প্রেমের গল্প, পরিযায়ী

প্রেমের গল্প, পরিযায়ী

Advertisemen
Best book


পরিযায়ী
  বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়
প্রেমের গল্প, www.amarsahitya.com

কলেজ থেকে বেরিয়ে প্রতিদিন আমি এই রাস্তাটা দিয়েই সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফিরি। দুপাসারি শাল জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কালো পিচে মোড়া রাস্তাটা চলে গেছে আমাদের গ্রামের দিকে। এদিকটায় বড় গাড়ি তেমন একটা চলে না। প্রতিদিন ফাঁকাই পড়ে থাকে রাস্তাটা। কিন্তু আজকে শ্যামপুরের দিকে বাঁক নেওয়ার সময় কোত্থেকে যে একটা ট্রাক মুখোমুখি এসে গেল কে জানে। আর একটু হলেই শুধু সাইকেল নয় হয়তো আমিও...
[এক]
আমাদের এই পাতাঝরা গ্রামটা পেরিয়ে গিয়েই ছোট্ট একটা পাহাড় আছে। সরকারি খাতায় যদিও ওর কোনও নাম নেই। গ্রামের লোকে বলে ধ্বজা পাহাড়। ধ্বজা পাহাড়টার ঠিক পায়ের কাছেই একটা পুকুর। শালূক পুকুর। রঙবেরঙের শালূক ফুলে ভরে থাকে পুকুরটা। শালূক পুকুরে এক সময় পরিযায়ী পাখির মেলা বসত। এক এক ঋতুতে এক এক ধরণের পাখিরা আসত শালূক পুকুরে। কোনও এক অজ্ঞাত অভিমানে এখন আর পরিযায়ী পাখির দল আসে না। খুব ছোটবেলায় বাবার আঙুল ধরে আমি এই পুকুরটার কাছে আসতাম। এই পুকুরটার কাছে এলেই কেন জানি না বাবা একটা গানই প্রতিদিন গাইতেন,
“উঠ গো ভারত-লক্ষ্মী, উঠ
আদি-জগত-জন-পূজ্যা,।।
দুঃখ দৈন সব নাশি, করো
দূরিত ভারত-লজ্জা।”
-গানটা গাইতে গাইতেই বাবার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। বাবার চোখে চোখ রেখে আমিও অকারণ যন্ত্রণায় ভিজতাম। বাবা চলে যাওয়ার পর আর শালূক পুকুরের দিকে আসা হয় না আমার। কান্না পায়, খুব কান্না পায়।

আজকে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ চোখ পড়ল শালূক পুকুরটার দিকে। দূরের থেকে দেখে মনে হল একাই যেন একটা মেয়ে শালূক পুকুরের পাড়ে বসে আছে। এমনটা হয় না সাধারণত। কারুর বাড়িতে নতুন অতিথি এলে ওদিকে যায় ঠিকই কিন্তু একা একা ওই নির্জন পাহাড়-পুকুরের দিকে তেমন কেউ যায় না। বেশ কৌতূহল হল আমার। চুপচাপ বাড়িতে ঢুকে কয়েক মিনিট পর আবার চুপচাপ বেরিয়ে পড়লাম। মা মনে হয় আমাকে দেখেনি। নতুবা সাইকেলটার খোঁজ নিশ্চয় করত।
এই কয়েক বছরেও তেমন পাল্টায়নি জায়গাটা। সেই তো এক চিলতে জঙ্গল পেরিয়ে কয়েকটা মহুয়ার গাছ তারপরই ধ্বজা পাহাড়। বড় রাস্তা থেকে মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু মহুয়ার গাছগুলো পেরিয়ে আরও খানিটা এগিয়ে এসে দেখলাম কোথাও কোনও মেয়ে নেই। এখান থেকে শালূক পুকুরের শালূক ফুলগুলো দেখা না গেলেও শালূক পুকুরের চারটা পাড় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। পায়ের গতি বাড়িয়ে কয়েক মিনিটেই পুকুরটার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালাম।
এবার চোখ পড়ল মেয়েটার উপর। দুহাতে দুটো শালূক ফুল নিয়ে জলে পা ডুবিয়ে আনমনে বসে রয়েছে মেয়েটা। হালকা হাওয়ায় ওর চুলগুলো এলোমেলো ভাবে এসে পড়েছে দু’গালের উপর। এই মেয়েটাকে এর আগে কোনওদিন দেখেছি বলে মনে হয় না। এমন রূপের মেয়ে চোখে পড়লে চোখ থেকে মোছে না সহজে। কাদের বাড়ির অতিথি হতে পারে সেটাও বোধগম্য হল না আমার। হওয়ার কথাও না, এমন হাইহিল আর জিন্স-কুর্তি পরা পরি আমাদের গ্রামের কারু অতিথি হয় কেমন করে!
মেয়েটা আমার আগমন টের পায়নি হয়তো। ওর দৃষ্টি এখনো দুটো বালিহাঁসের উপর স্থির হয়ে আছে। এখানে কবে থেকে আবার বালিহাঁস আসতে শুরু করেছে জানি না। শেষ যখন এখানে এসেছিলাম তখন এখানে কোনও পাখি আসত না আর। কিন্তু এখন কথা হল, ওকে আমি আমার উপস্থিতি জানাব কেমন করে ? খুক-খাক করে কাশা কিংবা সরাসরি কথাবলা কোনওটারই উপযুক্ত নই আমি। তাছাড়া ও কে ? কাদের বাড়িতে এসেছে ? একা একা কেনই বা এখানে কোনও কিছুই জানা নেই আমার।
হঠাৎ আলোর ঝলাকানির মতো বিদ্যুৎ খেলে গেল আমার বুদ্ধির ঘটে। শালূক পুকুরের পাড় থেকে নেমে মিটার কুড়ি পিছিয়ে গেলাম আমি। তারপর মোটা গলায় শুরু করলাম,-
“উঠ গো ভারত-লক্ষ্মী, উঠ
আদি-জগত-জন-পূজ্যা,।।”
                                                                    -যেমনটা ভেবেছিলাম ঠিক তেমনটাই হল। দুহাতে দুটো শালূক ফুল নিয়ে পুকুরের পাড়ে উঠে এলো জলপরি। আমি অবাক হওয়ার অভিনয় করতে গিয়েও ঠিকঠাক অবাক হতে পারলাম না কিছুতেই। কেন যেন মনে হল, এই মেয়েটাকে আমি চিনি। একে আমি দেখেছি কোথাও। মেয়েটাও অদ্ভুত ভাবে চেয়ে রইল আমার দিকে। ওর ভেতরেও কোনও অবাক হওয়া চিহ্ন নেই।
কয়েক মিটারের দূরত্বে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর হাঁটতে শুরু করলাম ধ্বজা পাহাড়টার দিকে। এমন সময় কানে এলো সুরের ছোঁয়া, ‘কী রে চিনতে পারলি না আমাকে ?’
পিছন ফিরে আবার মুখোমুখি দাঁড়ালাম আমি। খুব চেনা চেনা লাগছে, তবুও মনে করতে পারছি না কিছুতেই। কয়েক পা এগিয়ে এলাম।
‘আমি স্মৃতি। এবারেও যদি চিনতে না পারিস তাহলে তোর সঙ্গে কথা বলাই উচিৎ নয়।’ হাসি মুখেই কথাগুলো বলল ও।
নামটা বলতেই চিনতে পারলাম ওকে। যদিও ছোটবেলার সেই রোগাপাতলা চেহারার সঙ্গে আজকে ওর আর কোনও মিল নেই। তবুও কোথায় যেন একটা মিল রয়ে গেছে। গ্রামের স্কুলেই ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছিলাম আমরা। ভীষণ বকবকে স্বভাবের মেয়েছিল স্মৃতি। প্রায় ঝগড়া হত ওর সঙ্গে। এক্কেবারেই আমার পছন্দের বিপরীত মেরুতে ছিল ও। কথায় কথায় তর্ক, চুলোচুলি চলতেই থাকত আমাদের। ক্লাস ফোর পাশ করে বড় স্কুলে ভর্তির পর-পরই টাটা না কোথায় যেন চলে গিয়েছিল ওরা। ওকে মিস করতাম। ভীষণ মিস করতাম। এখনো মনে আছে ঠাকুর ঘরের দরজার কোনায় বসে গোপালের মূর্তির দিকে ভেজা ভেজা চোখে কতবার প্রার্থনা করেছি, ‘ঠাকুর ও শুধু একবার ফিরে আসুক, আর কোনওদিন ঝগড়া করব না ওর সঙ্গে।’ ঠাকুর কথাও শোনেনি, ওরাও আর ফিরে আসেনি।
‘কী রে চুপ করে আছিস যে ? সত্যিই চিনতে পারলি না!’ এবার কেমন যেন বিষণ্ণ লাগল ওর গলাটা।
‘তোর কাছে আমার দুটো রঙ পেনসিল আছে। সেই যে জীবন বিজ্ঞান পরীক্ষার দিন...’
‘থাক থাক আর মনে করাতে হবে না। সত্যি মাইরি... আমাকে মনে নেই কিন্তু পেনসিল দুটোর কথা ঠিক মনে আছে। শুনলাম অমরকানন কলেজে বাংলা নিয়ে পড়ছিলি ?’
‘এখনো শেষ হয়নি, পড়ছি। তোকে কে বলল ?’
‘সে যেই বলুক। সত্যি কি না বল ?’
‘হ্যাঁ, ঠিক শুনেছিস। তুই ?’
আমার প্রশ্নে কেন যেন ওর মুখটা ধূসর হয়ে গেল। উত্তর দিতে গিয়েও সময় নীল ও কিছুক্ষণ। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ইঞ্জিনিয়ারিং। বাট ওটা আমার পছন্দের ছিল না... ছাড় ওসব পুরনো কথা। কেমন ছিলি বল ?’ আমার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো ও।
‘ভালমন্দ মিশিয়ে। তা তোরা এলি কবে ? কতদিন থাকবি ?’
‘আমি একাই এসেছি। থাকব এখন...’ আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্মৃতি, ‘চল না পাহাড়টার ওদিক থেকে একটু ঘুরে আসি। যাবি?’
না বলার অধিকার আমার কোথায়! এমন সৌন্দর্যের সামনে সব ‘হ্যাঁ’ হয়ে যায়। শালূক পুকুরের পাড় থেকে নেমে আমরা পাহাড়টার দিকে হাঁটা লাগালাম। বিকেলের হলেদেটে আলোয় ঝলমল করছে পাহাড়টা। হয়তো স্মৃতির চুলগুলোকে বারবার এলোমেলো করার জন্যেই মিষ্টি একটা বাতাস বইছে এখন। কারণে অকারণে আমি মাঝে মাঝেই হ্যাংলার মতো ওকে দেখছি। বুকের ভেতর সম্পূর্ণ অচেনা একটা ঢেউ আমাকে বারবার দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

[দুই]
একবার ভেবেছিলাম স্মৃতির সঙ্গে ওদের বাড়ি পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে ঘুরে আসব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা আর হল না। যদি ও কিছু মনে করে, যদি ওর ঠাকুরদা কিংবা ঠাকুমা কিছু মনে করে, যদি... যতবার ওদের বাড়ি যাওয়ার কথা ভেবেছি ততবার হাজারটা ‘যদি’ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি নিজেও জানি আমার মতো ভোঁদড়ের পক্ষে এতগুলো ‘যদি’কে ডিঙিয়ে ওদের বাড়ি যাওয়া সম্ভব নয়। অগত্যা...

আজকে জানি না কেন খিদেও পায়নি আমার। শরীরটা কেমন যেন হালকা হয়ে আছে। বাড়ি ফিরে ছাদের উপর শুয়ে পড়লাম। মা প্রতিদিনের মতো সিরিয়ালে ডুবে আছে। আজকে আর সাইকেলের খোঁজ হবে বলে মনে হয় না। যদিও মা সাইকেলটার জন্য বকবে না জানি, বকবে আমার অসাবধানতার জন্যই। তবুও মায়ের মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করছে না আজ।
নড়বড় করতে করতেই এক সময় ঘুমকুমারী দেখা দিয়েছিলেন হয়তো। তবে স্থায়ী হননি বেশিক্ষণ। যখন ঘুম ভাঙল তখন কটা বাজছে কে জানে। আরও কিছুক্ষণ নড়বড় করে শেষ পর্যন্ত উঠতেই হল। ‘আচ্ছা স্মৃতি ভোরে আবার শালূক পুকুরের দিকে আসবে না তো ?’ কেন জানি না দুম করেই প্রশ্নটা এল মাথার ভেতর। আর মাথায় যখন এসেছে তখন পা দুটোকে সামলানো...

আজকে প্রথম অন্ধকারেও সাবলীল লাগছে নিজেকে। এটাই হয়তো পূর্বরাগ। পাতলা কুয়াশার চাদর মুড়ে ঘুমিয়ে আছে মহুয়া গাছগুলো। রাত্রির মাদকতা এখনো ওদের পাতায় লেগে রয়েছে। ধ্বজা পাহাড়টা অন্ধকার আর কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে। শালূক পুকুরটার বুক থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে কুয়াশা। আমি কিসের যেন আনন্দে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছি। মাঝে মাঝেই শৈশবের সেই দিনগুলো ডানা মেলে উড়ে আসছে চোখের পাতায়, আবার হারিয়ে যাচ্ছে কুয়াশার আড়ালে।
শালূক পুকুরের পাড়ের কিছুটা দূরে এসে চমকে দাঁড়ালাম। স্মৃতির গানের গলা হাওয়ার হাত ধরে ভেসে আসছে। এখনো ভোর হয়নি আর ও একাই...! বেশ অবাক লাগল আমার। অথচ সত্যিই স্মৃতি গাইছে,-
“জননী গো, লহো তুলে বক্ষে,
সান্ত্বন-বাস দেহো তুলে চক্ষে;
কাঁদিছে তব চরণতলে
ত্রিংশতি কোটি নরনারী গো।”
                                                                      -ভেবেছিলাম স্মৃতি একাই এসেছে! কিন্তু আরও কয়েক পা এগিয়ে আসতেই কানে এলো সমবেত কণ্ঠের সুর, “জননী গো, লহো তুলে বক্ষে...” আমার বিস্ময়ের আর সীমা রইল না। আমি এক ছুটে শালূক পুকুরের পাড়ের উপর উঠে এলাম। হ্যাঁ, স্মৃতি একা নয়। আরও অনেকেই আছে। কুয়াশা, অন্ধকার আর পাখির ভিড়ে ওদের মুখ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। রঙবেরঙের হাজার হাজার পাখি গানের তালে তালে উড়ছে শালূক পুকুরের জলের উপর।
একটা সময় আমকেও গানটার সুর পেয়ে বসল। যেন শৈশব ডাকছে আমায়। একছুটে আমিও নেমে এসে দাঁড়ালাম স্মৃতির পাশে। স্মৃতি গাইতে গাইতেই আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চোখের পলক ফেলে স্বাগত জানাল আমায়। আমিও শুরু করলাম,-
“ছাড়ো গো ছাড়ো শোকশয্যা, কর সজ্জা
পুনঃ কনক-কমল-ধন-ধান্যে!”
-এরপর যেটা ঘটল সেটা আমার কল্পনার বহু-বহু মাইল দূরে। গানটা শেষ হতে না হতেই কুয়াশাটাও যেন কেটে গেল এক মুহূর্তে। কিন্তু এ কী দেখছি আমি ? যারা এতক্ষণ গান গাইছিল তাদের সবার মাঝে আমার বাবা দাঁড়িয়ে। বাবার যেন বয়স বেড়েছে আরও। পাক ধরেছে চুল-দাড়িতে।
বাবা আমাকে হাত বাড়িয়ে ডাকলেন, ‘দাঁড়িয়ে রইলি যে ? আয় কাছে আয় ?’
বাবার কথার উত্তর না দিয়ে ভয়ে ভয়ে সবার মুখের দিকে এক-এক করে চাইলাম আমি। সবাই হাসি হাসি মুখে হাতের ঈশারায় ডাকছে আমায়। কেউ কেউ আমার চেনা, কাউকে কাউকে মনে পড়ছে না কিংবা চিনিই না। তবে যতজনকে আমি চিনতে পারছি তারা কেউ বেঁচে নেই। এতক্ষণে একটা শীতল ভয় ধীরে ধীরে জড়িয়ে ধরছে আমাকে। পা দুটো নিজেদের দৌড়ের উপর ভরসা হারিয়ে কাঁপছে ঠকঠক করে।
‘কাকু ডাকছে শুনতে পাচ্ছিস না ?’ স্মৃতি ধাক্কা দিল আমাকে। আর একটু হলে হুমড়ি খেয়ে জলেই পড়তাম।
‘ভয় পাচ্ছিস কেন ? আয়, কাছে আয়। বাবাকে ভয় পায় পাগল ?’

[তিন]
আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলে ভয়েই মরে যেতাম। ওখান থেকে কোনক্রমে বেঁচে ফিরেছি আমি। ওখানে যতজন ছিল সবাই মৃত। এমন কি স্মৃতিও বেঁচে নেই। তবে আমি যখন ছুটে আসছিলাম কেউ আমাকে তাড়া করেনি। শুধু স্মৃতি আমার নাম ধরে কয়েকবার ডেকেছিল। আমি সাড়া দিইনি।
একটা সময় ভাবতাম ভূত বা অশরীরী বলে কিছুই হয় না। আজকে হাড়ে হাড়ে বুঝলাম, হয় কি হয় না। তবে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম, অতগুলো অশরীরীর সামনে দাঁড়িয়ে আমার মূর্ছা যাওয়া উচিৎ ছিল। অথচ যতটা ভয় পাওয়া উচিৎ ততটা ভয়ও পাইনি আমি।
চোখ-মুখ-কপালের ঘাম মুছে সদর দরজা ঠেলে ঘরের অন্ধকার গলিটায় ঢুকলাম। কিন্তু গলিটায় ঢুকেই বেশ তাজ্জব লাগল। হঠাৎ কেন জানি না ঘরের ভেতর বেশ ভিড় জমেছে। মেয়েলি সুরের সমবেত কান্না ভেসে আসছে ঘরের উঠোন থেকে। ‘মায়ের কিছু হয়নি তো ?’ বুকটা শিউরে উঠল আমার। লম্বা পা ফেলে উঠোনের দিকে এগিয়ে এলাম। না, মায়ের কিছু হয়নি। তনু কাকিমার কাঁধে মাথা রেখে মা অপলক ভাবে নীচের দিকে তাকিয়ে। মায়ের কিছু হয়নি দেখে অনেকটা ভরসা ফিরে পেলাম। মা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। মায়ের কিছু হলে আমি তো মরেই...
কিন্তু ওটা কাকে শোয়ানো আছে আমাদের বাড়ির উঠোনে! ভিড়ের ভেতর দিয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে এলাম আমি। একটা ক্ষতবিক্ষত থেঁতলে যাওয়া লাশ! মুখটা চেনা না গেলেও পোশাকগুলো আমার পরিচিত। ওই জিন্স আর মেরুন রঙের পাঞ্জাবিটা গত বছর পূজায় অমল মামা আমাকেই কিনে দিয়েছিল। তারমানে কালকের ওই ট্রাকটা... মাথাটা বনবন করে ঘুরে গেল আমার। পড়েই যাচ্ছিলাম, ভাগ্যিস স্মৃতি ভিড়ের ভেতর থেকে শক্ত করে আমার হাতটা ধরল।
স্মৃতি ভিড়ের ভেতর থেকে টেনে আনল আমাকে, ‘বাচ্চা মানুষের মতো কাঁদছিস কেন পাগল ? চল এখান থেকে। নিজের লাশ নিজেকে দেখতে নেই।’
‘কিন্তু আমার মা যে...’
‘সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই চাইলেও আর ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারবি না। সব দেখতে পাবি শুনতে পাবি কিন্তু তোর অস্তিত্ব ওদেরকে আর বোঝানো চলবে না। দুদিন বাদে তোর মা তোকে দেখে ফেলার ভয়েই রাতের অন্ধকারে একা একা ভয় পাবে। এপার আর ওপারের ভেতর এটাই ফারাক।’
‘কিন্তু তুই আমাকে টানতে টানতে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস ?’
‘চল না দারুণ একটা যায়গা দেখাব। তোর নিশ্চিত মনে হবে এর চেয়ে সুন্দর স্বর্গও নয়।’
‘কিন্তু বিশ্বাস কর আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আমি আর বেঁচে নেই ? আমি মরে গেছি ! এটা মেনে নিতে পারছি না যে। আমার মা, খেলার মাঠ, বন্ধু, কলেজ, বড় হওয়ার স্বপ্ন সব হারিয়ে গেল এক মুহূর্তে !’
‘কোনও কিছু হারানোর জন্য এক মুহূর্তই তো যথেষ্ট। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাদে কতগুলো সিনিয়ার ছেলে আমাকে একা পেয়ে... এটাই নিয়তি। মেনে নিতে না পারলেও মানিয়ে নিতে হয়।’
‘আমার এখন কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘কিন্তু তোকে একা ছেড়ে রাখার অনুমতি নেই আমার কাছে। বলছি তো দারুণ একটা যায়গায় নিয়ে যাব, ওখানে তোর মন ঠিক ভাল হয়ে যাবে। আর তবুও যদি কান্না পায় তখন না হয় আমার বুক দুটো চোখের জলে ভিজিয়ে দিস। আমারও অপেক্ষার তীব্র জ্বালা মিটবে।’
আর আমার উত্তর শোনার অপেক্ষা করল না স্মৃতি। আমার হাত ধরে হাওয়ায় হাঁটতে শুরু করল এবার। জানি না কোথায় আমাকে নিয়ে যাবে ও। নিয়ে যাক যেখানে খুশি নিয়ে যাক। আমি তো আর ওপারের কেউ নই। আমার আর কোনও বড় হওয়ার দায় নেই। এতদিন ওপারে মায়ের বুকে বেঁচেছি। আজ আর আমার কোনও মা নেই। এবার এপারে যৌবন কড়া নাড়ছে হৃদয়ের দরজায়। এখনই সময় মুখ গোঁজার মতো নিটোল দুটো বুক খুঁজে নেওয়ার। নতুবা কাঁদব কোথায় ?
                                                                          [সমাপ্ত]
www.amarsahitya.com
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments