রক্তচোষা শকুন

রক্তচোষা শকুন

Advertisemen

রক্ত চোষা শকুন


                                                               বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


সেই ছোটবেলা থেকেই বক্সা জয়ন্তী বেড়াতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। এই বক্সা জয়ন্তী নিয়ে কত গল্প পড়েছি, কত ভ্রমণ পড়েছি। শেষ পর্যন্ত সুযোগটা দেরি করে হলেও এলো কিন্তু। স্কুলের তিনটা ছুটি পাওনা ছিল ওটা নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম আমার শৈশব স্বপ্ন পুরির পথে।
        বাসের সিঙ্গেল স্লিপারে শুয়ে জ্যোৎস্না ভেজা চা বাগান গুলোকে দেখতে দেখতে কত কী যে মাথায় আসছিল বলে বোঝাতে পারব না। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুই চায়ের বাগান। করিমগঞ্জ ঢোকার আগে থেকেই শুরু হয়েছে চায়ের বাগান গুলো। অনেকটা পিছনে ফেলে এসেছি ফারাক্কা ব্রিজ। জ্যোৎস্না রাতে ফারাক্কার সৌন্দর্যও মনে রাখার মতো। মোটের উপর প্রকৃতির সৌন্দর্যে চোখ ডুবিয়ে সারা রাত আমার ঘুম আসেনি।
        বাসটা সকালে যখন শিলিগুড়ি পৌঁছল তখন ঘড়ির কাঁটায় নটা বেজে পাঁচ। এবার আমাকে আলিপুর দুয়ারের জন্য আবার বাস ধরতে হবে। শিলিগুড়িতে নেমে পেট-পূজাটা সেরে নিলাম। পেটটা ঠাণ্ডা হলে চড়ে বসলাম ‘আলিপুর দুয়ার সুপার ফাস্ট’- নামের একটা বাসে। সত্যিই সুপার ফাস্ট। আমবাড়ি জামবাড়ি তেতুলবাড়ি কাঁঠালবাড়ি প্রত্যেকটা বাড়িতে দাঁড়িয়ে সুপার ফাস্ট বেলা দুটার সময় এসে পৌঁছল আলিপুর দুয়ারে। আলিপুর দুয়ার ঢোকার আগে থেকেই উত্তরবঙ্গ নিজের ভিন্নতার পরিচয় দিচ্ছিল আমাকে। এত সবুজ আমি এর আগে দেখিনি। দেখিনি এমন সুন্দর সুন্দর সব কাঠ আর টিন পাতের তৈরি বাড়ি ঘর। পুরো পরিবেশটা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির নির্মল প্রলেপ।
        একটা ভাল হোটেল দেখে এবার মাছ ভাত দিয়ে শান্ত করলাম পেটের ভেতর ছুটতে থাকা ইঁদুরটাকে। যদিও অভ্যাস নেই তবুও ভাতের পর একটা মিষ্টি পান গালের ভেতর ভরতে কিন্তু মন্দ লাগল না। আলিপুর দুয়ারে ঢোকার পর থেকেই দেখছি এখানে পানের রেওয়াজটা বেশ খানদানী। পানের পিকটা ডাস্টবিনে ফেলে পান দোকানদারকেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা ভাই বক্সা জয়ন্তী যাওয়ার জন্য এখান থেকে কোনও বাস পাওয়া যাবে ?’
দোকানদার বেশ কিছুক্ষণ চাইল আমার দিকে তারপর বেশ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে নতুন ?’
বললাম, ‘হাঁ প্রথমবার এসেছি।
‘বুঝতে পেরেছি। তা বক্সা জয়ন্তীর জন্য বাস তো আপনি পাবেন না। আপনাকে অটো ভাড়া করতে হবে।
‘অটো কোথায় পাব ?’
দোকানদার আঙুল বাড়িয়ে বললেন, ‘ওই চৌমাথার মোড়ে গিয়ে দাঁড়ান পেয়ে যাবেন।
        আমি আর সময় নষ্ট না করে চটপট চৌমাথার মোড়ে এসে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেই বুঝতে পারলাম ওদিকে প্যাসেঞ্জার অটো চলে না, অটো রিজার্ভ করতে হয়। দক্ষিণা তিনশ টাকা। তাতেই তথাস্তু। চড়ে পড়লাম একটা অটোতে। ছোট্ট শহরটা পেরিয়ে যেতেই শুরু হল শাল অর্জুন আর সেগুনের জঙ্গল। জঙ্গলের বুক চিরে রাস্তাটা চলে গেছে বক্সা জয়ন্তীর দিকে। এক জায়গায় এসে দেখলাম রাস্তাটা দুটো ভাগে ভাগ হয়েছে। অটো ড্রাইভার বাঁদিকের রাস্তাটা দেখিয়ে বলল, ‘ওই রাস্তাটা ভুটান যাচ্ছে।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভুটান এখান থেকে কতদূর ?’
ড্রাইভার এক কথাতেই উত্তর দিল, ‘সামনেই।
        রাস্তার যেন আর শেষ হয় না। অটোটা জঙ্গল ভেদ করে ছুটছে আর ছুটছে। হটাৎ চোখে পড়ল একটা ময়ূর। পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে উড়ে গেল ময়ূরটা। চরম উত্তেজনায় ড্রাইভারকে বললাম, ‘ভাই ময়ূর চোখে পড়লে একটু দাঁড়িও।
ড্রাইভার হাসি মুখে বলল, ‘দাদা এটা জঙ্গল, পার্ক নয়। এখানে হাতি গণ্ডার বাঘ বাইশন সবেই আছে। এই নির্জন রাস্তায় দাঁড়ানোটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বুঝতেই পারছেন নেহাত পেটের দায় নতুবা বিকেলের দিকে এই পথে আসার রিস্ক নিতাম না।
        ড্রাইভারের কথায় এতক্ষণে আমার খেয়াল হল শীতের দুপুর নিজের অজান্তেই গড়িয়ে গেছে। সঙ্গে আরেকটা কথা খেয়াল হল,- এটা পার্ক নয় এটা জঙ্গল। কেন জানি না ড্রাইভারের কথার ভঙ্গিটা ভাল লাগল না আমার। তাহলে কী আমি ভয় পাচ্ছি ? মনে মনে ভাবলাম এখানে ভয় না পাওয়াটাই তো অস্বাভাবিক। রাস্তায় ড্রাইভারের সঙ্গে আর একটাও কথা হল না আমার।
        শেষ পর্যন্ত অটোটা একটা অর্ধমৃত নদীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। বুঝতে পারলাম এটাই জয়ন্তী নদী। এই নদীটার ছবি তো আমি কম দেখিনি। আমাকে ছেড়ে যাওয়ার আগে ড্রাইভার দেখিয়ে দিয়ে গেল কোথায় থাকার জন্য আমি হোটেল পাব। চোখে পড়ল জয়ন্তীর বুকে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকজন নিজেদের ছবি তুলছে। ওদের গাড়িটাও চোখে পড়ল আমার। আমার মতোই হয়তো ওরাও বেড়াতে এসেছে।
দুই
বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর যখন দেখলাম সূর্য পশ্চিম আকাশে তরী ভিড়িয়েছে তখন আমাকে লজের সন্ধানে নদীর চরের দিকেই এগিয়ে আসতে হল। থাকার ব্যবস্থা না হলে সমস্যায় পড়ে যাব তাই আগাম ব্যবস্থা করে নেওয়াই ভাল। অটোর ড্রাইভার যেদিকে বলেছিল সেদিকে কিছুটা এগিয়ে আসতেই চোখে পড়ল একটা লজ। লজের উপরে বড়বড় করে লেখা ‘জ্যোৎস্না জয়ন্তী। সত্যি বলতে এমন লজ আমি এর আগে দেখিনি। পুরোটাই কাঠের বানানো। তায় আবার দোতলা। দূরের থেকে দেখে মনে হচ্ছে মাটি থেকে ফুট পাঁচেক উপরে যেন ঝুলছে লজটা। মাত্র চার কোনায় চারটা মোটা গাছের গুড়ির ভরে দাঁড়িয়ে আছে পুরো কাঠের একটা ইমারত। লজের বাইরের গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে আরও বেশি আশ্চর্য লাগল। বাইরের গেট থেকে রঙবেরঙের নুড়ি পাথর দিয়ে বানানো একটা রাস্তা আঁকাবাঁকা ভাবে গিয়ে লজের দরজায় মিশেছে। রাস্তাটার দুপাশে ফুলের বাগান। বড় বড় গাছের ডাল থেকে ঝুলছে অর্কিড। ঠিক যেন স্বর্গ রাজ্য।
        লজের সামনে এসে দেখলাম এক ভদ্রলোক চেয়ারে বসে টেবিলের উপরে রাখা একটা মোটা খাতায় কীসব লিখে যাচ্ছেন। আমার উপস্থিতি মনে হয় উনি টের পাননি। আমি, ‘নমস্কার জানালে ভদ্রলোক আমার দিকে মুখ তুলে চেয়ে বললেন, ‘বলুন। ভদ্রলোকের গলাটা বেশ ধারালো ঠেকল আমার কানে। আমি হালকা হেসে বললাম, ‘একরাতের জন্য একটা রুম লাগবে।
ভদ্রলোক এক কথায় জানালেন, ‘খালি নেই। কথাটা বলেই উনি আবার লিখতে শুরু করলেন। যে কারণেই হোক না কেন আমার বুকের ভেতরটা ঝম করে উঠল ‘খালি নেই’ কথাটা শুনে। আমি খানিকক্ষণ চুপ থেকে আবার বললাম, ‘অনেক দূর থেকে আসছি কিছু একটা ব্যবস্থা না হলে সমস্যায় পড়ব। তাই বলছিলাম যদি একটু ম্যানেজ করে দিতে পারেন।
সম্ভব নয়। কাকে বলব আপনি বেরিয়ে যান কিংবা পাশের ঘরে অন্যের সাথে থাকুন। সবাই টাকা দিয়ে বুক করেছে মশায়। আজকে মনে হয় পাশের লজেও খালি পাবেন না। সকালে এলে এখানেই হয়ে যেত।
ডবল ভাড়া দিলেও কী কিছু করা যাবে না ?’
        ভদ্রলোক আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না। আর কিছুক্ষণ পরেই জঙ্গলটার বুকে ঝুপ করে অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়বে। এদিকে আলিপুর দুয়ার ফিরে যাওয়াও সম্ভব না। ঠিক এমন সময় কাছে পিঠে কোথাও কয়েকটা শেয়াল ডেকে উঠল। এবার সত্যিই বেশ ভয় ভয় করছে আমার।
        আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভদ্রলোক আবার মুখ তুলে চাইলেন। তারপর কিছু একটা চিন্তা করে বললেন, ‘এখন নদীতে জল কম আছে। নদীর উপর দিয়ে হাঁটতে পারবেন ?’
জিজ্ঞেস করলাম, ‘কতদূর ?’
তাও মাইল দুয়েক ?’
হাঁ পারব। কিন্তু...’
ভদ্রলোক আমার মুখের কথা কাড়িয়ে নিয়ে বললেন, ‘তাহলে আর কিন্তু নয় হাঁটতে শুরু করুণ। নদীটার পশ্চিম দিক বরাবর হেঁটে যান লজটা ঠিক চোখে পড়বে। দেখবেন লজটার বাইরে লেখা আছে,- শেষ রাতের সঙ্গী
তিন
আমি ব্যাগটা কাঁধে তুলে বেরিয়ে পড়লাম। জঙ্গল আর জয়ন্তী নদীর বুকে সন্ধা গড়িয়ে পড়েছে এতক্ষণে। থেকে থেকে করুণ সুরে শেয়াল ডাকছে। অনেক দূরের থেকে ভেসে আসছে বনমোরগের ডাক। পুরো পরিবেশটাই গুমোট। এমন পরিবেশ ভেতরের ভয়টাকে বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। তবুও যতটা দ্রুত সম্ভব আমি পা ফেলে এগিয়ে চলতে লাগলাম। পাহাড়ি নদীর পাথুরে বুকে সাবধানে পা ফেলে ফেলে না চললে খালে পা পড়ে মচকাবার ভয় থাকে। কিন্তু আমি পায়ের চেয়েও প্রাণটাকে বেশি ভালবাসি তাই যতটা দ্রুত সম্ভব আমাকে হাঁটতে হচ্ছে । মরা নদীর বুকে হাঁটতে হাঁটতে অটো ড্রাইভারের কথাটা আরেকবার মনে পড়ে গেল, ‘এখানে হাতি গণ্ডার বাঘ বাইশন সবেই আছে ...’ ভয়ে ভয়ে একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে নিলাম কোনও বন্য জন্তু জানোয়ার পিছু নিয়েছে কি না। কিন্তু ঝাপসা অন্ধকারে কিছুই বোঝা গেল না।
        বড়বড় শালগাছ গুলোর মাথার উপর পরিচিত চাঁদটা বেরিয়ে আসাতে একটু ভরসা হল এবার। এই জলা জঙ্গলে ওই চাঁদটা ছাড়া আর কেউ আমাকে চেনে না আমিও কাউকে চিনি না। বুকের ভয়টাকে দমিয়ে রাখার জন্য একটা গান ভাঁজতে ভাঁজতে এগিয়ে চললাম।
        সময়ের সাথে পরিচিত চাঁদ জ্যোৎস্নার কাপড় মেলে ধরল জয়ন্তী নদীর উপর। পাহাড়ি বুনো ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে ভেতরের ভয়টা সমান তালে পাল্লা দিয়ে শরীরটাকে গরম করে রেখেছে। আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে ছোটবেলার স্বপ্নে দেখা বক্সা জয়ন্তীর কথা গুলোই ভাব ছিলাম। ঠিক এমন সময় হাড় হিম করে দেওয়া কান্নাটা ভেসে এলো। না আমি কোনও ভুল শুনছি না। একটা বাচ্চার কান্না ভেসে আসছে জঙ্গল থেকে। আর এক পা চলার মতো সাহস হল না আমার। হৃৎপিণ্ডের কম্পন টুকুও যেন শুনতে পাচ্ছি এবার। বাচ্চাটা এক নাগাড়ে কেঁদেই চলেছে। যতদূর জানি এখানে কোনও গ্রাম বা বস্তি থাকার কথা নয়। তাহলে বাচ্চাটা জঙ্গলে এলো কেমন করে?
        এক একটা ভয়ার্ত সেকেন্ড পেরিয়ে যাচ্ছে হিসেবের খাতা থেকে। কান্নাটা যেন আমার আরও কাছে এগিয়ে আসছে। আরও আরও কাছে। পা দুটো কাঁপতে শুরু করেছে যথারীতি। কাঁধের ব্যাগটাকেও ভীষণ ভারী বলে মনে হচ্ছে এবার। তাহলে কি পিছন ফিরে ছুটে পালিয়ে যাব ? নিজেই নিজেকে প্রশ্নটা করলাম ঠিকেই কিন্তু উত্তরটা ভেসে এলো একটা ঝোপের ভেতর থেকে, ‘দৌড়বেন না স্যার। ভয়ের কিছুই নেই। ওগুলো শকুনের বাচ্চা কাঁদছে। মুহূর্তের ভেতর মনে পড়ে গেল শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসের কথা। হাঁ শ্মশানে গিয়ে শ্রীকান্তও এমন কান্নার আওয়াজ শুনেছিল। কিন্তু এই ছেলেটা কে ? এ এখন এখানে কী করছে ?
একটা বার তেরো বছরের ছেলে ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে নিজেই নিজের পরিচয় দিল আমাকে, ‘ওই লজে যিনি আপনাকে এখানকার ঠিকানা বলেছেন উনি আমার বাবা। বাবা ফোনে বললেন আপনার আসার কথা। তা আপনার আসতে দেরি হচ্ছে দেখে আমি নিজেই এগিয়ে এলাম খানিকটা।
অন্ধকারে একা একা আসতে তোমার ভয় করল না ?’ প্রশ্নটা জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারলাম না।
ছেলেটি এক গাল হেসে উত্তর দিল, ‘আকাশে চাঁদ থাকলে আমার ভয়-টয় লাগে না।
তোমার বাবা তো ওখানের লজে আছেন তুমি কি তাহলে মায়ের সঙ্গে এখানে থাকো ?’
মা কোথায় পাব স্যার ? সে তো কবেই পালিয়ে গেছে।
        বাচ্চাটার সাবলীল উত্তর শুনে আমার আর ওকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হল না। আশ্চর্য লাগছিল এটা ভেবেই যে একটা বাচ্চা একাই একটা লজের দেখা শোনা করে! এটাও কি সম্ভব ? পথ চলতে চলতে আমি ওর নাম জিজ্ঞেস করাতে ও জানালো ওর নাম প্রকাশ। প্রকাশ অধিকারী।
        আরও মিনিট কুড়ি চলার পর আমরা এসে দাঁড়ালাম ‘শেষ রাতের সঙ্গী’-র সামনে। এই লজটাও কাঠের বানানো দোতলা। তবে লজটা যে বেশ পুরানো সেটা বাইরে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলোতেও বোঝা যাচ্ছে। ছেলেটা আমার ভেতরের ভাবনা আন্দাজ করতে পেরে বলল, ‘লজটাকে ভেতর থেকে না দেখলে আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না এটা কতটা সুন্দর। চলুন ভেতরে চলুন।
        না, মিথ্যে বলেনি প্রকাশ। বেশ সুন্দর কিন্তু লজটা। ভেতরে ঢুকে বোঝার উপায় নেই যে লজটা কাঠের বানানো। মৃদু মোমবাতির আলোতেও ঘরের আলমারি, পালঙ্ক ঝকঝক করছে। প্রায় প্রতিটা আসবাব সেগুন কাঠের। তার উপর আবার বার্নিশ করা। পায়খানা বাথরুমটাও ছিমছাম। এক কথায় বললে লজটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। কথায় কথায় প্রকাশের মুখে জানতে পারলাম, - এই লজে এখন আর তেমন কেউ আসে না। প্রায় প্রতিটা দিন প্রকাশের একলা কাটে। ওর বাবা কোনদিন কোনদিন খাবার পৌঁছে দিতে আসে আবার কোনদিন প্রকাশ নিজেই ওই লজে গিয়ে খাবার খেয়ে আসে। তবে রাতের খাবার ও নিজেই বানিয়ে নেয়।
চার
আমি প্রকাশকে আমার জন্য খাবার বানাতে মানা করে দিলাম। আমার সঙ্গে যে চিঁড়ে ভাজা আর বাদাম আছে তাতে অনায়াসে আমার রাতের আহার হয়ে যাবে। খাবার চিন্তা ভুলে আমি উত্তর দিকের খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে জয়ন্তী নদীর চরে জ্যোৎস্নার খেলা দেখছিলাম। এমন সময় প্রকাশ এসে এক বোতল খাবার জল টেবিলে রেখে শুভরাত্রি জানিয়ে গেল। জয়ন্তী নদী আর জঙ্গলের বুকে জ্যোৎস্নার ঢল নেমেছে এখন। দূর থেকে ভেসে আসা রাতচোরা পাখি আর শেয়ালের ডাককেও এতক্ষণে বেশ মনোরম বলেই মনে হচ্ছে আমার। ভেতরকার ভয়টা এখন আর নেই।
        এভাবে ঘণ্টা খানেক জ্যোৎস্নার খেলা দেখার পর চিঁড়ে ভাজা আর বাদাম সহযোগে রাতের আহার সেরে শুয়ে পড়লাম। খাবারের প্লেটটা আপাতত মেঝেতেই পড়ে রইল। সারাদিন যা ধকল গেছে তাতে নিদ্রা দেবী চোখের পাতায় নেমে আসতে বিশেষ সময় নিলেন না। নানান ভাবনার ভিড়ে ঘুরতে ঘুরতে একটা সময় নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
        রাত্রি তখন ঠিক কটা হবে বলতে পারব না। একটা পাখির বিকট চিৎকারে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। বালিশের নীচ থেকে মোবাইলটা বের করে টর্চটা জ্বালাতে গিয়ে দেখি চার্জ নেই মোবাইল বন্ধ পড়ে আছে। ঘরের মোমবাতিটা কখন নিভে গেছে সেটা আমার জানার কথা নয়। উত্তর দিকের খোলা জানালাটা দিয়ে চাঁদের আলো এসে বিছানায় পড়ছে।
        বেশ কিছুক্ষণ কান খাড়া করে রইলাম। কিন্তু কিছুই শুনতে পেলাম না। ভাবলাম স্বপ্ন দেখেছিলাম হয়তো। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে সবে শুয়েছি আবার ভেসে এলো সেই চিৎকার। প্রায় এক লাফে উঠে বসলাম বিছানায়। উত্তর দিক থেকেই ভেসে এলো চিৎকারটা। একবার ভাবলাম পাশের ঘরে গিয়ে প্রকাশের ঘুম ভাঙাই পরে আবার মনে হল না থাক নিজের ভয় কাটাতে যদি একটা বাচ্চাকে...। তাছাড়া ছেলেটা যখন এখানে একাই থাকে তখন নিশ্চয় ভয়ের কিছু হবে না।
        চিৎকারটা আরেকবার ভেসে এসে আমার কানে ধাক্কা খেল। এবার যেন খুব কাছাকাছি শোনা গেল চিৎকারটা। খানিটা সাহস অবলম্বন করে উত্তরের জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রথমটায় চোখে কিছু না পড়লেও পরের মুহূর্তে যা দেখলাম তাতে আমার হার্টফেল হওয়ার জোগাড়। পা দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। অনুভব করলাম শরীরের প্রতিটা শিরায় প্রতিটা ধমনীতে রক্তের বদলে হোহো করে ভয় প্রবাহিত হচ্ছে। জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে প্রকাশ একটা জ্যান্ত বনমোরগকে ছিঁড়ে খুবলে খাচ্ছে মহানন্দে। মোরগটা ঝটপট করছে যন্ত্রণায়। এর চেয়েও ভয়ংকর প্রকাশের শারীরিক পরিবর্তনটা। প্রকাশ যেন আস্ত একটা শকুন। জ্যোৎস্নার আলোতেও জ্বলজ্বল করছে ওর চোখ দুটো। বিশালাকার ঠোঁট দুটো থেকে গড়িয়ে পড়ছে টাটকা রক্তের ধারা।ও কি আমাকে দেখতে পাচ্ছে ?
প্রচণ্ড ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে আসতেই আমার পায়ে লেগে মেঝেতে নামিয়ে রাখা খাবারের প্লেটটা গেল উল্টে। মুহূর্তের ভেতর একটা দৈত্যাকার শকুন উড়ে এসে বসল জানালায়। বনমোরগটাকে দূরে ছুড়ে দিয়ে প্রাণপণ চেষ্টায় শকুনটা জানালা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে শুরু করল এবার। আমার অসহয় মুখের দিকে তাকিয়ে রক্তমাখা ঠোঁটে হাসছে শকুন রূপী প্রকাশ। আমি কোনও ভাবেই বোঝাতে পারব না ওই হাসিটা ঠিক কতটা ভয়ংকর। বুঝতে পারছি আমার হাত পা অসাড় হয়ে আসছে। প্রচণ্ড ভয়ে শক্তি শূন্য হয়ে পড়ছে শরীরটা। আর একটু পরেই জানালাটা ভেঙে ঢুকে পড়বে শকুনটা...
        এরপর আমার আর কিছুই মনে নেই। যখন চোখের পাতা খুললাম তখন আমাকে ঘিরে বেশ কয়েকজন বয়স্ক মানুষ বসে রয়েছেন। কিন্তু এটা কোথায় পড়ে রয়েছি আমি ? লজটায় বা কোথায় ? আমি উঠে বসার চেষ্টা করায় এক বয়স্ক ব্যক্তি নিষেধ করে বললেন, ‘আরও একটু বিশ্রাম করো বাবা। ভগবানের কৃপায় এখনো বেঁচে আছো। আমরা কাঠ কাঠতে এসে দেখি তুমি এখানে পড়ে শকুন শকুন করে গোঁ গোঁ করছ। ওই শকুন শকুন শব্দেই আমরা যা বোঝার বুঝে গেছলাম।
কিন্তু লজটা গেল কোথায় ?’
আরেক বয়স্ক উত্তর দিলেন, ‘ছিল, একটা লজ ছিল এখানে। কিন্তু চল্লিশ বছর আগে এক ভূমিকম্পে তলিয়ে গেছে।
কিন্তু কালকেই তো...’
প্রথম বয়স্ক মানুষটি আমাকে আর কথাটা শেষ করতে দিলেন না। বললেন, ‘তুমি যা যা বলবে এর কোনটায় আমাদের অজানা নয়। এমন অনেকবার হয়েছে। তোমার মতো কয়েক জন মাত্র বেঁচে ফিরেছে। চল্লিশ বছর আগের এক ভূমিকম্পে বাপ ব্যাটার সঙ্গে সেদিন লজ দুটাও তলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওরা কীভাবে রক্ত চোষা শকুন হয়েছে এটা কেউ জানে না। তবে হাঁ, বাপটা খুব ভালবাসত ব্যাটাকে। তাই হয়তো মরার পরেও ব্যাটার জন্য এখনো খাবার পাঠায়।’
আরেকজন বললেন, ‘আমরা দিনের আলোতেই এদিকে আসতে ভয় পাই। গাঁয়ের রোম দাঁড়িয়ে পড়ে। আর তুমি সারা রাত… ঈশ্বর তোমায় রক্ষ্যা করেছেন। এখানে আর থেকো না বাবা সোজা বাড়ি চলে যাও। তুমি শয়তানের চোখে পড়েছ তোমাকে সহজে ছাড়বে না।
***
এখন দুরন্ত গতিতে বাসটা শিলিগুড়ির পথে ছুটছে। আমি জানালার ধারে বসে বক্সা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছি। জানি এই হিসেব মিলবে না কোনদিন। ফেরার পথে ‘জ্যোৎস্না জয়ন্তী’ নামের লজটারও খোঁজ করেছিলাম কেউ কিছুই বলতে পারেনি। মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়ে বাসের জানালাটা বন্ধ করে দিলাম। এখন আর বক্সা পাহাড়টাকেও দেখা যাচ্ছে না।
[সমাপ্ত]


Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments