কেউ কেউ কবি

কেউ কেউ কবি

Advertisemen
www.amarsahitya.com
কেউ কেউ কবি
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

কবিতা, www.amarsahitya.com

ঘড়ির কাঁটায় নটা বাজল সবে। রবিবারের সকাল। বাগানের আকাশমণি গাছটার মাথা টপকে সূর্যটা এখন রাধাচূড়ার ফাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। পেপারটা টেবিলের উপর নামিয়ে রাখলেন রাধামাধব বাবু। হালকা করে একটা হাই তুলে নিয়ে পিছন ফিরে দেখলেন একবার। কৃষ্ণাবৌদির চা এখনো হয়নি মনে হয়। 
টেবিলের উপর নামিয়ে রাখা মোবাইলটা তুলে নিয়ে ডাটা অন করে ফেসবুক খুললেন উনি এবার। এখনো মাথার ভেতর মাছির মতো ভনভন করছে কবিতাটা। অনিতাবৌদির লেখা। অনিতাবৌদি হলেন রাধামাধব বাবুর স্কুলের বাংলা শিক্ষক বিপুল বাবুর স্ত্রী। এই কদিনেই ফেসবুকে বেশ নাম কামিয়েছেন অনিতাবৌদি। এখন তো এক ঘণ্টার ভেতর উনার কবিতায় শতাধিক লাইক পড়ে। অসাধারণ, চমৎকার, ফাটাফাটি, চালিয়ে যাও, মন ভরে গেল, বুক ভরে গেল... কত কত কমেন্ট। প্রথম দিকে অনিতাবৌদিও সবার কমেন্টের উত্তর দিতেন। রাধামাধব বাবুর কমেন্টের উত্তর দিতে গিয়ে লম্বা কয়েক লাইন লিখতেন। এখন আর সময় হয় না। এখন হালকা করে স্মাইলি দিয়েই ছেড়ে দেন। রাধামাধব বাবুর কষ্ট হলেও বলার বা করার কিছুই নেই।
‘তোমার চা...’ বলেই চায়ের কাপটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে রাধামাধব বাবুর পাশের চেয়ারেই বসলেন কৃষ্ণাবৌদি।
‘অনিতাবৌদির কালকে রাতের কবিতাটা পড়েছ ? পুরো ফাটিয়ে দিয়েছে। কবিতাটায় কে লাইক কমেন্ট করেছে জানো! শুনলে হতবাক হয়ে যাবে। ভাবলে অবাক লাগে, এই কদিন আগে শুরু করেই আজকে...’
‘তা লাইক-কমেন্টটা কে করল সেটাই তো বললে না।’ চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়েও চুমুক না দিয়ে বেশ বিরক্ত হয়ে কথাটা বললেন কৃষ্ণাবৌদি।
‘কে আবার! মার্কেটে তো একজনই আছে। নবদ্বীপের নিমাই।’
‘সে আবার কে ? নিমাই তো বহুকাল আগেই... এ আবার কোন নবদ্বীপের নিমাই ?’
‘এই তুমি বাংলায় এমে! কবি নবদ্বীপের নিমাইকেই চেনো না। লোকে শুনলে...’
রাধামাধব বাবুকে থামিয়ে কৃষ্ণাবৌদি বলেন, ‘না উনার লেখা কোনও ক্লাসেই আমাদের পাঠ্য ছিল না।’
‘হে ভগবান! উনি তো বছর দুই হল ফেসবুকে লিখছেন। এই তো কদিন আগেই পতিতা পত্রিকায় উনার কবিতা বেরিয়েছে শুনলাম। এবার যেন বোলো না যে পতিতা পত্রিকাটারই নাম জানো না।’
‘হ্যাঁ, সত্যিই সত্যিই জানি না। কিনেও তো নিয়ে আসনি কোনওদিন। তা এটা আবার কোন গ্রুপের পত্রিকা ?’
‘কিনে আনব কেমন করে ? এটা লক্ষণপুরের পত্রিকা। এদিকে আসে না। আর এটা কোনও গ্রুপেরও নয়। কবি শ্যামলকান্ত বসু বছর আড়াই এই পত্রিকাটা চালাচ্ছেন। তুমি দেখে নিও এই পতিতা একদিন সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে।’
‘আমি তো ফেসবুক টেসবুক অত ঘাঁটিও না জানিও না। তা তোমার অনিতাবৌদির কবিতাটা একবার পড়েই শোনাও, আমিও ধন্য হই।’
‘আজ হেঁয়ালি করছ করো কিন্তু দেখবে এই অনিতাবৌদির বিদ্রোহী কবিতাই একদিন পাড়ায় পাড়ায় বাজবে।’
‘হেঁয়ালি কোথায় করলাম ? শোনাতে বললাম তো...’
‘অনেক বড় কবিতা পুরোটা শোনানো সম্ভব নয়। পড়ে নিও। আমি শেষ কটা লাইন শোনাতে পারি...’
‘আচ্ছা তাই শোনাও।’
‘আমি আজ এক বন্ধা মাঠ/ পায়ে পায়ে পড়েছে পলি/ তবুও চলি মরুভূমির পথিক/ একদিন ঝর্ণা হয়ে ঝরে যাব।’
‘মানে ?’ অবাক হয়েই শব্দটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল কৃষ্ণাবৌদির।
‘সত্যিই তোমার মাথায় জৈবসার আছে। কবিতার মানে খোঁজে কেউ ? এই তুমি বাংলায়...’

[দুই]
ছাদের উপর চেয়ারে বসে রাধামাধব বাবুর সঙ্গে গল্প করছিলেন কৃষ্ণাবৌদি। এখন একটুকরো চাঁদ ভাসছে আকাশে। আকাশমণির ডালে জ্যোৎস্নার আলো বাঁচিয়ে একটা রাতচরা পাখি এসে বসেছে খানিক আগে। হয়তো বাগানের ইঁদুর ধরার মতলব ওর। এই নিয়েই শুরু হয়েছিল গল্প। গল্প থেকে জীবনানন্দের হাত ধরে ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় আসতেই শুরু হল তর্ক। রাধামাধব বাবুর দাবী জীবনানন্দ জীবিত থাকলে নিশ্চয় অনিতাবৌদির কবিতার প্রশংসা করতেন। এই সহজ কথাটা কৃষ্ণাবৌদি কিছুতেই মেনে নিতে না পারলে শুরু হল তর্ক। 
রাধামাধব বাবু রেগেগিয়ে শেষমেশ বৌদিকে চেলেঞ্জও জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ক্ষমতা থাকলে অমন একটা কবিতা লিখে দেখাও।’ তবে জীবনানন্দের মতো কবিতা লেখার কথা উনি অবশ্য বলেননি। বলেছেন অনিতাবৌদির কবিতার মতো একটা কবিতা লিখে দেখাতে।   
কৃষ্ণাবৌদিও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। উল্টে বরং তেড়েই ঝেড়ে দিয়েছেন। উনার বক্তব্যে, অনিতাবৌদির মতো অমন কবিতা উনিও গণ্ডায় গণ্ডায় লিখতে পারবেন। নবদ্বীপের নিমাই নাকি কোনও কবিই নয়! নিমাই নাকি কবিদের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে লটকিয়ে পরিচিত হয়েছে! আর পতিতা পত্রিকা সম্পর্কে বৌদি যা বলেছেন সেটাকে অত্যন্ত শুদ্ধ বাংলায় ‘স্মল-হেয়ার’ বলা গেলেও যেতে পারে। 
রাধামাধব বাবু তবু দমে গিয়ে থেমে জাননি। গম্ভীর অথচ নরম গলায় উনি এখনো বলেই চলেছেন, ‘...কবিতা তো আর কবিতা নয়। কবিতা লিখব বললেও লেখা যায় না। কবিতা হল শিল্প। কবি শিল্পী। বাড়ির উঠোনে ধান ছড়িয়ে চড়ুই কিংবা পায়রা ডাকার মতো করে ডাকলেও কবিতা আসে না। মাথা থেকে কবিতাকে খাতা কিংবা ল্যাপটপ-মোবাইলে আনতে হলে সাধনা করতে হবে। ভেতরের ভাবটাকে জাগাতে হবে। স্বভাবে অভাব থাকা চলবে না। তুমি খেয়াল করে দেখবে কবিদের ছবিগুলো...’ 
‘খেয়াল তুমি করবে যাও। বললাম তো অমন কবিতা আমি উঠতে বসতে লিখতে পারি।’ গলার স্বরটা আরও বাড়ল বৌদির, ‘বলে কিনা জীবনানন্দ জীবিত থাকলে অনিতাবৌদির... এতদিন কিছু বলিনি দেখে ভেবো না যে কিছুই জানি না আমি। আর বলিহারি ওই মহিলার স্বামীকেও। বৌ বুক-পেটের ছবির তলায় কবিতা ঝুলিয়ে লাইক কুড়চ্ছে আর উনি ভাবে গদগদ হচ্ছেন। ঝাঁটা মারি অমন কবিতার মুখে। পোকা পড়ুক অমন কবিতায়...’ 
‘তুমি পারো না দেখে হিংসেই পুড়ে মরছ। বাংলায় এমে করলেই কবিতার কদর বোঝা যায় না। আমি ফিজিক্সের লোক হয়েও বরাবর সাহিত্য পাগল ছিলাম। তাই ভালমন্দের বিচার আমায় বুঝিও না। কবিতার সঙ্গে একটা ছবি না থাকলে পাঠকের চোখ...’
‘তোমাদের মতো অমন পাঠক চোখ কুনজর দিয়েই পরের বৌকে প্রেগন্যান্ট করে দিতে পারে আমি জানি।’
‘তুমি কিন্তু সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ। আর এই তো মুখের ভাষা! কবিতা বুঝবেই বা কেমন করে।’ রাধামাধব বাবু বেগতিক বুঝে ছাদের থেকে নীচে চলে গেলেন। নীচে এসেই ঢক-ঢক করে এক গ্লাস জল খেয়ে লাইট বন্ধ না করেই শুয়ে পড়লেন।
এদিকে কৃষ্ণাবৌদি একলা একলাই কিছুক্ষণ গজগজ করলেন। তারপর কাঁদলেন। শেষে একা একা ভয় পেয়ে নীচে নেমে এসে রাধামাধব বাবুর দিকে পিছন ফিরে শুয়ে পড়লেন। আজ লাইট অন থাকল সারা রাত।

পরের দিন সারা সকাল দু’তরফেই নীরবতা পালিত হল। প্রতিদিনের মতো রাধামাধব বাবু দশটা বাজতেই স্কুলে বেরিয়ে পড়লেন। অন্যান্যদিন রাধামাধব বাবু স্কুল বেরনোর সময় কৃষ্ণাবৌদি দরজায় এসে দাঁড়ান। আজকে আর সেটা হল না। আজকে রাধামাধব বাবু নিজেই হাত ঘড়ি মোবাইল সব মনে করে করে নিয়েছেন।
বিকেল বেলায় স্ফুল-ফিরে রাধামাধব বাবু যত না অবাক হলেন ঘাবড়ে গেলেন তার চেয়েও বেশি। ডাইনিং রুমের পশ্চিম দিকের দেওয়ালটায় চক দিয়ে মোটা মোটা করে লেখা রয়েছে, ‘ঠোঁটের উপর বুলবুলি/ সামনে পিছনে বাঁশের ঝাড়।’ 
রাধামাধব বাবুর মাথাটা কয়েকবার দপ-দপ করার পর দাউ-দাউ করে উঠল। বৌদির নাম ধরে বিকট চিৎকার করে উঠলেন উনি। তারপর ধপ করে বসে পড়লেন সোফায়।
‘কী হল ষাঁড়ের মতো চিৎকার করছ কেন ?’
‘ওটা কী লিখেছ দেওয়ালে!’
‘কবিতা।’
‘ওটা কবিতা ?’ আরও রেগে গেলেন রাধামাধব বাবু। ঘাড়ে ঝোলা ব্যাগটাকে ছুঁড়ে দিলেন সোফার কোনায়।
‘হয়নি ?’
‘এটা কোন দিক থেকে কবিতা বোঝাতে পারবে আমাকে!’
‘কেন ? সামনে পিছনে দুটো দিকেই তো বাঁশের ঝাড় আছে। ঠোঁটে বুলবুলি আছে। তাও এটা কবিতা হয়নি ?’
‘তোমার মুণ্ডু হয়েছে।’
‘এটা আমার কবিতা নয়। এটা তোমার প্রিয় কবি অনিতাবৌদির কবিতা। তোমার লাইক কমেন্ট দুই আছে।’ কৃষ্ণাবৌদি তৈরি হয়েই ছিলেন। মোবাইলটা শুধু এগিয়ে দিলেন রাধামাধব বাবুর দিকে, ‘এই দেখো কাঁচা রক্তমাংস খাওয়া শকুনের মতো লাল টকটকে লিপস্টিক ঠোঁটে লাগিয়ে বাঁশ বাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে তোলা ছবিটা। সঙ্গে এই দুটো লাইন। তোমার কমেন্টটা দেখো, ‘সামনে পিছনে বাঁশের ঝাড়, অসাধারণ বলেছেন।’ 
বেশিদিন আগের পোস্ট নয়, মাত্র সাত মাস আগের। ‘চুপ করে আছো যে ? বাঁশের ঝাড়গুলো পিছনে ঢুকছে না তো আবার?’

সেদিন রাতটাও মৌনব্রত পালন করেই কেটে গেল। কৃষ্ণাবৌদির কান্নার শব্দ পেয়েও রাধামাধব বাবু কথা বলতে পারলেন না। আসলে কবিদের কাছাকাছি থাকার লোভেই আর পাঁচ জনের মতো উনিও মাঝে মাঝে এমন লাইক কমেন্ট করেন। কিন্তু এর সঙ্গে বুক-পেট-ঠোঁটের ছবির কোনও সম্পর্কই যে নেই সেটা কৃষ্ণাবৌদিকে বোঝাবেন কীভাবে ? তাই বাধ্য হয়ে চুপ থাকতে হল উনাকে। এখন কৃষ্ণায় বান এসেছে এখন কিছু বোঝাতে গেলে সব ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এখন কৃষ্ণার কূলে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার নেই।
[তিন]
রাধামাধব বাবুর কপালটা যে বেশ ভাল এটা কিন্তু মানতেই হবে। গত কালকের ঘটনা অনুযায়ী কৃষ্ণাবৌদির কমসেকম দু’তিন দিন মৌন থাকার কথা। সেটা কিন্তু হল না। পরের দিন সকালে উঠেই রাধামাধব বাবু দেখলেন কৃষ্ণাবৌদি হাসি হাসি মুখ করে একটা কাগজ নিয়ে বসে রয়েছেন। রাধামাধব বাবুর ঘুম ভাঙতেই কৃষ্ণাবৌদি কাগজটা উনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হাসবে না কিন্তু। এই প্রথমবার চেষ্টা করলাম।’ কথাটা বলেই কৃষ্ণাবৌদি চা করে আনার বাহানায় বেরিয়ে গেলেন।
কাগজটায় কয়েক লাইনের একটা কবিতা লেখা আছে। কবিতাটার নাম ‘প্রেম’। কবিতাটার নীচে কৃষ্ণাবৌদির সই, তার নীচে তারিখ। রাধামাধব বাবু চোখ দুটোকে ভাল করে কচলে নিয়ে পড়লেন কবিতাটা, ‘যদি ভালবাসা দাও/ অন্ধকার নিয়ে সব আলো দিয়ে দিতে পারি/ এই হাত, বুক, সমস্ত শরীর/ যা কিছু জেনেছি আপন/ সব তো তোমারি।’
কবিতাটা প্রথমবার পড়ার পর আরও দু’বার পড়লেন রাধামাধব বাবু। তারপর ডাকলেন বৌদিকে, ‘বলছি যে চা পরে করবে, একবার এদিকে এসো।’
কৃষ্ণাবৌদি চায়ের কাপ হাতেই ভেতরে ঢুকে বললেন, ‘দেখো হাসাহাসি করবে না কিন্তু। আমি ওদের মতো মহান নই। হতেও চাই না। শুধু দেখলাম পারি কি না।’
‘কবিতাটা ভাল হয়েছে না মন্দ হয়েছে ওসব জানি না। কবিতার ভাল মন্দ হয় বলেও জানি না। যে যেমন কবিতা তার কাছে তেমন হয়েই ধরা দেয়। কবিতাটার নীচে বাংলা ইংরেজি দুটোতেই ঠিকানা লিখে দিও কোনও পত্রিকায় পোস্ট করে দেবো।’
‘আর যেখানেই পোস্ট করও পিলিজ ওই পতিতা পত্রিকায় করবে না কিন্তু।’ হাসতে গিয়ে কৃষ্ণাবৌদির মুখটা সকালের নরম আলোয় ঝলমল করে ওঠে। রাধামাধব বাবু কিছু একটা বলতে গিয়েও বলেন না। বৌদির মুখের দিকে তাকিয়ে উনিও হেসে ফেলেন।
   
[চার]
দেখতে দেখতেই চোখের সামনে সময়টা বদলে গেল। কৃষ্ণাবৌদির সেই কবিতাটা ‘মাসিক ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে মাস দুই আগে। আরও কবিতা পাঠাতে বলেছেন সম্পাদক। পত্রিকা ও সাম্মানিক পোস্টে এসেছিল। এখন কৃষ্ণাবৌদিও ফেসবুকের পরিচিত মুখ। ছোটখাটো অনেক পত্রিকা লেখা চায় এখন। প্রথম প্রথম রাধামাধব বাবু কৃষ্ণাবৌদির ডাইরি থেকে কবিতাগুলোকে তুলে টাইপ করে বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠিয়ে দিতেন। এখন বৌদি নিজে সেটাও শিখে ফেলেছেন। এখন উনার কবিতাতেও শতাধিক লাইক পড়ে। অসাধারণ, ফাটাফাটি, চমৎকার, অপূর্বের ছড়াছড়ি। ‘দিদি আমার নতুন কবিতাটা পড়েছেন ?’ ‘দিদি আমাদের একটা অনলাইন পত্রিকা আছে। পরের সংখ্যায় একটা কবিতা দিতে হবে কিন্তু।’ ‘দিদি বই প্রকাশ করতে চাইলে আমাদের বলবেন। এখানে কিন্তু অনেক ধান্দাবাজ পাবলিশার আছে। আমরা কম খরচায় করি।’ কত লোকের কত রকম মেসেজ আসে এখন।
কৃষ্ণাবৌদির ফেসবুক আইডি কিন্তু নতুন নয়। ২০১৩ সাল থেকে ফেসবুকে ধুক্-ধুক্ করছিলেন। হঠাৎ করে কবি হয়ে যেতেই সব কেমন যেন জ্যান্ত হয়ে গেল। এখন লাইট রঙের শাড়ি পরা ছবি পোস্ট করতে হয়। বড় কবি দিদিরা পরেন বলেই বড় টিপ পরতে হয়। কেউ মেসেজ করলে উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া চলে না। ছোট পত্রিকা বেশ কয়েকবার চাইলে তবেই লেখা দিতে হয়। কেউ ভাল আছেন জিজ্ঞেস করলে শুধু ‘হুম’ লিখতে হয়। প্রশ্নকর্তা কেমন আছেন না আছেন জানা চলে না। কোন কবিতায় কে লাইক করল কে করল না খেয়াল রাখতে হয়। টোটাল লাইক কমেন্টের হিসেব রাখতে হয়। লাইক কমেন্ট কম হলে কারণ খুঁজে দেখতে হয়। আর সব চেয়ে বড় কথা বড় নামের কবিদেরকে লাইক কমেন্ট দিয়ে সব সময় খুশি রাখতে হয়।   
এই কটা মাসে আর পাঁচজনের মতোই নিজে নিজেই অনেক কিছু শিখে ফেললেন কৃষ্ণাবৌদি। খুব কম কবিই এত কম সময়ে এতটা উন্নতি করতে পারেন। প্রথম প্রথম অনিতাবৌদির উপর রাগ থাকলেও এখন সব ঠিক হয়ে গেছে। এখন মাঝে মাঝেই ইনবক্সে কথা হয় দুজনের।

প্রতিদিনের মতো আজকেও রাতের খাবার খাওয়ার পর কৃষ্ণাবৌদি একটা কবিতা নিয়ে বসেছেন দেখে, একা একাই ছাদে এসে দাঁড়ান রাধামাধব বাবু। প্রতিদিনের মতো ছাদটার কোনায় গিয়ে সিগারেট ধরান। চারদিকটা এখন অন্ধকারে ভরে আছে। বাগানের গাছগুলোও ঝাপসা। এমন অন্ধকারে নিজেকেও ঠিক চেনা যায় না। দিন দিন একা হয়ে পড়ছেন উনি। কৃষ্ণাবৌদি ফেসবুক আর কবিতায় ডুবে। কতদিন ভাল করে কথা হয়নি দুজনের। এক ছাদের তলায় থেকেও দুজন যেন প্রতিবেশী।
হঠাৎ রাধামাধব বাবুর মোবাইলটা বাজতে শুরু করে পাঞ্জাবীর পকেটের ভেতর। এতরাতে উনাকে ফোন করার মতো তো... পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে অবাক হন রাধামাধব বাবু। কৃষ্ণাবৌদি কল করছেন। সিগারেটটায় সজোর কয়েকটা টান মেরে নীচে নেমে আসেন উনি। নীচে নেমে এসেই দেখেন, কৃষ্ণাবৌদি মেঝেতে বসে তলপেটে দু’হাত চাপা দিয়ে কুঁকড়ে রয়েছেন। বাথরুম থেকে উনার কাছ পর্যন্ত রক্তের দাগ লেপটে রয়েছে!

[পাঁচ]
‘মিঃ রক্ষিত এতে ভয়ের কিছুই নেই। তবে হ্যাঁ আপনারা যদি বাচ্চা নিতে চান তাহলে মায়োমেটিক অস্ত্রপচার করতে হবে। আর যদি না চান তাহলে জারায়ু বাদ দিলেও হবে।’
‘কৃষ্ণা মা হতে পারবে আপনি বলছেন ?’ দু’চোখ বিস্ময় নিয়েই রাধামাধব বাবু ডক্টর দাসকে প্রশ্নটা করেন।
‘দেখুন উনি মা হতে পারবেন কি না সেটা বলা সম্ভব না। তবে চান্স একটা আছে নিশ্চয়। আপনি যদি ডক্টর চ্যাটার্জ্জীকে দিয়ে অপারশেনটা করান তাতে উনার মা হতে পারার সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি। তবে আগাম জানিয়ে দেওয়া ভাল, ডক্টর চ্যাটার্জ্জী চার্জ বেশি নেন কিন্তু।’
‘তাও কেমন কী খরচা হবে ?’ বেশ আড়ষ্ট হয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করলেন রাধামাধব বাবু। শিক্ষকতা করলেও হাত এখন হাহাকার করছে। গত বছর ফ্ল্যাট কেনার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে যে ইএমআই নিয়ে ছিলেন সেটার অর্ধেকও শোধ হয়নি এখনো। স্কুলের সহশিক্ষকদের কাছ থেকে ধার নেওয়া টাকাও দেওয়া হয়নি। বৌদির বেশিরভাগ গয়নাও তো ওই ফ্ল্যাটেই...
‘সব মিলিয়ে হাজার পঞ্চাশ পেরিয়ে যাবে।’
‘পঞ্চাশ হা-জা-র! কিন্তু এই মুহূর্তে অতটা টাকা...’
‘দেখুন আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি যে এটা অনেক পুরানো টিউমার। অনেক আগেই দেখানো উচিৎ ছিল।’
‘আসলে বিয়ের পর থেকেই তো দেখছি উনার পিরিয়ডের সমস্যা। ব্লিডিং বরাবর বেশি হত। তলপেটে যন্ত্রণাও হত। কোনও কোনও বার তো পিরিয়ড সারতে সাত-আট দিন সময় লেগে যেত। তাই বিষয়টা অত গুরুত্ব দিইনি।’ 
‘বাচ্চা আসছিল না দেখেও ডাক্তার দেখালেন না কেন ? তাহলে তো আগেই ধরা পড়ে যেত। যাই হোক বর্তমান যা কন্ডিশন তাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিউমারটা বাদ দেওয়া উচিৎ। এর পর লেট করলে ক্যান্সার হতেই পারে। আমি আপনাকে হসপিটাল যেতে বলতেই পারতাম। বলছি না কারণ, হসপিটালে গেলে অনেক দিন ঝুলিয়ে রেখে অপারশেন করবে। সাধারণত ফাইব্রয়েড টিউমার এত বড় হয় না। ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে না। কিন্তু আপনার স্ত্রীর টিউমারটা অনেক দিন আগের। তাই যত তাড়াতাড়ি অপারশেনটা হয়ে যায় ততই ভাল। এবার আপনারা যা ভাল বোঝেন।’
‘না না আমি দেখছি। আজকেই জানাচ্ছি আপনাকে। ধন্যবাদ।’
ডাক্তারের কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন রাধামাধব বাবু। তারপর উদ্ভ্রান্তের মতো নার্সিংহোম থেকে বেরিয়ে রাস্তা ধারের তেঁতুল গাছটার নীচে এসে দাঁড়ান। এখন সবে মাসের মাঝামাঝি। বেতন পেতে অনেক দেরি আছে। এই মুহূর্তে পঞ্চাশ হাজার টাকা জোগাড় করা উনার পক্ষে সত্যিই সমস্যা। কিন্তু টাকাটা জোগাড় না হলে আরও বড় সমস্যায় পড়তে হবে এটা তো ডাক্তার বলেই দিলেন। 
পরপর দুটো সিগারেট টানার পর রাধামাধব বাবু নার্সিংহোমের ছত্রিশ নম্বর রুমে এসে ঢুকলেন। কৃষ্ণাবৌদি ঘুমিয়ে আছে দেখে উনার মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে পাশের টুলটায় চুপচাপ বসলেন। মাথার ভেতর এখনো টাকা জোগাড়ের কথাটা ঘুণে পোকার মতো কুটকুট করে কাটছে। একজন স্কুল শিক্ষকের কাছে এই টাকাটা না থাকা কিংবা জোগাড় করতে না পারা অবিশ্বাস্য শোনায় আজকের দিনে। একবার ভূগোলের চন্দন বাবু বলেও ছিলেন পারিবারিক কোনও একটা সাস্থবীমা করিয়ে রাখতে। তখন করে নিলে আজকে এই সমস্যায় পড়তে হত না। একটা দীর্ঘ গরম নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে রাধামাধব বাবুর নাক মুখ দিয়ে।
‘কী ভাবছ তখন থেকে ?’ মাথায় হাত বোলান বন্ধ হতেই হয়তো ঘুমটা ভেঙে গেছে কৃষ্ণাবৌদির।
‘কই কিছু না তো। আসলে হঠাৎ করে তোমার এমন শরীর খারাপ হবে ভাবিনি।’
‘শরীর আবার বলে-কয়ে কবে খারাপ হয় ? চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তার কী বলল টিউমার না পাথর ?’
‘টিউমার। তবে ডাক্তার বলেছে অপারশেন করার পর তুমি মা হতে পারবে।’ ‘মা’ শব্দটা উচ্চারণ করতেই চিন্তার মেঘ কেটে গিয়ে হঠাৎ আলো ঝলমল করে উঠল রাধামাধব বাবুর দু’চোখে। 
‘সত্যি বলছ ?’ বিছানা থেকে উঠতে গিয়েও উঠতে পারলেন না কৃষ্ণাবৌদি। তলপেটটা মোচড় দিয়ে উঠল আবার।

[ছয়]
চিন্তার ভেতর ডুবেই কাটল আরও দুটো দিন। ডাক্তার যে ভাবে বলছে তাতে আর অপেক্ষা করাটাও ঠিক হবে না। এদিকে রাধামাধব বাবু দু’এক জায়গায় টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করেও ধূসর মুখে বাড়ি ফিরেছেন। সবার নাকি এখন হাত খালি। রাধামাধব বাবু নিজেও ভাল মতোই জানেন ধারে ডুবে থাকার কারণেই আর কেউ ধার দিতে চাইছে না।
আনমনে নার্সিংহোমের ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে টানতে হঠাৎ একটা উদ্ভট ভাবনা এলো উনার মাথায়। ‘আচ্ছা একবার চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী ?’ নিজে নিজেই বিড়বিড় করলেন। তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল লগঅফ করে কৃষ্ণাবৌদির প্রোফাইল লগঅন করলেন রাধামাধব বাবু। এরপর কয়েক মিনিট কিন্তু কিন্তু করে শেষ পর্যন্ত দিয়েই দিলেন একটা ওয়াল পোস্ট। সব কিছু খুলেই লিখলেন উনি। সাহায্যও চাইলেন। কয়েক মিনিটে, ‘দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন’ এর ঝড় উঠল কমেন্টে। কেউ কেউ ওয়াল পোস্টটিকে কবিতা ভেবে ‘দারুণ হয়েছে’ ও লিখলেন। ‘অসাধারণ’ বললেন কেউ কেউ। 
অন্ধ পাঠকগুলোর কমেন্টে রাগে অভিমানে রাধামাধব বাবুর চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছিল। কিন্তু পোস্টটি ডিলিট করতে গিয়ে উনাকে থামতে হল। অচেনা কবি নামের এক ভদ্রলোক/ভদ্রমহিলা কমেন্ট করেছেন, ‘দিদি আমার ইনবক্সে ব্যাঙ্ক একাউন্ট নম্বর দিন।’
কমেন্টটা পড়ার পর রাধামাধব বাবু অচেনা কবির প্রোফাইল খুলে দেখলেন কিছুক্ষণ। না কবিতা ছাড়া আর কিছুই নেই উনার ফেসবুক ওয়ালে। আর হ্যাঁ উনি মহিলা নন, পুরুষ। তবে ইনবক্সে উনার সঙ্গে কোনওদিন কথা হয়নি কৃষ্ণাবৌদির। রাধামাধব বাবু ব্যাঙ্ক একাউন্ট নম্বর আই-এফ-এস-সি কোড সবই দিলেন উনাকে। খানিক বাদে ইনবক্সে ভেসে উঠল মেঘলা মনের মেসেজ, ‘দিদি একাউন্ট নম্বর প্লিজ।’ রাধামাধব বাবু উনাকে অচেনা কবিকে পাঠানো মেসেজটাই কপি পেস্ট করে দিলেন।
ঘণ্টা খানেকের ভেতর আরও দুজন কবি ব্যাঙ্ক একাউন্ট নম্বর নিলেন। ওদিকে ওয়াল পোস্টটায় এখনো কেউ কেউ কমেন্ট করছে ‘দারুণ লিখেছেন দিদি।’ নিজের মনেই হাসলেন রাধামাধব বাবু। সত্যিই বিচিত্র এই দেশ। নার্সিংহোমের ছাদ থেকে নেমে এসে ঘুমন্ত কৃষ্ণাবৌদির মুখের দিকে সজল চোখে চাইলেন উনি। নাইট বাল্বের নীল আলোয় কেমন যেন কাব্যিক মায়া ছড়িয়ে রয়েছে কৃষ্ণাবৌদির সারা মুখ জুড়ে। আজ অনেক দিন পর কৃষ্ণাবৌদির ঘুমন্ত ঠোঁটে ঠোঁট রাখলেন রাধামাধব বাবু। দুশ্চিন্তার মেঘগুলো সরে সরে যাচ্ছে এখন। এবার ভালই ভালই অপারশেনটা হয়ে গেলেই হল।
                                [সমাপ্ত]

Active Search Results
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments