকে নিয়ে পালিয়ে যাবে দূরে কোথাও। যেখানে ওদেরকে কেউ চেনে না। 
এদিকে রোজ রাতজেগে ভাদু একটা ভাঙা স্বপ্নদেখে, রমেন রাজমিস্ত্রির কাজ করেছে আর ভাদু তাকে মশলা বাড়িয়ে দিচ্ছে দু’হাত তুলে। কাজ সেরে দুজনে সাইকেলে করে বাড়ি ফিরছে লাল মরামের রাস্তা দিয়ে। এর পরেরটা আর ভাদুর দেখা হয়নি কোনওদিন। এর পরেই কমলার মুখটা হঠাৎ মনে পড়ে যায় ভাদুর। কেন যে এমন হয় সে নিজেও জানে না। তখন সব টুকরো টুকরো করে দিতে ইচ্ছে করে। স্বপ্ন তো দূরের কথা সারারাত আর তার ঘুমও আসে না। কমলার বিছানা থেকে রমেনকে টেনে নিজের বিছানায় আনতে ইচ্ছে করে তখন। 
অন্যদিকে কমলার শরীর ভাঙতে ভাঙতে হাড়ের উপর চামড়া ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। রমেন যে ডাক্তার দেখাতে চায়নি তা নয় বরং কমলাই বাধা দিয়েছে। শেষের এক মাসে কমলার শরীর এতটাই ভেঙেছে যে রমেনকেই বাড়ির সব কাজ করতে হয়েছে। শুধু বাড়ির কাজ নয় কোনও কোনও দিন যখন কমলা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে তখন রমেনেই কমলার মুখে খাবার তুলে দিয়েছে। তবে যে কারণেই হোক না কেন রমেন কমলার সেবা করতে বিরক্ত হয়নি কোনওদিন। ধান বিক্রি হবার পর থেকেই ভাদু রমেনকে তাড়া দিচ্ছে পালিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু কমলাকে অসুস্থ ফেলে রেখে পালিয়ে যেতে রমেনের নারীললুপ বিবেকেও বাজে আজকাল। তাই সে পালিয়ে যেতে পারে না। মাঝে মাঝে ভাদুর বিষাক্ত সব কথায় রমেন কিছু বলতে না পারলেও বেশ বিরক্ত হয়। শেষবার শেষবার করলেও ভাদুও রমেনকে কোনও বারেই খালি হাতে ফেরায়নি। তবে ভাদু এখন শরীরের নরম মাদুর বিছিয়ে রমেনের কাছ থেকে মাঝে মাঝেই শাড়ি কাঁচের চুড়ি এইসব টুকিটাকি আদায় করে ছাড়ে। 
রমেনের বউ কমলার চাহিদা কম বরাবরেই। সে কখনোই মুখ ফুটে বলে না তার পরার শাড়ি ছিঁড়েছে কিংবা পরার মতো সায়া ব্লাউজ নেই। যখন রমেনের চোখে পড়ে নিজেই কাশীপুর হাটের থেকে কিনে আনে। গেল দুর্গা পূজার অষ্টমীর দিন রমেন কমলাকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিল বলে ভাদুর সাথে খুব ঝগড়া বেঁধেছিল রমেনের। এমনকি ভাদুর ভয়ে রমেন কমলাকে একটা ভাল শাড়ি পর্যন্ত কিনে দিতে পারেনি পূজাতে। রমেনের খুব ইচ্ছেছিল কমলাকে একটা তাঁতের শাড়ি কিনে দেবার। কিন্তু ইচ্ছেটা মেটেনি। তাঁতের শাড়ির কথা শুনে ভাদু বলেছিল, ‘মাগী তো কদিন পরেই ম্যরইব্যেক উহার ল্যাইগ্যা তাঁতের শাড়ি কিইন্যা খুরচা না কইর‍্যা টাকা গুল্যাইন রাখ পরে কাইজে ল্যাইগব্যেক।’ 
ভাদুর এমন পাষাণ কথা শুনে আর তাঁতের শাড়ি কিনতে পারেনি রমেন। একটা কম দামের শাড়ি কিনেই বাড়ি ফিরেছিল সেদিন। কিন্তু ওই শাড়িটাই বুকে জড়িয়ে কমলাও একই কথা বলেছিল, ‘শাড়ি না কিইন্যা টাকা গুল্যাইন রাইখ্যা দিল্যে পরে আমার ঘাট-ছেরাদ্দে কাজে ল্যাইগতক।’ প্রথম বার অচেনা একটা ভয়ে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল রমেনের ভেতরটা। 
অঘ্রাণের শেষ দিকে ঠাণ্ডাটা একটু বাড়তেই কমলার হাত পায়ের গিঁটে গিঁটে শুরু হল অসহ্য ব্যথা। আজকে সারা রাত কাঁতরে কাঁতরে যখন কমলার একটু ঘুম এসেছে তখন রমেনের চোখে ভেসে উঠল সেই সব দিনগুলো। বিয়ের প্রথম প্রথম রমেনের কাছে শুতেও কেমন যেন লজ্জা পেত কমলা। অনেক সময় লেগেছিল নববধূ কমলার লাজ ভাঙাতে। তারপর জ্যোৎস্না রাতে কাঠের তক্তায় শুয়ে রমেন কমলাকে জড়িয়ে ধরে তার মা-বাবা-ঠাকুমার গল্প শোনাত। শোনাত ছেলেবেলার দামাল দিনগুলোর গল্প। অন্ধকারে একলা মাছ ধরতে যাবার গল্প। ঠাকুর দালানের দুর্গা পূজার গল্প। আরও কতই না গল্পছিল রমেনের। সারারাত দুজনে গল্প করেই কাটিয়ে ফেলত। কমলাও রমেনের বুকে মাথা রেখে দু’চোখ পেতে যেন সব কুড়িয়ে নিত। বিয়ের মাস ছয় পরেই কমলার পেটে বাচ্চা এল। কিন্তু বাচ্চা প্রসবের সময় হবার কয়েক সপ্তাহ আগেই একদিন শুরু হল কমলার মাতৃঅঙ্গে প্রচণ্ড রক্তপাত। সেদিন কমলার শাড়ি সায়া সব ভিজে গিয়েছিল রক্তে। হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল কমলাকে। সেদিন কমলাকে বাঁচানো গেলেও বাচ্চাটা বাঁচানো যায়নি। সেদিনেই ডাক্তার বলেছিল আর কোনওদিনেই কমলা মা হতে পারবে না। তারপর থেকেই শুরু হল কমলার শরীর ভাঙতে। সেই সব দিনের কথা ভাবতে ভাবতে অনেক দূরের অতীতে হারিয়ে গিয়েছিল রমেন। হঠাৎ কমলা নড়ে উঠতেই আবার বাস্তবের মাটিতে ফিরল সে। লুঙ্গিটাকে উপরে তুলে চোখের জলটা মুছল রমেন। আবার কমলা একটু নড়ে উঠতেই রমেন জিজ্ঞেস  করল, ‘খুব কষ্ট হইচ্চ্যে কমলি ?’ কমলা হাঁ না কিছু উত্তর না দিয়ে মৃদু একটা ‘উঁ’ শব্দ করে পাশ ফিরে শোবার চেষ্টা করল শুধু। 
সারা রাত দু’চোখের পাতা এক করেনি রমেন। পাথরের মূর্তির মতো চুপচাপ বসেছিল কমলার মাথার কাছে। কমলার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতেই বারবার রমেন হারিয়ে যাচ্ছিল সেই সব ফেলে আসা লাল-হলুদ দিনগুলোতে।
[চার]
ফাল্গুনের প্রথম দিকে ঠাণ্ডাটা অনেকটাই কমে এলে কমলাও একটু সুস্থ বোধ করতে শুরু করল। রান্না-বান্না করতে না পারলেও নিজের খাবারটা নিজের হাতে খেতে পারে এখন। পায়খানা করার পর আর  রমেনকে ধুইয়ে দিতেও হয় না। হয়তো এই যাত্রায় বেঁচেই গেল ও। কমলার বারণ না শুনেই রমেন ডাক্তার দেখিয়েছিল ওকে। কিন্তু ডাক্তারও কমলার সঠিক রোগটা ধরতে পারেনি। হাঁ কমলার শরীরে রক্ত কম আছে ঠিক কথাই তাইবলে কেবল মাত্র রক্ত অল্পতার জন্য একটা মানুষ তিল তিল করে মরে যেতে পারে এই কথা বিশ্বাস করেনি রমেন। আসলে ভাদুও যে কমলার শুকিয়ে যাবার আরেকটা কারণ তা এখন রমেন ভালই বুঝতে পারে। তাই এখন রাতের বেলায় ভাদুর সাথে দেখা করে না রমেন আর। ভোরের দিকে যখন ভাদু পাতা কুড়োতে জঙ্গলে যায় তখন রমেন শরীরের স্বাদ মিটিয়ে আসে। রমেন আর ভাদুর সম্পর্কটা গ্রামের মানুষের কানাকানি হবার পর থেকেই ভাদুও কোমর বেঁধে লেগেছে রমেনকে নিয়ে পালিয়ে যাবার জন্য। এখন কথায় কথায় শাসানি দিয়ে ভাদু বলে, ‘তুর যদি কমলি মাগীটার জন্যি এত্তই দুরদ তাইল্যে উহাকে লিয়ে শরীদের ভুক মিটাল্যেই তু পারিস। আমি না হয় নামুপাড়ার তপনার সাথেই শাঙা করি। এই মাসের ভিতরে যদি পল্যাইতে পারিস তু ভাল নইল্যে বুড়া আঙ্গুইল চুসবি।’ 
রমেনও না শুনেছে অনেকের মুখে, ‘কানাইয়ার বউ ভাদির সাত্তে তপনার ঢলাঢলি আছে।’ ভাদুর নরম শরীরে কানাই হাত দেয় ভাবলেই রমেনের বুকটা কেমন গুড়ুম-গুড়ুম করে কাঁপতে থাকে। অন্য কারু কথা শুনলে তো মাথা খারাপ হবারেই কথা। রমেন শুধু অপেক্ষা করছে কমলা নিজের রান্নাটা করার মতো সুস্থ হোক তাহলেই সে পালিয়ে যাবে। ভাদুর শরীরের নেশাটা রমেনকে এমন ভাবেই পেয়ে বসেছে যেটার থেকে বেরিয়ে আসা রমেনের পক্ষে আর কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। অন্তত রমেন তাই মনে করে। কিন্তু রাতের বেলায় কমলার ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকালেই আবার এই রমেনেই যে হারিয়ে যায় অতীতের সেই সব সুখের ঝিনুক কুড়িয়ে আনার দিনগুলোতে । তখন যে আর ভাদুর শরীরের মধু কাজেই করে না!
কদিন ধরে ভাদুও বুঝতে পারছে রমেন তাকে আর আগের মতো চায় না। এখন ভাদু বাধা দিলে রমেন জোর করার চেষ্টাও করে না। রমেনের দিনদিন এই ভালমানুষ হয়ে উঠার জন্যেই ভাদুর সন্দেহটা বেশি হয় এখন। নানা ভাবনা আর রমেনকে হারাবার ভয়ে ভাদু মাঝে মাঝেই সারা রাত জেগেই বসে থাকে। কানাইকে নিয়ে কোনওদিনেই ভাবেনি ভাদু। স্ত্রীর কর্তব্য হিসেবে শুধু একটা ছেলের জন্ম দিয়েছে মাত্র। রমেনের এই পরিবর্তনটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না বলেই রাগটা গিয়ে পড়ছে বেচারা কমলার উপর। দিনদিন কমলার সুস্থ হয়ে উঠাটাও ভাদুর একটা চিন্তার কারণ। সাতে পাছে সব কিছু টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করে ওর।
[পাঁচ]
আজকে চৈত্র সংক্রান্তির রাত। রমেন বুধনপুর থেকে শিবের গাজন দেখে ফিরছে। মনটাও এখন বেশ ফুরফুরে ওর। কমলাও এখন অনেকটাই সুস্থ। আজকে কমলাও উপোষ দিয়ে বাড়িতেই শিবের পূজা করেছে। এই আনন্দেই অনেকদিন পর আজকে রমেন কমলার জন্য কাঁচের চুড়ি কিনেছে। শুধু তাই নয় মনে মনে ঠিক করেছে কালকে কমলাকে মেলায় নিয়ে আসবে। 
বুধনপুরের পাকা রাস্তা পেরিয়ে কাঁচা রাস্তায় নামতেই রমেনের চোখে পড়ল কে যেন নিম গাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। ইতস্তত করেই কিছুটা এগিয়ে আসে রমেন। অবাক হয়ে দেখে ভাদু দাঁড়িয়ে। রমেন কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ভাদু ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে। রমেন চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারে না ভাদুকে। ভাদু নিজেই নিজের শাড়ীর আঁচল সরিয়ে ব্লাউজ খুলে বুক দু’টোর ভেতরে রমেনের মুখটা গুঁজে দেয়। 
অনেকক্ষণ ভাদুর খোলা বুকে মুখ গুঁজে থাকার পর শেষ পর্যন্ত ভাদুর বুকের উগ্র কামুক গন্ধে রমেনের শরীরও সাড়া দিতে বাধ্য হয়। সবুজ ঘাসের উপর লুটিয়ে পড়ে দুটো শরীর। মাঝে মাঝেই ভাদুর ঠোঁট আর বুকের গন্ধকে ছাপিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ভাদুর দু’হাতে মাখানো উগ্র কেরোসিনের গন্ধ। সে গন্ধটুকু ভাদুকে ছুঁতেও পারে না। রমেনের শরীর নিগড়ে নিজের অতৃপ্ত শরীর আর মনের জ্বালা মেটাতে থাকে ভাদু।  
 শরীরের লহর শান্ত হবার পর ভাদু বলে, ‘আমি টাকা পয়সা গামছা কাপড় সুব ল্যিয়েই আইছি। তুর জুন্যে অনেকক্ষুন ইখানে দাঁড়াই আছি। কানাইয়া সুব জাইনে গ্যেইছে আইজকেই পল্যাই যাব চল।’ 
ভাদুর শরীরের উপর থেকে উঠে দাঁড়ায় রমেন। কিছুক্ষণ দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কিছু যেন চিন্তা করে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘তুই ইখানেই দাঁড়া আমি যাব আর আইসব।’
ভাদু অন্ধকারে একাই দাঁড়িয়ে থাকে। রমেন কমলার কাছ থেকে চোরের মতো পালিয়ে যেতে চায় না। আজকে সে কমলাকে সব বলবে। তাকে বলতেই হবে। সব বলেই রমেন বিদায় জানাবে কমলাকে। সব শোনার পর কমলা যে তাকে বাধা দেবে না সেটা ভাল মতোই জানে রমেন। আসলে কমলার করুণ মুখটা ফেলে রমেন পালিয়ে যাবে কেমন করে সেটাই তাকে অন্ধকারেও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু যেতে তাকে হবেই। কমলার সাথে যে তাকে ঘর করতে দেবে না ভাদু এটা রমেন ভাল মতোই জানে।    
কাঁচা রাস্তাটা ছেড়ে মাস্টারদের উঁচু পুকুর পাড়টায় চড়তেই আঁতকে উঠে রমেন। গ্রামের পশ্চিম দিকে ঠিক যেখানে রমেনের বাড়িটা সেখানেই দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলছে। ভেসে আসছে অনেক মানুষের চিৎকার। বাড়ির দিকে ছুটতে থাকে রমেন। কাছে আসতেই দেখতে পায় শুধু তার বাড়ি নয় পাশের আরও দুটো বাড়িতে আগুন লেগেছে। মাটির দেওয়ালগুলো ছাড়া তার বাড়িটার আর কিছুই পুড়তে বাকি নেই। কপাট জানালা খড়ের চাল কাঠের তক্তা সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পাড়ার ছেলেরা কোনও রকমে কমলাকে টেনে বের করেছে ঘর থেকে। পুরো শরীরটাই ঝলসে গেছে কমলার। তাকে চেনাই যাচ্ছে না। গালের মাংস পুড়ে দাঁতগুলো পর্যন্ত বেরিয়ে পড়েছে কমলার। কমলার মৃত দেহটার পাশে স্থির চোখে পাথরের মূর্তির মতো চুপচাপ বসে থাকে রমেন। ভাদুর হাতে লেগে থাকা কেরোসিনের গন্ধটা ওর নাকে আরেকবার ঝাপটা মেরে যায়।

পাশের বাড়ি দু’টোর আগুন নেভানোর পর কমলাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। শেষ কাজ সারতে সকাল নটা বাজে। চিতার আগুন নিভিয়ে যখন সবাই স্নান করার জন্য মাস্টারদের পুকুরের পথে ফিরছে তখন রমেনের কানে আসে পরানের একটা কথা, ‘কানাই এর বউ ভাদি কাইল র‍্যাইতে তপনার সাতে পল্যাইছে।’ রমেন কথাটা শুনেই মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। গরম দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নাকমুখ দিয়ে। নিজেকে সামলে নেওয়ার ভঙ্গিতে রমেন আবার চলতে থাকে ভাঙাচোরা শূন্য জীবনটায় ডুব দিতে।
                                 [সমাপ্ত]
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments