গল্প ফেরিওয়ালা

গল্প ফেরিওয়ালা

Advertisemen

                                ফেরিওয়ালা
বাসের জানালার ধারে বসে সুলেখা দূরের দিকে তাকিয়ে আছে । কতো যাত্রী উঠছে নামছে সুলেখার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। দূরের প্রকৃতির আঁচলে দৃষ্টি পড়ে ঠিকরে যাচ্ছে কোন অতীত দিনের বিকেল রঙের আলোয়। বাঁ হাতে কোরে চোখের জল মুছে সুলেখা আবার হারিয়ে যায় বনানির ছায়ায়। একদিন এই পথ ধরেই যাতায়াত করত সঞ্জয় এর সাথে, মাঝে মাঝে কবিতার বই নিয়ে বসত, গাছের নিচের পড়ে থাকা পাতার উপর। সেসব কবেকার হারিয়ে যাওয়া মন পোড়ান কলেজ জীবনের গল্প। মা বাবার অমতেও একদিন বাড়ি ছেড়েছিল সঞ্জয়ের হাতে হাত রেখে । টিকলো না শেষ অবধি সম্পর্খটা । বাঁধনটা আলগা হতে হতে কবেই খুলে গেছে। যদিও বাঁধন খোলার জন্য ও নিজেই দায়ি, দুরন্ত যৌবনের জটিল জালে জড়িয়ে এক দিন নিজেই সঞ্জয়ের সিন্দুরের উপর আরেক হাতের সিন্দুর চাপিয়ে ছিল। আজ সেই লালিমাও হারিয়েছে নিভে আসা যৌবনের দরজায় দাঁড়িয়ে। তাই আবার পাড়ি সেই ফেলে আসা বাড়ির বিছানার দিকে।
পড়ন্ত বিকেলের হলুদ রঙ টুকু ঝুলছে সুলেখার চোখের জলে। একটা মন্দির দেখে ধড়ফড় কোরে উঠে পড়ে সুলেখা, বিষ্ণুপুর এসে গেছে ।আবার কতো বছর পর লাল মাটিতে পা পড়ল সুলেখার । অনেক আশা আকাঙ্খা বুকে নিয়ে তার আবার এখানে আসা।মনের ভেতর সঞ্জয়ের জানালা বেয়ে যে ক্ষীণ আলো আসছে ওটাই হয়ত বাঁচার শেষ স্বপ্নটুকু । সহর হতে না পারার অভিমানে বিষ্ণুপুর যেন আজ সন্ধ্যার আলো ফোটাতেই ভুলে গেছে। এখানের পথ ঘাট সুলেখার স্মৃতির এলবামে যত্নে বাঁধানো। তাই পা কে চেনাতে হবেনা ফেলে যাওয়া রাস্তাটুকু।
২।
অবশেষে দূরের দোকানের আলো গুলো একটা একটা কোরে ফুটে উঠছে রাস্তার ধারে। মন্ত্র মুগ্ধের মতো চলছে পা দুটো সঞ্জয়ের দরজার দিকে ।সঞ্জয় দ্বিতীয় বিয়ে করেছে কিনা সেটা ভাবার মতো সাহস টুকুও এখন তার নেই। বুকের অন্তর্বাস ঘামের সাথে শরীরে চিটে গেছে, ঐতো ঐ গলির শেষের বাড়িটাই সঞ্জয়ের।কানের পাস দিয়ে সাপের মতো গড়িয়ে নামছে গরম ঘাম।আর যে পা চলতেই চাইছেনা অজানা অশনি সংকেতের ভয়ে। তবুও যোর কোরে পা দুটোকে টানতে টানতে বাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে সুলেখা। হাজার প্রশ্নের পাখিগুলো মাথার উপর বসে আবিরাম কিচির মিচির করছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চেষ্টা কোরেও কান্না টাকে চাপা দিতে পারছেনা, ইচ্ছে করছে ছুটে পালিয়ে যেতে। কিন্তু কোথায় যাবে সে ? সব ঠিকানাই এখন হারিয়েছে দিন বদলের সাথে সাথে, যৌবনের মধু শুকিয়ে শুধু দেহের মৌচাক টাই পড়ে আছে শাড়ির নিচে। কাঁপা কাঁপা হাতে কলিং বেল টায় চাপ দেয় সুলেখা । সন্ধ্যার নীরবতা নষ্ট কোরে চিৎকার কোরে বেজে উঠল বেল টা। অনেক ক্ষণ কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আবার চাপ দিল সুইচ টাতে। আবার কেঁপে উঠল বাড়িটা। অনেক দূরে তখন বেশ কয়েকটা কুকুর লড়াই করছে, এলাকা দখলের লড়াই। 
৩।
গল্প টা এখানেই শেষ হতে পারত কিন্তু হলনা, মৃদু শব্দ কোরে খুলে গেল আট বছর আগের ফেলে যাওয়া দরজা টা। আলো আঁধার আবছা সন্ধ্যাতেও সুলেখা দেখল শকুন্তলা দেবীর বাসি ফুলের মতো হটাত শুকিয়ে যাওয়া মুখটা। কারো মুখে কোন সাড়া শব্দ নেই, বিশ্বের যত নীরবতা যেন আজ এখানে এসে থেমেগেছে  মা বলে ডাকাটাও যে বড় সোজা কথা নয় । কিংকর্তব্য বিমুর হয়ে সুলেখা শকুন্তলা দেবীর ঠাণ্ডা পায়ে হাত রাখল, শকুন্তলা দেবীর মুখে কোন সাড়া শব্দ নেই ।যেন কোন অভিমানী দানব প্রাণপণ চেষ্টায় মুখ চেপে আছে। নাট্য মঞ্চের থেকে সরে যাবার মতই সুলেখা সরে গেল সিঁড়ির দিকে, একপা একপা কোরে উঠতে লাগলো উপরে । সঞ্জয় হয়ত দ্বিতীয় বউএর সাথে সন্ধ্যার খুনসুটিতে ব্যস্ত, কিম্বা আনমনে ডুবে আছে শক্তি সুনীলে।
আলতো ভাবে ঠেলা দিতেই খুলে গেল কপাট দুটো, কোথায় সঞ্জয়, বিছানা বা চেয়ার দুটোই ফাঁকা পড়ে। বেশ একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এলো নাক মুখ দিয়ে। যাক নিজেকে একটু সামলে নেওয়া যাবে। সঞ্জয় এই সন্ধ্যার দিকে একটু ক্লাবে যায় বরাবর, ও ফিরলে কী ভাবে ফেস করবে সেই এলোমেলো কথা গুলো আবার মনে মনে ঝালিয়ে নিতে থাকে সুলেখা। টেবিলের বই গুলতে ধুলো জমেছে, বাড়ির কোনায় মাকড়শার বাসা, পশ্চিমের জানালার উপর একটা টিকটিকি দেখছে আগন্তুককে । একটা অজানা অচেনা ভয় আবার বিদ্যুতের মতো খেলে গেল মাথায়। দ্বিতীয় বার বিয়ের কোন ছাপ নেই বাড়ি টাটে। এবার সুলেখা চুপচাপ বসল বিছানায়। হাজার যদির প্রশ্ন উঠছে বুকের থেকে বুদবুদের মতো। আর ভাবতে পারছেনা সুলেখা, গা বমি বমি করছে ভাবনায়।
৪।
এভাবে অনেকটা সময় বসে থাকার পর সুলেখা অনুভব করল ধীর ভাবে দুটো পা উঠে আসছে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে, সঞ্জয় কী তবে বাড়ি ফিরেছে! এবার গলাটাও শুকিয়ে আসছে, থরথর করছে বুক দুটো। পায়ের আওয়াজ ক্রমশ সামনে আসছে, আরও আরও সামনে, একদম দরজার কাছাকছি চলে এসেছে এবার । দুহাতে মুখ ঢেকে সুলেখা মৃদু সুরে গুমরে উঠল “ভগবান” । দাঁড়িয়ে গেল পা দুটো দরজার সামনে। উপরের দিকে মুখ কোরে আবার একবার ভগবান কে ডেকে নিল সুলেখা। হাতের আড়াল সরে যেতেই চোখ পড়ল সঞ্জয়ের একটা ছবির উপর -  অভিমানী চোখ দুটোতে কতো প্রশ্ন লেগে আছে, ঠোটের কোনে একটা ব্যেঙ্গের হাসি, গলায় ঝুলছে অনেক দিন আগের একটা শুকনো ফুলের মালা। সুলেখা এবার চিৎকার কোরে বলে উঠল- ‘‘ভগবান’’  । ফুলের মালাটা শুধু দুলতে লাগলো, আর দুলতে লাগলো ।
                                                বাপ্পাদিত্য         
Advertisemen

Disclaimer: Gambar, artikel ataupun video yang ada di web ini terkadang berasal dari berbagai sumber media lain. Hak Cipta sepenuhnya dipegang oleh sumber tersebut. Jika ada masalah terkait hal ini, Anda dapat menghubungi kami disini.
Related Posts
Disqus Comments